গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টরা বলছেন, নিয়ম মেনে মাত্র কয়েকটি উপকরণ যোগ করলেই সকালের কফিকে সহজেই রূপ দেওয়া যায় প্রদাহনাশী পানীয়ে। পাঁচ ধাপের সহজ পদ্ধতি মেনে তৈরি করুন স্বাস্থ্যকর মর্নিং ড্রিঙ্ক, আর দিন শুরু হোক হজম ও প্রদাহ দুটোই নিয়ন্ত্রণে রেখে।
শীতের সকালে গরম গরম দুধ-কফির মগ হাতে বসে দিন শুরু করার আনন্দ অনেকের কাছেই আলাদা। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই আছেন, যাঁরা দুধ-কফির স্বাদ আর গন্ধ ভালোবাসলেও গ্যাস, অম্বল, বুকজ্বালা কিংবা পেটখারাপের ভয়ে এই পানীয় থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। দুগ্ধজাত পণ্যে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা, সকালে দুধ হজম না-হওয়া, কিংবা দীর্ঘদিনের অম্বল-গ্যাসের সমস্যা—সব মিলিয়েই অনেকের কাছে দুধ-কফি যেন নিষিদ্ধ তালিকায় চলে যায়। অথচ দুধ-কফির গন্ধে কত মানুষের মন আজও ‘হু হু’ করে ওঠে!
এই জটিল সমস্যারই একটি সহজ, বৈজ্ঞানিক সমাধান দেখিয়েছেন এমস, হার্ভার্ড এবং স্ট্যানফোর্ড-প্রশিক্ষিত আমেরিকানিবাসী গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ড. সৌরভ শেট্টী। তাঁর মতে, কফিতে ব্যবহৃত কয়েকটি উপকরণ অম্বল কমাতে, অন্ত্রকে পুষ্ট রাখতে এবং শরীরের প্রদাহের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে আশ্চর্য কাজ করতে পারে। এমনকি যাঁরা দুধ সহ্য করতে পারেন না, তাঁরাও বিশেষ কিছু পরিবর্তন আনলে সকালের এই পানীয়টি উপভোগ করতে পারবেন অনায়াসে।
ড. শেট্টী ইনস্টাগ্রামে একটি ভাইরাল ভিডিয়োতে পাঁচটি সহজ ধাপ দেখিয়েছেন, যাতে যে কোনও সাধারণ কফিকে খুব সহজেই অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বা প্রদাহনাশী পানীয়তে পরিণত করা যায়। এই পানীয় শুধু স্বাদে নয়, স্বাস্থ্যের দিক থেকেও অত্যন্ত উপকারী। চলুন ধাপে ধাপে দেখে নেওয়া যাক, কী ভাবে আপনার সকালবেলার কফি হয়ে উঠতে পারে শরীরের জন্য কার্যকরী উপাদানে ভরপুর এক অনন্য পানীয়।
১. প্রথম ধাপ: কালো কফির শক্তি
দিনের শুরুতে এক কাপ কালো কফি শুধু মন ভালো করে না, শরীরকেও দেয় গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট। কফি বিনে উপস্থিত পলিফেনল শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেসই দীর্ঘকালের নানা রোগ—প্রদাহজনিত সমস্যা, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, এমনকি হৃদ্রোগেরও অন্যতম কারণ।
কালো কফির অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট এই প্রদাহের প্রতিক্রিয়া কমিয়ে শরীরকে ভিতর থেকে শক্তিশালী করে। তাই পানীয়ের ভিত্তি হিসেবে কালো কফিকে রাখা খুব জরুরি। এছাড়া দুধ বা ক্রিমের অতিরিক্ত ক্যালোরি ও ফ্যাট বাদ পড়ায় এটি আরও স্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে।
২. দুধের ব্যবহার—প্রয়োজনে বাদও দেওয়া যায়
অনেকে সকালে দুধ সহ্য করতে পারেন না। বিশেষ করে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্ট মানুষদের ক্ষেত্রে দুধ পেটে ঢুকতেই অস্বস্তি, গ্যাস, ফুলে থাকা এবং খারাপ লাগা শুরু হয়। এই সমস্যা থাকলে সাধারণ দুধের বদলে ব্যবহার করা যেতে পারে আমন্ড মিল্ক, সয়া মিল্ক, বা ওট মিল্ক।
এগুলি দুধের স্বাদ ও মোলায়েম পরত বজায় রাখলেও হজমের সমস্যা করে না।
যাঁদের দুধে সমস্যা নেই, তাঁরা অল্প পরিমাণ দুধ মেশালে কফির স্বাদ আরও মোলায়েম হয়। তবে মূল কথা—দুধ বাধ্যতামূলক নয়। চাইলে এই ধাপ বাদও দেওয়া যায়।
৩. দারচিনি: প্রদাহনাশী ও রক্তশর্করা নিয়ন্ত্রক
এক চিমটে দারচিনি কফিতে শুধু সুবাসই আনে না, সঙ্গে দেয় অসামান্য স্বাস্থ্যগুণ।
দারচিনির মধ্যে রয়েছে সিনামালডিহাইড নামের একটি উপাদান, যা শরীরের রক্তশর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সে ভোগা মানুষের জন্য দারচিনি অত্যন্ত উপকারী।
তা ছাড়া দারচিনি শক্তিশালী অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান। শরীরের প্রদাহ কমিয়ে এটি হজমশক্তি উন্নত করে, গাট হেলথ ভালো রাখে এবং ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে।
ফলে কফিতে সামান্য দারচিনি মিশিয়ে নেওয়া হলে পানীয়টি প্রদাহরোধী শক্তি পায়, আর স্বাদও হয়ে ওঠে অনন্য।
৪. কোকো পাউডার: অন্ত্রের উপকারী ব্যাক্টেরিয়া বাড়ায়
কোকো পাউডার সাধারণত চকলেটের সঙ্গে যুক্ত হলেও বিশুদ্ধ কোকো স্বাস্থ্যগুণে পরিপূর্ণ। কোকোতে রয়েছে পলিফেনল, যা অন্ত্রে থাকা ‘গুড ব্যাক্টেরিয়া’র বৃদ্ধি বাড়ায়।
এই ‘গুড ব্যাক্টেরিয়া’ আমাদের হজমশক্তি নিয়ন্ত্রণে রাখে, পেট গরম বা অম্বলের সমস্যা কমায়, আর অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি প্রক্রিয়া শক্তিশালী করে।
এছাড়াও কোকো পাউডার—
মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায়
মন ভালো রাখতে সাহায্য করে
হরমোন ব্যালান্স ঠিক রাখে
যাঁরা দুধ-কফিতে একটু চকলেটি ফ্লেভার পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে এটি দ্বিগুণ উপভোগ্য। তাই এক চা চামচ বিশুদ্ধ কোকো পাউডার এই পানীয়কে আরও স্বাস্থ্যকর করে তোলে।
৫. MCT Oil: শরীরকে দ্রুত শক্তি দেয়
শেষ ধাপে এক চা চামচ MCT Oil যোগ করা ড. শেট্টীর মতে অত্যন্ত উপকারী। MCT বা Medium Chain Triglycerides হলো একটি বিশেষ ধরনের ফ্যাট, যা খুব দ্রুত হজম হয় এবং শরীরকে তৎক্ষণাৎ শক্তি প্রদান করে।
এটি মূলত নারকেল তেল ও পাম কেরনেল অয়েল থেকে তৈরি হয়।
MCT Oil—
শরীরের মেটাবলিজম বাড়ায়
অন্ত্রের উপকারী অণুজীবকে পুষ্টি দেয়
মস্তিষ্ককে তাৎক্ষণিক এনার্জি সরবরাহ করে
প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে
সকালে এক চামচ MCT অয়েল কফিতে মেশালে শরীর চনমনে হয়ে ওঠে, আর দীর্ঘ সময় পেটও ভরা থাকে।
এই পাঁচ ধাপের কফি—কেন এত উপকারী?
এই বিশেষ পানীয়টি তিনটি দিক থেকে অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর:
কফি, দারচিনি, কোকো পাউডার—এই তিন উপাদানে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট। নিয়মিত গ্রহণ করলে শরীরের কোষগুলি সুস্থ থাকে, প্রদাহের মাত্রা কমে।
MCT Oil, কোকোর পলিফেনল এবং দারচিনি একসঙ্গে কাজ করে অন্ত্রের উপকারী ব্যাক্টেরিয়া বাড়ায়। ফলে অম্বল, গ্যাস ও বুকজ্বালা কমতে সাহায্য করে।
কালো কফির ক্যাফেইন + MCT Oil = মস্তিষ্ক ও শরীরের জন্য শক্তির ডাবল বুস্ট।
সাধারণ দুধের পরিবর্তে আমন্ড মিল্ক বা সয়া মিল্ক ব্যবহার করলে দুধে অ্যালার্জি থাকা ব্যক্তিরাও এই পানীয় উপভোগ করতে পারবেন।
কখন এবং কীভাবে খাবেন?
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন—এই পানীয় সকালবেলায় নাশতার আগে বা পরে খেলে সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
এটি—
শরীরকে ওয়ার্ম-আপ করে
পেটকে আরাম দেয়
দিনের কাজ শুরু করতে শক্তি জোগা
দীর্ঘদিন ধরে অনেকেই দুধ-কফির স্বাদ ভালোবাসলেও গ্যাস, অম্বল, বুকজ্বালা বা অসহিষ্ণুতার ভয়ে সকালে কফি পান থেকে বিরত থেকেছেন। বিশেষ করে শীতের সকালে গরম দুধ-কফির আকর্ষণ থাকার পরেও পেটের অস্বস্তির আশঙ্কায় অনেকের দিন শুরু হয় বঞ্চনা আর অভ্যাসের পরিবর্তনে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা এবং পুষ্টিবিদদের গবেষণা বলছে—কফি সঠিক উপায়ে তৈরি করা হলে এটি শুধু নিরাপদই নয়, বরং প্রদাহ কমানো, হজমশক্তি উন্নত করা এবং শরীরকে শক্তিশালী রাখার ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এক্ষেত্রেই ড. সৌরভ শেট্টীর প্রস্তাবিত পাঁচ ধাপের কফি প্রস্তুতপ্রণালী আজ নতুন আলোচনার বিষয়। তাঁর মতে, কফিকে অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি বা প্রদাহনাশী পানীয়ে পরিণত করা একেবারে সহজ। কালো কফিকে ভিত্তি করে, অল্প দুধ (অথবা বিকল্প দুধ), দারচিনি, কোকো পাউডার এবং শেষে এক চা চামচ MCT অয়েল—এই পাঁচটি ধাপই কফির স্বল্প গুণকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে।
কালো কফির অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট শরীরের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। দারচিনি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রদাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। কোকো পাউডারের পলিফেনল অন্ত্রের উপকারী ব্যাক্টেরিয়াকে বাড়িয়ে হজমশক্তি উন্নত করে। আর MCT অয়েল শরীরকে দ্রুত এনার্জি দেয়, মেটাবলিজম বাড়ায় এবং গাট হেলথ উন্নত করে।
যাঁরা দুধ সহ্য করতে পারেন না, তাঁদের জন্যও এটি একটি দারুণ বিকল্প। সাধারণ দুধের বদলে আমন্ড মিল্ক বা সয়া মিল্ক ব্যবহার করলে পানীয়টি আরও হজমবান্ধব হয়। ফলে অম্বল বা বুকজ্বালা হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। অনেকেই মনে করেন দুধ-কফি মানেই গ্যাসের সমস্যা, কিন্তু আসল সত্য হলো—সমস্যার জন্য দায়ী দুধ নয়, বরং ভুল উপায়ে কফি বানানো। সঠিক মিশ্রণ এবং সময়মতো গ্রহণ করলে কফি শরীরের জন্য উপকারীই হবে।
আজকের ব্যস্ত জীবনে প্রদাহ কমানো, হজমশক্তি বাড়ানো, এনার্জি ধরে রাখা—এই তিনটি প্রয়োজনীয়তা প্রায় সকলের ক্ষেত্রেই এক। এই পাঁচ ধাপের কফি ঠিক সেই তিনটি প্রয়োজন পূরণ করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, পেট থাকে আরামদায়ক, মস্তিষ্ক পায় দ্রুত এনার্জি বুস্ট। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই পানীয়টি বানানো অত্যন্ত সহজ এবং সময়সাশ্রয়ী।
যাঁরা এতদিন দুধ-কফির স্বাদ থেকে নিজেদের দূরে রেখেছিলেন, তাঁদের কাছে এই পদ্ধতি হতে পারে এক নতুন করে ফিরে দেখা। শীতের সকালে গরম মগ হাতে দিন শুরু করার সেই অনুভূতি আর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা—দুটোই মিলিয়ে এই পানীয় এখন অনেকের জীবনযাত্রায় নতুন জায়গা করে নিতে পারে। ড. শেট্টীর মতে, "কফিকে যদি সঠিক উপায় অনুসরণ করে তৈরি করা হয়, তাহলে এটি শরীরের শত্রু নয়, বরং শক্তির উৎস।"
তাই নিশ্ছিদ্রভাবে বলা যায়—সকালের শুরু হোক সেই পানীয় দিয়ে, যা শরীরকে ভিতর থেকে সুস্থ রাখবে, প্রদাহ কমাবে, পেটের অসুবিধা দূর করবে, আর দিনভর আপনাকে রাখবে সক্রিয় ও উদ্যমী। আপনার প্রতিদিনের অভ্যাসে এই প্রদাহনাশী কফি হয়ে উঠতে পারে এক বহুমূল্য পরিবর্তন—স্বাস্থ্যের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পথ।