Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সংখ্যার জন্মের আগেই ছিল গণিত আট হাজার বছরের পুরনো মাটির পাত্রে মিলল ইতিহাসের দলিল

বিজ্ঞানীদের দাবি, হাজার হাজার বছর আগে নির্মিত ওই মাটির পাত্র পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয় যে আধুনিক মানুষ লেখার ভাষা আয়ত্ত করার অনেক আগেই অঙ্ক কষার কৌশল রপ্ত করে ফেলেছিল।

পৃথিবীতে সংখ্যাতত্ত্বের আনুষ্ঠানিক আবিষ্কার ঘটার বহু আগেই যে মানুষ অঙ্কের ব্যবহার শুরু করে দিয়েছিল, তার এক বিস্ময়কর ও প্রামাণ্য দলিল সম্প্রতি সামনে এনেছেন বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার মানবসভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। আধুনিক মানুষের লেখন-পদ্ধতি বা প্রতীকভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থার বহু আগেই যে মানুষ গণনার কৌশল, জ্যামিতিক বিন্যাস এবং এক ধরনের অ্যালগরিদমিক চিন্তাভাবনা রপ্ত করেছিল, তারই স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে প্রায় আট হাজার বছরের পুরনো একটি মাটির পাত্রে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই নিদর্শন শুধু প্রাচীন শিল্পকলার নমুনা নয়, বরং মানব মনের প্রাথমিক গণিতচিন্তার এক জীবন্ত দলিল।

গবেষকদের দাবি, ওই মাটির পাত্রে আঁকা নকশাগুলি নিছক সৌন্দর্যের জন্য তৈরি নয়। সেখানে যে ফুলের নকশা, রেখা ও পুনরাবৃত্ত জ্যামিতিক বিন্যাস দেখা যাচ্ছে, তা সুস্পষ্টভাবে পরিকল্পিত ও হিসেবভিত্তিক। প্রতিটি নকশা একটি নির্দিষ্ট ছক মেনে সাজানো হয়েছে, যেখানে দূরত্ব, কোণ এবং পুনরাবৃত্তির সংখ্যা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই ধরনের নিখুঁত বিন্যাস সম্ভব হয়েছে কারণ তখনকার মানুষ সংখ্যা না জানলেও গণনার ধারণা বুঝত এবং সেটিকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারত।

এই পাত্রটি যে সভ্যতার নিদর্শন, তা হল উত্তর মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন হালাফিয়ান সভ্যতা। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৬২০০ থেকে ৫৫০০ সালের মধ্যে এই সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ওই সময়ে মানুষ কৃষিকাজ, পশুপালন ও মৃৎশিল্পে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছিল। কিন্তু এই আবিষ্কার দেখিয়ে দিচ্ছে যে, শুধু দৈনন্দিন জীবনযাপন নয়—চিন্তাভাবনার স্তরেও তারা অনেকটাই অগ্রসর ছিল। তারা পর্যবেক্ষণ করতে পারত, পরিকল্পনা করতে পারত এবং সেই পরিকল্পনাকে নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করতে জানত।

গবেষণায় দেখা গেছে, পাত্রটির নকশা আঁকার সময় একাধিক ধাপে কাজ করা হয়েছে। প্রথমে একটি মূল কাঠামো বা গ্রিড কল্পনা করা হয়েছে, তারপর তার উপর ভিত্তি করে নকশাগুলি আঁকা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি অনেকটাই আধুনিক অ্যালগরিদমের মতো—যেখানে নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করে চূড়ান্ত ফলাফল তৈরি করা হয়। সংখ্যার নাম বা লিখিত চিহ্ন না থাকলেও, এই ধরণের ধারাবাহিক চিন্তাভাবনা যে তখনকার মানুষের মধ্যে ছিল, তা এই নিদর্শন স্পষ্ট করে।

বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, এই আবিষ্কার মানবসভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এতদিন ধারণা ছিল, সংখ্যাতত্ত্ব ও জ্যামিতির বিকাশ শুরু হয় লিখিত ভাষা ও প্রতীক ব্যবস্থার পর। কিন্তু এই মাটির পাত্র প্রমাণ করছে, তার বহু আগেই মানুষের মনে গণিতের বীজ রোপিত হয়েছিল। শিল্প, গণনা এবং যুক্তিবোধ—এই তিনটির মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তারও এক প্রাচীন উদাহরণ এটি।

সব মিলিয়ে, এই প্রাচীন মাটির পাত্র শুধুমাত্র একটি প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার নয়; এটি মানব মস্তিষ্কের বিকাশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আধুনিক বিজ্ঞান ও গণ

বিজ্ঞানীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংখ্যার অস্তিত্বের আগে মানুষের মধ্যে অঙ্কের ধারণা ছিল। আর সেই অঙ্কের জ্ঞান শুধু দৈনন্দিন প্রয়োজনেই নয়, শিল্পচর্চার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হত। সম্প্রতি খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ছ’হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার একটি নিদর্শন পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তাঁরা। উত্তর মেসোপটেমিয়ার একটি প্রাচীন মাটির পাত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রায় নিশ্চিত হয়েছেন যে, ওই পাত্রের গায়ে থাকা নকশাগুলি নিছক অলংকরণ নয়—বরং তা সুপরিকল্পিত অঙ্ক কষে তৈরি করা।

এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন জেরুসালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। গবেষক দলের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক ইয়োসেফ গারফিঙ্কেল এবং গবেষক সারা ক্রুলউইচ। তাঁদের এই গবেষণা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা পত্রিকা ‘জার্নাল অফ ওয়ার্ল্ড প্রিহিস্টরি’-তে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং গণিতবিদদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।

গবেষকদের মতে, যে মাটির পাত্রটি নিয়ে এই গবেষণা করা হয়েছে, সেটি হালাফিয়ান সভ্যতার নিদর্শন। উত্তর মেসোপটেমিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৬,২০০ থেকে ৫,৫০০ বছর আগে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। হালাফিয়ান সভ্যতা মূলত তাদের উন্নত কুমোরশিল্প এবং নান্দনিক নকশার জন্য পরিচিত। তবে এই বিশেষ পাত্রটি আগের সব নিদর্শনের তুলনায় আলাদা, কারণ এতে শুধু সৌন্দর্য নয়—স্পষ্ট গণিতের ছাপ রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ওই মাটির পাত্রটির গায়ে আঁকা রয়েছে অসংখ্য ফুলের নকশা। সংখ্যা কম নয়—প্রায় ৭০০টিরও বেশি ফুলের নকশা রয়েছে সেখানে। কিন্তু এই ফুলগুলি এলোমেলোভাবে আঁকা নয়। প্রতিটি ফুলের পাপড়ি, তাদের অবস্থান এবং পুনরাবৃত্তির ধরণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সেগুলি সম্পূর্ণ জ্যামিতিক নিয়ম মেনে সাজানো।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। ফুলগুলির পাপড়ির সংখ্যা ও বিন্যাসের ক্রম হল—৪, ৮, ১৬, ৩২, ৬৪। এই ক্রমটি আসলে দ্বিগুণ বৃদ্ধির একটি ধারাবাহিকতা, যা আধুনিক গণিতে ‘পাওয়ার অফ টু’ বা বাইনারি বৃদ্ধির ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের ধারাবাহিক বিন্যাস নিছক চোখের আন্দাজে করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, পরিমাপ এবং গণনাজ্ঞান।

news image
আরও খবর

গবেষক ইয়োসেফ গারফিঙ্কেল জানিয়েছেন, “এই পাত্রটি আমাদের সামনে এমন এক সময়ের প্রমাণ তুলে ধরছে, যখন মানুষ এখনও লিখন-পদ্ধতি আবিষ্কার করেনি। অথচ তারা স্থান ভাগ করতে জানত, পুনরাবৃত্তির নিয়ম বুঝত এবং অ্যালগরিদমিক চিন্তা প্রয়োগ করতে পারত।” তাঁর মতে, গোটা পাত্রের গায়ে নির্দিষ্ট মাপে জায়গা ভাগ করে সেখানে ফুল আঁকার কাজটি গণিতের জ্ঞান ছাড়া একেবারেই অসম্ভব।

অন্য গবেষক সারা ক্রুলউইচের বক্তব্যও একই সুরে বাঁধা। তিনি বলেন, “এই মাটির পাত্র আমাদের শেখায় যে গণিত শুধু সংখ্যা বা লিখিত চিহ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গণিত ছিল একটি চিন্তাধারা—যা শিল্প, নকশা এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।” তাঁর মতে, আধুনিক মানুষ যখন লিখতে শেখেনি, তখনও তারা অঙ্ক কষতে জানত—এ কথা এতদিন অনুমান করা হলেও, এমন শক্ত প্রমাণ আগে পাওয়া যায়নি।

ঐতিহাসিকদের মতে, সংখ্যাতত্ত্ব কোনও একদিনে বা কোনও একটি নির্দিষ্ট স্থানে আবিষ্কৃত হয়নি। বহু গবেষকের ধারণা, সংখ্যা ধীরে ধীরে মানবসভ্যতার বিভিন্ন অঞ্চলে বিকশিত হয়েছে। তবে এক থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যার প্রাথমিক ধারণার উদ্ভব মেসোপটেমিয়াতেই হয়েছিল বলে মনে করা হয়। আজ থেকে প্রায় ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ বছর আগে এই অঞ্চলে সংখ্যার ব্যবহার শুরু হয়।

কিন্তু হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দাবি, এই সংখ্যার আবিষ্কারেরও আগে মেসোপটেমিয়ার মানুষ অঙ্কের ব্যবহার করত। তাঁদের যুক্তি, সংখ্যার প্রতীক না থাকলেও মানুষের মধ্যে পরিমাণ বোঝার ক্ষমতা, ভাগ করার ধারণা এবং জ্যামিতিক মাপজোখের জ্ঞান ছিল। এই মাটির পাত্র সেই অঙ্কজ্ঞানকে দৃশ্যমান করে তুলেছে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাচীন কালের যত মাটির পাত্র এখনও পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে, সেগুলির অধিকাংশেই পশু, মানুষ বা দৈনন্দিন জীবনের নানা দৃশ্য আঁকা থাকত। ফুলের নকশা ছিল অত্যন্ত বিরল। অথচ এই পাত্রে ফুলই প্রধান অলংকরণ। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কেবল শৈল্পিক পছন্দ নয়—বরং একটি পরিকল্পিত নকশা, যার মাধ্যমে গণনার নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে।

যদিও সেই সময়ে মানুষ ফুল ও পাতার ব্যবহার জানত এবং দৈনন্দিন জীবনে সেগুলির ব্যবহার ছিল, তবু শিল্পে ফুলের চিত্রায়ন তেমন দেখা যায়নি। এই দিক থেকে হালাফিয়ান সভ্যতার ওই পাত্রটি ব্যতিক্রমী। গবেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে সেই সময়ে শিল্প কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, জ্ঞান প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হত।

বিজ্ঞানী ক্রুলউইচের মতে, “এই পাত্রে আমরা ভাগ, পুনরাবৃত্তি এবং অ্যালগরিদমের সরাসরি প্রয়োগ দেখতে পাচ্ছি। এটি আধুনিক গণিতের বীজ বলা যেতে পারে।” তাঁর বক্তব্য, এই অঙ্কজ্ঞান শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল না—বরং দৈনন্দিন জীবনেও তার প্রয়োগ ছিল।

অধ্যাপক গারফিঙ্কেলও মনে করেন, হালাফিয়ান সভ্যতার মানুষ কৃষিকাজ, পণ্য বিনিময়, ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং সমাজব্যবস্থার নানা ক্ষেত্রে এই গণনাজ্ঞান ব্যবহার করত। এই পাত্র সেই বৃহত্তর জ্ঞানভান্ডারের একটি অংশমাত্র।

এই আবিষ্কার মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতদিন ধারণা ছিল, লেখন-পদ্ধতির আবিষ্কারের পরই মানুষ গণিতের দিকে এগিয়েছে। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে, বাস্তবে তার উল্টোটা ঘটেছিল—প্রথমে ছিল অঙ্ক, পরে সংখ্যা, আর তারও পরে লেখা।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে মানবসভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিয়ে গবেষণার নতুন পথ খুলে দেবে। প্রাচীন শিল্পকর্মগুলিকে এখন আর শুধু সৌন্দর্যের নিদর্শন হিসেবে দেখা যাবে না—বরং সেগুলিকে গণিত, যুক্তি ও চিন্তার দলিল হিসেবেও বিচার করা হবে।

সংখ্যার আগে অঙ্ক—এই ধারণা শুধু অতীতকে নতুন করে বুঝতে সাহায্য করছে না, বরং আধুনিক মানুষের চিন্তার শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত, তা-ও নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। হাজার হাজার বছর আগের একটি মাটির পাত্র আজ আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে—মানুষের বুদ্ধি, কল্পনা এবং গণনাশক্তি যুগে যুগে কীভাবে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে।

Preview image