বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে মঙ্গলে একসময় প্রচুর জলের অস্তিত্ব ছিল। নদী, হ্রদ ও জলবায়ুর নানা প্রমাণ থেকে স্পষ্ট, প্রাণ থাকুক বা না থাকুক, লাল গ্রহে জল ছিল এ বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত মহাকাশ গবেষকরা।
লাল গ্রহ মঙ্গল—মানুষের কৌতূহলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা মঙ্গলকে ঘিরে নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন। একসময় সেখানে কি জল ছিল? নদী, হ্রদ, সমুদ্রের অস্তিত্ব কি সত্যিই ছিল? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মঙ্গলে কি কখনও প্রাণের অস্তিত্ব ছিল?
এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নাসার মতো মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলি পাঠিয়েছে একের পর এক রোভার, উপগ্রহ ও মহাকাশযান। সাম্প্রতিক আবিষ্কার সেই অনুসন্ধানকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। মঙ্গলের রুক্ষ, লালচে মাটিতে ছড়িয়ে থাকা অচেনা সাদা পাথরের সন্ধান বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিয়েছে এক বিস্ময়কর ইতিহাসের দরজা।
মঙ্গলের রুক্ষ মাটিতে ইতিউতি ছড়িয়ে রয়েছে ছোট ছোট সাদা পাথর। এমন পাথর আগে কখনও দেখা যায়নি পৃথিবীর প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গলে। এই পাথরগুলির উৎস কী? কীসেরই বা ইঙ্গিত বহন করছে তারা?
এই প্রশ্নগুলিই বিজ্ঞানীদের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। নাসার ‘প্রিজ়ারভেন্স’ (Perseverance) রোভার যখন এই পাথরগুলির ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠায়, তখন থেকেই শুরু হয় ব্যাপক গবেষণা। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পাথরগুলির প্রকৃতি ও উৎস বোঝার চেষ্টা করেন।
সম্প্রতি মার্কিন বিজ্ঞানীদের একটি দল তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছে। গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, মঙ্গলের মাটিতে পাওয়া এই সাদা পাথর আসলে লাল গ্রহের এক প্রাচীন, ভেজা ও স্যাঁতসেতে অতীতের সাক্ষী।
নাসার রোভার যে পাথরগুলিকে শনাক্ত করেছে, বিজ্ঞানীরা সেগুলিকে ‘কেয়োলিনাইট ক্লে’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কেয়োলিনাইট হলো অ্যালুমিনিয়াম সমৃদ্ধ এক ধরনের খনিজ পদার্থ, যা পৃথিবীতেও পাওয়া যায়।
পৃথিবীতে কেয়োলিনাইট সাধারণত তৈরি হয় দীর্ঘ সময় ধরে জল ও আর্দ্র পরিবেশে শিলা ও পলির রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে। যখন শিলা ও পলির অধিকাংশ খনিজ উপাদান ধুয়ে যায় এবং শুধু অ্যালুমিনিয়াম সমৃদ্ধ অংশ অবশিষ্ট থাকে, তখনই সৃষ্টি হয় কেয়োলিনাইট।
বিজ্ঞানীদের মতে, কেয়োলিনাইট তৈরির জন্য প্রয়োজন—
দীর্ঘ সময় ধরে প্রচুর জল
উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া
টানা বৃষ্টি
স্থায়ী জলবায়ু পরিবর্তন
এই সব শর্ত পূরণ না হলে কেয়োলিনাইট তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব।
পৃথিবীতে কেয়োলিনাইট বেশি পাওয়া যায় ক্রান্তীয় অঞ্চলে, বিশেষত উষ্ণ ও বৃষ্টিপ্রবণ এলাকাগুলিতে। রেইনফরেস্ট অঞ্চলে এই খনিজের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কিন্তু মঙ্গলের বর্তমান জলবায়ু তো সম্পূর্ণ বিপরীত—শীতল, শুষ্ক ও রুক্ষ।
এই বৈপরীত্যই বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
মঙ্গলে জলের অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা নতুন নয়। বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা দাবি করে আসছেন যে, একসময় মঙ্গলে নদী, হ্রদ এবং সম্ভবত সমুদ্রও ছিল।
নাসার বিভিন্ন রোভার ও উপগ্রহের পাঠানো তথ্য থেকে পাওয়া গেছে—
নদীর মতো খাঁজ ও উপত্যকা
হ্রদের মতো গহ্বর
ডেল্টা অঞ্চলের মতো ভূপ্রকৃতি
বরফের অস্তিত্ব
জলীয় খনিজের উপস্থিতি
এই সব তথ্যই ইঙ্গিত দেয় যে, মঙ্গলে একসময় বিপুল পরিমাণ জল ছিল।
তবে এত দিন পর্যন্ত গবেষণার মূল ফোকাস ছিল নদী ও হ্রদের অস্তিত্ব নিয়ে। মঙ্গলে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি হয়েছিল কি না—এই প্রশ্নে এত দিন স্পষ্ট কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
কিন্তু কেয়োলিনাইটের উপস্থিতি সেই ধারণায় নতুন আলো ফেলেছে।
নাসার পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে আমেরিকার ইন্ডিয়ানা রাজ্যের পুরডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান ব্রোজ় এবং তাঁর সহকর্মীরা এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
তাঁদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল ‘Communications Earth & Environment’-এ।
গবেষণায় বলা হয়েছে—
মঙ্গলের মাটিতে পাওয়া কেয়োলিনাইট পাথরগুলি দীর্ঘ সময় ধরে জলের সংস্পর্শে থাকার ফল।
এই পাথরগুলি তৈরির জন্য লক্ষ লক্ষ বছর ধরে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া প্রয়োজন।
শুধু নদী বা হ্রদের জল দিয়ে এই ধরনের খনিজ তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।
টানা বৃষ্টি ও স্যাঁতসেতে পরিবেশ ছাড়া কেয়োলিনাইট সৃষ্টি হয় না।
অর্থাৎ, একসময় মঙ্গল শুধু জলপূর্ণ ছিল না, বরং সেখানে পৃথিবীর মতো বৃষ্টিভেজা জলবায়ুও থাকতে পারে।
এ প্রসঙ্গে মার্কিন বিজ্ঞানী ব্রিনয় হোরগ্যান বলেন—
“মঙ্গলের মাটিতে এই ধরনের পাথর আমরা বাইরের কক্ষপথ থেকেও দেখেছি। সম্ভবত এগুলি মঙ্গল সম্পর্কে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলির একটি। এমন পাথর তৈরিতে প্রচুর জল দরকার। মনে হচ্ছে, এটাই প্রাচীন উষ্ণ ও স্যাঁতসেতে মঙ্গলের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ।”
এই মন্তব্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গল আজ যে রুক্ষ, শীতল ও শুষ্ক গ্রহ—তা একদিনে হয়নি। বিজ্ঞানীদের মতে, মঙ্গলের আবহাওয়া দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে—
প্রাচীন মঙ্গল ছিল উষ্ণ ও আর্দ্র
সেখানে ঘন বায়ুমণ্ডল ছিল
জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি ছিল
ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডল পাতলা হয়ে যায়
সূর্যের বিকিরণ ও সৌরঝড় মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল ক্ষয় করে
ফলে জল বাষ্প হয়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যায়
এই পরিবর্তনের ফলে মঙ্গল ধীরে ধীরে বর্তমান রুক্ষ গ্রহে পরিণত হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হল—এই পরিবর্তন কত দ্রুত ঘটেছিল? কোন পর্যায়ে মঙ্গল তার জল হারায়? আর কত দিন ধরে সেখানে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ ছিল?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা মরিয়া।
নাসার প্রিজ়ারভেন্স রোভার ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মঙ্গলের জেজ়েরো (Jezero) গর্তে অবতরণ করে।
বিজ্ঞানীদের মতে—
জেজ়েরো গর্তে একসময় বিশাল হ্রদ ছিল
সেখানে নদী এসে মিশত
ডেল্টার মতো ভূপ্রকৃতি তৈরি হয়েছিল
হ্রদের তলদেশে পলি জমা হয়েছিল
এই অঞ্চলেই প্রথম কেয়োলিনাইট পাথরের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—
এই পাথরগুলি কি এখানেই তৈরি হয়েছিল?
নাকি অন্য কোথাও তৈরি হয়ে এখানে এসে জমা হয়েছে?
কীভাবে এত দূরে ছড়িয়ে পড়ল এই পাথর?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
নাসার রোভার যে কেয়োলিনাইট পাথরগুলি শনাক্ত করেছে, সেগুলি সব আকারে ছোট নয়।
মঙ্গলে পাওয়া গেছে—
ক্ষুদ্র পাথরের টুকরো
মাঝারি আকারের শিলা
বিশাল সাদা বোল্ডার
এই বৈচিত্র্য বিজ্ঞানীদের আরও ভাবিয়ে তুলেছে।
পৃথিবীতে পাওয়া কেয়োলিনাইটের সঙ্গে মঙ্গলের পাথরের নমুনা তুলনা করে দেখা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে—
রাসায়নিক গঠন প্রায় একই
খনিজ উপাদানের মিল রয়েছে
তবে মঙ্গলের পাথরে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে
এই তথ্যগুলি মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মঙ্গলকে আজ আমরা যেভাবে দেখি, তা তার প্রকৃত ইতিহাসের সম্পূর্ণ চিত্র নয়।
প্রাচীন মঙ্গল ছিল—
উষ্ণ
আর্দ্র
জলপূর্ণ
সম্ভাব্যভাবে বাসযোগ্য
বর্তমান মঙ্গল—
শীতল
শুষ্ক
রুক্ষ
প্রায় প্রাণহীন
এই দুই অবস্থার মধ্যে পরিবর্তন কীভাবে ঘটল—এটাই বিজ্ঞানীদের প্রধান অনুসন্ধানের বিষয়।
মঙ্গলে জল ছিল—এ বিষয়ে বিজ্ঞানীরা অনেকটাই নিশ্চিত। কিন্তু জল থাকলেই কি প্রাণ ছিল?
বিজ্ঞানীদের মতে—
জল প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত
তবে জল থাকলেই প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত হয় না
প্রাচীন মঙ্গলে অণুজীবের মতো প্রাণ থাকতে পারে
কেয়োলিনাইটের উপস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে
কারণ, উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ জীবনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
মঙ্গলের মাটিতে কেয়োলিনাইটের আবিষ্কার শুধু একটি খনিজের সন্ধান নয়। এটি মঙ্গলের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ঘটনা।
এই আবিষ্কার থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন—
মঙ্গলের জলবায়ু কেমন ছিল
কত দিন ধরে সেখানে বৃষ্টি হয়েছিল
কীভাবে মঙ্গল তার জল হারিয়েছে
কীভাবে বায়ুমণ্ডল পরিবর্তিত হয়েছে
সেখানে প্রাণের সম্ভাবনা কতটা ছিল
অর্থাৎ, মঙ্গলের অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণা সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে উঠছে।
নাসার প্রিজ়ারভেন্স রোভার এখনও মঙ্গলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
পরিকল্পনা রয়েছে—
মঙ্গলের মাটি ও পাথরের নমুনা পৃথিবীতে আনা
আরও উন্নত বিশ্লেষণ করা
নতুন রোভার ও মহাকাশযান পাঠানো
মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা
এই সব গবেষণা থেকে হয়তো একদিন জানা যাবে—
মঙ্গল কি সত্যিই একসময় পৃথিবীর মতো ছিল?
সেখানে কি প্রাণের সূচনা হয়েছিল?
কেন মঙ্গল তার জল ও বায়ুমণ্ডল হারাল?
মঙ্গলের রুক্ষ মাটিতে পাওয়া সাদা কেয়োলিনাইট পাথর শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়, বরং এটি লাল গ্রহের অতীতের এক জীবন্ত সাক্ষী।
এই পাথরগুলি প্রমাণ করে যে, একসময় মঙ্গল ছিল উষ্ণ, আর্দ্র ও বৃষ্টিভেজা গ্রহ। সেখানে নদী ও হ্রদের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি হয়েছিল।
এই আবিষ্কার মানুষের কল্পনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। মঙ্গল সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান এখনও অসম্পূর্ণ। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আমাদের সামনে খুলে দিচ্ছে অজানা মহাবিশ্বের দরজা।
আর সেই মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায় হয়তো এখনও আমাদের অপেক্ষায়।