গুজরাটের গান্ধীনগরে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা। চিনের পর এবার ভারত সফলভাবে তৈরি করল নিজস্ব কৃত্রিম সূর্য বা নিউক্লিয়ার ফিউশন রিঅ্যাক্টর। ইনস্টিটিউট ফর প্লাজমা রিসার্চ বা আইপিআর এর বিজ্ঞানীরা সূর্য এর মতো শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম হলেন। এই প্রযুক্তির ফলে মিটবে দেশের সমস্ত বিদ্যুতের চাহিদা এবং কমবে দূষণ। এক নতুন সূর্যোদয়ের সাক্ষী থাকল বিশ্ব।
মানুষের সভ্যতার চাকা ঘোরানোর জন্য চাই শক্তি বা এনার্জি। আদিম যুগে মানুষ আগুনের ওপর নির্ভর করত। তারপর এল বাষ্পীয় ইঞ্জিন এবং কয়লার যুগ। এরপর খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস। এতদিন আমরা কয়লা তেল বা গ্যাসের ওপর নির্ভর করে এসেছি। কিন্তু এই জ্বালানি ফুরিয়ে আসছে এবং পৃথিবীকে দূষণে ভরিয়ে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই স্বপ্ন দেখছিলেন এমন এক শক্তির যা হবে অফুরন্ত এবং সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত। সেই শক্তির উৎস হলো নক্ষত্র বা সূর্য। সূর্য যেভাবে কোটি কোটি বছর ধরে আলো ও তাপ দিচ্ছে সেই একই প্রক্রিয়া কি পৃথিবীতে বসে তৈরি করা সম্ভব। আজ ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখালেন। গুজরাটের গান্ধীনগরে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর প্লাজমা রিসার্চ বা আইপিআর এর গবেষণাগারে আজ জ্বলে উঠল ভারতের প্রথম কৃত্রিম সূর্য।
আজ সকাল ১১টায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক পরীক্ষাটি চালানো হয়। এসএসটি ২ বা স্টেডি স্টেট সুপারকন্ডাক্টিং টোকাম্যাক নামের বিশাল যন্ত্রটি চালু করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার ভেতরে প্লাজমা বা অতি উত্তপ্ত গ্যাস সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার চেয়েও ১০ গুণ বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মনিটরে ফুটে ওঠে এক উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি। বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেন যে তারা সফলভাবে নিউক্লিয়ার ফিউশন বা সংযোজন প্রক্রিয়া শুরু করতে পেরেছেন এবং তা থেকে শক্তি উৎপাদন হচ্ছে। এই ঘোষণার সাথে সাথেই ল্যাবরেটরিতে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। ভারতের তেরঙ্গা পতাকা আজ গর্বের সাথে উড়ছে বিশ্ব বিজ্ঞানের আঙিনায়।
নিউক্লিয়ার ফিউশন কী এবং কেন এটি জটিল
Shutterstock
Explore
সহজ কথায় বলতে গেলে নিউক্লিয়ার ফিউশন হলো দুটি হালকা পরমাণুকে জুড়ে একটি ভারী পরমাণু তৈরি করা। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে শক্তি নির্গত হয়। সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্র এই ফিউশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আলো ও তাপ দেয়। সেখানে মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে হাইড্রোজেনের পরমাণুগুলো জুড়ে হিলিয়াম তৈরি হয়। কিন্তু পৃথিবীতে এই প্রক্রিয়া ঘটানো অত্যন্ত কঠিন। কারণ এখানে সূর্যের মতো মহাকর্ষীয় চাপ নেই। তাই কৃত্রিমভাবে এই প্রক্রিয়া ঘটাতে হলে প্রয়োজন প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এত বেশি তাপমাত্রায় কোনো কঠিন পদার্থ টিকে থাকতে পারে না। লোহা বা স্টিল গলে বাষ্প হয়ে যাবে। তাই বিজ্ঞানীরা শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র বা ম্যাগনেটিক ফিল্ড ব্যবহার করে এই উত্তপ্ত গ্যাস বা প্লাজমাকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখেন। যে যন্ত্রের মধ্যে এটি করা হয় তাকে বলা হয় টোকাম্যাক।
ভারতের টোকাম্যাক এসএসটি ২ এর বিশেষত্ব ও বিশ্বরেকর্ড
ভারতের বিজ্ঞানীরা যে যন্ত্রটি তৈরি করেছেন তা সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। আইপিআর এর অধিকর্তা ডক্টর শশাঙ্ক চতুর্বেদী বলেন আমাদের টোকাম্যাক যন্ত্রটি বিশ্বের অন্যতম উন্নত মানের। আমরা এখানে সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ব্যবহার করেছি যা অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে এবং খুব কম বিদ্যুতে চলে। আজ আমরা প্রায় ২০ মিনিট ধরে এই ফিউশন বিক্রিয়া ধরে রাখতে পেরেছি যা একটি বিশ্বরেকর্ড। এর আগে চিন ১৭ মিনিট এবং দক্ষিণ কোরিয়া ১০ মিনিটের কম সময় ধরে প্লাজমা ধরে রাখতে পেরেছিল। ভারত সেই সব রেকর্ড ভেঙে দিল। এই দীর্ঘ সময় ধরে প্লাজমা স্থিতিশীল রাখা প্রমাণ করে যে ভারত ফিউশন এনার্জি বা সংযোজন শক্তি উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারিতে পৌঁছে গেছে। এটি কেবল পরীক্ষামূলক সাফল্য নয় এটি বাণিজ্যিক উৎপাদনের দিকে এক বিশাল পদক্ষেপ।
কেন এটি জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প এবং ফিশন থেকে আলাদা
বর্তমানে আমরা যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ বা নিউক্লিয়ার পাওয়ার ব্যবহার করি তা হলো ফিশন বা বিভাজন প্রক্রিয়া। এতে ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করা হয়। পরমাণু ভাঙার ফলে শক্তি উৎপন্ন হয় কিন্তু তার সাথে তৈরি হয় প্রচুর তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বা রেডিওঅ্যাক্টিভ ওয়েস্ট যা হাজার হাজার বছর ধরে পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক থাকে। চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনার ভয় থাকে। কিন্তু ফিউশন বা কৃত্রিম সূর্য প্রযুক্তিতে কোনো দীর্ঘমেয়াদী তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয় না। এর জ্বালানি হলো হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়াম। ডিউটেরিয়াম সমুদ্রের জল থেকে সহজেই পাওয়া যায়। এক গ্লাস সমুদ্রের জল থেকে যে পরিমাণ ফিউশন শক্তি পাওয়া যাবে তা এক ব্যারেল বা প্রায় ১৫৯ লিটার তেলের সমান। অর্থাৎ জ্বালানি নিয়ে আর কোনোদিন চিন্তা করতে হবে না। এটি সম্পূর্ণ কার্বন মুক্ত তাই গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়নের সমস্যাও মিটবে। পৃথিবী পাবে এক নতুন শ্বাস।
অর্থনৈতিক প্রভাব এবং শক্তির স্বাধীনতা
ভারত তার প্রয়োজনের ৮০ শতাংশ তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা বা বিলিয়ন ডলার খরচ হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতের অর্থনীতিতে ধস নামে। কৃত্রিম সূর্য প্রযুক্তি সফল হলে ভারত জ্বালানির দিক থেকে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভর হবে। আমাদের আর আরব দেশগুলোর দিকে তেলের জন্য তাকিয়ে থাকতে হবে না। সস্তা এবং অফুরন্ত বিদ্যুৎ পেলে ভারতের শিল্প ক্ষেত্রে বিপ্লব আসবে। কারখানার উৎপাদন খরচ কমবে যার ফলে জিনিসের দাম কমবে। সাধারণ মানুষের ইলেকট্রিক বিল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। গ্রামের কৃষকরা বিনা খরচে সেচ পাম্প চালাতে পারবেন। ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জিং খরচ হবে নগণ্য। এটি ভারতের জিডিপি বা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অবস্থান ও কূটনীতি
এই সাফল্যের ফলে ভারত আইটিইআর বা ইটার প্রকল্পের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে উঠে এল। ইটার হলো ফ্রান্সের মাটিতে তৈরি হতে চলা বিশ্বের বৃহত্তম ফিউশন রিয়্যাক্টর যেখানে ভারত আমেরিকা রাশিয়া চিন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন একসাথে কাজ করছে। ভারতের এই সাফল্য ইটার প্রকল্পকেও ত্বরান্বিত করবে। বিশ্বের তাবড় বিজ্ঞানীরা আজ ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মেধার প্রশংসা করছেন। নাসা এবং সার্ন থেকেও অভিনন্দন বার্তা এসেছে। আমেরিকার শক্তি সচিব বলেছেন ভারত আজ যা করে দেখাল তা মানবজাতির জন্য এক উপহার। এতদিন মহাকাশ গবেষণায় ইসরোর নাম ছিল এবার পরমাণু গবেষণায় আইপিআর ভারতের নাম উজ্জ্বল করল। ভারত এখন আর কেবল প্রযুক্তি গ্রহণকারী দেশ নয় ভারত এখন প্রযুক্তি প্রদানকারী দেশ।
চ্যালেঞ্জ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন: ২০৩৫ এর লক্ষ্যমাত্রা
তবে ল্যাবরেটরিতে সফল হওয়া এবং বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এক নয়। বিজ্ঞানীদের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রযুক্তিকে আরও বড় স্কেলে নিয়ে যাওয়া এবং গ্রিডে যুক্ত করা। ডক্টর চতুর্বেদী বলেন আমরা আশা করছি ২০৩৫ সালের মধ্যে আমরা ভারতের প্রথম ফিউশন পাওয়ার প্ল্যান্ট বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করতে পারব। সেখান থেকে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। এর জন্য প্রচুর বিনিয়োগ এবং পরিকাঠামো প্রয়োজন। সরকার জানিয়েছে তারা এই গবেষণায় ফান্ডের কোনো অভাব রাখবে না। ইতিমধ্যে প্রাইভেট সেক্টর বা বেসরকারি সংস্থাগুলো যেমন আদানি এবং রিলায়েন্স এই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলে এই প্ল্যান্ট তৈরি হতে পারে।
পরিবেশ এবং নিরাপত্তা: ভয়ের কি কোনো কারণ আছে?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে ১০ কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রা কি নিরাপদ। যদি কোনো বিস্ফোরণ ঘটে। বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত করেছেন যে ফিউশন রিয়্যাক্টর ফিশন রিয়্যাক্টরের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। ফিশন রিয়্যাক্টরে চেইন রিয়্যাকশন বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গেলে মেল্টডাউন হতে পারে। কিন্তু ফিউশনে সেটা অসম্ভব। কারণ ফিউশন প্রক্রিয়াটি খুবই নাজুক। যদি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় বা তাপমাত্রা সামান্য কমে যায় তবে প্লাজমা সাথে সাথে ঠান্ডা হয়ে যাবে এবং বিক্রিয়া নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। এটি নিজে থেকে বিস্ফোরিত হতে পারে না। তাই এটি জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও স্থাপন করা সম্ভব। এতে কোনো গ্রিনহাউস গ্যাস বা বিষাক্ত ধোঁয়া বের হয় না।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন: এক নতুন পৃথিবী
কল্পনা করুন এমন এক পৃথিবীর কথা যেখানে বিদ্যুতের জন্য কোনো কয়লা পোড়াতে হয় না কোনো ধোঁয়া ওড়ে না। যেখানে গাড়ি চলে জল দিয়ে তৈরি জ্বালানিতে। যেখানে মরুভূমিতেও এসি চলে দিনরাত কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি হয় না। যেখানে সমুদ্রের জল লবণমুক্ত করে পানীয় জল তৈরি করা হয় সস্তা বিদ্যুতে। কৃত্রিম সূর্য আমাদের সেই স্বপ্নের দুনিয়ায় নিয়ে যাবে। আজ গান্ধীনগরে যে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল তা আগামী দিনে সারা পৃথিবীকে আলোকিত করবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর কয়লার খনিতে কাজ করবে না বা তেলের যুদ্ধের সাক্ষী হবে না। তারা দেখবে এক দূষণমুক্ত নীল আকাশ।
জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া ও আবেগ
ভারতের সাধারণ মানুষ এই খবরে উচ্ছ্বসিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং টপিক এখন কৃত্রিম সূর্য এবং আইপিআর। স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞানীদের ছবি নিয়ে পোস্টার তৈরি করছে। বিজ্ঞান মিউজিয়ামগুলোতে ফিউশন টেকনোলজি নিয়ে মডেল তৈরির ধুম পড়েছে। বেঙ্গালুরুর এক ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র বলেন আমাদের জেনারেশনের জন্য এর চেয়ে বড় খবর আর হতে পারে না। আমরা একটা ক্লিন বা পরিষ্কার প্ল্যানেট পাব। কৃষকরাও খুশি কারণ সস্তা বিদ্যুতে তারা সেচ পাম্প চালাতে পারবেন। এক প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী বলেন আমরা ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিলাম আজ আমরা তেলের পরাধীনতা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ পেলাম।
উপসংহার
২০২৬ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি দিনটি মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আগুন আবিষ্কারের পর মানুষ যেমন সভ্যতার প্রথম ধাপে পা দিয়েছিল তেমনি কৃত্রিম সূর্য আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষ শক্তির এক নতুন যুগে প্রবেশ করল। ভারত আজ সেই নতুন যুগের মশাল বহন করছে। সূর্যকে আমরা দেবতা হিসেবে পুজো করি। আদিত্য হৃদয় স্তোত্র পাঠ করি। সেই সূর্যের শক্তিকে পৃথিবীর বুকে নামিয়ে এনে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা আজ ঋষিদের মতো কাজ করলেন। বেদের সেই মন্ত্র তমসো মা জ্যোতির্গময় অর্থাৎ অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে চলো। ভারতের কৃত্রিম সূর্য আজ সেই মন্ত্রকেই বাস্তবে রূপ দিল। এই আলো অফুরন্ত এই আলো শাশ্বত। আজ থেকে ভারত আর বিশ্বকে অনুসরণ করবে না বিশ্ব ভারতকে অনুসরণ করবে। জয় বিজ্ঞান জয় ভারত।