মহারাষ্ট্রের গড়চিরৌলি জেলার আলদান্দি টোলা গ্রামে মর্মান্তিক ঘটনা। গ্রামে রাস্তা না থাকায় অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেই হাসপাতালের উদ্দেশে হাঁটা শুরু করেন এক আশাকর্মী। দীর্ঘ পথ হাঁটার পর গর্ভেই সন্তানের মৃত্যু হয়। অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছতে দেরি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান ওই মহিলা।
গ্রামে কোনও হাসপাতাল নেই। ন্যূনতম প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের খোঁজ করতেও কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে যেতে হয়। রাস্তার নামমাত্র অস্তিত্ব থাকলেও তা এতটাই বেহাল যে সেখানে কোনও গাড়ি চলাচল করে না। এই চরম অব্যবস্থার মধ্যেই অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় জঙ্গলের পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে প্রাণ হারালেন এক মহিলা। বাঁচানো গেল না তাঁর গর্ভের সন্তানকেও। ঘটনাটি ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল দেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তব চিত্র।
মহারাষ্ট্রের গড়চিরৌলি জেলা-র আলদান্দি টোলা গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। মৃত মহিলার নাম আশা সন্তোষ কিরাঙ্গা। বয়স মাত্র ২৪ বছর। তিনি পেশায় একজন আশাকর্মী ছিলেন। যিনি নিজে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা, প্রসূতি পরিচর্যা এবং টিকাকরণ সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতন করে এসেছেন, সেই তিনিই শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারালেন।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, আশা ন’মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। সন্তান জন্মের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ততই পরিবার চিন্তিত হয়ে পড়ছিল। কারণ তাঁদের গ্রামে প্রসবের কোনও পরিকাঠামো নেই। নেই কোনও স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র, নেই ধাত্রী বা প্রশিক্ষিত নার্স। সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্রামে যাওয়ার মতো কোনও পাকা রাস্তা নেই। ফলে কোনও গাড়ি বা অ্যাম্বুল্যান্স গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না।
গত ১ জানুয়ারি প্রসব যন্ত্রণা শুরু হলে পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, যেভাবেই হোক হাসপাতালে পৌঁছতে হবে। বাধ্য হয়েই অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হাঁটা শুরু করেন আশা। সঙ্গে ছিলেন পরিবারের কয়েকজন সদস্য। জঙ্গল, উঁচুনিচু মাটির রাস্তা আর পাথুরে পথ পেরিয়ে প্রায় ছ’কিলোমিটার হাঁটার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এত ভারী শরীর নিয়ে সেই পথ যে কতটা বিপজ্জনক, তা যেন কারও ভাবনায় ছিল না।
হাঁটার কিছুদূর যাওয়ার পরই আশার শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয়। তীব্র পেটব্যথা ও দুর্বলতায় তিনি আর হাঁটতে পারছিলেন না। তখনই অ্যাম্বুল্যান্সে ফোন করা হয়। কিন্তু গ্রামে রাস্তা না থাকায় অ্যাম্বুল্যান্সও নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার পর কোনওভাবে তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছনো হলে চিকিৎসকেরা জানান, গর্ভে থাকা সন্তানের মৃত্যু আগেই হয়ে গিয়েছে। অতিরিক্ত রক্তচাপ এবং শারীরিক ক্লান্তির কারণে আশার অবস্থাও অত্যন্ত সংকটজনক হয়ে পড়ে। সব চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয় তাঁরও।
হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে, দীর্ঘ পথ হাঁটার ফলে শরীরে অতিরিক্ত চাপ পড়েছিল। উচ্চ রক্তচাপ, প্রসবজনিত জটিলতা এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়াই এই মৃত্যুর প্রধান কারণ বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, যদি সময়মতো অ্যাম্বুল্যান্স বা ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া যেত, তাহলে এই প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব ছিল।
এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হল, আশা নিজে একজন আশাকর্মী ছিলেন। যাঁদের কাজই হল গ্রামে গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা, নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা। অথচ নিজের জীবনের ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থাই তাঁর জন্য ছিল না। সহকর্মীদের মতে, আশা সবসময় গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। বহু প্রসূতিকে তিনি হাসপাতালে পৌঁছতে সাহায্য করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য কোনও সহায়তা পাননি।
গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, প্রশাসনের দরজায় বারবার কড়া নাড়লেও তাঁদের সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান হয়নি। রাস্তা নেই, স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, জরুরি পরিষেবার কোনও নিশ্চয়তা নেই এই বাস্তবতার মধ্যেই বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাঁদের। বর্ষা এলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কাদা, জল আর জঙ্গলের মাঝে গ্রাম কার্যত বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন অসুস্থ মানুষকে কাঁধে তুলে বাঁশের খাটিয়ায় করে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। সেই দীর্ঘদিনের অবহেলারই করুণ পরিণতি হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা আশা সন্তোষ কিরাঙ্গার মর্মান্তিক মৃত্যুকে।
মহারাষ্ট্রের গড়চিরৌলি জেলার আলদান্দি টোলা গ্রামটি আদিবাসী অধ্যুষিত এক প্রত্যন্ত এলাকা। এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ছোঁয়া এখনও অনেকটাই অধরা। গ্রামে নেই পাকা রাস্তা, নেই কোনও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। বিদ্যুৎ আর পানীয় জলের সমস্যাও নিত্যদিনের সঙ্গী। এমন একটি এলাকায় অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এক মহিলার হাসপাতালে পৌঁছনো যে কতটা কঠিন, তা এই ঘটনার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মৃত আশা সন্তোষ কিরাঙ্গা পেশায় একজন আশাকর্মী ছিলেন। অর্থাৎ, যাঁর কাজই ছিল গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত থাকা, গর্ভবতী মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া, টিকাকরণে সহায়তা করা এবং প্রয়োজনে তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। অথচ সেই আশাকর্মীকেই শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনের জন্য লড়াই করতে হল এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে, যেখানে তাঁর জন্যই ছিল না ন্যূনতম নিরাপত্তা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, আশা ছিলেন নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসছিল। ১ জানুয়ারি তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু গ্রাম থেকে হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার। কোনও পাকা রাস্তা না থাকায় সেখানে অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছনো সম্ভব নয়। বাধ্য হয়েই পরিবারের সদস্যরা ও গ্রামবাসীরা তাঁকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে, অসমতল পথে হাঁটতে হাঁটতে একসময় তাঁর পেটে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত হাতের বাইরে চলে যায়। পথেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই মৃত্যু হয় তাঁর। বাঁচানো যায়নি তাঁর গর্ভের সন্তানের প্রাণও। একদিকে এক জন হবু মা, অন্যদিকে অনাগত একটি জীবন দু’টি প্রাণ একসঙ্গে নিভে গেল প্রশাসনিক ব্যর্থতার অন্ধকারে।
ঘটনার পর গড়চিরৌলি জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রতাপ শিন্ডে জানান, মহিলাকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তিনি আরও জানান, এই ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট তালুক স্তরের স্বাস্থ্য আধিকারিকের কাছে চাওয়া হয়েছে। গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত চলছে।
তবে প্রশাসনের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রশ্ন, যদি আগেই গ্রামে রাস্তা থাকত, যদি ন্যূনতম একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকত, যদি নিয়মিত অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা পৌঁছত তাহলে কি এমন মৃত্যু ঘটত? তাঁদের মতে, তদন্ত বা রিপোর্টের আশ্বাস বহুবার শুনেছেন তাঁরা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি।
এই ঘটনার পর ফের বড় করে উঠে আসছে ভারতের গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। সরকারিভাবে বারবার দাবি করা হয়, প্রসূতি পরিষেবার উন্নতি হয়েছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেশের বহু গ্রাম এখনও সেই উন্নয়নের বাইরে রয়ে গেছে।
বিশেষ করে আদিবাসী ও দুর্গম এলাকাগুলিতে আজও প্রসূতি মায়েদের জীবন প্রতিদিন ঝুঁকির মুখে। রাস্তা নেই বলে অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছয় না, অ্যাম্বুল্যান্স থাকলেও চালক নেই, স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেখানে ডাক্তার বা নার্স অনুপস্থিত এই সব সমস্যাই যেন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বড় বড় হাসপাতাল তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। গ্রাম পর্যন্ত পাকা রাস্তা তৈরি করা, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা চালু করা, প্রতিটি গ্রামে বা কাছাকাছি এলাকায় কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করাও সমান জরুরি।
তাঁদের আরও বক্তব্য, আশাকর্মী ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। অথচ তাঁদের নিজেরাই অনেক সময় ন্যূনতম সুরক্ষা ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। আশা সন্তোষ কিরাঙ্গার মৃত্যু সেই নির্মম বাস্তবতারই প্রতিফলন। যাঁর দায়িত্ব ছিল অন্যদের জীবন রক্ষা করা, তিনিই শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থার ফাঁকে পড়ে প্রাণ হারালেন।
এই মৃত্যু শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি গোটা ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এটি দেখিয়ে দেয়, নীতিনির্ধারণী স্তরে নেওয়া সিদ্ধান্ত আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে কতটা ফারাক রয়ে গেছে। কাগজে-কলমে উন্নয়নের ছবি যতই উজ্জ্বল হোক, বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন না ঘটলে সেই উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়ে।
গ্রামবাসীদের আশঙ্কা, এই ঘটনাও হয়তো কিছুদিন সংবাদমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে। কয়েকটি তদন্ত, কয়েকটি বৈঠক, কিছু আশ্বাস এরপর ধীরে ধীরে বিষয়টি আবার আড়ালে চলে যাবে। কিন্তু আলদান্দি টোলার মতো অসংখ্য গ্রামে পরিস্থিতি বদলাবে না।
আজ আশা সন্তোষ কিরাঙ্গা নেই। কিন্তু তাঁর মতো আরও কত জন অন্তঃসত্ত্বা মা রয়েছেন, যাঁরা প্রতিদিন একই ঝুঁকির মুখে দিন কাটাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠছে, আর কত জন আশাকে এভাবে প্রাণ দিতে হবে, তবে কি বদলাবে বাস্তবতা? নাকি এই মৃত্যুগুলি সংখ্যায় পরিণত হয়ে যাবে পরিসংখ্যানের খাতায়?
এই ঘটনা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের আসল মানে শুধু শহরের উঁচু বিল্ডিং বা আধুনিক হাসপাতাল নয়। উন্নয়নের মানে হল প্রত্যন্ত গ্রামের একজন অন্তঃসত্ত্বা মায়ের নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছনোর অধিকার নিশ্চিত করা। সেই অধিকার যতদিন না বাস্তবে রূপ পাচ্ছে, ততদিন এমন মর্মান্তিক খবর হয়তো বারবারই আমাদের সামনে আসতে থাকবে।