বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অভিযোগ, বিশ্বকাপে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাটিতে ম্যাচে থাকার অনুমতি তাঁরা পাননি। এই অভিযোগের মাঝেই আশার কথা শুনিয়েছে আইসিসি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ আজ আর নবাগত নয়। ১৯৯৯ সালে আইসিসির পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ নিয়মিত আইসিসি ইভেন্টে অংশগ্রহণ করছে। শুধু খেলোয়াড়রাই নয়—বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকরাও দীর্ঘদিন ধরে আইসিসি ইভেন্ট কাভার করে আসছেন। বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ—প্রতিটি বড় মঞ্চেই থেকেছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা।
কিন্তু ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে ঘটেছে এক নজিরবিহীন ঘটনা। আইসিসি কর্তৃক বাংলাদেশি সাংবাদিকদের মিডিয়া অ্যাক্রেডিটেশন (কার্ড) না দেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক, ক্ষোভ এবং প্রশ্ন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো অভিযোগ করেছে—বাংলাদেশ দল এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার পর, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় আয়োজিত ম্যাচগুলোতে উপস্থিত থাকার অনুমতি থেকে তাদের সাংবাদিকদের বঞ্চিত করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত শুধু পেশাগত অধিকার নয়—বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও স্বীকৃতির ওপরও বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে আইসিসি জানিয়েছে—সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে, এবং কার্ড প্রদানের প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। এতে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখছেন বাংলাদেশি সাংবাদিকেরা।
এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব—
কী ঘটেছে পুরো ঘটনাক্রম
কেন আইসিসি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে
বাংলাদেশি সাংবাদিকদের অভিযোগ কী
আইসিসির ব্যাখ্যা কতটা গ্রহণযোগ্য
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কী হওয়ার কথা
এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে
বিশ্বকাপ বা বড় কোনো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে মিডিয়া অ্যাক্রেডিটেশন কেবল একটি কার্ড নয়—এটি একজন সাংবাদিকের পেশাগত স্বীকৃতির প্রতীক। এই কার্ড ছাড়া কোনো সাংবাদিক মাঠে প্রবেশ, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, প্রেস কনফারেন্স কাভার বা আনুষ্ঠানিক সংবাদ সংগ্রহ করতে পারেন না।
আইসিসি সাধারণত তার প্রতিটি ইভেন্টের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মে মিডিয়া কার্ড দেয়। সদস্য দেশগুলোর ক্রিকেট বোর্ডের মাধ্যমে সাংবাদিকদের আবেদন জমা পড়ে, এরপর আইসিসি যাচাই-বাছাই করে কার্ড প্রদান করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রীতি আছে—
যে দেশই আইসিসি’র পূর্ণ বা সহযোগী সদস্য, সে দেশের সাংবাদিকেরা সাধারণত আইসিসি ইভেন্টে কাভার করার সুযোগ পান, তাদের দল খেলুক বা না খেলুক।
ঠিক যেমন ফুটবল বিশ্বকাপে ফিফা সব সদস্য দেশের সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার দিয়ে থাকে।
এই নীতিই এতদিন ধরে আইসিসি অনুসরণ করে এসেছে।
২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। এই দুই দেশে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচ কাভার করতে বাংলাদেশের প্রায় ১৩০ থেকে ১৫০ জন সাংবাদিক মিডিয়া কার্ডের জন্য আবেদন করেন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) যথারীতি আবেদনগুলো আইসিসির কাছে পাঠায়।
কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের আবেদনগুলো অনুমোদন পায় না। এমনকি যেসব সাংবাদিক প্রথম ধাপে অনুমোদন পেয়েছিলেন, পরবর্তী ইমেলে তাদের অনুমতিও বাতিল করা হয়।
এখানেই শুরু হয় মূল বিতর্ক।
বাংলাদেশের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’ প্রথম এই বিষয়টি প্রকাশ করে।
সংবাদটিতে বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন জানান—
“আমার যতদূর জানা, বাংলাদেশি সাংবাদিকদের কার্ডের আবেদন খারিজ করা হয়েছে। এ বছর ১৩০ থেকে ১৫০ জন সাংবাদিক আবেদন করেছিলেন। কেউ অনুমতি পাননি।”
এই বক্তব্যের পরপরই ক্রীড়া সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
কারণ অতীতে কখনোই বাংলাদেশি সাংবাদিকদের পুরোপুরি বাদ দেওয়ার নজির নেই।
বাংলাদেশের সাংবাদিক মীর ফরিদ জানান—
“আইসিসি গত ২০ জানুয়ারি ইমেলের মাধ্যমে আমাকে অনুমতি দিয়েছিল। ভিসা সংক্রান্ত কাগজপত্রও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ২৬ জানুয়ারি আরেকটি ইমেল করে সেই অনুমতি বাতিল করা হয়েছে।”
এমন ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ভুল নয়—এটি একজন সাংবাদিকের পেশাগত পরিকল্পনা, ভ্রমণ প্রস্তুতি ও আর্থিক বিনিয়োগের ওপরও বড় আঘাত।
আরিফুর রহমান বাবু—বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার এক সুপরিচিত নাম। তিনি ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে প্রতিটি আইসিসি ইভেন্ট কাভার করে আসছেন।
এবার তাকেও অনুমতি দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন—
“যদি দল না-ও খেলে, তবুও আইসিসির পূর্ণ ও সহযোগী সদস্য দেশের সাংবাদিকদের অনুমতি দেওয়া হয়। কেন আমাদের অনুমতি দেওয়া হলো না, বুঝতে পারছি না। আমি এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করছি।”
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের এমন বক্তব্য বিষয়টির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।
সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে আইসিসির একটি সূত্র জানায়—
“নতুন করে সবটা হচ্ছে। আবেদনের সংখ্যা বেড়েছে এবং সূচি বদলেছে, তাই সময় লাগছে। সাংবাদিকদের কার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।”
পাশাপাশি আইসিসি জানায়—
“প্রতিটি দেশের একটি নির্দিষ্ট কোটা থাকে। ৪০ জনের বেশি সাংবাদিককে কার্ড দেওয়া যায় না। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি সাংবাদিক আবেদন করেছেন। প্রত্যেককে দেওয়া সম্ভব নয়। কাদের কার্ড দেওয়া হবে, তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।”
এখানে মূল দুটি কারণ সামনে আসে—
১) আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি
২) দেশের জন্য নির্ধারিত কোটা সীমিত
বিশ্লেষকদের মতে, শুধুই কোটা সমস্যা হলে—
আগে অনুমতি দেওয়া কার্ড বাতিল করা হতো না
বা সম্পূর্ণ দেশভিত্তিক শূন্য অনুমোদনের অভিযোগ উঠত না
তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—
বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে না থাকায় কি অঘোষিতভাবে সাংবাদিকদের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে?
আইসিসি প্রকাশ্যে তা স্বীকার না করলেও, অনেকেই মনে করছেন—এটি একটি নীতিগত বিচ্যুতি।
ফিফা, অলিম্পিক কমিটি, এমনকি আইসিসির পূর্ববর্তী ইভেন্টগুলোতেও দেখা গেছে—
কোনো দেশের দল অংশ না নিলেও, সেই দেশের স্বীকৃত সাংবাদিকেরা ইভেন্ট কাভার করার সুযোগ পান।
কারণ আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার মূল দর্শন হলো—
গণমাধ্যমের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
এটি স্বচ্ছতা ও বিশ্বব্যাপী দর্শকসংযোগের অংশ।
বাংলাদেশে ক্রীড়া সাংবাদিকতার ইতিহাস দীর্ঘ।
১৯৯৬ বিশ্বকাপে প্রথমবার বাংলাদেশি সাংবাদিকদের বড় উপস্থিতি
১৯৯৯ সালে আইসিসি ট্রফি জয়
২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা
এই প্রতিটি ধাপে সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তারা শুধু ম্যাচ রিপোর্ট করেননি—বাংলাদেশ ক্রিকেটের ব্র্যান্ড ভ্যালু গড়তেও ভূমিকা রেখেছেন।
যদি আইসিসি ভবিষ্যতে দল না খেললে সংশ্লিষ্ট দেশের সাংবাদিকদের সীমিত করে—
ছোট দেশের ক্রিকেট কাভারেজ কমে যাবে
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বৈচিত্র্য হ্রাস পাবে
ক্রীড়া সাংবাদিকতায় অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে
এটি দীর্ঘমেয়াদে ক্রিকেটের বৈশ্বিক সম্প্রসারণের বিপরীত দর্শন তৈরি করবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড চাইলে—
আইসিসির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে পারে
সাংবাদিক কোটা পুনর্বিবেচনার দাবি তুলতে পারে
এসিসি বা অন্যান্য বোর্ডের সমর্থন চাইতে পারে
এখানে বিসিবির কূটনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক বিবৃতিতে আইসিসি জানিয়েছে—
“প্রক্রিয়া এখনো চলমান, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।”
এই বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে—
কিছু বাংলাদেশি সাংবাদিক শেষ পর্যন্ত কার্ড পেতে পারেন
পূর্বের বাতিল সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা হতে পারে
এ কারণেই বলা হচ্ছে—আইসিসি বাংলাদেশি সাংবাদিকদের “আশার কথা” শোনাল।
বাংলাদেশি ক্রীড়া সাংবাদিকদের মূল দাবি—
ন্যায্য ও স্বচ্ছ অ্যাক্রেডিটেশন নীতি
পূর্ববর্তী ইভেন্টগুলোর মতো সমান অধিকার
দল না খেললেও মিডিয়া প্রবেশাধিকার
এটি শুধু ব্যক্তিগত সুযোগ নয়—জাতীয় গণমাধ্যমের মর্যাদার প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
দেশভিত্তিক কোটা বাড়ানো
সিনিয়র ও নিয়মিত কাভারিং সাংবাদিকদের অগ্রাধিকার
আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা
এগুলো বাস্তবায়িত হলে সমস্যা সমাধান সম্ভব।
ক্রিকেট আজ বৈশ্বিক খেলা। আইসিসির অন্যতম লক্ষ্য—
নতুন দর্শক তৈরি
মিডিয়া সম্প্রসারণ
বিশ্বব্যাপী সংযোগ
এই লক্ষ্য অর্জনে ছোট দেশগুলোর সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
বাংলাদেশি সাংবাদিকদের কার্ড বিতর্ক একটি সংকট হিসেবে শুরু হলেও, এটি আইসিসির জন্য একটি সুযোগ—
নিজেদের নীতিমালা আরও স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার।
আর বাংলাদেশের জন্য এটি সুযোগ—
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রশাসনে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তভাবে তুলে ধরার।
শেষ পর্যন্ত সবাই আশা করছে—
আইসিসি তাদের ঐতিহ্যবাহী নীতি বজায় রাখবে,
বাংলাদেশি সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করবে,
এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর শোনা যাবে।