৫–১৫ বছর বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বীরভূমে নতুন আধার কার্ড তৈরি ও সংশোধনের কাজ শুরু করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় ডাক বিভাগ ২৩টি পোস্ট অফিসে সেন্টার খুলেছে, এবং এই পরিষেবা পুরোপুরি বিনামূল্যে।
বীরভূম জেলায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের আধার তৈরির উদ্যোগ দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। বহু পরিবারই অভিযোগ করেছিলেন, শিশুর স্কুলে ভর্তির সময়, বিভিন্ন বৃত্তি প্রকল্পের ক্ষেত্রে, কিংবা স্বাস্থ্য পরিষেবায় আধার নম্বর চাওয়া হলেও শিশুর আধার না থাকায় তাঁদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অবশেষে সেই সমস্যার সুরাহা করতে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বড়সড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্দেশ এসেছে যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের আধার তৈরির কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করতে হবে এবং সেই উদ্দেশ্যেই বীরভূমের ২৩টি পোস্ট অফিসে নতুন করে আধার এনরোলমেন্ট ও সংশোধন পরিষেবা চালু করা হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই উদ্যোগ শুধু বীরভূম নয়, গোটা দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত কার্যকর করা হচ্ছে, যাতে দেশের প্রতিটি শিশুকে পরিচয় ব্যবস্থার মূল সিস্টেমের আওতায় আনা যায়।
বীরভূমের বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলে আধার তৈরির ক্ষেত্রে এতদিন সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ভৌগোলিক দূরত্ব। অনেক পরিবারেরই অভিযোগ ছিল, আধার তৈরির সেন্টার দূরে হওয়ায় শিশুদের নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াত। শিশুদের স্কুলের সময় নষ্ট হত, আর্থিকভাবেও অতিরিক্ত খরচ হতো। কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন নির্দেশিকা অনুসারে এখন প্রতিটি উপ-ডাকঘরেই ধীরে ধীরে আধার পরিষেবা চালু করার কাজ চলছে, যাতে মানুষ নিকটবর্তী পোস্ট অফিসে গিয়েই শিশুদের আধার তৈরি করতে পারেন। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, এই উদ্যোগে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। প্রতিটি পোস্ট অফিসের সামনে সকাল থেকেই ভিড় জমতে শুরু করেছে। অনেকে আবার আগাম তথ্য নিয়েই হাজির হচ্ছেন যাতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা না হয়।
শিশুদের আধার তৈরির নিয়ম আগের তুলনায় অনেক সহজ করা হয়েছে। বিশেষত ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক বিধিতে কিছু পরিবর্তন এনেছে ইউআইডিএআই। সাধারণত ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য ফটো এবং পরিবারের সদস্যের আধার নম্বরের ভিত্তিতে আধার তৈরি করা হয় এবং বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হয় না। কিন্তু ৫ বছর বয়স পার করার পর সেই শিশুর রিকগনাইজেবল বায়োমেট্রিক তথ্য নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, এগুলি হল ব্যক্তির সনাক্তকরণের সবচেয়ে নির্ভুল পদ্ধতি। এবার সেই একই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে ৫ থেকে ১৫ বছরের শিশুদের জন্যও, যাতে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়োমেট্রিক আপডেট করা সম্ভব হয়। শিশুদের আঙ্গুলের ছাপ, চোখের মণির স্ক্যানসহ সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হবে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এবং সেই তথ্য নিরাপদ সার্ভারে সংরক্ষণ করবে ইউআইডিএআই।
এই প্রকল্প শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছেন স্কুল পড়ুয়া শিশুরা। কারণ, বর্তমানে প্রায় সব স্কুলেই বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, মিড-ডে মিল, বৃত্তি, ছাত্রভাতা সহ নানা পরিষেবায় আধার নম্বর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনেক স্কুলেই দেখা গিয়েছে, বৃত্তির টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে শিশুর আধারের সঙ্গে অভিভাবকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট লিঙ্ক থাকা জরুরি। কিন্তু আধার না থাকলে বা ভুল তথ্য থাকলে এই প্রকল্পগুলির সুবিধা পাওয়া যায় না। অনেক পরিবারই বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। তাই এই নতুন সিদ্ধান্ত তাঁদের কাছে অনেকটাই স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। পোস্ট অফিসে এসে আধার করানোর পাশাপাশি অভিভাবকেরা বিভিন্ন প্রশ্নও করছেন—কীভাবে ব্যাঙ্কে লিঙ্ক করতে হবে, কখন বায়োমেট্রিক আপডেট প্রয়োজন হবে, ভবিষ্যতে কোনো সংশোধনের দরকার পড়লে কোথায় যেতে হবে; সব প্রশ্নের উত্তর পোস্ট অফিসের আধার অপারেটররা ধৈর্য সহকারে দিচ্ছেন।
আধার তৈরির পাশাপাশি সংশোধন পরিষেবাও শুরু হয়েছে। বহু শিশুরই জন্মতারিখ, ঠিকানা কিংবা নামের বানানে ভুল থাকে, যা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত স্কুল-কলেজে ভর্তির সময় নথিপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই ভুলগুলিই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এবার পোস্ট অফিসেই সেই ভুলগুলি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। জন্মসনদ, স্কুল সার্টিফিকেট, অভিভাবকের আধারসহ নির্দিষ্ট নথি দেখিয়ে তথ্য সংশোধন করা যাবে। প্রশাসনের অনুমান, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্কর আধার সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
এই উদ্যোগে ডাক বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভাগীয় আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, প্রতিটি পোস্ট অফিসে আধার এনরোলমেন্ট কিট, বায়োমেট্রিক ডিভাইস, ওয়েবক্যাম, স্ক্যানার সহ প্রয়োজনীয় সমস্ত সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে কর্মীদের। যেহেতু শিশুদের নিয়ে কাজ করতে হয়, তাই ধৈর্যের সঙ্গে তাঁদের বোঝানো, ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ নেওয়া—এসবের জন্য আলাদা গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। যেসব পোস্ট অফিসে ভিড় বেশি, সেখানে টোকেন সিস্টেম চালু রয়েছে যাতে কেউ সমস্যায় না পড়েন। বীরভূমের সদরের পোস্ট অফিসে পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আগামী কয়েক সপ্তাহ মানুষের ভিড় আরও বাড়বে। অনেকেই বলছেন, স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আধার করিয়ে নেওয়া দরকার।
শুধু শহর বা বড় বাজার নয়, গ্রামাঞ্চলেও আধার পরিষেবা পৌঁছে দিতে বিশেষ তৎপরতা দেখা গেছে। প্রশাসনের নির্দেশে ব্লকভিত্তিক পোস্ট অফিসগুলোতেও কাজ চলছে। অনেক জায়গায় আবার আউটরিচ ক্যাম্পেরও পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট দিনে গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস বা কমিউনিটি হলের ভেতরে সাময়িক আধার সেন্টার বসবে। এতে দূরবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের আর পোস্ট অফিসে গিয়ে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হবে না। বিশেষত আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে এই ক্যাম্প সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, কারণ সেখানে অনেক পরিবারই আর্থিকভাবে সচ্ছল নন এবং যাতায়াতের খরচটুকুও তাঁদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ক্যাম্পে আধার করানোর সুযোগ তাঁদের কাছে অত্যন্ত উপকারী।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, শিশুদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই আধার প্রক্রিয়ায় একাধিক নিরাপত্তা বিধি জারি করা হয়েছে। যেমন—শিশুর বায়োমেট্রিক নেওয়ার সময় অভিভাবক বা বৈধ অভিভাবকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কোনো ক্ষেত্রেই একা শিশুর ওপর প্রক্রিয়া চালানো যাবে না। পাশাপাশি ডেটা সংগ্রহ, আপলোড ও সংরক্ষণ সব কিছুই নির্দিষ্ট এনক্রিপশন টেকনোলজির মাধ্যমে করা হবে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনুমোদিত। ইউআইডিএআই জানিয়েছে, দেশের প্রতিটি শিশুর পরিচয় সুরক্ষিত রাখাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। আধার নম্বর থাকলে ভবিষ্যতে শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনবন্টন, সামাজিক সুরক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা জালিয়াতির সুযোগ থাকবে না।
এদিকে অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রচার শুরু হয়েছে। পঞ্চায়েত অফিস, ব্লক অফিস, পোস্ট অফিস এবং স্কুলগুলিতে পোস্টার টাঙানো হচ্ছে। এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে জানানো হচ্ছে যে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের আধার তৈরির জন্য নির্দিষ্ট তারিখে সেন্টারে উপস্থিত হতে হবে। অনেক স্কুলে আবার বিশেষ নোটিশ দেওয়া হয়েছে যাতে অভিভাবকেরা নির্দিষ্ট সময়ে শিশুদের নিয়ে গিয়ে আধারের কাজ সারেন। কিছু স্কুলে দেখা গেছে, ক্লাস শিক্ষকরাই অভিভাবকদের ফোন করে আধার তৈরির সময়সীমা সম্পর্কে জানাচ্ছেন। কারণ, আধার নম্বর না থাকলে ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে অসুবিধা হবে।
শিশুদের আধার তৈরির এই নতুন উদ্যোগ ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাস যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু সন্দেহ-সংশয়ও দেখা যাচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, শিশুর বায়োমেট্রিক কি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে না? ইউআইডিএআই জানিয়েছে, বাচ্চাদের আঙুলের ছাপ ও আইরিস স্ক্যান বয়স বাড়ার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, তাই ১৫ বছর বয়সে বায়োমেট্রিক পুনর্নবীকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তখনই আধারের বায়োমেট্রিক চূড়ান্তভাবে স্থায়ী হবে। এর আগে ৫ বছর ও ১০ বছর বয়সে বায়োমেট্রিক আপডেট করার নিয়ম রাখা হয়েছে যাতে তথ্য সঠিক থাকে।
মানুষের আরেকটি প্রশ্ন ছিল—আধার করার জন্য কোনো ফি লাগবে কি? কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, শিশুদের আধার তৈরি ও আপডেট করা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। তবে যারা প্রিন্টেড কার্ড নিতে চান, তাঁদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট চার্জ নেওয়া হতে পারে। কিন্তু বেসিক এনরোলমেন্ট ও বায়োমেট্রিক আপডেটের ক্ষেত্রে কোনো খরচ নেই।
সমগ্র প্রকল্পটি সফল হলে জেলার প্রতিটি শিশুকে জাতীয় পরিচয়ভিত্তিক ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন পরিষেবা পৌঁছে যাবে প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে। সরকারের আশা, ভবিষ্যতে আধারভিত্তিক ডিজিটাল আইডেন্টিটি সিস্টেম আরও শক্তিশালী হবে এবং প্রতিটি নাগরিকের তথ্য সুরক্ষিত রাখতে একটি স্বচ্ছ ডিজিটাল স্ট্রাকচার তৈরি হবে।
মানুষের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট, এই নতুন উদ্যোগ সামাজিক ও প্রশাসনিক দু’দিকেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একদিকে নাগরিক সুবিধা সহজ হবে, অন্যদিকে সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতাও বাড়বে। শিশুদের আধার তৈরির এই প্রকল্প বীরভূমে কতটা সফল হবে তা সময় বলবে, তবে শুরু থেকেই যেভাবে মানুষ অংশ নিচ্ছেন, তা দেখে মনে হচ্ছে উদ্যোগটি দ্রুততম সময়ে তার লক্ষ্যপূরণ করবে।