Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

অনলাইন গেম নিয়ে পারিবারিক বিরোধ, ১০তলা থেকে ঝাঁপ তিন বোনের — মর্মান্তিক মৃত্যু

অনলাইন গেম খেলা নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঝগড়ার পর ১২, ১৪ ও ১৬ বছরের তিন বোন ১০তলা থেকে ঝাঁপ দেয় বলে পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, ঘটনায় শোকস্তব্ধ এলাকা।

অনলাইন গেমের প্রতি আসক্তি যে কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তারই এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ উঠে এল উত্তরপ্রদেশের গাজ়িয়াবাদ থেকে। বাবা-মায়ের গেম খেলায় আপত্তির কারণে অভিমানে একসঙ্গে আবাসনের দশতলা থেকে ঝাঁপ দিল তিন নাবালিকা বোন। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে ১২, ১৪ এবং ১৬ বছর বয়সি ওই তিন কিশোরীর। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় শোকস্তব্ধ গোটা এলাকা। পুলিশ জানিয়েছে, এটি প্রাথমিক ভাবে আত্মহত্যার ঘটনা বলেই মনে করা হচ্ছে, যদিও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পরেই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে।

ঘটনাটি ঘটেছে গাজ়িয়াবাদের লোনি এলাকার একটি বহুতল আবাসনে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পরিবারটি শান্ত স্বভাবের এবং তিন মেয়েই পড়াশোনায় মোটামুটি ভাল ছিল। তবে করোনার সময় থেকেই ধীরে ধীরে মোবাইল ফোন ও অনলাইন গেমের প্রতি ঝোঁক বাড়তে শুরু করে তিন বোনের। প্রথমে অবসর সময়ে খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আসক্তিতে পরিণত হয়। দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে গেম খেলাই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান অভ্যাস।

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, অনলাইন গেমের প্রতি এই অতিরিক্ত আসক্তি নিয়ে বাবা-মায়ের উদ্বেগ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিল। পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজকর্মে অনীহা, দেরি করে ঘুমোতে যাওয়া, সকালবেলা স্কুলে যেতে গড়িমসি করা — সব মিলিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন তাঁরা। মাঝেমধ্যেই গেম খেলা নিয়ে বকাবকি হত বাড়িতে। বাবা-মায়ের দাবি ছিল, পড়াশোনা ও বাস্তব জীবনের দায়িত্ব থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তিন কিশোরী।

স্থানীয়দের কথায়, সম্প্রতি ওই তিন বোন একটি বিশেষ ধরনের টাস্ক-বেস্‌ড অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছিল। এই ধরনের গেমে খেলোয়াড়দের বিভিন্ন কাজ বা মিশন সম্পন্ন করতে হয়, যার ভিত্তিতে লেভেল বা র‍্যাঙ্ক বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইনে থাকতে হয়, একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয় এবং মাঝে মাঝে গেমের মধ্যে নানা মানসিক চ্যালেঞ্জও দেওয়া হয়। পরিবারের আশঙ্কা ছিল, এই গেমগুলি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলছে এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।

মঙ্গলবার রাতেও গেম খেলা নিয়েই অশান্তি বাধে বাড়িতে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, রাত প্রায় দু’টো নাগাদ বাবা-মা তিন বোনকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে বারণ করেন। তাঁদের দাবি ছিল, অনেক রাত হয়ে গিয়েছে এবং পরদিন স্কুল থাকায় এখনই ঘুমোনো উচিত। তবে সেই নিষেধাজ্ঞা মেনে নিতে পারেনি তিন কিশোরী। কথাকাটাকাটির মধ্যেই বাবা-মায়ের সঙ্গে তর্ক বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় বলে সূত্রের খবর।

এর পরই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, অভিমানে ও মানসিক চাপে তিন বোন একসঙ্গে আবাসনের দশতলা থেকে ঝাঁপ দেয়। ঘটনাস্থলেই তাঁদের মৃত্যু হয়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পড়ে চিৎকার-চেঁচামেচিতে। আবাসনের বাসিন্দারা ছুটে এসে তিন কিশোরীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হয় পুলিশে।

খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছন টিলা মোড় থানার পুলিশ আধিকারিকেরা। দেহগুলি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। পাশাপাশি মৃত কিশোরীদের বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন এবং আবাসনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বাড়িতে কোনও আত্মহত্যার চিরকুট পাওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক অশান্তি এবং অনলাইন গেম নিয়ে বিরোধকেই এই চরম সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এই ঘটনায় গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, তিন বোনই ছিল মিশুক স্বভাবের। কারও সঙ্গে ঝামেলা বা বিরোধের কথা তাঁরা আগে কখনও শোনেননি। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা জানিয়েছেন, পড়াশোনায় খুব দুর্বল ছিল না তারা, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে উপস্থিতির হার কিছুটা কমে যাচ্ছিল। কেউ ভাবতেই পারেননি, এমন একটি মর্মান্তিক পরিণতি অপেক্ষা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ও কিশোরদের মধ্যে অনলাইন গেমের প্রতি আসক্তি দিন দিন বেড়ে চলেছে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ইতিমধ্যেই ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’কে একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার স্বীকৃতি দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইন গেম খেলার ফলে ঘুমের সমস্যা, একাকিত্ব, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের মানসিক চাপ থেকে আত্মহানির প্রবণতাও তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন মনোবিদেরা।

মনোবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুদের ক্ষেত্রে অনলাইন গেমিং আসক্তি শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ধীরে ধীরে তা তাদের আবেগ, আচরণ এবং সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। গেমে জেতা-হারার সঙ্গে যুক্ত উত্তেজনা, লেভেল আপ করার নেশা, ভার্চুয়াল দুনিয়ায় স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা — সব মিলিয়ে অনেক সময় তারা বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলিকে উপেক্ষা করতে শুরু করে। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন হলে সেই মানসিক চাপ আরও বেড়ে যায়।

এই ঘটনার পর ফের প্রশ্ন উঠছে — শিশুদের অনলাইন গেম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। বরং সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা, গেমের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সচেতনতা, সময়সীমা নির্ধারণ এবং বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের মানসিক অবস্থার দিকে নজর রাখা এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।

news image
আরও খবর

গাজ়িয়াবাদের এই ঘটনায় তিনটি কচি প্রাণের অকালপ্রয়াণ শুধু একটি পরিবারেরই নয়, গোটা সমাজের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। ডিজিটাল যুগে বড় হয়ে ওঠা প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কতটা জরুরি, তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই ঘটনা। বাবা-মা ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে শিশুদের অনলাইন অভ্যাসের উপর নজর রাখার, পাশাপাশি তাদের আবেগগত চাহিদা বোঝার এবং সমস্যার মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোর।

পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ওই টাস্ক-বেস্‌ড গেমটির বিষয়বস্তু ও কার্যপ্রণালী নিয়েও তদন্ত চলছে। প্রয়োজনে সাইবার বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হতে পারে বলে সূত্রের খবর। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ওই গেমে কোনও ধরনের মানসিক চাপ, বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ বা আত্মহানিমূলক প্ররোচনার মতো উপাদান ছিল কি না।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীরা বলছেন, স্কুলস্তর থেকেই ডিজিটাল লিটারেসি ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শিশুদের শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শেখালেই হবে না, বরং তা কীভাবে নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে হবে, সে সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

মনোচিকিৎসকদের মতে, পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও বিশ্বাসের সম্পর্ক থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। সন্তানদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যাওয়া, ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন, বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া — এই ধরনের লক্ষণগুলি দেখা গেলে তা অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গাজ়িয়াবাদের এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং ডিজিটাল যুগের একটি বড় সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। অনলাইন গেমিং, সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা শিশুদের জীবনে যেমন নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছে, তেমনই তৈরি করেছে নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি তার নেতিবাচক দিকগুলির মোকাবিলা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে মৃত তিন কিশোরীর পরিবার চরম শোক ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, সন্তান হারানোর যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসন পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছে। সমাজকর্মীদের একটি দলও পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছে বলে জানা গিয়েছে।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে অনলাইন গেমিংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। অনেকেই দাবি করছেন, শিশুদের জন্য ক্ষতিকর গেমগুলির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা প্রয়োজন। আবার কেউ কেউ বলছেন, গেম নির্মাতা সংস্থাগুলির উচিত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে কনটেন্ট তৈরি করা এবং বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ বা আসক্তিকর উপাদান এড়িয়ে চলা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের পাশাপাশি পরিবার, স্কুল এবং সমাজ — সকলের সমন্বিত উদ্যোগেই এই ধরনের সমস্যার মোকাবিলা সম্ভব। ডিজিটাল যুগে শিশুদের সুস্থ ও নিরাপদভাবে বড় করে তুলতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য।

পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে। প্রাথমিক ভাবে এটি আত্মহত্যা বলেই ধরে নেওয়া হলেও, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ওই অনলাইন গেমের বিষয়বস্তু ও প্রভাব নিয়েও বিস্তারিত খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অভিভাবকদের শুধু সন্তানদের পড়াশোনা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবলেই হবে না, বরং তাদের আবেগ, মানসিক চাপ ও অনলাইন আচরণ সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। তবেই হয়তো ভবিষ্যতে এমন করুণ ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।

গাজ়িয়াবাদের এই মর্মান্তিক ঘটনা গোটা সমাজের জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার সময় এনে দিয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোও বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিশুদের মানসিক ও আবেগগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে। তিন বোনের অকালমৃত্যু যেন সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।

Preview image