মঙ্গলবার দুপুরে মমতা ও অভিষেক রেড রোডে অম্বেডকর মূর্তির সামনে থেকে মিছিল শুরু করেন। চোখে পড়ার মতো ভিড় জমে যায়। বিভিন্ন ধর্মের গুরু, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র তারকা, খেলোয়াড়রা সবাই পা মিলিয়েছেন মিছিলে। মিছিল শেষ হয় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সামনে।
মঙ্গলবার দুপুরে রেড রোড থেকে শুরু হওয়া মিছিলে তৃণমূল সভাপতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ছেলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ব্যাপক জনসমাগম লক্ষণীয় ছিল। অম্বেডকর মূর্তির সামনে থেকে মিছিল নেমে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সামনে মঞ্চস্থ হয়। বিভিন্ন ধর্মের গুরুবর্গ, টেলি–টলি তারকা ও খেলোয়াড়রা মিছিলে অংশ নেয়—এমন বৈচিত্র্যই ভিড়কে চোখে পড়ার মতো নিয়েছে। মোট কার্যক্রমের কারণে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বন্ধ ছিল এবং ওই এলাকায় জনজীবন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।
ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে তৃণমূলের অভিযোগকে কেন্দ্র করেই কর্মসূচিটি সংগঠিত করা হয়েছিল। মিছিলের পর ভাষণ দিতে নেমে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে ‘দিদি’ রূপেই উপস্থাপন করে জনগণকে আশ্বস্ত করেন: “দিদি এখনও আছে! ভয় পাবেন না। ওরা কারও নাম বাদ দিতে পারবে না।” তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে তৃণমূল থালাবাটি বিক্রি করে মানুষের সাহায্য করবে এবং যাদের নথি নেই, তাদের তৃণমূলের ক্যাম্পে পাঠাতে বলেছিলেন—ক্যাম্পের মাধ্যমে কর্মীরা সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করবেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চ থেকে জানান যে নেত্রীর অনুমতি নিয়েই তিনি বলছেন—সংগঠন এসআইআর প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে এবং প্রয়োজনে দিল্লি অভিযান চালাতে প্রস্তুত। অভিষেক দাবি করেন, দু’ মাসের মধ্যেই এসআইআর নিয়ে দিল্লি অভিযানে যাওয়া হবে; পাশাপাশি তিনি কিছু ক্ষেত্রে জেলা সফরের সম্ভাব্যতা উত্থাপন করেন, যদিও পুরো পরিকল্পনাটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। মঞ্চে গত সাত দিনে নিহত সাতজনের নাম সম্বলিত তোরণ রাখা ছিল, যা অনুষ্ঠানের আবেগীয় পরিবেশকে আরও তীব্র করেছে; সেই প্রসঙ্গে অভিষেক ‘এসআইআর আতঙ্কে মৃত’দের ‘শহিদ’ বলে অভিহিত করেন।
মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দলের বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনকেও আক্রমণের টান অনুভূত হয়েছিল। মমতা প্রশ্ন তোলেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকা কেন সূচক হিসেবে নেওয়া হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট তালিকা কতটা নির্ভুল—এ সব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে কিছু অঞ্চলে ২০০৩ সালের তালিকাকেও সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে; এর বিপরীতে কমিশনের বক্তব্য ছিল, ২০০২ সালের তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের আলাদা করে নথি জমা দিতে হবে না। মমতার ভাষায়: “বুথ থেকে কোর্ট, কোর্ট থেকে রাস্তা—সর্বত্র লড়াই হবে। মানুষের নাম কেটে ওরা আমাদের হারাতে পারবে না।” একইসঙ্গে মমতা ও অভিষেক উভয়েই নির্বাচনী ও রাজনৈতিক বিরোধী বাহিনী—বিশেষত বিজেপি ও কমিশনের—নীতিগুলিকে সমালোচনা করেছেন এবং নাম না নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদেরও আক্রমণ করেছেন।
সভায় বিশেষভাবে মতুয়া সম্প্রদায়ের উপস্থিতি এবং তাদের কণ্ঠস্বরও লক্ষণীয় ছিল। মমতা দাবি করেন, মতুয়া সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু দুর্বলতা ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে—তারা যে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি; ফলে তারা বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অভিষেকও মঞ্চ থেকে মতুয়ার প্রতি একাধিকবার সতর্কবার্তা দেন এবং রাজনৈতিক ফাঁদে পা না দেওয়ার অনুরোধ করেন।
আহত ও মৃতদের স্মরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে সভা শেষ হয়। রাজনৈতিক আঙিনায় এসআইআর–কে কেন্দ্র করে তৃণমূলের এই তপ্ত প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে আরও কড়া কর্মসূচি ও অভিযোগ-যুদ্ধের সূচনা করতে পারে—এমন ইঙ্গিত সমাবেশ থেকেই স্পষ্ট।