প্রায় পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হবে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। এর মধ্যে ৫৮ মিনিট ১৫ সেকেন্ড থাকবে সবচেয়ে নাটকীয় পূর্ণগ্রাস পর্ব, যখন খালি চোখেই দেখা যাবে লালচে চাঁদ। তবে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে এই দৃশ্য দেখা যাবে না।
মার্চে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ: কোথায় কতটা দেখা যাবে, পশ্চিমবঙ্গের আকাশে কী ছবি?
সাম্প্রতিক সূর্যগ্রহণ ভারতের আকাশে দৃশ্যমান না হলেও মার্চ মাসে আকাশপ্রেমীদের জন্য রয়েছে বিশেষ চমক—পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। সূর্যগ্রহণের মতো বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন নেই; খালি চোখেই দেখা যায় চন্দ্রগ্রহণ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই উৎসাহ বেশি। তবে এই গ্রহণ পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে সমান ভাবে দেখা যাবে না। ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল থেকে আংশিক বা খণ্ডগ্রাস পর্যায় দেখা গেলেও পূর্ণগ্রাস পর্যায় সবার জন্য দৃশ্যমান নাও হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে সূর্যাস্ত ও চন্দ্রোদয়ের সময়ের কারণে পূর্ণগ্রাস দেখা কঠিন।
নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হল—কখন, কোথায়, কতক্ষণ এবং কী ভাবে দেখা যাবে এই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা।
চন্দ্রগ্রহণ কী এবং কেন হয়?
চাঁদের নিজস্ব আলো নেই। সূর্যের আলো চাঁদের উপর প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়। যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে এসে পড়ে এবং পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে, তখন সূর্যের আলো সরাসরি চাঁদে পৌঁছাতে পারে না। এই অবস্থাকেই বলা হয় চন্দ্রগ্রহণ।
পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের ক্ষেত্রে চাঁদ পুরোপুরি পৃথিবীর গাঢ় ছায়া বা ‘আম্ব্রা’ অঞ্চলে ঢুকে যায়। তখন চাঁদ সম্পূর্ণ অদৃশ্য না হয়ে লালচে রঙ ধারণ করে। এই কারণেই একে অনেক সময় ‘রক্ত চাঁদ’ বা ‘ব্লাড মুন’ বলা হয়ে থাকে।
সূর্যগ্রহণ বনাম চন্দ্রগ্রহণ: পার্থক্য কোথায়?
সূর্যগ্রহণ দেখতে বিশেষ চশমা বা সুরক্ষার প্রয়োজন হয়, কারণ সূর্যের তীব্র আলো চোখের ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু চন্দ্রগ্রহণ সম্পূর্ণ নিরাপদ। খালি চোখে, এমনকি দূরবীন বা টেলিস্কোপ দিয়েও নিশ্চিন্তে দেখা যায়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হল—সূর্যগ্রহণ সাধারণত কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়, কিন্তু চন্দ্রগ্রহণ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে। এই দীর্ঘ সময়ের জন্যই তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ বেশি। ধীরে ধীরে ছায়ার অগ্রগতি দেখা যায়—যেন আকাশে এক নিঃশব্দ নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে।
৩ মার্চের পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ: সময়সূচি বিস্তারিত
এই গ্রহণ প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলবে। তার মধ্যে সবচেয়ে নাটকীয় পর্যায়—পূর্ণগ্রাস—চলবে প্রায় ৫৮ মিনিট ১৫ সেকেন্ড।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ
পৃথিবীর যে অংশে তখন রাত থাকবে, সেখান থেকেই গ্রহণ দেখা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৪ মিনিট থেকে ৫টা ২ মিনিট পর্যন্ত পূর্ণগ্রাস পর্যায় দৃশ্যমান হবে। দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার বড় অংশ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং কিছু ইউরোপীয় দেশ থেকেও গ্রহণ দেখা যাবে।
ভারতের সময় অনুযায়ী
ভারতে পূর্ণগ্রাস শুরু হবে বিকেল ৪টা ৫৮ মিনিটে এবং শেষ হবে বিকেল ৫টা ৩২ মিনিটে।
খণ্ডগ্রাস পর্যায় চলবে রাত ৭টা ৫৩ মিনিট পর্যন্ত।
কিন্তু সময়ের এই অঙ্কের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মূল সমস্যা—পূর্ণগ্রাসের সময় ভারতের বহু অঞ্চলে তখনও সূর্যাস্ত হয়নি। ফলে চাঁদ তখন দিগন্তের নীচে থাকবে।
পশ্চিমবঙ্গের আকাশে কী দেখা যাবে?
কলকাতায় ৩ মার্চ সূর্যাস্ত হবে আনুমানিক বিকেল ৫টা ৩৪ মিনিট নাগাদ। চন্দ্রোদয়ও হবে তার কিছু পরেই। অর্থাৎ পূর্ণগ্রাস পর্যায় (৪:৫৮–৫:৩২) শেষ হওয়ার আগেই সূর্যাস্ত সম্পূর্ণ হবে না।
ফলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ণগ্রাস দেখা কার্যত অসম্ভব। তবে সূর্যাস্তের পর চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে খণ্ডগ্রাস পর্যায়ের শেষাংশ দেখা যেতে পারে—যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং দিগন্তরেখা স্পষ্ট হয়।
গ্রহণের শেষ দিকে চাঁদের একাংশে ছায়া দেখা যেতে পারে। যদিও তা পূর্ণগ্রাসের মতো নাটকীয় হবে না, তবু জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য তা আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে।
দিল্লি, মুম্বই ও অন্যান্য শহরের চিত্র
দিল্লি ও নয়ডায় চন্দ্রোদয় হবে সন্ধ্যা ৬টা ২৬ মিনিট নাগাদ। সেখানে পূর্ণগ্রাস অনেক আগেই শেষ হয়ে যাবে। মুম্বইতেও প্রায় একই অবস্থা। দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশে হয়তো একটু বেশি সময় খণ্ডগ্রাস দেখা যেতে পারে, কারণ সূর্যাস্ত তুলনামূলক আগে হয়।
তবে ভারতের কোথাও পূর্ণগ্রাস পর্যায় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা কম।
পূর্ণগ্রাসে চাঁদ লাল কেন হয়? বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ পুরোপুরি কালো হয়ে যায় না। বরং তা গাঢ় লাল, কমলা বা তামাটে আভা নেয়। এর কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল।
সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে তা প্রতিসরিত ও বিচ্ছুরিত হয়। নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট হওয়ায় তা বেশি ছড়িয়ে পড়ে। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় তা অপেক্ষাকৃত কম বিচ্ছুরিত হয়ে পৃথিবীর ছায়া পেরিয়ে চাঁদের উপর পড়ে।
এই প্রক্রিয়ার ফলেই চাঁদ লাল দেখায়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ধূলিকণা বা দূষণের মাত্রা বেশি হলে চাঁদের রং আরও গাঢ় হতে পারে।
গ্রহণ পর্যবেক্ষণে কী কী খেয়াল রাখবেন?
১. খোলা আকাশ ও কম আলো দূষণযুক্ত স্থান বেছে নিন।
২. সূর্যাস্তের সময় ও চন্দ্রোদয়ের দিক জেনে নিন।
৩. দূরবীন থাকলে ব্যবহার করতে পারেন।
৪. ছবি তুলতে চাইলে ট্রাইপড ব্যবহার করুন।
৫. আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে নিন।
গ্রহণ ও লোকবিশ্বাস
ভারতীয় সমাজে গ্রহণ নিয়ে নানা লোকবিশ্বাস রয়েছে। কেউ গ্রহণের সময় খাওয়া-দাওয়া এড়িয়ে চলেন, কেউ বিশেষ পূজা বা প্রার্থনা করেন। যদিও বিজ্ঞান বলছে, গ্রহণ একটি স্বাভাবিক মহাজাগতিক ঘটনা, তবুও সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রভাব সমাজে রয়ে গেছে।
তবে শিক্ষিত সমাজে এখন গ্রহণকে ঘিরে কৌতূহল ও বৈজ্ঞানিক আগ্রহই বেশি।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গুরুত্ব
চন্দ্রগ্রহণ আমাদের সৌরজগতের জ্যামিতিক সম্পর্ক বোঝার এক অনন্য সুযোগ। সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান না হলে পূর্ণগ্রাস সম্ভব নয়।
স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বাস্তব শিক্ষার ক্ষেত্র। মহাকাশ বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা—কক্ষপথ, ছায়া, প্রতিসরণ—সবই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বোঝানো যায়।
পূর্ণগ্রাস দেখার সময় মানসিক অভিজ্ঞতা
চন্দ্রগ্রহণ শুধু বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, এটি এক আবেগের মুহূর্তও। ধীরে ধীরে উজ্জ্বল পূর্ণচাঁদ যখন অন্ধকারে ঢেকে যায়, তখন আকাশে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। অনেকেই বলেন, পূর্ণগ্রাসের সময় প্রকৃতির আবহাওয়াতেও যেন সূক্ষ্ম পরিবর্তন অনুভূত হয়—আলো কমে আসে, পরিবেশ হয় স্থির।
ফটোগ্রাফির জন্য বিশেষ মুহূর্ত
চন্দ্রগ্রহণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ফটোগ্রাফারদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। লং এক্সপোজার ফটোগ্রাফিতে লালচে চাঁদের ছবি অসাধারণ দেখায়। শহরের স্কাইলাইন, গাছের ছায়া বা ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গে গ্রহণের ছবি তুললে তা হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
পশ্চিমবঙ্গে যারা ছবি তুলতে চান, তাঁদের জন্য সূর্যাস্তের পরপরই পূর্ব দিগন্তে নজর রাখা জরুরি। যদিও পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে না, তবুও আংশিক ছায়া-ঢাকা চাঁদের ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব।
আবহাওয়া ও বায়ুদূষণের প্রভাব
চাঁদের লাল রঙের তীব্রতা অনেক সময় নির্ভর করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অবস্থার উপর। ধূলিঝড়, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা দূষণের মাত্রা বেশি হলে লাল রঙ আরও গাঢ় হয়। আবার পরিষ্কার বায়ুমণ্ডলে তুলনামূলক উজ্জ্বল তামাটে আভা দেখা যায়।
মার্চ মাসে ভারতে অনেক জায়গায় আবহাওয়া শুষ্ক থাকে, ফলে দৃশ্যমানতা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে স্থানীয় মেঘলা পরিস্থিতি গ্রহণের দৃশ্যমানতা কমিয়ে দিতে পারে।
পরিবারের সঙ্গে গ্রহণ উপভোগ
গ্রহণ একটি সামাজিক অভিজ্ঞতাও হতে পারে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে ছাদে বা খোলা জায়গায় বসে আকাশ দেখা—এ যেন আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝে এক অন্যরকম বিরতি। শিশুদের জন্য এটি শিক্ষামূলক ও আনন্দের মুহূর্ত।
মহাজাগতিক সময়ের অনুভূতি
চন্দ্রগ্রহণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য এক বিশাল মহাজাগতিক ছন্দে আবর্তিত হচ্ছে। কোটি কোটি বছর ধরে এই ছন্দ চলছে, আর আমরা তার ক্ষণিক দর্শক মাত্র।
এই উপলব্ধি মানুষকে বিনয়ী করে। দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো সমস্যা তখন তুচ্ছ মনে হতে পারে।
মার্চের পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ একটি উল্লেখযোগ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা। ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল থেকে অন্তত আংশিক ভাবে তা দেখা যাবে। তবে পশ্চিমবঙ্গে পূর্ণগ্রাস পর্যায় দেখা সম্ভব নয়—কারণ সূর্যাস্ত ও চন্দ্রোদয়ের সময়ের কারণে চাঁদ তখন দৃশ্যমান থাকবে না।
তবুও খণ্ডগ্রাস পর্যায়ের শেষ অংশ হয়তো দেখা যেতে পারে। তাই ৩ মার্চ সন্ধ্যায় আকাশের দিকে একবার তাকাতে ভুলবেন না।
হয়তো দিগন্তের ধারে লালচে আভা মাখা চাঁদ আপনাকে মনে করিয়ে দেবে—এই মহাবিশ্বে এখনও কত অজানা রহস্য অপেক্ষা করে আছে আমাদের দেখার জন্য।