ফের লখিমপুর খেরির ঘটনার ছায়া যোগীরাজ্যে। ২০২১ সালে লখিমপুর খেরিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজয় মিশ্রের ছেলে আশিসের গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছিলেন চার কৃষক। সেই স্মৃতি এখনও মানুষের মনে তাজা। এবার আবার মন্ত্রিপুত্রের গাড়ি জড়িত দুর্ঘটনায় মৃত্যু যুবকের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠছে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনের ভূমিকা নিয়ে।
লখনউ: ফের লখিমপুর খেরির ঘটনার ছায়া উত্তরপ্রদেশে। ক্ষমতার গাড়ির তলায় সাধারণ মানুষের প্রাণ যাওয়ার ঘটনা যেন যোগীরাজ্যে নতুন কিছু নয়। ২০২১ সালে লখিমপুর খেরিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজয় মিশ্রের ছেলে আশিসের গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছিলেন চার কৃষক। সেই ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনরোষের জন্ম দিয়েছিল। ঠিক চার বছর পর আবারও একই ধরনের অভিযোগ উঠল উত্তরপ্রদেশে—এবার প্রতিমন্ত্রীর ছেলের গাড়ির ধাক্কায় মৃত্যু হল এক যুবকের।
সোমবার রাতে উত্তরপ্রদেশের ললিতপুর জেলায় ঘটে যায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা। অভিযোগ, প্রতিমন্ত্রী মনোহরলাল কোরির ছেলে নরেশ কোরির চালানো এসইউভির ধাক্কায় প্রাণ হারান মোটরসাইকেল আরোহী শীবেন্দ্র (১৮)। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দু’জন—শঙ্কর সিং (৪৫) এবং অনুজ (২০)। তাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই উত্তরপ্রদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে চাঞ্চল্য ও ক্ষোভ। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, দুর্ঘটনার সময় মন্ত্রীপুত্র ও তাঁর সঙ্গীরা ছিলেন মদ্যপ অবস্থায়। শুধু তাই নয়, দুর্ঘটনার পর তাঁরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং ভয় দেখাতে শূন্যে গুলিও চালান। এই অভিযোগ সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার রাতে শীবেন্দ্র, শঙ্কর সিং এবং অনুজ মোটরসাইকেলে করে বারখেরা গ্রামে নিজেদের বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। জাখুরা থানা এলাকার একটি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পিছন দিক থেকে দ্রুতগতির একটি এসইউভি তাঁদের মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা মারে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গাড়িটির গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার।
ধাক্কার তীব্রতায় মোটরসাইকেলটি ছিটকে পড়ে যায় এবং তিনজনই রাস্তায় ছিটকে পড়েন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে ললিতপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁদের ঝাঁসি মেডিকেল কলেজে রেফার করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই মৃত্যু হয় শীবেন্দ্রর।
ঘটনার পর স্থানীয় গ্রামবাসীরা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির ভিতরে মদের বোতল ও প্লাস্টিকের গেলাস দেখতে পান বলে দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, গাড়িতে নরেশ কোরির সঙ্গে আরও চারজন বন্ধু ছিলেন এবং সকলেই ছিলেন মদ্যপ অবস্থায়।
এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “দুর্ঘটনার পর তারা প্রথমে গাড়ির ভিতরেই ছিল। পরে পালানোর চেষ্টা করে। গ্রামবাসীরা এগিয়ে এলে ভয় দেখাতে শূন্যে গুলি চালায়।”
এই বক্তব্য সামনে আসতেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর নরেশ ও তাঁর সঙ্গীরা প্রথমে গাড়ির কাচ বন্ধ করে ভিতরে বসে থাকেন। পরে পালানোর জন্য গাড়ির পিছনের উইন্ডশিল্ড ভাঙেন। গ্রামবাসীরা ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে গেলে ভয় দেখাতে তাঁরা শূন্যে গুলি চালাতে চালাতে পালিয়ে যান।
যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও গুলি চালানোর অভিযোগ পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়নি, তবে স্থানীয় মানুষের বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ মন্ত্রীপুত্র ও তাঁর বন্ধুদের আড়াল করছে।
মঙ্গলবার সকালে দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়িটি উদ্ধার করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ বেধে যায়। গ্রামবাসীরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছন উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকরা। দীর্ঘ সময় ধরে বোঝানোর পর বিক্ষোভ শামাল দেওয়া হয় এবং গাড়িটি উদ্ধার করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কালু সিং জানান, দুর্ঘটনাগ্রস্ত এসইউভিটি প্রতিমন্ত্রী মনোহরলাল কোরির স্ত্রী কস্তুরী দেবীর নামে কেনা। দুর্ঘটনার সময় কে গাড়িটি চালাচ্ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
এই ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে লখিমপুর খেরির স্মৃতি। ২০২১ সালে কৃষক আন্দোলনের সময় লখিমপুর খেরিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজয় মিশ্রের ছেলে আশিসের গাড়ির ধাক্কায় চার কৃষকের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
ললিতপুরের এই দুর্ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে—ক্ষমতার অপব্যবহার, আইনের সমতা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে।
ঘটনার পর বিরোধী দলগুলি সরকারকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছে। তাঁদের দাবি, যোগীরাজ্যে ক্ষমতাশালীদের জন্য আইন আলাদা, সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা।
এক বিরোধী নেতার বক্তব্য, “যদি সাধারণ মানুষের গাড়িতে এমন দুর্ঘটনা ঘটত, তবে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা হত। কিন্তু মন্ত্রিপুত্র হলে তদন্তের নামে সময় ক্ষেপণ করা হয়।”
অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনার পূর্ণ তদন্ত হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ললিতপুরের এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ স্পষ্ট। স্থানীয়দের দাবি, ক্ষমতাশালীদের গাড়ির দাপটে বারবার সাধারণ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, অথচ বিচার পাওয়া যায় না।
এক গ্রামবাসী বলেন, “আমরা কি শুধুই মরার জন্য? বড়লোক আর ক্ষমতাশালীদের গাড়ি চলবে, আর আমাদের প্রাণ যাবে—এটা কি আইন?”
এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মন্ত্রীপুত্র নরেশ কোরির বিরুদ্ধে আদৌ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
লখিমপুর খেরির ঘটনায় দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া এখনও মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ললিতপুরের এই ঘটনায়ও কি একই পরিণতি হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনায় দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে মানুষের বিশ্বাস আরও কমে যাবে।
ললিতপুরের দুর্ঘটনা শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, এটি ক্ষমতা, রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে এক বড় প্রশ্ন।
লখিমপুর খেরির ঘটনার পরেও যদি একই ধরনের ঘটনা ঘটে, তবে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতিফলন।
এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনায় সত্যিই কি ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে, নাকি ক্ষমতার আড়ালে আবারও চাপা পড়ে যাবে সত্য।
ললিতপুরের দুর্ঘটনা শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, এটি ক্ষমতা, রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে এক বড় প্রশ্ন। যখন ক্ষমতার আসনে থাকা মানুষের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়—আইন কি সবার জন্য সমান? নাকি ক্ষমতাশালীদের জন্য আইন আলাদা?
লখিমপুর খেরির ঘটনার পরেও যদি একই ধরনের ঘটনা ঘটে, তবে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতিফলন। বারবার একই ধরনের দুর্ঘটনা ও অভিযোগ সামনে আসা প্রমাণ করে, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক শিথিলতা এখনও পুরোপুরি রোধ করা যায়নি। সাধারণ মানুষের প্রাণের মূল্য কি এতটাই তুচ্ছ যে ক্ষমতার গাড়ির নিচে চাপা পড়েও বিচার পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে ওঠে?
এই ঘটনায় আরও একবার সামনে এসেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন। দুর্ঘটনার পর দ্রুত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ উঠতেই মানুষের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি সাধারণ নাগরিক হতেন, তবে হয়তো এতক্ষণে তাঁকে গ্রেফতার করা হত। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে—এই ধারণা সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত হচ্ছে।
এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনায় সত্যিই কি ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে, নাকি ক্ষমতার আড়ালে আবারও চাপা পড়ে যাবে সত্য। বিচার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে, সেটাই নির্ধারণ করবে মানুষের আস্থা। যদি এই ঘটনায় কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়, তবে তা শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি হবে না, বরং সমাজের কাছে একটি শক্ত বার্তা পৌঁছে দেবে—আইন সবার জন্য সমান।
অন্যদিকে, যদি এই ঘটনাও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ধামাচাপা পড়ে যায়, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে আরও গভীর হতাশা সৃষ্টি করবে। তখন শুধু ললিতপুর নয়, গোটা দেশেই প্রশ্ন উঠবে—ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ কি সত্যিই এতটাই কঠিন?