বিরাট কোহলি মাইলফলক নিয়ে খেলেন না, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। আগের ব্যাটার আউট হলে দর্শকদের উন্মাদনা উপভোগ করেন না
বিরাট কোহলি, ভারতীয় ক্রিকেটের এক প্রবাদপ্রতিম নাম, তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারে বহু মাইলফলক অর্জন করেছেন। একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছেন এবং নিজেকে একের পর এক মাইলফলকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু তাঁর খেলোয়াড়ি জীবন এবং ব্যাটিং দক্ষতার প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তা সবার থেকে আলাদা। কোহলির খেলায় লক্ষ্য কখনও নিজের রেকর্ড বা মাইলফলক অর্জন নয়; বরং তিনি সবসময় দলের জন্য খেলেন। তাঁর মনে একটি বিষয়ই থাকে—দলের জয়ে অবদান রাখা এবং দলের জয় নিশ্চিত করা।
বিরাট কোহলির ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তাঁর মনোভাব ছিল দলের জন্য খেলা। তিনি সবসময় মাইলফলক বা রেকর্ডের চেয়ে বড়ভাবে দলের জয় এবং দলীয় সম্মানকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক সিরিজে তিনি যেভাবে খেলেছিলেন, তা তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনোভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিল। প্রতিটি ম্যাচে কোহলি যেভাবে তাঁর ভূমিকা পালন করেন, তা দলকে একটি জয়ী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্যই। তিনি কখনও নিজেকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখেন না, বরং দলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন।
কোহলি সবসময়ই বলেছেন যে, তিনি কখনও মাইলফলক নিয়ে খেলেন না। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, যখন আপনি ক্রিকেট খেলেন, তখন প্রথমে দলের চিন্তা করতে হবে। মাইলফলক আসবে, কিন্তু আপনার প্রধান লক্ষ্য থাকবে দলকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়া। যে কারণে কোহলির এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং খেলার ধরন একেবারে আলাদা। তিনি সবসময় পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই ব্যাটিং করে দলের প্রয়োজনীয় রান সংগ্রহের চেষ্টা করেন, যাতে দল জয়লাভ করতে পারে। তার মতে, দলের জয় আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত, এবং ব্যক্তিগত রেকর্ডের থেকেও সেটি অনেক বেশি মূল্যবান।
যদিও বিরাট কোহলি কখনও তার ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে গর্ব করেন না, কিন্তু তিনি যে অসাধারণ পরিশ্রম এবং প্রতিভার অধিকারী, তা সবার কাছে স্পষ্ট। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে অসংখ্য ম্যাচ সেরার ট্রফি, এবং তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একাধিক রেকর্ড করেছেন। কিন্তু তিনি কখনোই এই রেকর্ডগুলোকে তার কাছে প্রধান হিসেবে গ্রহণ করেন না। বরং তিনি বলেন, "মা আমার ট্রফি সাজিয়ে রাখেন।" অর্থাৎ, তাঁর রেকর্ডগুলো তাঁর কাছে শুধু একটি স্মৃতি, যা তাঁর পরিবার এবং তার কাছের মানুষদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কোহলির মাইলফলক এবং রেকর্ডগুলো বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে চিরকাল মনে রাখা হবে। তিনি একমাত্র ভারতীয় ক্রিকেটার, যিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন, এবং তাঁর এই অর্জন ক্রিকেট ইতিহাসের একটি অমূল্য দিক। কিন্তু কোহলি কখনোই এই ধরনের অর্জন নিয়ে মাতামাতি করেন না। তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে কোনো অবস্থায় দলকে জয়ী করা এবং নিজের খেলার প্রতি আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা।
কোহলির সর্বাধিক পরিচিতি তার ব্যক্তিগত রেকর্ড বা মাইলফলক অর্জনের জন্য নয়, বরং তার দলীয় মনোভাবের জন্য। তিনি সবসময় দলের স্বার্থকে নিজের স্বার্থের ওপর অগ্রাধিকার দেন। কোহলি যখন ব্যাট করতে নামেন, তখন তার প্রধান লক্ষ্য থাকে দলের জন্য যতটা সম্ভব রান সংগ্রহ করা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ম্যাচের গতিপথ পরিবর্তন করা। তিনি কখনও নিজের খেলার মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেন না। বরং তিনি সর্বদা খেলার ধরন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন।
কোহলি নিজের ইনিংসের মাধ্যমে দলের জন্য সংগ্রহ করেন, কিন্তু তার খেলায় লক্ষ্য থাকে দলের জয়। তার মতে, ব্যক্তিগত রেকর্ড কখনওই দলের জয়কে ছাপিয়ে যেতে পারে না। তিনি নিজের খেলার মধ্যে কোনোরকম অহংকার রাখেন না, বরং দলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে খেলেন। কোহলির খেলার ধরন সেইসব খেলোয়াড়দের জন্য আদর্শ, যারা দলীয় পারফরম্যান্সের দিকে মনোযোগ দেন এবং কখনও ব্যক্তিগত স্বার্থকে দলের স্বার্থের চেয়ে বড় মনে করেন না।
কোহলির নেতৃত্বও তার এই দলের প্রতি গুরুত্ব এবং মনোভাবের পরিচয় দেয়। তিনি যখন ভারতের অধিনায়ক ছিলেন, তখন তিনি দলের প্রতি একদম উদার মনোভাব দেখিয়েছেন। তার নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একাধিক সাফল্য অর্জন করেছে। কোহলির নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তার দলীয় মনোভাব এবং শক্তিশালী মানসিকতা। তিনি সবসময় দলকে একত্রিত করে এবং একে অপরকে সহযোগিতা করতে উৎসাহিত করেছেন।
কোহলি তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে যে স্তরে পৌঁছেছেন, তা সম্ভব হয়েছে তার কঠোর পরিশ্রম এবং পরিবারের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসার কারণে। কোহলি প্রায়ই বলেছেন যে তার সফলতার পেছনে তার মা এবং পরিবারই মূল প্রেরণা। তার ট্রফি এবং মাইলফলক কখনই তার কাছে একটি আত্মসন্তোষের বিষয় ছিল না, বরং তার পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া উৎসাহই তাকে আরও ভালো খেলতে প্রেরণা দিয়েছে।
মা-কে তিনি খুবই সম্মান করেন, এবং তার সব ট্রফি মা-কে পাঠানোর কথা বলেছেন। এটা স্পষ্ট যে, তার সাফল্যের পেছনে তার পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোহলি বুঝতে পারেন যে, একাই সব কিছু করা সম্ভব নয়, এবং দলের মধ্যে সহযোগিতা এবং পরিবারের সাপোর্ট তার খেলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কোহলির খেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র হল—"কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস"। তিনি বিশ্বাস করেন যে, কোনো কিছু অর্জন করতে হলে কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই। কোহলি তার নিজস্ব ক্ষমতা জানেন এবং সেটি সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে নিজেকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গেছেন। তার খেলার এই মন্ত্র অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
তার মতে, "ঈশ্বর আমায় অনেক কিছু দিয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ।" এই কৃতজ্ঞতা এবং তার খেলার প্রতি নিবেদিত মনোভাবই তাকে একজন সফল এবং শ্রদ্ধেয় ক্রিকেটার করে তুলেছে। কোহলির জন্য, প্রতিটি ম্যাচ তার জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ, এবং তিনি প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করেন দলকে জয়ী করতে।
বিরাট কোহলি একজন মহান ক্রিকেটার, কিন্তু তার আসল শ্রদ্ধা এবং সম্মান তার খেলার মধ্যে নিহিত। তিনি শুধু নিজের জন্য খেলেন না, বরং তার দলের জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত। তিনি জানেন, জয় দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এবং সেটা অর্জন করতে হলে, তাকে সবসময় নিজের সেরা ফর্মে থাকতে হবে। কোহলির ক্রিকেট জীবন প্রমাণ করে যে, একজন সফল খেলোয়াড় হতে হলে, শুধু দক্ষতা নয়, দলের প্রতি দায়বদ্ধতাও জরুরি
।
গত ম্যাচে বিরাট কোহলির দুর্দান্ত ইনিংসের পর সঞ্চালক হর্ষ ভোগলের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন, তিনি মাইলফলক নিয়ে খেলার চেষ্টা করেন না। "আমি গুনিনি," কোহলি হাসতে হাসতে বলেন, যখন ভোগলে জানতে চান, তার কতগুলো ম্যাচ সেরার ট্রফি রয়েছে। তার কথায়, "মা আমার সব ট্রফি যত্ন করে সাজিয়ে রাখেন, নয়ডার বাড়িতে। মা বলতে পারবেন, কটা ট্রফি হল। এই ট্রফিটাও মায়ের কাছেই পাঠিয়ে দেব।" এই মন্তব্যে কোহলি আবারও প্রমাণ করলেন, তার জীবনের প্রধান উৎসাহ তার পরিবার এবং বিশেষ করে তার মা।
ম্যাচ সেরার ট্রফি বা রেকর্ডের থেকেও কোহলির কাছে সবচেয়ে মূল্যবান বিষয় হল তার খেলার মনোভাব। তিনি বললেন, "যখন আমার আগের ব্যাটার আউট হন, তখন দর্শকরা যে ধরনের উন্মাদনা সৃষ্টি করেন, সেটা আমাকে খুব ভাল লাগে না। আমি চেয়েছি আমার আগের ব্যাটারের আউট হওয়া নিয়ে চিৎকার করা না হয়ে, ম্যাচের প্রতি দর্শকদের মনোযোগ রাখা উচিত।" তিনি আরও বলেন, "এটা মহেন্দ্র সিংহ ধোনির ক্ষেত্রেও হতো, আর এখন আমার ক্ষেত্রেও হচ্ছে। আমি জানি, সমর্থকেরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন, কিন্তু এই বিষয়টি আমাকে আরামদায়ক মনে হয় না। আমি শুধু খেলায় মনোযোগ দিতে চাই। তবে তাদের এই ভালবাসা আমাকে আশীর্বাদ হিসাবে গ্রহণ করি।"
কোহলি শুধু একজন ক্রিকেটারই নন, তিনি একজন দলীয় খেলোয়াড়, যিনি নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে দলীয় স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন। তিনি বললেন, "সবসময় আমি চেষ্টা করি দলের জন্য খেলতে, দলের জন্য যতটা সম্ভব সহায়ক হতে। মাইলফলক বা রেকর্ড নিয়ে খেলার ইচ্ছা আমার নেই। দলের জয়টাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"
এই ম্যাচের পর কোহলি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোট রানে কুমার সাঙ্গাকারা-কে পেছনে ফেলেছেন এবং এখন তার সামনে শুধুমাত্র সচিন তেন্ডুলকর রয়েছেন। ভোগলে এই বিষয়টি উল্লেখ করলে কোহলি বললেন, "এখন আমি মাইলফলক, রেকর্ড নিয়ে খেলি না। আমি জানি, আমি অনেক কিছু অর্জন করেছি, কিন্তু এখন আমি শুধু পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার চেষ্টা করি। দলের জন্য খেলার চেষ্টাই আমার প্রধান লক্ষ্য।"
কোহলির ৯৩ রানের ইনিংস ভারতের জয়ের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তবে শুভমন গিলের দলের জন্য এটি ছিল একটি কঠিন সংগ্রাম। কোহলি আউট হওয়ার পর ভারত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল, কিন্তু রবীন্দ্র জাডেজা ও শ্রেয়স আয়ারের সহায়তায় দল ফিরে আসে। শেষ পর্যন্ত, ওয়াশিংটন সুন্দরকে চোট নিয়ে ব্যাট করতে নামতে হয়, তবে কোহলির ৯৩ রানের ইনিংস পরিস্থিতি সহজ করে দিয়েছিল।
শুভমন গিল ম্যাচের পর জানালেন, "আমরা রান তাড়া করতে সব সময় উপভোগ করি, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলা গুরুত্বপূর্ণ। কোহলির ইনিংস আমাদের কাজটা অনেক সহজ করে দিয়েছে। এই পিচে ব্যাটিং শুরু করা সহজ নয়, কিন্তু কোহলি ভাই যেভাবে শুরু করলেন, সেটা অন্যদের জন্য কঠিন ছিল। আশা করি, কোহলি ভাই আমাদের জন্য এইভাবে রান করে যাবেন।"
কোহলির অসাধারণ পারফরম্যান্সের পাশাপাশি, শুভমন গিল দলের বোলারদেরও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলানোর পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেছেন, "আমরা বোলারদের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলাতে চাই। সবার মধ্যে ম্যাচের মধ্যে থাকা নিশ্চিত করার জন্য।"
এছাড়া, ওয়াশিংটন সুন্দরকে নিয়ে শিবিরে কিছু উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ তিনি চোট পেয়েছেন। শুভমন গিল জানান, "ওয়াশিংটনকে স্ক্যান করানোর জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পেলে আমরা জানব চোটের পরিস্থিতি।"
এই ম্যাচের পর, কোহলির সততা এবং দলীয় মনোভাব আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি জানিয়ে দিলেন, মাইলফলক বা রেকর্ড তার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার জন্য যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হল দলের জয়।