Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সন্তানের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে খাবারে যোগ করুন কয়েকটি মশলা

সন্তান অসুস্থ হলে কর্মরত বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি বাড়ে। তাই কাজের চাপের মাঝেও সন্তানের রোগ প্রতিরোধ শক্তি আগেভাগেই বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি, যাতে অসুখ থেকে দূরে রাখা যায়।

শীতকাল এবং শীত বিদায়ের সময়টা ছোটদের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এই সময়েই জ্বর সর্দি কাশি থেকে শুরু করে ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। স্কুলে যাওয়া শিশুরা যেমন দ্রুত সংক্রমিত হয়, তেমনই বাড়িতে থাকা ছোটদের শরীরও এই সময় নানা অসুখে দুর্বল হয়ে পড়ে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিকমতো মানিয়ে নিতে না পারলেই সমস্যার শুরু হয়।

শিশু অসুস্থ হলে শুধু তারই কষ্ট হয় না, সেই ভোগান্তির প্রভাব পড়ে গোটা পরিবারের উপর। বিশেষ করে কর্মরত বাবা-মায়েদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও গভীর। একদিকে অফিসের দায়িত্ব, অন্যদিকে অসুস্থ সন্তানের চিন্তা এই দুইয়ের ভারসাম্য রাখা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে ওঠে। অসুস্থ সন্তানকে বাড়িতে রেখে কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়, আবার সন্তানের পাশে থেকে যত্ন নেওয়ার সুযোগও সবসময় পাওয়া যায় না। ফলে শারীরিক ক্লান্তির পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়তে থাকে।

এই কারণেই চিকিৎসকেরা বারবার বলছেন, সন্তানের অসুখ হওয়ার পর চিন্তা না করে আগে থেকেই সতর্ক হওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। প্রতিদিনের খাবার এবং জীবনযাত্রার মধ্যেই যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা যায়, তা হলে অনেকটাই কমে যেতে পারে শীতকালীন অসুখের ঝুঁকি।

ক্যালেন্ডার বলছে এখন মাঘ মাস। খুব শিগগিরই শীতের দাপট কিছুটা কমবে, আর তার সঙ্গেই শুরু হবে আবহাওয়ার ওঠানামা। দিনে গরম, রাতে ঠান্ডা এই বদলের সময়েই ভাইরাস সবচেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সময় থেকেই সন্তানের ইমিউনিটি শক্তিশালী করার দিকে নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।

পঞ্জাবের মোহালির চিকিৎসক মাধবী ভরদ্বাজ জানাচ্ছেন, শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে আলাদা করে দামি সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধের প্রয়োজন নেই। বরং ঘরের রান্নাঘরে থাকা কিছু সাধারণ মশলাই এই কাজে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। প্রতিদিনের খাবারে সামান্য পরিবর্তন আনলেই শিশুর শরীর ধীরে ধীরে ভিতর থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম মূলত শরীরের সেই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা বাইরের জীবাণু ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণ থেকে আমাদের রক্ষা করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ইমিউন সিস্টেম এখনও পুরোপুরি পরিণত হয় না। ফলে বড়দের তুলনায় তারা অনেক সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী হলে শুধু সংক্রমণের ঝুঁকিই কমে না, অসুখ হলেও তা দ্রুত সেরে ওঠে। জ্বর সর্দি কাশি কম হয়, অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন কমে এবং শিশুর সামগ্রিক বৃদ্ধি ও বিকাশও ভাল হয়।

খাবারের মাধ্যমেই ইমিউনিটি শক্তিশালী করা সম্ভব

অনেক বাবা-মায়ের ধারণা, ইমিউনিটি বাড়াতে আলাদা টনিক বা ওষুধ দরকার। কিন্তু বাস্তবে নিয়মিত খাবার থেকেই শরীর সবচেয়ে ভাল পুষ্টি পায়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যদি কিছু উপকারী উপাদান যোগ করা যায়, তা হলে প্রাকৃতিকভাবেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

এই ক্ষেত্রে মশলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রান্নাঘরে থাকা বহু মশলাই আসলে প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টে ভরপুর।

১। রসুন

রসুন বহু শতাব্দী ধরে আয়ুর্বেদ ও প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রে ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অনেকেই মনে করেন রসুন ঝাল বলে শিশুরা খেতে পারবে না। কিন্তু ঠিকভাবে ব্যবহার করলে রসুন খাবারের স্বাদই বাড়ায়, ঝাল ভাব তেমন থাকে না।

রসুনে রয়েছে অ্যালিসিন নামক একটি উপাদান, যা শক্তিশালী অ্যান্টি ব্যাক্টেরিয়াল ও অ্যান্টি ভাইরাল হিসেবে কাজ করে। জার্নাল অফ ইমিউনোলজি রিসার্চে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, রসুন শরীরে জীবাণুর প্রবেশ রোধ করে এবং প্রবেশ করলেও তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।

নিয়মিত রসুন খেলে সর্দি কাশি কম হয়, শ্বাসনালির সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা মেলে এবং শরীরের সামগ্রিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

কীভাবে খাওয়াবেন:
শিশুদের জন্য রসুন কাঁচা না দিয়ে রান্না করে দেওয়াই ভাল। স্যুপে বা ডালের ফোড়নে ২ থেকে ৩ কোয়া রসুন কুচি ব্যবহার করা যেতে পারে। মাংস বা সবজির ঝোলে রসুন ফোড়ন দিলে স্বাদও বাড়বে। অনেকে অল্প ঘিয়ে রসুন ভেজে ভাতের সঙ্গে মেখে খাওয়ান এটিও শিশুদের জন্য কার্যকর ও নিরাপদ উপায়।

২। আদা

আদা শীতকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মশলা। এতে রয়েছে জিঞ্জারল নামক শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, যা শরীরের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখে। প্রদাহ সঠিক মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে থাকলে ইমিউন সিস্টেম অনেক বেশি কার্যকর ভাবে কাজ করতে পারে।

news image
আরও খবর

শিশুদের ক্ষেত্রে ভাইরাস সংক্রমণের সময় শরীরে অপ্রয়োজনীয় প্রদাহ বেড়ে যায়। আদা সেই প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি জোগায়।

আদা হজমশক্তিও বাড়ায়। ফলে শিশুদের পেটের সমস্যা কম হয় এবং খাবারের পুষ্টি ভালভাবে শরীরে শোষিত হয়।

কীভাবে খাওয়াবেন:
নুডলস, ভাত বা স্যুপ রান্নার সময় অল্প আদা কুচি ব্যবহার করা যেতে পারে। তরকারিতে আদা দিলে স্বাদ যেমন বাড়ে, তেমনই শরীর পায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি। শীতের সময়ে গরম জল বা হালকা শরবতে অল্প আদা কুচি মিশিয়েও দেওয়া যেতে পারে।

৩। ছোট এলাচ

ছোট এলাচ শুধু সুগন্ধি মশলাই নয়, এটি একটি শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধকও বটে। এলাচে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ও অ্যান্টি ব্যাক্টেরিয়াল উপাদান। পাশাপাশি এটি রক্ত পরিশ্রুত করতেও সাহায্য করে।

এলাচ শরীরের ভেতরের প্রদাহ কমায়, হজমে সাহায্য করে এবং শ্বাসযন্ত্র সুস্থ রাখে। সর্দি কাশি বা গলা ব্যথার সময় এলাচ বিশেষ উপকারী।

কীভাবে খাওয়াবেন:
এলাচ থেঁতো করে বা গুঁড়ো করে গরম দুধে মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে এক চামচ মধু মেশালে শিশুরা সহজেই খেতে পারবে। এছাড়া পোলাও, খিচুড়ি বা সবজি রান্নাতেও এলাচ ব্যবহার করা যায়।

নিয়মিত ব্যবহারেই মিলবে সুফল

এই মশলাগুলি একদিন খাওয়ালেই জাদুর মতো কাজ করবে এমনটা নয়। নিয়মিত অল্প অল্প করে খাবারে যোগ করলেই ধীরে ধীরে শিশুর শরীর শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সবচেয়ে বড় কথা, এগুলি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রায় নেই।

কিছু অতিরিক্ত সতর্কতা

শিশুর বয়স অনুযায়ী মশলার পরিমাণ ঠিক করা জরুরি। খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মশলা না দেওয়াই ভাল। যদি শিশুর কোনও অ্যালার্জি বা বিশেষ অসুখ থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

উপসংহার

শীত ও শীত-পরবর্তী সময় শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জিং পর্ব। এই সময় আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তন, দিনের তাপমাত্রা ও রাতের ঠান্ডার ফারাক এবং বাতাসে ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়ার সক্রিয়তা সব মিলিয়ে ছোটদের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। জ্বর, সর্দি, কাশি বা গলা ব্যথার মতো সাধারণ সমস্যার পাশাপাশি ভাইরাসজনিত সংক্রমণও এই সময় বেশি দেখা যায়। ফলে শুধু শিশু নয়, মানসিক ও শারীরিক চাপের মধ্যে পড়েন বাবা-মায়েরাও।

বিশেষ করে কর্মরত বাবা-মায়েদের কাছে এই সময়টা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অফিসের দায়িত্ব সামলে অসুস্থ সন্তানের দেখভাল করা সব সময় সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়েই সন্তানকে বাড়িতে রেখে কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়, যা বাবা-মায়ের মনে অপরাধবোধ ও দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তোলে। তাই সন্তানের অসুখ হওয়ার পর দৌড়ঝাঁপ না করে, আগে থেকেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি শক্তিশালী থাকলে শিশুরা সহজে অসুস্থ হয় না। আর অসুস্থ হলেও রোগের তীব্রতা কম হয় এবং দ্রুত সেরে ওঠে। এই ইমিউনিটি বাড়ানোর জন্য সব সময় দামি ওষুধ বা সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য কিছু পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড় সুফল দিতে পারে।

রান্নাঘরে থাকা রসুন, আদা ও এলাচের মতো সাধারণ মশলাগুলি প্রাকৃতিকভাবেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। রসুন শরীরকে জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে, আদা প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রেখে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি জোগায়, আর এলাচ শরীরকে ভেতর থেকে পরিষ্কার রেখে শ্বাসযন্ত্র ও হজমতন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে এই মশলাগুলি সন্তানের খাবারে যোগ করলে ধীরে ধীরে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও মজবুত হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে ভালো দিক হল, এই উপায়গুলি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ। কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয় না রেখেই দৈনন্দিন জীবনে এগুলি সহজে প্রয়োগ করা যায়। এতে শুধু অসুখের ঝুঁকিই কমে না, সন্তানের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও শক্তিও উন্নত হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সন্তানের সুস্থতা বজায় রাখতে বড় কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট সচেতন অভ্যাসই বড় ফল এনে দিতে পারে। প্রতিদিনের খাবারে সামান্য মশলার ব্যবহার, সঠিক খাবার ও পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন এই সব মিলিয়েই সন্তানের শীতকালীন অসুখ থেকে অনেকটাই সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। এর ফলে সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে কর্মরত বাবা-মায়ের জীবনেও ফিরবে স্বস্তি, দুশ্চিন্তা কমবে, আর ঘরে থাকবে সুস্থ ও চনমনে সন্তানের হাসি।

Preview image