Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

“আধার না নেওয়ায় ভোগান্তি! SIR নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কথা তুলে ধরলেন মমতা”

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আধার কার্ড গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলে SIR-এর বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগে তীব্র প্রতিক্রিয়া দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে আধার না গ্রহণের অভিযোগ: SIR নিয়ে বিস্ফোরক মমতা
দেশের সর্বোচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও একাধিক ক্ষেত্রে আধার কার্ড গ্রহণ করা হচ্ছে না—এই অভিযোগ তুলে ফের কেন্দ্রের একটি সংস্থা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরব হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। SIR (স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন রেজিস্ট্রেশন/রিভিউ) প্রক্রিয়ার নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, সুপ্রিম কোর্ট যেখানে স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে আধার কার্ড একটি বৈধ পরিচয়পত্র, সেখানে তা অস্বীকার করা সংবিধান ও আদালতের নির্দেশের সরাসরি অবমাননা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা, যাচাই প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক কাজে আধার কার্ড থাকা সত্ত্বেও মানুষকে পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এর ফলে রাজ্যের প্রান্তিক মানুষ, পরিযায়ী শ্রমিক, বয়স্ক নাগরিক এবং দরিদ্র শ্রেণির মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “সুপ্রিম কোর্ট বলার পরেও যদি আধার কার্ড গ্রহণ করা না হয়, তাহলে সেটা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, জনগণের মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত।”
SIR প্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্ক
SIR প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে যে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। মমতার দাবি, পরিচয় যাচাইয়ের নামে মানুষকে একাধিক নথি জমা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, অথচ আধার কার্ড দেখালেও তা মানা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন দফতরে ঘুরতে হচ্ছে, কাজ হারাতে হচ্ছে, এমনকি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আধার কার্ড শুধুমাত্র একটি পরিচয়পত্র নয়, এটি আজ কোটি কোটি ভারতবাসীর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। রেশন, পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা—প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই আধারের গুরুত্ব অপরিসীম। সেখানে আধার থাকা সত্ত্বেও পরিষেবা না দেওয়া মানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তোলা।
সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান
সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে স্পষ্ট করেছে যে আধার কার্ড একটি বৈধ পরিচয়পত্র এবং নির্দিষ্ট কিছু পরিষেবা ছাড়া কাউকে শুধুমাত্র আধার না থাকার অজুহাতে বঞ্চিত করা যাবে না। এমনকি যেখানে আধার প্রযোজ্য, সেখানেও বিকল্প পরিচয়পত্রের সুযোগ রাখার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, “সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ যদি কার্যকর না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে যদি কোনও প্রশাসনিক সংস্থা আধার গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, তাহলে তা আইনত প্রশ্নের মুখে পড়ে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট দফতর নয়, গোটা প্রশাসনিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষুণ্ণ হয়।
রাজনৈতিক চাপানউতোর
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে রাজ্যের মানুষকে হয়রানি করছে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করছে। তাদের অভিযোগ, SIR-এর মতো প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে এক ধরনের “প্রশাসনিক সন্ত্রাস” চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, পরিচয় যাচাই একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং এতে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। তবে তারা এটাও স্বীকার করেছে যে যদি সত্যিই আধার কার্ড থাকা সত্ত্বেও মানুষ পরিষেবা না পান, তাহলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসছে ভোগান্তির গল্প। কেউ রেশন পাচ্ছেন না, কেউ পেনশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলছেন, আবার কেউ সরকারি অফিসে গিয়ে শুনছেন—“আধার চলবে না, অন্য কাগজ আনুন।” গ্রামবাংলা থেকে শহর—সব জায়গাতেই একই ছবি। অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় অন্য নথি নেই, ফলে তাঁরা কার্যত অসহায়।
একজন প্রবীণ নাগরিকের কথায়, “সারা জীবন কাজ করেছি, এখন পেনশনটাই ভরসা। আধার আছে, তবুও বলছে হবে না। আমরা যাব কোথায়?” এই প্রশ্নই যেন মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মাধ্যমে আরও জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও দায়িত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনের দায়িত্ব হলো আদালতের নির্দেশ মেনে চলা এবং নাগরিকদের সর্বনিম্ন ভোগান্তি নিশ্চিত করা। যদি কোনও নতুন প্রক্রিয়া চালু করা হয়, তবে তা যেন স্বচ্ছ, মানবিক ও সহজ হয়—এই বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। নচেৎ সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা বাড়বে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার জনগণের পাশে থাকবে এবং কোনওভাবেই আদালতের নির্দেশ অমান্য করে কাউকে হয়রানি করতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে আইনগত পথেও যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
উপসংহার
আধার কার্ড গ্রহণ না করা নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক শুধু একটি নথি সংক্রান্ত বিষয় নয়; এটি দেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রশ্ন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করা প্রশাসনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সেখানে ব্যতিক্রম হলে তা শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, সামাজিক সংকটও তৈরি করে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক মন্তব্য সেই সংকটকেই সামনে এনেছে। এখন দেখার, কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি এই অভিযোগের কী জবাব দেয় এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়

আইনি ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
আধার কার্ড গ্রহণ না করার অভিযোগ ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা ধীরে ধীরে একটি বড় আইনি ও সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও নাগরিকের বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও তাকে পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করা হলে তা সংবিধানের ১৪ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী হতে পারে। সমানাধিকারের নীতি ও জীবনধারণের অধিকারের প্রশ্নে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
সমাজকর্মীদের একাংশের দাবি, SIR-এর মতো প্রক্রিয়ার নামে নথি যাচাই আরও কঠোর হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর। গ্রামীণ এলাকায় বহু মানুষের কাছে জন্ম শংসাপত্র, স্থায়ী ঠিকানার নথি বা অন্যান্য সরকারি কাগজপত্র নেই। তাঁদের কাছে আধার কার্ডই একমাত্র পরিচয়। সেই আধার যদি অস্বীকার করা হয়, তাহলে তাঁরা কার্যত রাষ্ট্রের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন

রাজ্য প্রশাসনের একাংশের মতে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ স্পষ্ট হওয়ার পরেও যদি মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন না ঘটে, তবে প্রশাসনিক স্তরে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। নির্দেশিকা থাকলেও তা ঠিকমতো বাস্তবায়িত না হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আরও স্পষ্ট যোগাযোগ এবং দায়িত্ব বণ্টন জরুরি হয়ে পড়েছে।
ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
এই ইস্যু আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একদিকে যেমন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনগণের স্বার্থে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার দাবি তুলছেন, অন্যদিকে কেন্দ্রের নীরবতা বা ব্যাখ্যার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না—এমন মতও উঠে আসছে বিভিন্ন মহল থেকে।

news image
আরও খবর

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি স্পষ্ট ও মানবিক নীতির প্রণয়ন, যাতে পরিচয় যাচাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক অধিকারও সুরক্ষিত থাকে। প্রশাসনের কাজ হওয়া উচিত মানুষকে সাহায্য করা, তাদের আরও বেশি নথির জালে আটকে দেওয়া নয়। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার সুবিধা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করবে।
সব মিলিয়ে আধার কার্ড গ্রহণ না করা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের বিশ্বাস করছে? নাকি সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সামাজিক ন্যায় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কতটা শক্তিশালী থাকবে।

এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের দাবি একটাই—সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর হোক এবং প্রশাসনিক জটিলতায় আর যেন কোনও নাগরিক বঞ্চিত না হন।

এবং দ্রুত দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিয়ে আস্থা ও ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হোক।

Preview image