কান্না ও হাসির সূক্ষ্ম সমন্বয় শিশুমস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশেরই অংশ। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নবজাতকের কান্না তার শ্বাসপ্রশ্বাস শুরু হওয়া, স্নায়ুর সক্রিয়তা এবং বাইরের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার প্রথম সংকেত। এই কান্নার নেপথ্যে রয়েছে শারীরিক ও মানসিক নানা গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
শিশু জন্মেই কেঁদে ওঠে এই দৃশ্যের সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। একরত্তির কান্নার শব্দ কানে এলেই যেন এক অদ্ভুত স্বস্তি নেমে আসে চিকিৎসক থেকে শুরু করে পরিবারের সকলের মুখে। অনেকের চোখে জল, অনেকের মুখে হাসি কিন্তু এই কান্না আসলে শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর ও জটিল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। পৃথিবীর আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই নবজাতক কেন কাঁদে, অথচ জন্মেই কেন কখনও হাসে না এই প্রশ্ন বহু মা-বাবার মনেই আসে। অনেক সময় শিশুর অতিরিক্ত কান্নায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন অভিভাবকেরা। মনে হয়, কোথাও কোনও সমস্যা হল না তো?
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই কান্না কোনও সমস্যার লক্ষণ নয়, বরং সুস্থতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
মাতৃগর্ভে শিশুর বেড়ে ওঠা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে ঘটে। গর্ভের ভিতরে শিশুর চারপাশে থাকে ‘অ্যামনিয়োটিক ফ্লুইড’। এই তরল শিশুর শরীরের জন্য একপ্রকার সুরক্ষাকবচ। এই তরলের মধ্যেই শিশুর ফুসফুস, পেশি, হাড়, ত্বক এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। এই তরল শিশুকে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং পরোক্ষভাবে শ্বাসপ্রশ্বাসের কাজেও সাহায্য করে।
কিন্তু জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি বদলে যায়। মাতৃগর্ভের উষ্ণ, তরলপূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ থেকে হঠাৎ করেই শিশুকে চলে আসতে হয় ঠান্ডা, আলো-হাওয়ায় ভরা এক সম্পূর্ণ নতুন জগতে। এই আকস্মিক পরিবর্তনই শিশুর শরীর ও মস্তিষ্কে একাধিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। সেই প্রতিক্রিয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ হল কান্না।
শুনতে অবাক লাগলেও, জন্মের পর শিশুর প্রথম কান্নার অর্থ হল তার নিজের শ্বাস নেওয়ার সূচনা। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন শিশুর ফুসফুসে জমে থাকে অ্যামনিয়োটিক ফ্লুইড। জন্মের পর এই তরল ফুসফুস থেকে বের হওয়া অত্যন্ত জরুরি। শিশু যখন জোরে কাঁদে, তখন ফুসফুসে জমে থাকা এই তরল ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়।
এই সময়ই প্রথমবার বাইরের অক্সিজেনসমৃদ্ধ বাতাস শিশুর ফুসফুসে প্রবেশ করে। ফুসফুসের ছোট ছোট বায়ুথলি বা অ্যালভিওলাই খুলে যেতে শুরু করে। এই প্রসারণ প্রক্রিয়ায় সামান্য অস্বস্তি হয়, যা কান্নার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাই বলা যায়, কান্না আসলে শিশুর জীবনের প্রথম শ্বাস।
জন্মের পরপরই শিশুর শরীরে রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন ঘটে। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন শিশুর রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা মায়ের শরীরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সেই যোগসূত্র ছিন্ন হয়। নিজের শরীরের ভেতরেই রক্ত চলাচলের নতুন ছন্দ তৈরি করতে হয় শিশুকে।
এই সময় কান্না শিশুর হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জোরে কাঁদলে বুকের পেশি সক্রিয় হয়, হৃদপিণ্ড দ্রুত ও নিয়মিতভাবে রক্ত পাম্প করতে শুরু করে। ফলে মস্তিষ্কসহ শরীরের প্রতিটি অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছয়।
শিশুর কান্নার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল পাচনতন্ত্রকে সক্রিয় করা। জন্মের পর শিশুকে প্রথমবার মায়ের দুধ খেতে হয়। কিন্তু তার আগে পাকস্থলী, অন্ত্র এবং হজম প্রক্রিয়াকে প্রস্তুত হতে হয়। কান্নার সময় শরীরের বিভিন্ন স্নায়ু উত্তেজিত হয়, যা পাচনতন্ত্রকে সক্রিয় করে তোলে। এর ফলে শিশুর ক্ষুধাবোধ তৈরি হয় এবং সে স্তন্যপানের জন্য প্রস্তুত হয়।
শিশু জন্মেই কেন কাঁদে, অথচ হাসি কেন আসে অনেক পরে এর উত্তর লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কের গঠনে।
মানুষের মস্তিষ্ক একসঙ্গে পুরোপুরি বিকশিত হয় না। নবজাতকের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কিছু অংশ জন্মের সময়ই তুলনামূলকভাবে সক্রিয় থাকে, আবার কিছু অংশ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়।
কান্না নিয়ন্ত্রণ করে মূলত মস্তিষ্কের নিচের অংশ যেমন ব্রেনস্টেম এবং অ্যামিগডালা। এই অংশগুলি জন্মের সময়ই কার্যকর থাকে, কারণ এগুলি জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি কাজের সঙ্গে যুক্ত। শ্বাসপ্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন, প্রতিক্রিয়াশীল আবেগ সবই এই অংশগুলির নিয়ন্ত্রণে।
ফলে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই কান্না প্রকাশ পায় স্বাভাবিকভাবেই।
হাসি, বিশেষ করে সামাজিক হাসি, নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের উপরের অংশ সেরিব্রাল কর্টেক্স এবং মোটর কর্টেক্স। এই অংশগুলি শিশুর জন্মের সময় সম্পূর্ণ বিকশিত থাকে না। ধীরে ধীরে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, মুখচেনা, শব্দের প্রতিক্রিয়া এই সবের মধ্য দিয়ে এই অংশগুলির বিকাশ ঘটে।
সাধারণত জন্মের ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর শিশু প্রথম সামাজিক হাসি দেয়। এর আগে ঘুমের মধ্যে শিশুর মুখে যে হাসির আভাস দেখা যায়, তাকে বলা হয় ‘রিফ্লেক্স স্মাইল’। এটি আসলে পেশির স্বাভাবিক সংকোচন ও প্রসারণের ফল, এর সঙ্গে আবেগের কোনও সম্পর্ক নেই।
কিন্তু যখন শিশু বাবা-মা বা পরিচিত মুখ দেখে হেসে ওঠে, সেটিই প্রকৃত অর্থে সামাজিক হাসি। এটি মস্তিষ্কের উন্নত বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন।
শিশু জন্মেই কাঁদবে এই প্রত্যাশা নিয়েই প্রসূতি কক্ষের বাইরে অপেক্ষা করেন বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন এবং চিকিৎসকেরা। সেই কান্নার শব্দ যেন জীবনের প্রথম ঘোষণা। তাই জন্মের পর যদি শিশুর কান্না না শোনা যায়, তখনই পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নেয়। চিকিৎসকদের চোখেমুখে ভেসে ওঠে উদ্বেগ, দ্রুত শুরু হয় জরুরি পরীক্ষা ও চিকিৎসা। কারণ, জন্মের মুহূর্তে কান্নার অনুপস্থিতি কোনও সাধারণ বিষয় নয় এটি হতে পারে মারাত্মক শারীরিক ও স্নায়বিক সমস্যার প্রথম লক্ষণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, জন্মের পর শিশু না কাঁদার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় ‘পেরিনাটাল অ্যাসফিক্সিয়া’। এই অবস্থায় শিশুর শরীর, বিশেষ করে মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছয় না। অক্সিজেনের অভাবই মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিগুলির একটি আর নবজাতকের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেশি।
‘পেরিনাটাল’ বলতে বোঝায় জন্মের আগে, জন্মের সময় বা জন্মের ঠিক পরবর্তী সময়কাল। আর ‘অ্যাসফিক্সিয়া’ মানে অক্সিজেনের অভাব। অর্থাৎ, জন্মকালীন বা তার আশপাশের সময়ে শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছনোই হল পেরিনাটাল অ্যাসফিক্সিয়া।
এই অবস্থার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। যেমন
প্রসবের সময় দীর্ঘক্ষণ ধরে জটিলতা হওয়া
নাড়ি গলায় পেঁচিয়ে যাওয়া
মায়ের রক্তচাপ খুব বেশি বা খুব কম থাকা
প্ল্যাসেন্টার সমস্যা
প্রসবকালীন সংক্রমণ
অত্যধিক রক্তক্ষরণ
এই সব পরিস্থিতিতে শিশুর শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয়। ফলস্বরূপ, জন্মের পর সে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারে না এবং কাঁদতেও পারে না।
অক্সিজেন মানবদেহের প্রতিটি কোষের জন্য অপরিহার্য। নবজাতকের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক অক্সিজেনের উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। জন্মের পর যদি কয়েক মিনিটের জন্যও মস্তিষ্কে অক্সিজেন না পৌঁছয়, তবে তার প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।
প্রথমেই দেখা দিতে পারে
শ্বাসকষ্ট
নীলচে ত্বক (বিশেষ করে ঠোঁট ও নখ)
অচেতনতা
খিঁচুনি
দুর্বল হৃদস্পন্দন
এই অবস্থায় শিশুকে অবিলম্বে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (NICU) নিয়ে গিয়ে অক্সিজেন, ভেন্টিলেশন এবং অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দিতে হয়।
যদি অক্সিজেনের অভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে শিশুর মস্তিষ্কে তৈরি হতে পারে এক ভয়াবহ অবস্থা হাইপক্সিক-ইস্কেমিক এনসেফেলোপ্যাথি
এই রোগে মস্তিষ্কের কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। সমস্যাটি আরও ভয়ঙ্কর কারণ, এর প্রভাব অনেক সময় জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না। কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর ধীরে ধীরে লক্ষণ প্রকাশ পায়।
HIE-এর ফলে শিশুর ভবিষ্যতে যে সমস্যাগুলি দেখা দিতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে
সেরিব্রাল পলসি
মৃগী বা খিঁচুনির রোগ
কথা বলতে দেরি হওয়া বা একেবারেই না পারা
দৃষ্টি বা শ্রবণশক্তি হ্রাস
শেখার অক্ষমতা
মানসিক প্রতিবন্ধকতা
এই কারণেই চিকিৎসকেরা জন্মের মুহূর্তে শিশুর কান্নাকে শুধুমাত্র আবেগের প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোলজিক্যাল সাইন হিসেবে দেখেন।
শিশুর কান্না মানে
তার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়েছে
ফুসফুস কার্যকরভাবে কাজ করছে
হৃদস্পন্দন ও রক্তসঞ্চালন সচল
মস্তিষ্কের ব্রেনস্টেম সক্রিয়
অর্থাৎ, কান্না হল শিশুর শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম একসঙ্গে কাজ করার প্রমাণ। তাই জন্মের পরপর যদি শিশুর কান্না শোনা যায়, চিকিৎসকেরা খানিকটা নিশ্চিন্ত হন।
শিশুর কান্না নতুন মা-বাবার কাছে অনেক সময় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে এই উদ্বেগ আরও বেশি। অনেকেই ভাবেন “শিশু এত কাঁদছে কেন? কোনও ব্যথা হচ্ছে না তো? আমরা ঠিকমতো দেখভাল করতে পারছি তো?”
চিকিৎসকেরা বলছেন, জন্মের পরপর শিশুর কান্না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। এটি শিশুর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
তবে কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া জরুরি। যেমন—
কান্না খুব বেশি সময় ধরে চললে
কান্নার স্বর খুব দুর্বল বা অস্বাভাবিক হলে
শিশু খেতে না চাইলে
শ্বাস নিতে কষ্ট হলে
বারবার খিঁচুনি হলে
শরীর নীলচে হয়ে গেলে
এই লক্ষণগুলির কোনওটি দেখা গেলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
চিকিৎসকেরা শুধু কান্না হচ্ছে কি না, সেটাই দেখেন না—কান্নার ধরনও তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
জোরে, পরিষ্কার কান্না সাধারণত সুস্থতার লক্ষণ
খুব ক্ষীণ বা করুণ কান্না স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে
একটানা উচ্চস্বরে কান্না ব্যথা বা সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে
অভিভাবকদের উচিত ধীরে ধীরে এই পার্থক্যগুলি বুঝে নেওয়া এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া।
শিশুর কান্না কোনও দুর্বলতার প্রতীক নয়। বরং এটি জীবনের প্রথম শক্তিশালী ঘোষণা। এই কান্নার মধ্য দিয়েই শিশু পৃথিবীকে জানায় সে এসেছে, সে শ্বাস নিচ্ছে, সে বেঁচে আছে।
মস্তিষ্কের গভীর স্তরে চলতে থাকা কান্না-হাসির এই জটিল খেলা ধীরে ধীরে শিশুকে নিয়ে যায় পূর্ণাঙ্গ মানুষের পথে। আজ যে কান্না আমাদের উদ্বিগ্ন করে, কাল সেই কান্নাই বদলে যাবে হাসিতে। আর সেই হাসিতেই লুকিয়ে থাকবে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিশ্রুতি সুস্থ, নিরাপদ ও আনন্দময় ভবিষ্যৎ।