২০২০ সালের ১৫ অগস্ট গড়বেতার বহড়াশোল জঙ্গলে এক ২১ বছরের তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় মেদিনীপুর প্রথম অতিরিক্ত জেলা দায়রা আদালত (বিচারক উদয় রানা) তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। প্রত্যেকের উপর ১ লক্ষ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারকে নির্যাতিতাকে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ বছর আগের স্বাধীনতা দিবসে পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা থানার অন্তর্গত বহড়াশোল এলাকার জঙ্গলে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনার রায় ঘোষণা করল আদালত। মেদিনীপুর প্রথম অতিরিক্ত জেলা দায়রা আদালতের বিচারক উদয় রানা বৃহস্পতিবার তিন অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। একই সঙ্গে প্রত্যেকের উপর এক লক্ষ টাকা করে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়—আদালত নির্দেশ দিয়েছে, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীকে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
এই রায় শুধুমাত্র একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়—এটি গ্রামাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় নারী নিরাপত্তা, বিচার প্রক্রিয়ার গতি, সাক্ষ্যপ্রমাণের গুরুত্ব এবং পুনর্বাসনের প্রশ্নে একাধিক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে, যে অপরাধ সমাজকে নাড়িয়ে দেয়—তার বিচার যখন দীর্ঘসূত্রিতার পরে হলেও সম্পন্ন হয়, তখন তা একদিকে যেমন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের পথে আস্থা জোগায়, তেমনই অপরদিকে অপরাধীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে।
সরকারি আইনজীবী দেবাশিস মাইতির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১৫ অগস্ট ওই তরুণীকে বিয়ের নাম করে জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিলেন এক যুবক (যিনি নির্যাতিতার প্রেমিক বলেও বর্ণিত)। পরে সেখানে তাঁর কয়েক জন বন্ধু ও পরিচিত মিলে ওই তরুণীর উপর যৌন নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ধরনের ঘটনা সাধারণত নিছক ‘হঠাৎ’ ঘটে যাওয়া অপরাধ নয়—এখানে বিশ্বাস, সম্পর্ক, নিরাপত্তা—সবকিছুর ভিত নড়িয়ে যায়। ভুক্তভোগী যদি অভিযুক্তকে আগে থেকে চেনে, তাহলে অভিযোগ জানানো আরও কঠিন হয়ে ওঠে—কারণ তখন পরিবার, সমাজ, সম্পর্ক, অপবাদ—সব মিলিয়ে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। এই মামলার ক্ষেত্রেও অভিযোগের কাঠামো থেকে স্পষ্ট, অভিযোগকারিণীকে পরিচিত পরিসরের মানুষই টার্গেট করেছিল—যা আরও উদ্বেগজনক।
ভারতের বিচার ব্যবস্থায় নাবালকদের ক্ষেত্রে আলাদা আইন ও আলাদা আদালত রয়েছে—কারণ তাদের বয়স, মানসিক বিকাশ ও সংশোধনের সম্ভাবনা বিবেচনা করে বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। তবে নাবালক হলেও যদি অভিযোগ গুরুতর হয়, সে ক্ষেত্রেও আইন নির্দিষ্ট পথ দেখায়। এই মামলায় সেই পৃথক প্রক্রিয়াই অনুসৃত হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।
মামলার বিচারপর্বে ১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয় বলে খবরে উল্লেখ। সাক্ষ্যপ্রমাণ ও নথি খতিয়ে দেখার পর আদালত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬(ডি) ধারায় তিন জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
যৌন অপরাধের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সামাজিক চাপ, ভয়, হুমকি বা লজ্জার কারণে সাক্ষীরা পিছিয়ে যান—ফলে মামলা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সেই জায়গায় ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ, তদন্তের ধারাবাহিকতা, এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে মামলাটির বিচারিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছেন আইনজীবীদের একাংশ।
আদালত তিন দোষীর ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণা করেছেন এবং প্রত্যেকের উপর ১,০০,০০০ করে জরিমানা ধার্য হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারকে ভুক্তভোগীকে ১০,০০,০০০ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সাজার এই তিনটি স্তর—(১) কারাদণ্ড, (২) জরিমানা, (৩) রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ—আসলে অপরাধের শাস্তি ও ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন, দু’দিককেই গুরুত্ব দেয়। শুধু অপরাধীকে জেলে পাঠানোই শেষ কথা নয়—ভুক্তভোগীর জীবন নতুন করে গড়ার জন্য আর্থিক সহায়তা, চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সাপোর্ট—এসবও জরুরি। ক্ষতিপূরণ সেই পুনর্বাসনেরই এক অংশ।
ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ডি (Gang rape) ধারায় বলা আছে—যদি কোনও নারীকে একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে, তাহলে প্রত্যেককেই ধর্ষণের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং শাস্তি হবে কঠোর। এই ধারায় ন্যূনতম ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, যা যাবজ্জীবন পর্যন্ত হতে পারে, এবং জরিমানারও বিধান রয়েছে।
এই ধারা প্রণয়নের মূল লক্ষ্য ছিল—দলবদ্ধ যৌন অপরাধে “কে কতটা করেছে” ধরনের ফাঁকফোকরকে কমিয়ে আনা। কারণ দলবদ্ধ অপরাধে অনেকে “আমি সরাসরি করিনি” বলে দায় এড়াতে চায়। কিন্তু আইন স্পষ্টভাবে যৌথ দায়ের ধারণাকে জোরদার করেছে, যাতে দলবদ্ধ অপরাধে জড়িত প্রত্যেকের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
এই মামলায় আদালত রাজ্য সরকারকে ভুক্তভোগীকে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
ভারতে ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধিতে ধারা ৩৫৭এ (Victim Compensation Scheme) রয়েছে, যেখানে বলা আছে—রাষ্ট্র সরকারকে কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের জন্য তহবিল/স্কিম তৈরি করতে হবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫৭বি ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, ৩৭৬ডি-সহ কয়েকটি ধারায় রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ জরিমানার অতিরিক্ত (অর্থাৎ fine-এর বাইরে) দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, আদালত জরিমানা ধার্য করলেও ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ শুধুমাত্র জরিমানার উপর নির্ভর করে আটকে থাকবে না—রাষ্ট্রের আলাদা দায়িত্ব থাকবে। এই কাঠামোর উদ্দেশ্য হলো—ভুক্তভোগী যেন কেবল “মামলা জিতল” এই কাগুজে স্বীকৃতির মধ্যে আটকে না থাকেন; বাস্তব জীবনে তিনি যেন পুনর্বাসনের সুযোগ পান।
খবরে উল্লেখ রয়েছে, ঘটনাটি ২০২০ সালের; আর রায়/সাজা ঘোষণা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে।
ভারতের বিচারব্যবস্থায় ফৌজদারি মামলা, বিশেষত গুরুতর অপরাধের মামলা, অনেক সময় দীর্ঘ সময় নেয়—তার কারণগুলো বহুস্তরীয়:
তদন্ত ও চার্জশিটের সময়,
সাক্ষী হাজির করানো,
আদালতের ক্যালেন্ডার ও মামলার চাপ,
আইনি জটিলতা ও যুক্তিতর্কের সময়,
কখনও কখনও সাক্ষীদের ভয়/চাপ/পিছু হটা।
তবে যে কোনও দেরি ভুক্তভোগীর জন্য মানসিক চাপ বাড়ায়—কারণ বিচার চলাকালীন তাঁকে বারবার ঘটনা মনে করতে হয়, আদালত-থানা-আইনজীবী—এই চক্রের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তাই দ্রুত বিচার (speedy trial) এবং ভুক্তভোগী-বান্ধব বিচারপর্ব আজকের দিনে বড় সামাজিক দাবি।
এই মামলার সবচেয়ে আলোচিত দিক—অভিযোগ অনুযায়ী নির্যাতিতার প্রেমিকও অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন।
টা সমাজের কাছে কঠিন প্রশ্ন তোলে: নিরাপত্তা কি শুধুই অপরিচিতের থেকে ঝুঁকির বিষয়? নাকি পরিচিত বৃত্তের মধ্যেও ভয়াবহ অপরাধ লুকিয়ে থাকতে পারে?
একাংশ সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, “পরিচিত ব্যক্তি” দ্বারা সংঘটিত অপরাধে ভুক্তভোগীর দ্বিধা বাড়ে—কারণ অভিযোগ করলে সম্পর্ক ভাঙে, পরিবারে অশান্তি হয়, সমাজ প্রশ্ন তোলে। কিন্তু আদালতের এই রায় বার্তা দিল—অপরাধ অপরাধই, সম্পর্ক-পরিচয় দিয়ে তাকে ঢেকে রাখা যাবে না।
যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ আইনত নিষিদ্ধ। ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা ২২৮এ-তে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ/প্রকাশনার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে—যাতে সামাজিক লাঞ্ছনা, অপবাদ ও দ্বিতীয়বার আঘাত (secondary victimisation) কমানো যায়।
এই কারণেই সংবাদমাধ্যমে সাধারণত নাম, ঠিকানা, পরিচয়সূচক ছবি বা এমন তথ্য প্রকাশ করা হয় না যা ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। এই প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও সেই নীতিই অনুসৃত হওয়া উচিত—এবং একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম হিসেবে সেটিই করা দরকার।
অধিকাংশ মানুষ আদালতের রায় বলতে শুধু “কত বছরের সাজা” বোঝেন। কিন্তু আধুনিক ফৌজদারি ন্যায়ের ধারণায়—শাস্তির পাশাপাশি ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন, মানসিক চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আদালত যখন ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়, তখন তা এক ধরনের “অপরাধের সামাজিক দায়” স্বীকার করে নেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিপূরণ যেন শুধু এককালীন অর্থ সাহায্য না হয়ে দাঁড়ায়—বরং তা যেন ভুক্তভোগীর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে (চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, কর্মসংস্থান/শিক্ষা সহায়তা) কাজে লাগে, সেই দিকেও নজর রাখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি (DLSA) বা সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থার ভূমিকা বড় হয়ে ওঠে।
গড়বেতা, বহড়াশোল—এ ধরনের গ্রামাঞ্চল বা আধা-গ্রামাঞ্চল এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে কিছু বাস্তব সমস্যা থাকে:
অনেক জায়গায় রাতে আলো-সিসিটিভি পর্যাপ্ত নয়
জঙ্গল/ফাঁকা এলাকা, মাঠ-ঘাট—পাবলিক নজরদারি কম
দ্রুত পুলিশের কাছে পৌঁছনো বা হেল্পলাইনে যোগাযোগ সম্পর্কে সচেতনতা কম
সামাজিক চাপে অনেক সময় অভিযোগ দায়ের বিলম্বিত হয়
তাই প্রতিরোধের জন্য স্থানীয় প্রশাসন, পঞ্চায়েত, স্কুল-কলেজ, নারী সংগঠন—সবাইকে নিয়ে ধারাবাহিক সচেতনতা কর্মসূচি জরুরি। শুধু বড় শহরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা করলে হবে না; ছোট শহর-গ্রামাঞ্চলে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
যদি কেউ যৌন হেনস্থা/সহিংসতার শিকার হন বা আশঙ্কা থাকে, দ্রুত সাহায্যের জন্য সরকারি হেল্পলাইনগুলো ব্যবহার করা যায়:
NCW 24×7 Women Helpline: 14490
ERSS জরুরি পরিষেবা: 112
এছাড়াও রাজ্যভিত্তিক Women Helpline/One Stop Centre পরিষেবা থাকে—যেখানে আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং, চিকিৎসা সংযোগের ব্যবস্থা করা হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পুলিশ ও নিকটস্থ বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে জানানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই রায় ঘোষণার পর অভিযুক্তদের পক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল করার আইনি সুযোগ থাকতে পারে—এটা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। তবে ট্রায়াল কোর্টে দোষ সাব্যস্ত হওয়া মানে প্রাথমিকভাবে প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত অপরাধ নিশ্চিত বলে মনে করেছে। আপিলে কী হবে, তা উচ্চ আদালতের বিবেচনার বিষয়।
এদিকে, ভুক্তভোগীর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো—আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ কার্যকরভাবে পাওয়া, মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসনে সহায়তা, এবং ভবিষ্যৎ জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর সমাজের দায়িত্ব হলো—ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করে পাশে দাঁড়ানো, আইনকে সম্মান করা, এবং “চুপ থাকলেই সব ঠিক” ধরনের ক্ষতিকর মানসিকতা বদলানো।
গড়বেতা কাণ্ডে তিন দোষীর যাবজ্জীবন সাজা এবং ক্ষতিপূরণের নির্দেশ—সেই বদলের পথেই এক দৃঢ় পদক্ষেপ।