অবশেষে বরফের চাদরে ঢাকা পড়ল উত্তর ভারতের পাহাড়ি এলাকা। মানালি, সিমলা এবং গুলমার্গে প্রবল তুষারপাতের জেরে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। দীর্ঘ খরা কাটিয়ে পর্যটন শিল্পে আবার খুশির হাওয়া।
শিরোনাম: শ্বেতশুভ্র হিমালয়ের হাতছানি: দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পর্যটনের নবজাগরণ
নিজস্ব প্রতিবেদন | গুয়াহাটি/নয়াদিল্লি
অবশেষে প্রকৃতির রুদ্ররোষ শান্ত হলো। দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনে যখন পর্যটক থেকে শুরু করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, ঠিক তখনই উত্তরের আকাশ কালো করে নামল কাঙ্ক্ষিত সেই মুহূর্ত। উত্তর ভারতের পাহাড়ি জনপদগুলি, বিশেষ করে হিমাচল প্রদেশ এবং জম্মু ও কাশ্মীরের উপত্যকাগুলি ফের ঢেকে গেল সাদা বরফের চাদরে। মানালি, সিমলা, গুলমার্গ—নামগুলো শুনলেই চোখের সামনে যে ছবিটা ভেসে ওঠে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সেই ছবির দেখা মিলছিল না। তবে গত ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার ভোলবদল যেন জাদুকরী কাঠির ছোঁয়ায় বদলে দিয়েছে পুরো দৃশ্যপট। রুক্ষ, শুষ্ক পাহাড়ের গায়ে এখন নরম তুলোর মতো বরফের আস্তরণ। পর্যটকদের কলরবে মুখরিত হয়ে উঠেছে হিমালয়ের কোল। এই তুষারপাত শুধুমাত্র প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেনি, বরং মৃতপ্রায় শীতকালীন পর্যটন শিল্পে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।
এবারের শীতকালটা উত্তর ভারতের জন্য ছিল কিছুটা অন্যরকম। সাধারণত ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারির শুরু থেকেই হিমাচল ও কাশ্মীরে তুষারপাতের ধুম পড়ে যায়। কিন্তু এ বছর এল নিনো এফেক্ট বা পশ্চিমী ঝঞ্ঝার দুর্বলতার কারণে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্তও ভালো তুষারপাতের দেখা মেলেনি। পাহাড় ছিল বিবর্ণ, ধূসর। যে পর্যটকরা বড়দিনের ছুটিতে বা নববর্ষ উদযাপনে পাহাড়ে গিয়েছিলেন, তাদের ফিরতে হয়েছিল একরাশ হতাশা নিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল বরফহীন গুলমার্গ বা ধুলোমাখা সিমলার ছবি। পরিবেশবিদরা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন, আর পর্যটন ব্যবসায়ীদের কপালে পড়েছিল গভীর চিন্তার ভাঁজ।
কিন্তু ২৫ জানুয়ারির ঠিক আগে আগেই প্রকৃতির এই আশীর্বাদ যেন সমস্ত গ্লানি ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসকে সত্যি করে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় শুরু হয়েছে ভারী তুষারপাত। মানালির মল রোড থেকে শুরু করে সিমলার জুব্বারহাটি, কুফরি, নারকান্দা—সবজায়গাতেই এখন বরফের রাজত্ব। কাশ্মীরের পরিস্থিতিও তথৈবচ। গুলমার্গের স্কি রিসোর্টগুলো, যা এতদিন ফাঁকা পড়েছিল, এখন সেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই।
হিমাচল প্রদেশের মানালি বরাবরই পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকে। কিন্তু এবারের তুষারপাত মানালিকে যেন নতুন রূপ দিয়েছে। সোলং ভ্যালিতে এখন হাঁটুজল বরফ। সেখানে স্কিয়িং, প্যারাগ্লাইডিং এবং স্নো-স্কুটার চালানোর ধুম পড়ে গেছে। স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, অটল টানেলের দক্ষিণ প্রান্ত এবং উত্তর প্রান্ত—উভয় দিকেই ভারী তুষারপাত হয়েছে। রোহতাং পাসের রাস্তা বন্ধ থাকলেও, পর্যটকরা কোকসার এবং সিসু পর্যন্ত গিয়ে বরফের আনন্দ উপভোগ করছেন।
মানালির এক হোটেল মালিকের কথায়, "গত দু'মাস ধরে আমরা মাছি তাড়াছিলাম। বুকিং ক্যানসেল হচ্ছিল। পর্যটকরা ফোন করে আগে জিজ্ঞেস করছিলেন—বরফ আছে কি না? আমরা মিথ্যে আশ্বাস দিতে পারছিলাম না। কিন্তু গতকাল থেকে ফোন আর থামছে না। আগামী ১০ দিনের জন্য আমাদের সব রুম বুকড। এটা আমাদের জন্য ভগবানের আশীর্বাদ।"
সিমলার আকর্ষণ তার ঔপনিবেশিক স্থাপত্য এবং মল রোডের আভিজাত্য। সেই আভিজাত্য বহুগুণ বেড়ে যায় যখন চার্চের ওপর বরফের প্রলেপ পড়ে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিমলা শহরে প্রায় ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার তুষারপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কুফরিতে বরফের পরিমাণ আরও বেশি। পর্যটকরা হাড়কাঁপানো ঠান্ডা উপেক্ষা করেই ভিড় করছেন রিজ ময়দানে। কেউ বানাচ্ছেন স্নো-ম্যান, কেউ বা একে অপরের দিকে বরফ ছুড়ে মেতে উঠছেন আনন্দে।
কলকাতা থেকে সিমলায় বেড়াতে যাওয়া এক পর্যটক দম্পতি জানালেন, "আমরা ভেবেছিলাম এবার হয়তো বরফ দেখতে পাব না। ফিরতি টিকিট কাটার কথাও ভাবছিলাম। কিন্তু সকালে হোটেলের জানলা খুলে দেখি সব সাদা হয়ে আছে। এই দৃশ্য নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আমাদের ভ্রমণ সার্থক।"
"পৃথিবীতে যদি কোথাও স্বর্গ থাকে, তবে তা এখানেই"—কাশ্মীর সম্পর্কে এই উক্তিটি যথার্থ হয়ে ওঠে যখন উপত্যকা বরফে ঢেকে যায়। গুলমার্গ, পহেলগাম এবং সোনমার্গে গত দু'দিন ধরে একটানা তুষারপাত চলছে। বিশেষ করে গুলমার্গের স্কি স্লোপগুলো এখন আন্তর্জাতিক মানের স্কিইং-এর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। পর্যটকরা গন্ডোলা রাইডে চড়ে আফারওয়াত পিকের দিকে যাচ্ছেন এবং ওপর থেকে বরফে ঢাকা উপত্যকার যে দৃশ্য দেখছেন, তা তাদের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকছে।
শ্রীনগর শহরেও হালকা তুষারপাত হয়েছে, যা ডাল লেকের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শিকারায় চড়ে বরফপড়া দেখার অভিজ্ঞতাই আলাদা। স্থানীয় হাউসবোট মালিকরা জানাচ্ছেন, পর্যটকদের আগমনে আবার চনমনে হয়ে উঠেছে ডাল লেক চত্বর।
এই তুষারপাত শুধুমাত্র পর্যটকদের আনন্দের খোরাক নয়, এটি পাহাড়ের অর্থনীতির লাইফলাইন। হিমাচল প্রদেশ এবং জম্মু ও কাশ্মীরের জিডিপি-র একটি বড় অংশ আসে পর্যটন থেকে। হোটেল মালিক, রেস্তোরাঁ, ট্যাক্সি চালক, ট্যুর গাইড, ছোটখাটো হস্তশিল্প বিক্রেতা, এমনকি রাস্তার ধারের ম্যাগি বা চা বিক্রেতা—সকলের রুজিরুটি নির্ভর করে পর্যটকদের ওপর। আর পর্যটকরা আসেন মূলত এই বরফের টানেই।
গত দেড় মাসের 'ড্রাই স্পেল' বা শুষ্ক আবহাওয়া স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। আপেল চাষীরাও চিন্তিত ছিলেন, কারণ আপেল বাগানের জন্য শীতকালীন তুষারপাত বা 'চিলিং আওয়ার্স' অত্যন্ত জরুরি। বরফ না পড়লে আপেলের ফলন ভালো হয় না, পোকার উপদ্রব বাড়ে। তাই এই তুষারপাত কৃষি এবং পর্যটন—উভয় খাতের জন্যই আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
কুলুর এক শাল বিক্রেতা বললেন, "পর্যটকরা যখন খুশি মনে ঘোরেন, তখন তাদের কেনাকাটার আগ্রহও বাড়ে। গত কয়েকদিন ধরে বিক্রিবাট্টা একদম ছিল না। আজ সকাল থেকে দোকানে পা ফেলার জায়গা নেই। পর্যটকরা খুশি, আমরাও খুশি।"
মুদ্রার যেমন এপিঠ-ওপিঠ থাকে, তেমনই ভারী তুষারপাতের কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। পাহাড়ের রাস্তাঘাট বরফে ঢেকে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সিমলা-রামপুর রোড, মানালি-লেহ হাইওয়ে এবং কাশ্মীরের মুঘল রোড সহ একাধিক জাতীয় সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে বা ধীরগতিতে গাড়ি চলছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাস্তায় 'ব্ল্যাক আইস' (বরফ গলে জমে যাওয়া পিচ্ছিল স্তর) তৈরি হচ্ছে, যা গাড়ি চালানোর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষ করে যারা সমতল থেকে গাড়ি নিয়ে আসছেন, তাদের পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু জায়গায় গাড়ি স্কিড করার খবর পাওয়া গেছে, যদিও বড় কোনো দুর্ঘটনার খবর নেই।
হিমাচল রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন (HRTC) তাদের বাস পরিষেবা কিছু রুট পরিবর্তন করেছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে এবং রাস্তা পরিষ্কার করতে বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন (BRO) এবং স্থানীয় প্রশাসন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে। স্নো-কাটার মেশিন দিয়ে বরফ সরিয়ে রাস্তা সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে হিমাচল ও কাশ্মীর প্রশাসন একাধিক নির্দেশিকা জারি করেছে:
১. রাতের ভ্রমণ এড়িয়ে চলা: সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে এবং রাস্তায় বরফ জমে যাচ্ছে। তাই রাতে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ২. গরম পোশাক: পর্যটকদের পর্যাপ্ত গরম পোশাক, বিশেষ করে থার্মাল ইনার, গ্লাভস এবং জলরোধী জ্যাকেট সাথে রাখতে বলা হয়েছে। ৩. গাড়ি চালানো: ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যারা আসছেন, তাদের ফোর-হুইল ড্রাইভ গাড়ি ব্যবহার করতে বা চাকাতে স্নো-চেইন লাগাতে বলা হয়েছে। ৪. স্বাস্থ্য সতর্কতা: শিশু এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাইপোথার্মিয়া বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা হতে পারে। তাই ওষুধের বক্স এবং প্রয়োজনে পোর্টেবল অক্সিজেন ক্যান সাথে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
বর্তমান যুগে কোনো খবরের সত্যতা বা জনপ্রিয়তা অনেকটাই নির্ভর করে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর। গত ২৪ ঘণ্টায় ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং টুইটারে (এক্স) #Snowfall, #Manali, #Shimla, #Kashmir ডায়ালগ দিয়ে লক্ষ লক্ষ ছবি ও ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। বরফের মধ্যে পর্যটকদের নাচের রিলস, স্নো-ফাইটের ভিডিও মুহূর্তে ভাইরাল হচ্ছে।
এই ভার্চুয়াল প্রচার পর্যটনের জন্য 'ফ্রি মার্কেটিং'-এর কাজ করছে। যারা এখনো বাড়িতে বসে ছিলেন, তারা এই ছবি দেখে ব্যাগ গোছাতে শুরু করেছেন। ট্রাভেল এজেন্টদের মতে, আগামী দুই সপ্তাহের জন্য ট্রেন এবং বিমানের টিকিটের চাহিদাও তুঙ্গে। দিল্লি থেকে সিমলা বা মানালি যাওয়ার ভলভো বাসের টিকিট পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। বিমান সংস্থাগুলোও শ্রীনগর এবং চণ্ডীগড়ের ফ্লাইটের ভাড়া কিছুটা বাড়িয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তর বা IMD (India Meteorological Department)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও ৪৮ ঘণ্টা পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে উত্তর ভারতের পাহাড়ি এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি তুষারপাত চলতে পারে। এরপর আকাশ পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আকাশ পরিষ্কার হলে রাতের তাপমাত্রা আরও কমবে এবং হাড়কাঁপানো ঠান্ডা অনুভূত হবে।
পর্যটকদের জন্য এটি সুসংবাদ কারণ আকাশ পরিষ্কার থাকলে বরফে ঢাকা পাহাড়ের দৃশ্য আরও মনোরম হয় এবং যাতায়াতের সমস্যাও কমে।
প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। কখনো সে রুক্ষ, কখনো বা মমতাময়ী। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর উত্তর ভারতের পাহাড়ে এই তুষারপাত যেন প্রকৃতির এক মমতাময়ী রূপ। এটি শুধুমাত্র পর্যটকদের ক্ষণিকের আনন্দ নয়, এটি পাহাড়ের মানুষের বেঁচে থাকার রসদ। সাদা বরফের চাদরে ঢাকা এই পাহাড় আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের কথা।
সপ্তাহান্তে যারা দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারে না। তবে আনন্দ করার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা এবং নিজস্ব নিরাপত্তার দিকটিও পর্যটকদের মাথায় রাখা জরুরি। প্লাস্টিক বর্জন করে এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে যদি আমরা এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারি, তবেই এই 'শ্বেতশুভ্র হিমালয়' তার গরিমা বজায় রাখতে পারবে আগামী দিনেও।
তাই আর দেরি কেন? গরম জামাকাপড় গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। পাহাড় ডাকছে, আর এবার সে সেজেছে তার সেরা সাজে।