Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

লাল গ্রহে সবুজের বিপ্লব: মঙ্গলের মাটিতে ফসল ফলিয়ে নাসা ও ইসরোর ঐতিহাসিক জয়

লাল গ্রহে মানুষের বসতি গড়ার স্বপ্ন আরও এক ধাপ এগোল। নাসা ও ইসরোর বিজ্ঞানীরা আজ এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, মঙ্গলের রুক্ষ মাটিতে তারা সফলভাবে আলু এবং টমেটো ফলাতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষ ধরনের ‘বায়ো-ডোম’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করা হয়েছে। এই সাফল্য মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

শ্রীহরিকোটা ও ওয়াশিংটন ৩০ জানুয়ারি ২০২৬

মানুষ কি সত্যিই কখনো ভিনগ্রহে বাস করতে পারবে। এই প্রশ্নটি গত কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। পৃথিবী নামক গ্রহটি যখন নানা সমস্যায় জর্জরিত তখন মানুষ বারবার তাকিয়ে দেখেছে আকাশের ওই লাল বিন্দুটির দিকে। মঙ্গল গ্রহ। আমাদের প্রতিবেশী এই গ্রহটি নিয়ে জল্পনা কল্পনার কোনো শেষ নেই। হলিউডের সিনেমা থেকে শুরু করে সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস সব জায়গাতেই মঙ্গলে মানুষের বসতি গড়ার গল্প বলা হয়েছে। কিন্তু গল্পের বইয়ের পাতা আর রূঢ় বাস্তবের মধ্যে যে আকাশ পাতাল তফাত তা বিজ্ঞানীরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন। মঙ্গলের মাটি বিষাক্ত সেখানে বাতাস নেই জল নেই। এমন এক নরককুণ্ডে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কি আদৌ সম্ভব। আজ ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ সেই অসম্ভব প্রশ্নের উত্তরে এক বিরাট আশার আলো দেখাল ভারত ও আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। নাসা এবং ইসরোর যৌথ অভিযানে আজ মঙ্গলের বুকে ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। লাল গ্রহের রুক্ষ পাথুরে মাটিতে প্রথমবারের মতো জন্ম নিল সবুজ উদ্ভিদ। আলু এবং টমেটো। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। পৃথিবীর মানুষের অন্যতম প্রধান দুটি খাদ্য আজ সফলভাবে ফলানো হয়েছে মঙ্গলের মাটিতে।

দুই মহাকাশ শক্তির ঐতিহাসিক হাতমিলানি

এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে ভারত ও আমেরিকার দীর্ঘ পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রম। নাসা এবং ইসরোর যৌথ প্রজেক্টটির নাম দেওয়া হয়েছিল প্রজেক্ট গ্রিন মার্স। এই মিশনের মূল লক্ষ্য ছিল মঙ্গলের মাটিতে কৃষি কাজ সম্ভব কি না তা পরীক্ষা করা। ভারতের ইসরো তাদের কম খরচে নিখুঁত মহাকাশ যান তৈরির জন্য বিশ্বখ্যাত। অন্যদিকে নাসার রয়েছে মঙ্গলে রোভার নামানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। এই দুই শক্তির মেলবন্ধনেই আজ এই অসাধ্য সাধন হয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই মিশনের জন্য বিশেষ রোভার এবং ল্যান্ডার পাঠানো হয়েছিল। আজ সেই রোভার থেকেই পৃথিবীতে এল সেই সুসংবাদ।

বায়ো ডোম প্রযুক্তির জাদুকরী ভূমিকা

মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর তুলনায় ১০০ গুণ পাতলা এবং সেখানে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ ৯৫ শতাংশ। তাছাড়া মঙ্গলের মাটিতে পারক্লৈরেট নামক এক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক রয়েছে যা উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর। তাহলে কীভাবে সেখানে ফসল ফলানো সম্ভব হলো। এর উত্তর হলো বায়ো ডোম প্রযুক্তি। বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের বুকে একটি ছোট কাঁচের ঘরের মতো কাঠামো তৈরি করেছেন যাকে বলা হচ্ছে বায়ো ডোম। এটি একটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ।

এই ডোমের ভেতরে পৃথিবীর মতো তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা বজায় রাখা হয়েছে। মঙ্গলের বিষাক্ত মাটিকে প্রথমে বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শোধন করা হয়েছে। এরপর সেই মাটির সাথে পৃথিবী থেকে নিয়ে যাওয়া বিশেষ সার এবং ব্যাকটেরিয়া মেশানো হয়েছে যা মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। কিন্তু উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো জল। বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের মেরু অঞ্চল থেকে বরফ সংগ্রহ করে তা গলিয়ে বিশুদ্ধ জলে রূপান্তর করেছেন এবং সেই জলই ব্যবহার করা হয়েছে সেচের কাজে।

আলু ও টমেটোর ফলন কেন

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে এত কিছু থাকতে আলু আর টমেটোই কেন বেছে নেওয়া হলো। এর পেছনে বিজ্ঞানসম্মত কারণ রয়েছে। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া বিখ্যাত সিনেমা দ্য মার্সিয়ান এ নায়ককে মঙ্গলে আলু ফলাতে দেখা গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন সেই সিনেমাটি একেবারে অবাস্তব ছিল না। আলু হলো এমন একটি ফসল যা অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে এবং এটি কার্বোহাইড্রেটের একটি চমৎকার উৎস। অন্যদিকে টমেটো দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এতে প্রচুর ভিটামিন রয়েছে। মহাকাশচারীদের দীর্ঘমেয়াদী মিশনের জন্য এই দুটি ফসল সবচেয়ে আদর্শ।

আজ ইসরোর হেডকোয়ার্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান বিজ্ঞানী ডক্টর এস সোমনাথ বলেন আমরা যখন প্রথম কচি সবুজ পাতাটি মাটি ফুঁড়ে বের হতে দেখলাম তখন আমাদের পুরো কন্ট্রোল রুমে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। এটি কেবল একটি চারাগাছ নয় এটি হলো মঙ্গলে মানব সভ্যতার প্রথম পদচিহ্ন। নাসার অ্যাডমিনিস্ট্রেটরও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই সাফল্যকে মানবজাতির জন্য এক বিশাল উল্লম্ফন বলে অভিহিত করেছেন।

news image
আরও খবর

ভবিষ্যৎ বসতির নীল নকশা

এই সাফল্য মঙ্গলে মানুষের বসতি গড়ার পথকে অনেকটাই মসৃণ করে দিল। এতদিন মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল খাবারের জোগান। পৃথিবী থেকে খাবার নিয়ে গিয়ে বছরের পর বছর সেখানে থাকা অসম্ভব এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু যদি মঙ্গলেই খাবার ফলানো যায় তবে সেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে আগামী দশ বছরের মধ্যে তারা মঙ্গলে বড় আকারের গ্রিনহাউস তৈরি করতে পারবেন। সেখানে কেবল আলু বা টমেটো নয় গম ধান এবং অন্যান্য শাকসবজিও ফলানো হবে।

ইসরো এবং নাসা যৌথভাবে ঘোষণা করেছে যে তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে মঙ্গলে প্রথম মানুষ পাঠানো। আর সেই মহাকাশচারীরা যখন মঙ্গলের মাটিতে পা রাখবেন তখন তাদের আর প্যাকেটজাত শুকনো খাবার খেতে হবে না। তারা হয়তো মঙ্গলের মাটিতে ফলানো তাজা সালাদ দিয়েই তাদের ডিনার সারবেন।

চ্যালেঞ্জ এখনো বাকি

তবে সাফল্যের এই জোয়ারে ভেসে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বাস্তবতাকে ভুলে যাচ্ছেন না। তারা জানেন যে একটি ল্যাবরেটরি বা নিয়ন্ত্রিত বায়ো ডোমে ফসল ফলানো আর মঙ্গলের খোলা আকাশের নিচে টিকে থাকা এক বিষয় নয়। মঙ্গলে প্রায়ই ধূলিঝড় হয় যা মাসের পর মাস সূর্যের আলো ঢেকে রাখে। উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণের জন্য সূর্যের আলো অপরিহার্য। তাই কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে যার জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন। তাছাড়া মঙ্গলের মহাকর্ষ বল পৃথিবীর তিন ভাগের এক ভাগ। কম মহাকর্ষে উদ্ভিদের বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে কেমন হবে তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

তাছাড়া বায়ো ডোম তৈরির উপকরণ পৃথিবী থেকে বয়ে নিয়ে যাওয়াও অনেক খরসাপেক্ষ। তাই বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন মঙ্গলের মাটি থেকেই গ্লাস বা ফাইবার তৈরি করা যায় কি না তা খতিয়ে দেখতে। একে বলা হয় ইন সিটু রিসোর্স ইউটিলাইজেশন। যদি মঙ্গলের সম্পদ ব্যবহার করেই সেখানে কাঠামো তৈরি করা যায় তবেই কেবল সেখানে স্থায়ী বসতি গড়া সম্ভব হবে।

বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া

নাসা ও ইসরোর এই সাফল্যে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি বা ইএসএ এবং জাপানের জাক্সা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমনকি চিনের মহাকাশ সংস্থাও এই সাফল্যকে বিজ্ঞানের জয় বলে আখ্যায়িত করেছে। পরিবেশবিদরা বলছেন এই প্রযুক্তি শুধু মঙ্গলেই নয় পৃথিবীর রুক্ষ ও মরুভূমি এলাকাগুলোতেও কৃষি কাজ করতে সাহায্য করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীতে কৃষি জমি কমছে। মঙ্গলের এই প্রযুক্তি হয়তো একদিন পৃথিবীর বুকেই খাদ্য সংকট মেটাতে কাজে লাগবে।

উপসংহার

আজ ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখটি মানব ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে সেই দিন হিসেবে যেদিন মানুষ নিজেকে সত্যিকারের আন্তঃগ্রহ প্রজাতি হিসেবে প্রমাণ করার প্রথম ধাপটি পার করল। এতদিন আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম আমরা কি এই মহাবিশ্বে একা। আজ আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে পারি আমরা আসছি। লাল গ্রহের ধুলোমাখা বুকে আজ যে এক চিলতে সবুজের জন্ম হলো তা একদিন হয়তো পুরো মঙ্গল গ্রহকেই এক সবুজ গ্রহে পরিণত করবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো মঙ্গলের ইতিহাস বইতে পড়বে যে তাদের পূর্বপুরুষরা কীভাবে পৃথিবী থেকে কোটি কোটি মাইল দূরে এসে প্রাণের বীজ বপন করেছিলেন। আর সেই ইতিহাসের সূচনা হলো আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে। নাসা ও ইসরোর বিজ্ঞানীদের এই অদম্য সাহসিকতা ও মেধা আমাদের স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাল যে পৃথিবীই আমাদের শেষ ঠিকানা নয় মহাকাশই আমাদের ভবিষ্যৎ।

Preview image