শুক্রবার দুপুর ১টা ২২ মিনিট নাগাদ কেঁপে ওঠে কলকাতা। শহরের পাশাপাশি রাজ্যের একাধিক জেলাতেও কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলা, যা টাকি থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
শুক্রবার দুপুর ১টা ২২ মিনিট নাগাদ কেঁপে ওঠে কলকাতা। শহরের পাশাপাশি রাজ্যের একাধিক জেলাতেও কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলা, যা কলকাতা থেকে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। পশ্চিমবঙ্গের টাকি থেকে ভূকম্পের উৎসস্থলের দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার।
ভূমিকম্পের জেরে মধ্য কলকাতায় একটি বহুতল হেলে গিয়েছে বলে দাবি করেন স্থানীয়দের একাংশ। খবর পেয়ে গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ লাগোয়া ৩৪এ মেটকাফ স্ট্রিটের ওই বহুতলের সামনে পৌঁছে যায় দমকলের একাধিক ইঞ্জিন। নিরাপত্তার খাতিরে এলাকা ঘিরে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়।
তবে বহুতলের বাসিন্দা এবং স্থানীয়দের অন্য একটি অংশের দাবি, বাড়িটি দীর্ঘ দিন ধরেই একই অবস্থায় রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, ভূমিকম্পের কারণে নতুন করে হেলে পড়ার ঘটনা ঘটেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় জল্পনা তৈরি হলেও প্রশাসনিক সূত্রে বড়সড় ক্ষয়ক্ষতির কোনও নিশ্চিত খবর মেলেনি।
মার্কিন ভূকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা United States Geological Survey (USGS)–এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৩ এবং উৎপত্তিস্থল মাটি থেকে প্রায় ৯.৮ কিলোমিটার গভীরে।
অন্যদিকে, ভারতের National Center for Seismology জানিয়েছে, কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৫। দুই সংস্থার পরিমাপে সামান্য তারতম্য থাকলেও, কম্পন মাঝারি মাত্রার বলেই বিশেষজ্ঞদের মত।
হঠাৎ কম্পনে বহু মানুষ বাড়ি ও অফিস থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। বহুতল আবাসন ও বাণিজ্যিক ভবনগুলিতে কিছুক্ষণের জন্য আতঙ্ক ছড়ালেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি। দমকল ও প্রশাসনের তরফে পরিস্থিতি নজরে রাখা হয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত না হয়ে খোলা জায়গায় চলে যাওয়া, লিফট ব্যবহার না করা এবং ভবনের কাঠামোগত ক্ষতি চোখে পড়লে দ্রুত প্রশাসনকে জানানো উচিত।
অন্যদিকে, ভারতের National Center for Seismology জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৫। মার্কিন সংস্থা USGS–এর পরিমাপের সঙ্গে সামান্য পার্থক্য থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫.৩ থেকে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্পকে সাধারণত মাঝারি মাত্রার কম্পন হিসেবে ধরা হয়। এই ধরনের ভূমিকম্পে সুসংহত ও নিয়ম মেনে নির্মিত ভবনে বড় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে, তবে পুরনো বা কাঠামোগত ভাবে দুর্বল ভবনে ফাটল বা আংশিক ক্ষতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। উৎপত্তিস্থল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে হওয়ায় কম্পন তুলনামূলক ভাবে বিস্তৃত এলাকায় অনুভূত হয়েছে বলে মত ভূকম্প বিশেষজ্ঞদের।
হঠাৎ কম্পনে বহু মানুষ বাড়ি, অফিস, দোকানপাট ও বহুতল আবাসন থেকে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন। অনেক জায়গায় কয়েক সেকেন্ড ধরে জানলা, দরজা, আলমারি ও ঝুলন্ত বস্তু কাঁপতে দেখা যায়। বহুতল আবাসন ও বাণিজ্যিক ভবনগুলিতে সাময়িক আতঙ্ক ছড়ালেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি। দমকল ও স্থানীয় প্রশাসনের তরফে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজখবর নেওয়া হয় এবং পরিস্থিতির উপর নজরদারি চালানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ভূমিকম্পের সময় আতঙ্ক ছড়ানোই সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হতে পারে। হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি থাকে। তাই শান্ত থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই শ্রেয়। যাঁরা বহুতলে থাকেন, তাঁদের জন্য ‘ড্রপ, কাভার, অ্যান্ড হোল্ড’ পদ্ধতি কার্যকর—অর্থাৎ মজবুত টেবিল বা আসবাবের নীচে আশ্রয় নেওয়া, মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখা এবং কম্পন থামা পর্যন্ত সেখানেই থাকা।
লিফট ব্যবহার এড়িয়ে চলুন — ভূমিকম্পের সময় বা ঠিক পরে লিফট ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি থাকে।
খোলা জায়গায় যান — সম্ভব হলে ভবন, বিদ্যুতের খুঁটি, গাছ বা সাইনবোর্ড থেকে দূরে খোলা স্থানে দাঁড়ান।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ পরীক্ষা করুন — কম্পনের পর বাড়িতে গ্যাস লিক বা বৈদ্যুতিক তারের ক্ষতি হয়েছে কি না খতিয়ে দেখা জরুরি।
ফাটল বা কাঠামোগত ক্ষতি দেখলে জানান — দেওয়াল, স্তম্ভ বা বিমে বড় ফাটল চোখে পড়লে দ্রুত পুরসভা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত।
আফটারশকের সম্ভাবনা মাথায় রাখুন — মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের পর ছোটখাটো কম্পন অনুভূত হতে পারে। তাই কিছু সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন, ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তিতে ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা ব্যবহার করলে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা অনেকটাই কমানো যায়। পুরনো ভবনের ক্ষেত্রে নিয়মিত কাঠামোগত নিরীক্ষা (structural audit) করানো প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, শুক্রবারের কম্পনে আতঙ্ক ছড়ালেও বড় বিপর্যয়ের খবর নেই। প্রশাসন পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং নাগরিকদের সচেতন ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে।
যদি কম্পন চলাকালীন বাইরে বেরোনোর সুযোগ না থাকে, তবে মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নীচে আশ্রয় নিন, মাথা ও ঘাড় হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন এবং আসবাব শক্ত করে ধরে থাকুন। জানলা, কাচ, ভারী আলমারি বা ঝুলন্ত বস্তুর কাছ থেকে দূরে থাকুন।
কম্পন থামার পর যত দ্রুত সম্ভব খোলা জায়গায় চলে যান। ভবন, বারান্দা, বিদ্যুতের খুঁটি, গাছ, সাইনবোর্ড বা উঁচু প্রাচীর থেকে দূরে দাঁড়ান। এগুলি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
বাড়িতে ফিরে প্রথমেই গ্যাস লিকের গন্ধ আছে কি না দেখুন। সন্দেহ হলে গ্যাসের রেগুলেটর বন্ধ করুন এবং আগুন বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার করবেন না। বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেলে বা স্পার্কিং দেখা দিলে মেইন সুইচ বন্ধ করে ইলেকট্রিশিয়ানের সাহায্য নিন।
দেওয়াল, স্তম্ভ, বিম, সিঁড়ি বা ছাদে বড় ফাটল দেখা গেলে তা হালকাভাবে নেবেন না। দরজা-জানলা হঠাৎ আটকে গেলে বা মেঝে কাত হয়ে গেলে সেটিও কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। দ্রুত পুরসভা বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে জানান এবং প্রয়োজনে ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ নিন।
মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের পর ছোটখাটো কম্পন বা ‘আফটারশক’ অনুভূত হতে পারে। প্রথম কম্পনের পরে অন্তত কয়েক ঘণ্টা সতর্ক থাকুন। বারবার ভবনে ঢোকা-বেরোনো এড়িয়ে চলুন যতক্ষণ না পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হচ্ছে।
পরিবারে বয়স্ক, শিশু, গর্ভবতী মহিলা বা অসুস্থ কেউ থাকলে তাঁদের আগে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিন। আতঙ্ক কমাতে শান্তভাবে কথা বলুন।
ভূমিকম্পের পরে সামাজিক মাধ্যমে নানা গুজব ছড়াতে পারে। অযাচিত তথ্য শেয়ার না করে প্রশাসন বা সরকারি সংস্থার নির্দেশিকা অনুসরণ করুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিল্ডিং কোড মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক প্রকৌশল ব্যবস্থায় ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা (earthquake-resistant design) ব্যবহার করলে ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা অনেকটাই বাড়ে।
নতুন ভবন তৈরির সময় মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা উচিত।
অনুমোদিত নকশা ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারের তত্ত্বাবধানে কাজ করা জরুরি।
পুরনো ভবনের ক্ষেত্রে নিয়মিত ‘স্ট্রাকচারাল অডিট’ বা কাঠামোগত নিরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
বড় ফাটল, স্যাঁতসেঁতে হয়ে লোহার রডে মরচে ধরা বা ভিত্তির বসে যাওয়া—এই ধরনের লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়।
শহরাঞ্চলে ঘনবসতি ও বহুতল বাড়ির সংখ্যা বেশি হওয়ায় সচেতনতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্রশাসনের উপর নির্ভর না করে নাগরিকদেরও নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
শুক্রবারের কম্পনে সাময়িক আতঙ্ক ছড়ালেও বড় ধরনের বিপর্যয়ের খবর মেলেনি। দমকল ও প্রশাসন পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, সচেতনতা, সঠিক প্রস্তুতি এবং নিয়ম মেনে নির্মাণই ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি কমানোর প্রধান উপায়।অতএব, আতঙ্ক নয়—সতর্কতাই হোক প্রধান অস্ত্র।