Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

এখন আমার ‘মেনোপজ়’-এর সময়’! আবার স্বামী গোবিন্দকে নিয়ে কোন ক্ষোভ উগরে দিলেন সুনীতা?

সুনীতা নিজেই গোবিন্দের প্রেমজীবন নিয়ে নানা সময়ে নানা ইঙ্গিত করেছেন। এ বার সুনীতার গলায় উল্টো সুর। তিনি গোবিন্দকে ক্ষমা করতে রাজি। তবে রাখলেন একটি শর্ত।স্বামী গোবিন্দের আলোচিত প্রেমিকার নাম নাকি কোমল। এই নামটার প্রতি তাই ঘৃণা রয়েছে তাঁর, নিজেই জানিয়েছিলেন সুনীতা আহুজা। গত দেড় বছরে একাধিক বার গোবিন্দের পরকীয়ার গুঞ্জন শোনা গিয়েছে। সুনীতা নিজেই গোবিন্দের প্রেমজীবন নিয়ে নানা ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। এ বার সুনীতার গলায় উল্টো সুর। তিনি নাকি গোবিন্দকে ক্ষমা করতে রাজি। তাঁর কথায়, ‘‘আমার মেনোপজ়ের সময় চলছে। আমার এখন স্বামীকে প্রয়োজন।’’

স্বামীকে ঠিক কী কারণে প্রয়োজন, স্পষ্ট জানান সুনীতা। তাঁর কথায়, একসময়ে শ্বশুরবাড়ির ভয়ে দিন কাটিয়েছেন। এখন আর কাউকে ভয় পান না। সুনীতার দাবি, তিনি নিজের একটা পরিচিতি বানাতে সক্ষম হয়েছেন। বছরদেড়েক হল সুনীতা ভ্লগিং শুরু করেছেন। অল্প দিনের মধ্যেই রীতিমতো নাম করা নেটপ্রভাবী হয়ে উঠেছেন তিনি, জানিয়েছেন নিজেই। সুনীতার কথায়, ‘‘আমার ৪০ বছরের সম্পর্ক তো রাতারাতি এমন হয়ে যায়নি। যে কেউ এসে আমাকে ভেঙে দিয়ে চলে যেতে পারবে না। সকলে আমার সারল্যের সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু এখন বুকে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছি। একটা সময় ছিল, যখন শ্বশুরবাড়ির লোকের মুখের উপর কথা বলতে পারিনি। কারণ তাঁদের সম্মান করতাম। কিন্তু এখন এত বছর ধরে গোবিন্দের সঙ্গে আমি সংসার করছি। আর কেন ভয় পাব ওকে?’’

তবে গোবিন্দের বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ হোক বা শ্বশুরবাড়ির চাপ, সব কিছুর জন্য স্বামীকে ক্ষমা করে দিতে রাজি তিনি। সুনীতার কথায়, ‘‘গোবিন্দ যদি নিজেকে বদলে ফেলে, তা হলে ওকে ক্ষমা করতে রাজি। যতই হোক ছোটবেলার ভালবাসা আমার। এখন যে বয়সে এসে দাঁড়িয়েছি, তাতে এ সব চাপ নিতে পারছি না। তা ছাড়াও আমার রজঃনিবৃত্তির সময় চলছে, এখন স্বামীকে পাশে প্রয়োজন।’’

দাম্পত্য, আত্মপরিচয় ও মানসিক আশ্রয়: সুনীতার বক্তব্যের সামাজিক প্রেক্ষিত

সমাজে দাম্পত্য সম্পর্ক কেবল দু’জন মানুষের একত্রে বসবাসের চুক্তি নয়; এটি মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বহু স্তরের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক গভীর বন্ধন। এই বন্ধনের ভিত শক্ত হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, নির্ভরতা এবং দীর্ঘদিনের সহযাত্রার অভিজ্ঞতায়। সাম্প্রতিক সময়ে সুনীতার বক্তব্য সেই দাম্পত্য সম্পর্কেরই এক বাস্তব, স্পষ্ট এবং আবেগঘন দিককে সামনে এনেছে। তিনি স্বামীকে কেন প্রয়োজন—এই প্রশ্নের জবাবে যে অকপট স্বীকারোক্তি করেছেন, তা কেবল ব্যক্তিগত নয়; বরং আমাদের সমাজে বিবাহ, নারীর আত্মপরিচয়, শ্বশুরবাড়ির চাপ এবং বয়সজনিত মানসিক প্রয়োজন—সব কিছুকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

শ্বশুরবাড়ির ভয়ের দিনগুলি

সুনীতা জানিয়েছেন, জীবনের এক দীর্ঘ সময় তিনি শ্বশুরবাড়ির ভয়ে দিন কাটিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা ভারতীয় উপমহাদেশের বহু নারীর জীবনেই অচেনা নয়। বিয়ের পর নতুন পরিবারে মানিয়ে নেওয়া, সকলের মন জোগানো, নিজের মতামত চেপে রাখা—এসব যেন এক অদৃশ্য সামাজিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক নারীই সম্মানের জায়গা থেকে চুপ থাকেন, প্রতিবাদ না করে সহ্য করেন। সুনীতাও সেই পথেই হেঁটেছিলেন।

তিনি বলেছেন, একসময় শ্বশুরবাড়ির লোকের মুখের উপর কথা বলতে পারেননি, কারণ তিনি তাঁদের সম্মান করতেন। এই বক্তব্যে দ্বৈত বাস্তবতা আছে—একদিকে শ্রদ্ধা, অন্যদিকে ভয়। আমাদের সমাজে বহু ক্ষেত্রে শ্রদ্ধা আর ভয় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, ফলে নারীর নিজস্ব কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে।

৪০ বছরের সম্পর্ক: রাতারাতি ভাঙে না

সুনীতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য—“আমার ৪০ বছরের সম্পর্ক তো রাতারাতি এমন হয়ে যায়নি।” এই বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে দাম্পত্যের গভীরতা। চার দশকের সম্পর্ক মানে শুধু সুখের স্মৃতি নয়; তাতে আছে সংগ্রাম, সমঝোতা, ভুল বোঝাবুঝি, ক্ষমা এবং আবার নতুন করে শুরু করার সাহস।

দীর্ঘ সম্পর্কের একটি মনস্তাত্ত্বিক দিক হল—মানুষ অভ্যাসে পরিণত হয়। জীবনযাত্রা, সিদ্ধান্ত, আবেগ—সব কিছুর সঙ্গে সঙ্গী জড়িয়ে থাকে। তাই সম্পর্কে টানাপোড়েন এলেও তা সহজে ছিন্ন করা যায় না। সুনীতার বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে।

আত্মপরিচয়ের সন্ধান: ভ্লগিং থেকে নেটপ্রভাবী

সুনীতা জানিয়েছেন, বছরদেড়েক হল তিনি ভ্লগিং শুরু করেছেন এবং অল্প সময়েই পরিচিত নেটপ্রভাবী হয়ে উঠেছেন। এই অংশটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিন গৃহবন্দি বা পরিবারকেন্দ্রিক জীবনের পর অনেক নারীই যখন নিজের পরিচয় তৈরি করেন, তখন তাদের মানসিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আজ বহু নারীর আত্মপ্রকাশের জায়গা। রান্না, লাইফস্টাইল, পারিবারিক অভিজ্ঞতা—এসব শেয়ার করতে করতে তারা দর্শক, সমর্থন ও আর্থিক স্বাধীনতা—সবই পান। সুনীতার ক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তন ঘটেছে। তিনি এখন আর শুধু কারও স্ত্রী নন; তিনি নিজস্ব পরিচিতিসম্পন্ন একজন ব্যক্তি।

এই আত্মপরিচয়ই তাঁকে সাহস দিয়েছে বলতে—এখন আর কাউকে ভয় পান না।

সম্পর্কের ভাঙন ও মানসিক আঘাত

সুনীতা বলেছেন, “যে কেউ এসে আমাকে ভেঙে দিয়ে চলে যেতে পারবে না।” এই বক্তব্যে স্পষ্ট মানসিক আঘাতের ছাপ আছে। সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতির অভিযোগ হোক বা পারিবারিক চাপ—এসবই একজন মানুষের আত্মসম্মানকে আঘাত করে।

দাম্পত্যে বিশ্বাসভঙ্গ সবচেয়ে বড় ধাক্কা। এতে শুধু রাগ নয়, অপমান, একাকিত্ব, নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে জটিল মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। সুনীতা স্বীকার করেছেন, অনেকেই তাঁর সরলতার সুযোগ নিয়েছে। এই উপলব্ধি সাধারণত দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরই আসে।

বুকের পাথর চাপা দিয়ে বাঁচা

তিনি বলেছেন, এখন “বুকে পাথর চাপা দিয়ে” রেখেছেন। এই রূপক বাক্যটি দাম্পত্যে নীরব সহনশীলতার প্রতীক। অনেক নারীই সংসার টিকিয়ে রাখতে নিজের কষ্ট গোপন রাখেন। সমাজ, সন্তান, সম্পর্ক—সবকিছুর ভার বহন করতে গিয়ে নিজের অনুভূতিকে স্তব্ধ করে দেন।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে—এটি কি দুর্বলতা, নাকি শক্তি?

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, এটি একধরনের মানসিক সহনশীলতা (emotional endurance)। তবে দীর্ঘমেয়াদে তা মানসিক ক্লান্তি ডেকে আনে। সুনীতার বক্তব্যে সেই ক্লান্তির ছাপও রয়েছে।

স্বামীকে কেন প্রয়োজন?

সবচেয়ে আলোচিত অংশ—তিনি স্পষ্ট বলেছেন, এই বয়সে এসে স্বামীকে পাশে প্রয়োজন। এর পেছনে কয়েকটি স্তর রয়েছে:

১. মানসিক সঙ্গ

দীর্ঘ জীবনের সঙ্গীই মানুষের সবচেয়ে বড় আবেগীয় আশ্রয় হয়ে ওঠে। বন্ধু, আত্মীয় থাকলেও দাম্পত্য সঙ্গ আলাদা।

২. অভ্যাসগত নির্ভরতা

দৈনন্দিন জীবনযাত্রা—খাওয়া, কথা বলা, সিদ্ধান্ত—সব কিছুর সঙ্গে সঙ্গী জড়িয়ে থাকে।

৩. সামাজিক নিরাপত্তা

আমাদের সমাজে এখনও দাম্পত্য পরিচয় সামাজিক মর্যাদার অংশ।

৪. বয়সজনিত শারীরিক-মানসিক পরিবর্তন

সুনীতা নিজেই বলেছেন, তাঁর রজঃনিবৃত্তির সময় চলছে।

রজঃনিবৃত্তি ও সঙ্গীর ভূমিকা

রজঃনিবৃত্তি (Menopause) নারীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈব-মানসিক পর্যায়। এই সময়ে—

  • হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে

  • মুড সুইং হয়

  • উদ্বেগ বাড়ে

  • একাকিত্বের ভয় তৈরি হয়

  • শারীরিক অস্বস্তি দেখা দেয়

চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এই সময় সঙ্গীর মানসিক সমর্থন অত্যন্ত জরুরি। বোঝাপড়া, ধৈর্য, যত্ন—এসব নারীর মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

news image
আরও খবর

সুনীতার বক্তব্য তাই কেবল আবেগ নয়; এটি বাস্তব শারীরিক-মানসিক প্রয়োজনের স্বীকৃতি।

ক্ষমার মানসিকতা

সব অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি বলেছেন—স্বামী বদলে গেলে ক্ষমা করতে রাজি। এই ক্ষমার ইচ্ছা কয়েকটি দিক নির্দেশ করে:

  1. সম্পর্ক রক্ষার আকাঙ্ক্ষা

  2. পুরনো ভালোবাসার মূল্য

  3. একাকিত্বের ভয়

  4. সামাজিক স্থিতি বজায় রাখার মানসিকতা

তিনি বলেছেন—“ছোটবেলার ভালোবাসা।” অর্থাৎ সম্পর্কের শিকড় গভীরে প্রোথিত।

নারীর সহনশীলতা বনাম আত্মমর্যাদা

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্ন উঠে আসে—ক্ষমা কি আত্মমর্যাদার পরাজয়?

সব ক্ষেত্রে নয়। কখনও ক্ষমা মানে নতুন করে শুরু করার সুযোগ দেওয়া। তবে শর্ত—পরিবর্তন সত্যিই ঘটতে হবে। সুনীতাও সেই শর্তই রেখেছেন—স্বামী যদি নিজেকে বদলায়।

ভয় থেকে নির্ভীকতা

সুনীতার যাত্রাপথ লক্ষণীয়—

ভয় → সহনশীলতা → আত্মপরিচয় → স্পষ্ট উচ্চারণ

এটি আধুনিক ভারতীয় নারীর রূপান্তরের প্রতীক। আজকের নারী সম্মান করেন, কিন্তু অন্যায় মেনে নেন না। সংসার টিকিয়ে রাখতে চান, কিন্তু নিজের সত্তা বিসর্জন দিতে চান না।

ডিজিটাল যুগে নারীর কণ্ঠস্বর

ভ্লগিং তাঁকে শুধু পরিচিতি দেয়নি; দিয়েছে কণ্ঠস্বর। সোশ্যাল মিডিয়া অনেক নারীর জন্য থেরাপির মতো কাজ করে—

  • অভিজ্ঞতা ভাগ করা

  • সমর্থন পাওয়া

  • আর্থিক স্বাধীনতা

  • আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি

সুনীতার ক্ষেত্রেও তা ঘটেছে বলেই তিনি আজ প্রকাশ্যে নিজের কথা বলতে পারছেন।

দাম্পত্যের নতুন সংজ্ঞা

সুনীতার বক্তব্য থেকে আধুনিক দাম্পত্যের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট:

  • সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ

  • কিন্তু আত্মপরিচয়ও জরুরি

  • ক্ষমা আছে, কিন্তু শর্তসাপেক্ষ

  • নির্ভরতা আছে, কিন্তু ভয় নেই

সামাজিক প্রতিফলন

এই ঘটনা সমাজে তিনটি বড় আলোচনার দরজা খুলে দেয়:

  1. শ্বশুরবাড়ির ক্ষমতার কাঠামো

  2. দীর্ঘ দাম্পত্যে বিশ্বাসভঙ্গের প্রভাব

  3. বয়সজনিত মানসিক সঙ্গের প্রয়োজন

উপসংহার

সুনীতার বক্তব্য কোনও একক নারীর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া নয়; এটি বহু নারীর নীরব অভিজ্ঞতার ভাষা। তিনি স্বামীকে প্রয়োজন বলছেন দুর্বলতা থেকে নয়—বরং দীর্ঘ সহযাত্রা, মানসিক অভ্যাস, শারীরিক পরিবর্তন এবং সম্পর্কের ঐতিহাসিক গভীরতা থেকে।

তিনি যেমন ক্ষমা করতে প্রস্তুত, তেমনই নিজের পরিচয় নিয়েও দৃঢ়। ভয় পাওয়া গৃহবধূ থেকে আত্মবিশ্বাসী নেটপ্রভাবী—এই রূপান্তরই তাঁর আসল শক্তি।

দাম্পত্য এখানে কর্তৃত্বের নয়, সহযাত্রার।
ক্ষমা এখানে আত্মবিসর্জন নয়, পুনর্গঠনের সম্ভাবনা।
আর স্বামীকে প্রয়োজন—কারণ ভালোবাসা, অভ্যাস, স্মৃতি ও মানসিক আশ্রয়—সব মিলিয়ে জীবন একা বয়ে নেওয়া যায় না।

Preview image