লিয়োনেল মেসির ভারত সফরের আয়োজন করেছিলেন শতদ্রু দত্ত, যিনি যুবভারতী কাণ্ডের দিন গ্রেফতার হন। ৩৯ দিন পর গত ১৯ জানুয়ারি তিনি অন্তর্বর্তী জামিন পান। তবে মেসির ম্যাচের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি এখনো বিচারাধীন।
যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লিয়োনেল মেসির ভারত সফরের সময় যে ঘটনা ঘটেছিল, তা এখনো অনেক দর্শক ও ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করছে। ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যে নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার পর থেকে আজও অনেক দর্শক টিকিটের টাকা ফেরতের অপেক্ষায় রয়েছেন। সেই দিন, মেসি এবং আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলারদের দেখতে হাজার হাজার মানুষ দূরদূরান্ত থেকে কলকাতা আসেন। অনেকেই মেসিকে কাছ থেকে দেখার আশা নিয়ে ১২ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করে টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু দর্শকরা মেসি দেখতে না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি তোলেন। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য পুলিশ, মন্ত্রী, প্রশাসনসহ অনেকেই টিকিটের টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তা আজও পূর্ণ হয়নি।
এই ঘটনার পর রাজ্য পুলিশের তৎকালীন ডিজি রাজীব কুমার বলেছিলেন, দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া উচিত এবং যদি টাকা ফেরত না দেওয়া হয়, তবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে রাজীব কুমার পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, এবং আজও দর্শকরা তাঁদের টিকিটের টাকা ফেরত পাননি। তবে, টিকিটের টাকা ফেরতের বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন।
মেসির ভারত সফরের আয়োজক ছিলেন শতদ্রু দত্ত। যুবভারতী কাণ্ডের দিনই তাকে গ্রেফতার করা হয়, তবে গত ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে অন্তর্বর্তী জামিনও পেয়ে যান তিনি। কিন্তু তার পর থেকে তিনি কার্যত বেপাত্তা। ফোনে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, এবং প্রকাশ্যে কোথাও দেখা যাচ্ছে না তাকে।
তবে যুবভারতী কাণ্ডের পরে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তদন্ত কমিটি গঠন করেন এবং টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। রাজ্যের বিশেষ তদন্তকারী দলও (সিট) বার বার আদালতে টিকিট ফেরতের পক্ষে সওয়াল করেছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনো দর্শক টিকিটের টাকা ফেরত পায়নি।
এই পরিস্থিতি দেখে মেসির নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুতই তাকে স্টেডিয়াম থেকে বের করে আনেন, কারণ পরিস্থিতি হুমকির মুখে ছিল। মেসির সাথে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো ডি'পল, কিন্তু তাদেরও ভিড়ে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল। মেসির দ্রুত সরে যাওয়ার ফলে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং দর্শকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
অনেক দর্শক, যারা হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছিলেন, এখনো টাকা ফেরতের অপেক্ষায় আছেন। এমনকি, হাওড়ার বাসিন্দা অনিন্দিতা বেরা তাঁর ভাই ও বন্ধুর সাথে মেসিকে দেখতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তারা এক ঝলকও মেসিকে দেখতে পাননি। ১৩ হাজার টাকা খরচ করেও তারা মেসির সাক্ষাৎ লাভ করেননি। অনিন্দিতার মতো হাজার হাজার মানুষ এখনও টিকিটের টাকা ফেরতের আশায় রয়েছেন, কিন্তু তা পাচ্ছেন না। কিছু দর্শক আশা ছেড়ে দিয়েছেন, আবার কিছু মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, কারণ তারা এখনও কোনো যোগাযোগ পায়নি।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুবভারতী কাণ্ডের পর সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে বলেছিলেন, "এই ঘটনার জন্য আমি স্তম্ভিত ও বিচলিত। মেসি, ক্রীড়াপ্রেমী এবং ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়েছি।" তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করেন এবং সিটের মাধ্যমে এই বিষয়টির তদন্ত শুরু হয়।
তবে, সিট এই মামলার তদন্তে বার বার আদালতে টিকিট ফেরতের পক্ষে সওয়াল করেছে, কিন্তু তারপরও সেটা কার্যকর হয়নি। আদালত এখন পুরো বিষয়টি বিচার করছে এবং এ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসার অপেক্ষা করা হচ্ছে।
তবে, সিটের তদন্তে এই তথ্য উঠে এসেছে যে, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে অনুষ্ঠিত মেসির ম্যাচের জন্য টিকিট বিক্রির কাজ একটি অনলাইন সংস্থা করেছিল। ওই সংস্থাটি ৩৪,৫৭৬টি টিকিট বিক্রি করেছিল, যার মাধ্যমে ২০ কোটি টাকার বেশি আয় হয়েছিল শুধুমাত্র টিকিট বিক্রির মাধ্যমে। এই তথ্যটি সিটের তদন্তে প্রকাশ্যে আসে এবং তা আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।
এখনো পর্যন্ত দর্শকরা এক ঝলক মেসি দেখতে পাননি, অথচ তারা এইসব টিকিটের জন্য বিশাল পরিমাণ টাকা খরচ করেছেন। এখন প্রশ্ন উঠছে, সরকার, প্রশাসন এবং আয়োজকরা কি তাদের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে এবং টিকিটের টাকা ফেরত দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা, তবে আদালতের নির্দেশনার পর হয়তো পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।
যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লিয়োনেল মেসির ভারত সফরের সময় ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলা এবং দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত না পাওয়ার ঘটনা আজও অনেকের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করছে। এই ঘটনা শুধু পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য নয়, বরং পুরো ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। টিকিটের টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, কিন্তু এখনো সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। এই অব্যবস্থাপনা ও নিরবতার ফলে দর্শকরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক ম্যাচে মেসি, লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো ডি’পল, এই তিনজন ফুটবল তারকা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু মাঠের ভিড়ের চাপে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। মেসি ও তার সহকর্মীরা মাঠে ঢোকার পরই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। একদিকে মন্ত্রীরা, অন্যদিকে প্রভাবশালীরা স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন, যার ফলে পরিস্থিতি দ্রুত হাতের বাইরে চলে যায়। নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত মেসি ও অন্যান্য খেলোয়াড়দের স্টেডিয়াম থেকে বের করে নেন। এই ঘটনাটি এক বিরাট গণরোষ সৃষ্টি করে এবং ক্ষুব্ধ দর্শকরা টিকিটের টাকা ফেরতের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
এ বিষয়ে রাজ্য প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং আয়োজকরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। রাজ্য পুলিশের তৎকালীন ডিজি রাজীব কুমার সাংবাদিক সম্মেলনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, যদি দর্শকদের টাকা ফেরত না দেওয়া হয়, তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর কথায়, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এবং যত দ্রুত সম্ভব এটি সমাধান করা হবে। কিন্তু তার পর থেকে এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি, আর টিকিটের টাকা ফেরত পাওয়ার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, যদি প্রশাসন, আয়োজক এবং পুলিশ এতই শক্তিশালী ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছিলেন, তাহলে কেন এতদিন পরেও সমস্যাটি সমাধান করা হলো না? কেন টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি? পুলিশ কমিশনার, মুখ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য প্রভাবশালীদের প্রতি দর্শকদের আস্থাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ তারা তাঁদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছেন না।
তবে, এই পুরো ঘটনাটি তদন্তের জন্য সিটের হাতে রয়েছে। সিট তদন্তে প্রকাশিত হয় যে, মেসির ম্যাচের টিকিট বিক্রির কাজ একটি অনলাইন সংস্থা করেছে। ওই সংস্থাটি ৩৪,৫৭৬টি টিকিট বিক্রি করে, যার মাধ্যমে ২০ কোটি টাকার বেশি আয় হয়েছিল। এই টিকিট বিক্রির পুরো ব্যাপারটি সিটের তদন্তে উঠে আসে এবং আদালতে সেটি প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ, যে সংস্থাটি টিকিট বিক্রি করেছে, তারা খুবই বড় আকারে ব্যবসা করেছে এবং দর্শকদের কাছ থেকে বিশাল পরিমাণ টাকা আদায় করেছে। তবে, এই টাকা ফেরত না পাওয়ার বিষয়টি এখনো আইনানুগভাবে বিচারাধীন।
এদিকে, সিটের তদন্তকাজও এখনও চলছে। আদালতে সিট বারবার দর্শকদের টাকা ফেরত দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছে, কিন্তু প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন, আর আদালত এই বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে, আদালতের সিদ্ধান্তের পরেও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসছে—যদি টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কিভাবে এবং কতদিনে সম্পন্ন হবে?
এটা স্পষ্ট যে, এই ঘটনা শুধু একটি ক্রীড়া ইভেন্টের বিপর্যয় নয়, বরং একটি সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংকটও সৃষ্টি করেছে। একদিকে দর্শকদের কাছে টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে সিস্টেমের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও এই ঘটনার পরে শোক প্রকাশ করেছিলেন এবং ক্ষমা চেয়েছিলেন, তবে সে সময়ের পরে কেন এই সমস্যার সমাধান হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এছাড়াও, সিটের রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, ওই অনলাইন সংস্থা শুধুমাত্র টিকিট বিক্রির জন্য দায়িত্বে ছিল, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যদি এই সংস্থার উপর নির্ভরশীল থাকাটা ভুল হয়ে থাকে, তবে তারাও দায়িত্বহীনতার জন্য দায়ী। সিট এবং প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল যে, এই ঘটনা তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।
মেসি এবং তার দলের নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া গিয়েছিল, কিন্তু দর্শকদের নিরাপত্তা এবং টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব কে নিবে? এই প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত। দর্শকদের ক্ষোভ এবং আক্রোশ বাড়ছে, এবং তারা তাঁদের অধিকার ও টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তা করছেন।
তবে, শেষ পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্তে হয়তো এই সমস্যার একটি সমাধান আসবে। তবে সবার জন্য এটি একটি মূল্যবান শিক্ষা হয়ে থাকবে যে, এমন বড় ইভেন্টের আয়োজনের ক্ষেত্রে সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দর্শকদের টাকা ফেরত দেওয়া এবং আয়োজকদের দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।