Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

১৬ শিশুর ডিএনএ এক বাবার সঙ্গে মিলে চাঞ্চল্য নাম শুনেই থানায় ভিড় মহিলাদের

১৬ শিশুর ডিএনএ এক বাবার সঙ্গে মিলে চাঞ্চল্য নাম শুনেই থানায় ভিড় মহিলাদের।

নেদারল্যান্ডসের রাইনস্টেট হাসপাতালকে ঘিরে যে ঘটনা সামনে এসেছে তা আধুনিক চিকিৎসা ইতিহাসের এক গভীর নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। বহু বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা কীভাবে সময়ের ব্যবধানে আবার সামনে এসে মানুষের বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিতে পারে এই ঘটনাটি তারই এক বাস্তব উদাহরণ। ১৯৭০ এবং ১৯৮০ এর দশকে হাসপাতালটির এক প্রাক্তন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা আলেকজান্ডার শ্মাউটজিগার এমন একটি কাজ করেছিলেন যা আজকের দিনে শুধু আইন বিরুদ্ধ নয় বরং মানবিকতার চরম লঙ্ঘন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। স্বাধীন তদন্তে উঠে এসেছে যে তিনি সম্ভাব্য পিতামাতাদের অজান্তে এবং তাদের সম্মতি ছাড়াই নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করে অন্তত ১৬টি সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর শুধু নেদারল্যান্ডস নয় গোটা বিশ্বের চিকিৎসা মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

এই ঘটনাটি বোঝার জন্য আমাদের সেই সময়ের প্রেক্ষাপটও জানা প্রয়োজন। ১৯৭০ এবং ১৯৮০ এর দশকে কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। দাতা শুক্রাণুর ব্যবহার তখন অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মবদ্ধ ছিল না এবং আইনগত কাঠামোও আজকের মতো শক্তিশালী ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকদের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হতো রোগীদের। এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই ডা শ্মাউটজিগার এমন কাজ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাবা মা মনে করতেন তারা অজ্ঞাত কোনও দাতার শুক্রাণু ব্যবহার করছেন কিন্তু বাস্তবে সেই জায়গায় ব্যবহার করা হচ্ছিল চিকিৎসকের নিজের শুক্রাণু।

২০২৬ সালের ১০ মার্চ হাসপাতালের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে আসে। সেখানে বলা হয় যে ডাক্তার নিজেই স্বীকার করেছেন যখন উপযুক্ত দাতার শুক্রাণু পাওয়া যেত না তখন তিনি নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করতেন। এই স্বীকারোক্তি শুধু এক ব্যক্তির অপরাধ নয় বরং একটি পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে। কারণ প্রশ্ন উঠছে কীভাবে এত বছর ধরে এই বিষয়টি গোপন রইল এবং কেন তা আগে ধরা পড়ল না।

ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১৬ জন সন্তানের পরিচয় মিলেছে যাদের জৈবিক পিতা ওই ডাক্তার। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই সন্তানদের অনেকেই বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী। তারা যখন জানতে পারেন যে তাদের জন্মের পেছনে এমন এক প্রতারণা লুকিয়ে ছিল তখন তাদের মানসিক অবস্থার কথা সহজেই অনুমান করা যায়। অনেকেই নিজেদের পরিচয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। তাদের জীবনের ভিত্তিই যেন হঠাৎ করে বদলে গেছে।

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে সেই সব মায়েদের উপর যারা চিকিৎসকের উপর ভরসা করে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে গিয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন তারা একটি নিরাপদ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান লাভ করছেন। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছেন যে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছিল। অনেক নারী এই ঘটনা জানার পর থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। কেউ কেউ আবার শুধু সত্যটা জানতে চেয়েছেন। তাদের কাছে বিষয়টি শুধুমাত্র আইনি লড়াই নয় বরং মানসিক মুক্তিরও একটি পথ।

পুলিশ ইতিমধ্যে ডাক্তারের বিরুদ্ধে প্রতারণা সম্মতি ছাড়া চিকিৎসাগত হস্তক্ষেপ এবং নৈতিক লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। এই মামলা শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধের বিচার নয় বরং একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনেরও বিষয়। যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে সেই দিকটিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই ঘটনা প্রথম নয়। নেদারল্যান্ডসে এর আগেও একাধিকবার এমন কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে। যেমন ইয়ান কারবাত নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করে বহু সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন যা পরে ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়। ইয়োস বিক এবং ইয়ান ভিল্ডশুটের ঘটনাও একইভাবে আলোচনায় এসেছিল। তবে রাইনস্টেটের এই ঘটনাটি আলাদা কারণ এখানে অভিযুক্ত চিকিৎসক জীবিত আছেন এবং তিনি নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। ফলে আইনি প্রক্রিয়া এবং সত্য উদঘাটন আরও স্পষ্টভাবে এগোতে পারছে।

এই ঘটনাটি চিকিৎসা নীতির একটি বড় প্রশ্নও তুলে ধরেছে। একজন চিকিৎসকের প্রতি রোগীর যে আস্থা থাকে তা যদি এভাবে ভেঙে যায় তাহলে পুরো ব্যবস্থার উপরই প্রশ্ন উঠে যায়। চিকিৎসা শুধু একটি পেশা নয় এটি একটি দায়িত্ব যেখানে মানবিকতা এবং সততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় এমন একটি ঘটনা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

রাইনস্টেট হাসপাতাল জানিয়েছে যে সেই সময়ে দাতা শুক্রাণু কর্মসূচি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল না এবং কঠোর আইনও ছিল না। তবে তারা এটাও স্বীকার করেছে যে আইন না থাকলেও এই কাজ নৈতিকভাবে সম্পূর্ণ ভুল ছিল। হাসপাতাল এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে তাদের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এই সহায়তা কি সেই মানসিক ক্ষত পূরণ করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এই ঘটনা আমাদের আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয় যে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন তার ব্যবহার যদি সঠিকভাবে না হয় তাহলে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কৃত্রিম প্রজনন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্ষেত্র যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের আবেগ ভবিষ্যৎ এবং পরিচয়। সেখানে সামান্য অনিয়মও জীবনের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

news image
আরও খবর

অনেক সন্তান এখন তাদের জৈবিক পরিচয় খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ জানতে চাইছেন তাদের ভাই বোন কতজন এবং কোথায় আছেন। এই খোঁজের মধ্যে একদিকে যেমন কৌতূহল রয়েছে অন্যদিকে রয়েছে গভীর মানসিক যন্ত্রণা। তাদের জীবনের গল্প এখন নতুন করে লেখা হচ্ছে।

এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ হল চিকিৎসা নীতির প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন। যখন কোনও রোগী বা সম্ভাব্য অভিভাবক চিকিৎসকের কাছে যান তখন তারা শুধু চিকিৎসা নয় বরং একটি নৈতিক দায়িত্বও তার হাতে তুলে দেন। সেই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই চিকিৎসা ব্যবস্থার ভিত দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা সেই ভিতকে নাড়িয়ে দেয় এবং মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে যে তারা আসলে কতটা নিরাপদ। বিশেষ করে কৃত্রিম প্রজননের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে সেখানে এই ধরনের প্রতারণা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই ঘটনার পর বিভিন্ন দেশে আইন প্রণেতারা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন কীভাবে এই ক্ষেত্রকে আরও স্বচ্ছ এবং নিয়ন্ত্রিত করা যায়। অনেক দেশেই ইতিমধ্যে দাতা পরিচয় সংরক্ষণ ডিএনএ রেকর্ড রাখা এবং চিকিৎসা পদ্ধতির উপর কঠোর নজরদারি চালু করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু দেশে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিটি দাতার তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে সংরক্ষণ করার প্রস্তাব উঠেছে যাতে ভবিষ্যতে কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়লে তা দ্রুত শনাক্ত করা যায়। এর ফলে শুধু রোগীদের নিরাপত্তাই বাড়বে না বরং চিকিৎসকদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা যাবে।

একই সঙ্গে এই ঘটনা চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার দিকেও নজর দিতে বাধ্য করেছে। শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয় নৈতিক শিক্ষা এবং পেশাগত সততার উপর আরও বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। একজন চিকিৎসক কেবল একজন পেশাদার নন তিনি একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি যার সিদ্ধান্ত অনেক মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তাই তার প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যে সততা এবং স্বচ্ছতা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ডিএনএ প্রযুক্তির ভূমিকা। আজকের দিনে জেনেটিক পরীক্ষা এতটাই উন্নত হয়েছে যে বহু বছর আগের ঘটনাও এখন প্রমাণসহ সামনে আনা সম্ভব হচ্ছে। এই প্রযুক্তি একদিকে যেমন সত্য উদঘাটনে সাহায্য করছে অন্যদিকে এটি মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রশ্নও তুলে ধরছে। যারা এতদিন নিজেদের একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে বড় হয়েছেন তারা হঠাৎ করে জানতে পারছেন তাদের জীবনের গল্প সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই মানসিক ধাক্কা সামলানো সহজ নয় এবং এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সহায়তা।

অনেক পরিবার এখন নতুন করে নিজেদের সম্পর্ককে বুঝতে চেষ্টা করছে। মা সন্তানের সম্পর্ক নতুনভাবে মূল্যায়ন হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে এই সম্পর্ক শুধুমাত্র জৈবিক নয় বরং আবেগের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে। তবে সেই আবেগের মধ্যেও প্রতারণার আঘাত রয়েছে যা সহজে মুছে ফেলা যায় না। অনেক মা নিজেকে দায়ী মনে করছেন যদিও বাস্তবে তারা ছিলেন প্রতারণার শিকার। এই মানসিক অবস্থার জন্য তাদের পাশে দাঁড়ানো সমাজের দায়িত্ব।

এই ঘটনা ভবিষ্যতে কৃত্রিম প্রজননের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কেউ কেউ হয়তো এই পদ্ধতির উপর আস্থা হারাতে পারেন আবার অনেকে আরও সচেতন হয়ে উঠবেন। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ যে তারা কীভাবে মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে। এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা এবং নিয়মিত নজরদারি।

একই সঙ্গে এই ঘটনা মিডিয়ার ভূমিকাকেও সামনে এনেছে। সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি। কারণ এই ঘটনায় জড়িত অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন এবং তাদের সম্মান রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

সবশেষে বলা যায় এই ঘটনা একটি সতর্কবার্তা যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রযুক্তির উন্নতি যতই হোক না কেন তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আইন নীতি এবং মানবিকতার মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। সমাজ চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং প্রশাসন সকলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে যাতে মানুষের বিশ্বাস অটুট থাকে এবং আগামী প্রজন্ম একটি নিরাপদ ও স্বচ্ছ পরিবেশে বড় হতে পারে।

Preview image