Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ফুচকার লোভেই বিপদ! প্রিয় এই স্ট্রিট ফুড থেকেই কি লিভার ফেল করার আশঙ্কা?

শিশুদের ফুচকার প্রতি আকর্ষণ থাকলেও এই স্ট্রিট ফুডে লুকিয়ে আছে সংক্রমণের বড় ঝুঁকি। চিকিৎসকদের মতে, নোংরা জল, খোলা পরিবেশে রাখা উপকরণ ও অতিরিক্ত ঝাল শিশুর লিভার ও পেটের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে সম্পূর্ণ বন্ধ না করে পরিষ্কার জায়গা থেকে খাওয়া, কম ঝাল বেছে নেওয়া, জল ও আলু সেদ্ধ করা কি না নিশ্চিত করা এবং খাওয়ার পর হাত মুখ ভালোভাবে ধোয়ার মতো সতর্কতা মানলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

কোথাও ফুচকা, কোথাও গোলগাপ্পা, কোথাও আবার পানিপুরি—নাম আলাদা হলেও স্বাদে এক। টক, ঝাল, মুচমুচে এই স্ট্রিট ফুড গোটা দেশের মানুষের কাছেই অত্যন্ত প্রিয়। স্কুল ফেরত শিশু থেকে শুরু করে কলেজ পড়ুয়া, অফিসযাত্রী কিংবা মধ্যবয়সী—সব বয়সের মানুষের কাছেই ফুচকা এক অনিবার্য লোভ। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে একের পর এক ফুচকা খাওয়ার আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্মৃতি, অভ্যাস আর আবেগ। কিন্তু এই প্রিয় খাবারের আড়ালেই যে লুকিয়ে থাকতে পারে মারাত্মক রোগের ঝুঁকি, সে বিষয়ে অনেকেই সচেতন নন।

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিয়োর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেছেন এমস প্রশিক্ষিত গুরুগ্রাম নিবাসী স্নায়ুরোগ চিকিৎসক প্রিয়ঙ্কা শেরাওয়াত। ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত ওই ভিডিয়োয় তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন—ফুচকা বা পানিপুরির মতো রাস্তার খাবার খাওয়ার আগে দ্বিতীয় বার ভাবা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই খাবার আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

ফুচকার সঙ্গে কী ভাবে জড়িয়ে পড়ে রোগের ঝুঁকি?

চিকিৎসক প্রিয়ঙ্কা শেরাওয়াতের মতে, ফুচকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এতে ব্যবহৃত জল। রাস্তার ধারে তৈরি হওয়া ফুচকার জল অনেক ক্ষেত্রেই পরিষ্কার বা পরিশ্রুত হয় না। সেই জল তৈরি হয় কলের অপরিশোধিত জল, ট্যাঙ্কের জল বা দীর্ঘ সময় খোলা পাত্রে রাখা জল দিয়ে। এর ফলে সেই জলে সহজেই ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস ও নানা ধরনের ক্ষতিকারক জীবাণু জন্মাতে পারে।

এই জীবাণুগুলির মধ্যেই থাকতে পারে হেপাটাইটিস এ-এর মতো মারাত্মক ভাইরাস। এই ভাইরাস মূলত সংক্রমিত জল ও খাবারের মাধ্যমেই শরীরে প্রবেশ করে। একবার শরীরে ঢুকলে এটি অন্ত্রের মাধ্যমে লিভারে আঘাত হানে। প্রথম দিকে বিষয়টি খুব একটা গুরুতর মনে না হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা জন্ডিস, লিভারের প্রদাহ এবং গুরুতর ক্ষেত্রে লিভার ফেলিওরের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

শিশুদের জন্য কেন বেশি বিপজ্জনক?

শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কম। ফলে সংক্রমিত খাবার বা জল থেকে তারা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, ফুচকার মতো খোলা পরিবেশে তৈরি খাবার শিশুদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্ট্রিট ফুডের তালিকায় পড়ে।

শিশুরা সাধারণত বেশি ঝাল, টক বা মশলাদার খাবার পছন্দ করে। কিন্তু অতিরিক্ত ঝাল ও টক শিশুর পেটের উপর চাপ ফেলে। তার সঙ্গে যদি সংক্রমিত জল বা বাসি আলু-ছোলার পুর মেশে, তাহলে পেট খারাপ, বমি, জ্বর তো বটেই—ধীরে ধীরে লিভার সংক্রান্ত জটিলতাও তৈরি হতে পারে। চিকিৎসক প্রিয়ঙ্কা শেরাওয়াতের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, জন্ডিস থেকে লিভার ফেল পর্যন্ত পরিস্থিতি গড়াতে পারে, বিশেষ করে যদি সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়া হয়।

হেপাটাইটিস এ কী এবং কেন ভয়ংকর?

হেপাটাইটিস এ মূলত একটি ভাইরাল সংক্রমণ, যা দূষিত জল ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি সরাসরি লিভারকে আক্রমণ করে। এই রোগে আক্রান্ত হলে শরীরে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়, যা অনেক সময় প্রথমে সাধারণ জ্বর বা পেটের সমস্যা বলে মনে হয়। ফলে রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়ে যায়।

চিকিৎসকদের মতে, হেপাটাইটিস এ সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যেতে পারে, তবে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যাদের আগে থেকেই লিভারের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি। গুরুতর সংক্রমণে লিভার সম্পূর্ণ কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।

কোন কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন?

চিকিৎসক প্রিয়ঙ্কা শেরাওয়াত জানিয়েছেন, কিছু লক্ষণ দেখা দিলেই অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে—

পেট খারাপ বা দীর্ঘদিন ধরে ডায়রিয়া,
জ্বর এবং শরীর ব্যথা,
চোখের সাদা অংশ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া,
প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হলুদ বা বাদামি হয়ে যাওয়া,
খাওয়ায় অরুচি ও অতিরিক্ত ক্লান্তি।

এই লক্ষণগুলি জন্ডিস বা হেপাটাইটিসের ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এমন কিছু দেখা গেলে দেরি না করে রক্তপরীক্ষা ও চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত জরুরি।

news image
আরও খবর

ফুচকা খেতে হলে কী কী সতর্কতা মানবেন?

চিকিৎসকদের একটাই পরামর্শ—যতটা সম্ভব রাস্তার ফুচকা এড়িয়ে চলুন। তবে যদি একেবারে না খাওয়াই সম্ভব না হয়, তাহলে কিছু সতর্কতা মানলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।

প্রথমত, বাড়িতে তৈরি ফুচকাই সবচেয়ে নিরাপদ। পরিষ্কার ও ফিল্টার করা জল ব্যবহার করে ফুচকার জল বানানো উচিত। আলু, ছোলা বা পুর ভালভাবে সেদ্ধ করা এবং খোলা জায়গায় বেশি সময় না রাখা প্রয়োজন। হাত ধুয়ে, পরিষ্কার বাসন ব্যবহার করে খাবার তৈরি করলে সংক্রমণের আশঙ্কা অনেকটাই কমে।

দ্বিতীয়ত, শিশুদের ক্ষেত্রে বাইরে ফুচকা খাওয়ানোর অভ্যাস এড়ানোই ভালো। যদি কখনও খেতেই হয়, তাহলে কম ঝাল ও কম টক বেছে নেওয়া উচিত এবং খাওয়ার পর ভালোভাবে হাত-মুখ ধোয়া বাধ্যতামূলক।

তৃতীয়ত, যে জায়গা থেকে খাবার কিনছেন, সেখানে পরিচ্ছন্নতা কেমন, জল কোথা থেকে নেওয়া হচ্ছে, বিক্রেতা হাত ধুচ্ছেন কি না—এই বিষয়গুলির দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ

স্ট্রিট ফুড ভারতের খাদ্যসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফুচকা, চাট, ঝালমুড়ি কিংবা পকোড়া—এই খাবারগুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশবের স্মৃতি, বন্ধুদের আড্ডা আর শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে খাওয়ার আনন্দ। তবে সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনযাত্রার ধরনও। আজকের দিনে শুধু স্বাদের কথা ভাবলেই চলবে না, তার সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিতে হবে স্বাস্থ্য সচেতনতার দিকটিকেও। কারণ সামান্য অসতর্কতাই ভবিষ্যতে বড় শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এই প্রসঙ্গেই সম্প্রতি সকলকে সতর্ক করেছেন এমস প্রশিক্ষিত গুরুগ্রাম নিবাসী স্নায়ুরোগ চিকিৎসক প্রিয়ঙ্কা শেরাওয়াত। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—স্ট্রিট ফুড একেবারে নিষিদ্ধ করার কথা তিনি বলছেন না, কিন্তু তা খাওয়ার আগে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাঁর সতর্কবার্তার মূল উদ্দেশ্য ভয় দেখানো নয়, বরং মানুষকে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করা।

আধুনিক জীবনে আমরা প্রায়শই ব্যস্ততার চাপে স্বাস্থ্যবিধির দিকে নজর দিতে ভুলে যাই। রাস্তার ধারের খাবার অনেক সময়ই তৈরি হয় অপরিষ্কার পরিবেশে, সংক্রমিত জল ও খোলা উপকরণ ব্যবহার করে। এই সবের ফলেই শরীরে ঢুকে পড়তে পারে নানা ধরনের ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাস। প্রথমে সামান্য পেটের সমস্যা বা জ্বর মনে হলেও, পরে তা জন্ডিস বা লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই জায়গাতেই সচেতনতার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কোথা থেকে খাবার খাচ্ছেন, কী ধরনের জল ব্যবহার করা হচ্ছে, বিক্রেতা স্বাস্থ্যবিধি মানছেন কি না—এই ছোট ছোট বিষয়গুলিই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, একটু সাবধান হলেই সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় এমন অসুখ, যা পরে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন তৈরি করে।

বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় সংক্রমিত খাবার তাদের শরীরে দ্রুত প্রভাব ফেলে। স্বাদের লোভে তারা প্রায়ই বেশি ঝাল বা টক খাবার খেতে চায়, কিন্তু সেটাই ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই অভিভাবকদের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। শিশুরা কী খাচ্ছে, কোথা থেকে খাচ্ছে—এই বিষয়গুলির উপর নজর রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের মতে, সম্পূর্ণভাবে স্ট্রিট ফুড বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে বাড়িতে পরিষ্কার জল ও স্বাস্থ্যকর উপকরণ ব্যবহার করে ফুচকা বা চাট বানিয়ে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন স্বাদ বজায় থাকে, অন্যদিকে তেমনই স্বাস্থ্যঝুঁকিও অনেকটাই কমে।

সবশেষে বলা যায়, সচেতনতা বাড়ানোই আসল প্রতিরোধ। একটু সচেতন সিদ্ধান্ত, একটু সাবধানতা—এই দুই-ই বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আজই যদি আমরা সচেতন হই, তাহলে আগামী দিনে অনেক বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি সহজেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

Preview image