চন্দননগরের মানকুণ্ডুর নতুনপাড়ার জগদ্ধাত্রী পুজো এবার পদার্পণ করেছে ৭০ বছরে। এ বছরের থিম — ‘মনের মানুষ’, যেখানে মানবতার আবেগ, ভালোবাসা ও আত্মিক শান্তির বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। মণ্ডপসজ্জা থেকে আলোকসজ্জা—সবেতেই ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সৌন্দর্য ও আন্তরিকতার ছোঁয়া।
চন্দননগরের মানকুণ্ডু নতুনপাড়ার জগদ্ধাত্রী পুজো এবার উদযাপন করছে তার ৭০তম বর্ষপূর্তি। দীর্ঘ সাত দশকের ঐতিহ্য, পরম্পরা ও আবেগকে সঙ্গে নিয়ে এ বছরের থিম রাখা হয়েছে — ‘মনের মানুষ’। এই থিমের মধ্য দিয়ে পুজো কমিটি দর্শনার্থীদের মনে এক বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিতে চায় — মানুষের অন্তরের সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও মানবিকতার গুরুত্ব।
১৯৫৬ সালে শুরু হওয়া এই পুজো আজ চন্দননগরের অন্যতম দর্শনীয় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। বছর ঘুরে ফের এলে চারদিক ভরে ওঠে আলোর ছটায়, ঢাকের আওয়াজে ও ধূপের গন্ধে। তবে এবার একটু ভিন্নতার স্পর্শ আছে — এই থিমের মূল ভাবনা হলো, “আমাদের আশেপাশে থাকা সাধারণ মানুষই আমাদের মনের মানুষ, যাদের উপস্থিতিতেই জীবন পূর্ণ হয়।”
মণ্ডপসজ্জার নকশায় ধরা পড়েছে এই ভাবনা। টিন, কাপড় ও বাঁশের কাঠামো দিয়ে তৈরি মণ্ডপে নেই অতি-চমকপ্রদ বাহার, বরং সরলতা ও ভাবনার গভীরতাই এ বছরের মূল আকর্ষণ। মণ্ডপের একেকটি অংশে তুলে ধরা হয়েছে জীবনের নানা চরিত্র — মা, শ্রমিক, চাষি, শিশু, বাউল ও সেবিকা — যারা সমাজের প্রকৃত মনের মানুষ।
দেবী জগদ্ধাত্রীর প্রতিমাও এই ভাবনার সঙ্গেই একাত্ম। দেবী এখানে কেবল শক্তির প্রতীক নন, বরং মা-রূপে ভালোবাসা ও স্নেহের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। প্রতিমার মুখের কোমল হাসি যেন বলছে — “ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় পূজা।”
পুজো কমিটির এক সদস্য বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম এমন একটা থিম, যা মানুষকে ভাবাবে। আমরা দেখেছি, আজকের সমাজে মানুষ ব্যস্ত নিজের সাফল্যে, কিন্তু মানবিক সম্পর্কগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ‘মনের মানুষ’ থিমের মাধ্যমে আমরা সেই হারানো অনুভূতিটাই ফিরিয়ে আনতে চেয়েছি।”
চন্দননগর মানকুণ্ডুর এই পুজোয় দর্শনার্থীর ঢল নামছে প্রতিদিন। কেউ মণ্ডপের ভেতরে প্রবেশ করে মাটির গন্ধে খুঁজে পাচ্ছেন শৈশবের স্মৃতি, কেউবা দেবীর চোখে খুঁজছেন শান্তির বার্তা। সন্ধ্যা নামলে আলোর ঝলকানিতে গোটা এলাকা যেন স্বপ্নের রাজ্য। ঢাকের তালে তালে ধুনুচি নাচ, আলপনা-সাজানো রাস্তা আর মৃদু বাউল সুর—সব মিলিয়ে এ যেন এক অন্য রকম উৎসব।
যদিও চন্দননগরের নানা বড় পুজোর মধ্যে নতুনপাড়ার পুজো তুলনামূলক ছোট আকারের, তবু তার আবেগ ও থিমের গভীরতা একে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। এখানে নেই অতিরিক্ত গ্ল্যামার, আছে কেবল অনুভবের স্পর্শ।
শেষে বলা যায়, নতুনপাড়া জগদ্ধাত্রী পুজো শুধুমাত্র এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানুষের মনের সঙ্গে মনের এক গভীর সংযোগের উৎসব। ‘মনের মানুষ’ থিমের মধ্য দিয়ে এই পুজো শেখাচ্ছে — দেবীর আরাধনা মানেই মানবতার আরাধনা, আর ভালোবাসাই জীবনের প্রকৃত শক্তি।