Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

প্রাইভেটে এমবিবিএস পড়া এখন সরকারি কলেজের চেয়ে ২০০ গুণ ব্যয়বহুল!

সরকারি মেডিকেল কলেজে সেমেস্টার পিছু যেখানে খরচ মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা, সেখানে প্রাইভেটে এমবিবিএস পড়ার ব্যয় এখন তার তুলনায় ২০০ গুণেরও বেশি।

প্রাইভেটে এমবিবিএস পড়ার খরচ এখন সরকারি মেডিকেল কলেজের তুলনায় প্রায় ২০০ গুণেরও বেশি — এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ভারতের চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থা আজ গভীর বৈষম্য ও সংকটের মুখে। যেখানে সরকারি মেডিকেল কলেজে সাড়ে পাঁচ বছরের এমবিবিএস কোর্সে মোট খরচ পড়ে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা, সেখানে প্রাইভেট কলেজে সেই একই ডিগ্রি অর্জনের জন্য পরিবারকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৪০ লক্ষ থেকে শুরু করে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত। এই বিপুল খরচের ব্যবধান শুধু শিক্ষার সুযোগে নয়, বরং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান, সামাজিক গতিশীলতা এবং চিকিৎসা পরিষেবার কাঠামোকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

সরকারি বনাম প্রাইভেট এমবিবিএস: খরচের বিস্ময়কর ব্যবধান

বর্তমান বাজারদরের যুগেও সরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়তে সেমেস্টার পিছু পড়াশোনার খরচ মাত্র ৪,৫০০ টাকা। অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ বছরের পুরো কোর্সে (ইন্টার্নশিপ সহ) পড়াশোনার খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫৪,৭৭২ টাকা। এই অঙ্কের মধ্যে রয়েছে—

  • ৯টি সেমেস্টারের পড়াশোনার খরচ: ৪০,৫০০ টাকা

  • ভর্তি ফি: ১,০০০ টাকা

  • বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ও রেজিস্ট্রেশন ফি: ৮,৪০০ টাকা

  • হস্টেল খরচ (পুরো কোর্স + ইন্টার্নশিপ): মাত্র ৮৭২ টাকা

এই হিসেব শুনলে অনেকেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে আজকের ভারতে এত কম খরচে একজন ডাক্তার তৈরি হওয়া সম্ভব। অথচ সরকারি ব্যবস্থায় এখনও এই কাঠামো টিকে রয়েছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে চিকিৎসা শিক্ষাকে বাস্তবসম্মত করে রেখেছে।

কিন্তু ছবিটা একেবারে উল্টো প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলিতে। সেখানে—

  • ম্যানেজমেন্ট কোটায় সেমেস্টার পিছু গড়ে খরচ প্রায় ১০ লক্ষ টাকা, অর্থাৎ পুরো কোর্সে ৪৫–৫০ লক্ষ টাকা।

  • স্টেট কোটায় পড়লেও খরচ পড়ে সেমেস্টার পিছু ২–৪ লক্ষ টাকা।

  • আর এনআরআই কোটায় এমবিবিএস করতে খরচ পৌঁছে যায় ১.৫ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত।

এর সঙ্গে যোগ হয় ভর্তি ফি (৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা), হস্টেল খরচ (বছরে ১–২.৫ লক্ষ টাকা), খাওয়া-দাওয়া, বই, লগবুক, ইউনিফর্ম, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ। সব মিলিয়ে প্রাইভেট কলেজে এমবিবিএস পড়ার মোট ব্যয় বহু ক্ষেত্রেই ৬০ লক্ষ থেকে ২ কোটিরও বেশি হয়ে দাঁড়ায়।

সরকারি কলেজে হস্টেল খরচ: প্রায় প্রতীকী

সরকারি মেডিকেল কলেজগুলিতে হস্টেল খরচ কার্যত প্রতীকী। পুরো সাড়ে পাঁচ বছরে মোট খরচ মাত্র ৮৭২ টাকা। সরকারি হিসেব অনুযায়ী—

  • হস্টেল ভর্তি ফি: ৮০ টাকা

  • প্রতি সেমেস্টারে ৭২ টাকা করে ৯টি সেমেস্টার: ৬৪৮ টাকা

  • ইন্টার্নশিপের ১২ মাসে মাসে ১২ টাকা করে: ১৪৪ টাকা

এই অঙ্ক আজকের বাজারে একদিনের চায়ের বিলের চেয়েও কম। অথচ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে একই সুবিধার জন্য বছরে দিতে হয় ১ থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা। এসি রুম হলে খরচ আরও বাড়ে। কোথাও দু’জনের রুম, কোথাও একা থাকা — সেই অনুযায়ী চার্জ আলাদা।

আসন সংকট: প্রতিযোগিতার চাপে লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া

এই বিপুল খরচের বৈষম্যের মূল কারণ একটাই — সরকারি মেডিকেল কলেজে আসনের ভয়াবহ সংকট। বর্তমানে দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস আসন সংখ্যা আনুমানিক ৬০ থেকে ৬৫ হাজার। অথচ প্রতি বছর NEET পরীক্ষায় বসেন প্রায় ২৩ লক্ষ পড়ুয়া।

অর্থাৎ, প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনও সরকারি কলেজে সুযোগ পান না। বাকিদের সামনে থাকে দু’টি পথ—
এক, অন্য কোনও পেশায় চলে যাওয়া।
দুই, বিপুল অর্থ খরচ করে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া।

ফলত চিকিৎসা শিক্ষা আজ মেধার চেয়েও অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে আর্থিক সামর্থ্যের উপর। সমাজে তৈরি হচ্ছে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে মূলত ধনী ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যেই।

ডাক্তারির বাজার: বিনিয়োগের তুলনায় রিটার্ন কতটা?

এখানেই প্রশ্ন উঠছে — এত টাকা খরচ করে এমবিবিএস পড়িয়ে আদৌ কি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন বাবা-মায়েরা?

রাজ্যের প্রাক্তন স্বাস্থ্য অধিকর্তা (শিক্ষা) ডাঃ প্রদীপ মিত্রের মতে, পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। তাঁর কথায়,

“এত টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েদের বাবা-মায়েরা পড়াচ্ছেন। সত্যিটা হল, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মাসে ৫০ হাজার টাকার চাকরি জোটাতেই ডাক্তারদের কালঘাম ছুটে যাবে। চাহিদার থেকে জোগান অনেক বেশি হয়ে গিয়েছে।”

অর্থাৎ, আজ যে পরিবার ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা খরচ করে সন্তানকে এমবিবিএস পড়াচ্ছে, তাদের সামনে বিনিয়োগের তুলনায় রিটার্ন আদৌ মিলবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বিশেষ করে শহরাঞ্চলে চিকিৎসকের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় নতুন এমবিবিএস পাস করা ডাক্তারদের জন্য ভালো চাকরি বা প্র্যাকটিস শুরু করা কঠিন হয়ে উঠছে। সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ সীমিত, আর প্রাইভেট হাসপাতালে শুরুর বেতন অনেক ক্ষেত্রেই ৩০–৪০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এমবিবিএস-এর পর খরচের শেষ নেই

এমবিবিএস পড়া শেষ মানেই যে ডাক্তারি জীবনের আর্থিক সংগ্রাম শেষ, তা নয়। বাস্তবে শুরু হয় আরও দীর্ঘ পথ—

  • পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন (MD/MS)

  • সুপার স্পেশালিটি কোর্স (DM/MCh)

  • বিভিন্ন ট্রেনিং ও ফেলোশিপ

এই প্রতিটি ধাপে খরচ আরও বাড়ে। সরকারি কলেজে PG বা সুপার স্পেশালিটি আসন পাওয়াও কঠিন। ফলে বহু চিকিৎসক আবার প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হন, যেখানে PG কোর্সের ফি কয়েক লক্ষ থেকে শুরু করে কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।

অর্থাৎ, এমবিবিএস-এ যে ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা খরচ, সেটাই শেষ নয় — চিকিৎসা শিক্ষার পুরো যাত্রায় পরিবারকে আরও বহু বছর ধরে আর্থিক চাপ বইতে হয়।

news image
আরও খবর

চিকিৎসা শিক্ষা কি ধীরে ধীরে বিলাসপণ্যে পরিণত হচ্ছে?

এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন উঠে আসছে — চিকিৎসা শিক্ষা কি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে? যাঁরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তাঁদেরই কি শেষ পর্যন্ত ডাক্তার হওয়ার সুযোগ মিলছে না?

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হতে পারে। কারণ—

  • দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের সন্তানরা চিকিৎসা শিক্ষায় ঢুকতে না পারলে, সেই সমাজের সমস্যাগুলো বোঝার মতো চিকিৎসকের অভাব তৈরি হবে।

  • চিকিৎসা পেশা ধীরে ধীরে একটি “এলিট প্রফেশন”-এ পরিণত হবে, যেখানে আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়া প্রবেশ করা অসম্ভব হয়ে উঠবে।

সরকারি মেডিকেল কলেজ বাড়লেও সংকট কাটছে না

গত কয়েক বছরে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যৌথভাবে নতুন মেডিকেল কলেজ খোলার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, গত এক দশকে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু তবুও চাহিদার তুলনায় আসন সংখ্যা এখনও অনেক কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কলেজ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন—

  • আরও বেশি সরকারি মেডিকেল কলেজ

  • পরিকাঠামো ও শিক্ষক নিয়োগে বিনিয়োগ

  • গ্রামীণ ও আধা-শহর অঞ্চলে মেডিকেল শিক্ষা সম্প্রসারণ

এছাড়া প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলির ফি কাঠামোর উপর আরও কড়া নিয়ন্ত্রণ দরকার বলেও মত অনেকের।

প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে ফি কাঠামো: নিয়ন্ত্রণের অভাব

বর্তমানে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলির ফি রাজ্য ফি রেগুলেটরি কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত হলেও বাস্তবে তার বাস্তবায়ন নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে—

  • প্রকাশিত ফি-এর বাইরে নানা নামে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া হয়

  • হস্টেল, মেস, ডেভেলপমেন্ট ফি ইত্যাদির মাধ্যমে মোট খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়

  • এনআরআই কোটায় ভর্তি নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়

এই কারণে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের একাংশের দাবি, চিকিৎসা শিক্ষাকে বাজারের পণ্যে পরিণত করা থেকে বিরত রাখতে সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

ডাক্তারি পড়াশোনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

চিকিৎসা পেশাকে বহুদিন ধরেই সমাজে “নোবেল প্রফেশন” বলা হয়। কিন্তু যখন একজন ডাক্তার হতে পরিবারকে কোটি টাকা খরচ করতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে — এই বিনিয়োগ কি ভবিষ্যতে চিকিৎসকের মনোভাবকেও প্রভাবিত করবে না?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁরা বিপুল অর্থ ব্যয় করে ডাক্তার হন, তাঁদের মধ্যে অনেকে পরে উচ্চ আয়ের ক্ষেত্রেই বেশি ঝোঁকেন, যাতে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া যায়। এর ফলে গ্রামীণ বা দরিদ্র অঞ্চলে কাজ করতে আগ্রহী চিকিৎসকের সংখ্যা কমতে পারে, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অসমতা আরও বাড়িয়ে তুলবে।

অভিভাবকদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজকের অভিভাবকদের সামনে কঠিন প্রশ্ন—

  • সরকারি কলেজের জন্য বছর বছর পুনরায় NEET দেওয়ানো হবে?

  • নাকি প্রাইভেট কলেজে বিপুল অর্থ খরচ করে ভর্তি করানো হবে?

  • নাকি সন্তানকে অন্য পেশার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে?

ডাঃ প্রদীপ মিত্রের কথায়,

“চাহিদার থেকে জোগান অনেক বেশি হয়ে গিয়েছে। বাবা-মায়েদের উচিত বাস্তবতা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। একই সঙ্গে সরকারকেও ভাবতে হবে, মুড়ি-মুড়কির মতো প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ চালু করে আখেরে আদৌ লাভ হচ্ছে কি না।”

ভবিষ্যতের পথ কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা শিক্ষাকে টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত রাখতে হলে কয়েকটি বিষয় জরুরি—

  1. সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানো

  2. প্রাইভেট কলেজের ফি কাঠামোতে কড়া নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা

  3. মেধাভিত্তিক স্কলারশিপ ও লোন সুবিধা বাড়ানো

  4. গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের পড়ুয়াদের জন্য বিশেষ কোটা ও সহায়তা

  5. ডাক্তারদের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা, যাতে অতিরিক্ত জোগান থাকলেও কাজের সুযোগ থাকে

চিকিৎসা শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত পেশা গড়ার বিষয় নয়, এটি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি। সেখানে যদি সুযোগ কেবল অর্থবানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে ভবিষ্যতে তার সামাজিক ও মানবিক মূল্য চুকাতে হবে গোটা দেশকেই।

Preview image