ক্যানসার থেকে বাঁচতে প্রতিষেধক নেওয়া জরুরি। তবে সব ক্যানসারের টিকা ভারতে এখনও আসেনি। বেশ কিছু টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পথে। তবে দেশে এখন যে সব প্রতিষেধক পাওয়া যায়, সেগুলি সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
ক্যানসার এখন বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ রোগগুলির মধ্যে একটি। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, দূষণ, খাদ্যাভ্যাস, জেনেটিক কারণ ও ভাইরাস সংক্রমণের ফলে ক্যানসারের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আধুনিক প্রযুক্তি ও থেরাপির উন্নতির ফলে অনেক ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসা সম্ভব হলেও প্রতিরোধই এখনও সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। সেই কারণেই বিজ্ঞানীরা ক্যানসার প্রতিরোধে টিকার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বর্তমানে ক্যানসার প্রতিরোধে কয়েকটি কার্যকর টিকা বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সব ধরনের ক্যানসারের জন্য এখনও টিকা পাওয়া যায়নি। অনেক প্রতিষেধক এখনও গবেষণার স্তরে রয়েছে এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। ভারতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্যানসার প্রতিরোধক টিকা ইতিমধ্যেই উপলব্ধ হলেও আরও অনেক ভ্যাকসিন ভবিষ্যতে বাজারে আসতে পারে।
এই প্রতিবেদনে বর্তমানে ভারতে পাওয়া ক্যানসার প্রতিরোধক টিকা, সেগুলির কার্যকারিতা, কারা নিতে পারেন, এবং ভবিষ্যতের গবেষণার দিক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।
ক্যানসার সাধারণত শরীরের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি থেকে হয়। কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাস বা সংক্রমণ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যেমন—
হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) জরায়ুমুখ, মুখগহ্বর ও গলার ক্যানসারের কারণ হতে পারে
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়
এই ধরনের ভাইরাসজনিত ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য টিকা অত্যন্ত কার্যকর।
HPV বা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস একটি সাধারণ ভাইরাস যা যৌন সংক্রমণের মাধ্যমে ছড়ায়। এই ভাইরাসের কিছু স্ট্রেন জরায়ুমুখের ক্যানসারের প্রধান কারণ।
ভারতে বর্তমানে কয়েক ধরনের HPV টিকা পাওয়া যায়, যেমন—
Gardasil
Cervarix
Quadrivalent বা Nonavalent HPV vaccine
এই টিকা শরীরকে HPV ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ফলে ভবিষ্যতে ভাইরাস সংক্রমণ হলেও জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
সাধারণত ৯ থেকে ২৬ বছর বয়সী মেয়েদের জন্য সুপারিশ করা হয়
কিছু ক্ষেত্রে ছেলেরাও নিতে পারে, কারণ HPV গলার ও মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়
যৌন জীবন শুরু হওয়ার আগেই নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর
সাধারণত ২ বা ৩ ডোজে দেওয়া হয়, বয়সের উপর নির্ভর করে।
হেপাটাইটিস বি একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমণ থাকলে সিরোসিস এবং লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
হেপাটাইটিস বি টিকা শরীরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা দেয়, ফলে ভবিষ্যতে লিভার ক্যানসারের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।
নবজাতক থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক সবাই
যারা আগে টিকা নেননি
স্বাস্থ্যকর্মী, রক্তদাতা বা উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা
সাধারণত ৩ ডোজে দেওয়া হয়।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ক্যানসারের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী ও নির্দিষ্ট টিকা তৈরির চেষ্টা করছেন। কিছু টিকা এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
এগুলি প্রতিরোধ নয়, বরং ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এই টিকা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
Prostate cancer vaccine
Melanoma vaccine
Lung cancer vaccine
COVID-19 টিকার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্যানসারের জন্য mRNA ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে। এই টিকা শরীরকে ক্যানসার কোষ শনাক্ত করতে শেখায়।
স্তন ক্যানসার
ফুসফুস ক্যানসার
কোলন ক্যানসার
এই ধরনের ভ্যাকসিন রোগীর জেনেটিক তথ্য অনুযায়ী তৈরি করা হয়। প্রতিটি রোগীর ক্যানসারের ধরন অনুযায়ী টিকা ডিজাইন করা হয়, যা ভবিষ্যতের চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটাতে পারে।
ভারতে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আইআইটি, আইসিএমআর এবং বায়োটেক কোম্পানি ক্যানসার ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করছে। কিছু প্রতিষেধক ইতিমধ্যেই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
ভারতের বিজ্ঞানীরা বিশেষ করে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে কাজ করছেন—
জরায়ুমুখের ক্যানসার
স্তন ক্যানসার
মুখ ও গলার ক্যানসার
ফুসফুস ক্যানসার
যদিও ক্যানসার ভ্যাকসিন একটি বড় অগ্রগতি, তবুও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে—
বেশিরভাগ ক্যানসার জেনেটিক বা পরিবেশগত কারণে হয়, যেখানে ভাইরাসের ভূমিকা নেই।
টিকা ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়, তবে নিয়মিত স্ক্রিনিং প্রয়োজন।
ভারতে অনেক মানুষ এখনও HPV বা হেপাটাইটিস বি টিকা সম্পর্কে জানেন না।
টিকা ছাড়াও ক্যানসার প্রতিরোধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস অনুসরণ করা প্রয়োজন—
ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
নিয়মিত ব্যায়াম
প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট
ম্যামোগ্রাফি
লিভার ফাংশন টেস্ট
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় ভ্যাকসিন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। mRNA প্রযুক্তি, জেনেটিক থেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপির উন্নতির ফলে ক্যানসারকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগে পরিণত করা সম্ভব হতে পারে।
ক্যানসার বর্তমানে মানবজাতির অন্যতম বড় স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে ক্যানসারের চিকিৎসা অনেকাংশে উন্নত হয়েছে, কিন্তু এই রোগের সম্পূর্ণ নিরাময় এখনও বহু ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। সেই কারণেই ক্যানসার প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আর এই প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ক্যানসার প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে ভাইরাসজনিত কিছু ক্যানসার টিকার মাধ্যমে অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন HPV টিকার মাধ্যমে জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়, আবার হেপাটাইটিস বি টিকার মাধ্যমে লিভার ক্যানসারের সম্ভাবনা অনেকটাই হ্রাস পায়। এগুলি ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি বড় সাফল্য এবং ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তবে এটাও সত্য যে ক্যানসার একটি অত্যন্ত জটিল রোগ। সব ক্যানসার ভাইরাসজনিত নয়, অনেক ক্যানসার জেনেটিক, পরিবেশগত বা জীবনযাত্রার কারণে হয়। তাই সব ধরনের ক্যানসারের জন্য এখনও কার্যকর প্রতিষেধক তৈরি করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। mRNA প্রযুক্তি, ইমিউনোথেরাপি, জিন থেরাপি এবং ব্যক্তিগতকৃত ক্যানসার ভ্যাকসিনের মতো আধুনিক ধারণা ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতেও ক্যানসার ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা জোরকদমে চলছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বায়োটেক সংস্থা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে নতুন প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টা করছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আরও নতুন ক্যানসার প্রতিরোধক ও চিকিৎসামূলক ভ্যাকসিন বাজারে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এর ফলে ক্যানসার হয়তো ভবিষ্যতে আর ভয়ঙ্কর মারণরোগ হিসেবে দেখা যাবে না, বরং নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগে পরিণত হতে পারে।
কিন্তু কেবল টিকা বা আধুনিক চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়। ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য মানুষের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, দূষণ এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এই বিষয়গুলি ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট এবং স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং, পুরুষদের ক্ষেত্রে লিভার ও ফুসফুসের স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় কথা, ক্যানসার প্রতিষেধক সম্পর্কে এখনও অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা ও অজ্ঞতা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন ক্যানসারের টিকা প্রয়োজন নেই বা এগুলি নিরাপদ নয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত টিকাগুলি নিরাপদ এবং ক্যানসার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। তাই সরকার, স্বাস্থ্য সংস্থা ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং টিকাকরণের গুরুত্ব বোঝানো।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ক্যানসার প্রতিরোধে টিকা মানব সভ্যতার জন্য এক নতুন আশার আলো। বর্তমানে পাওয়া টিকাগুলি ইতিমধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করছে, এবং ভবিষ্যতের গবেষণা আরও শক্তিশালী প্রতিষেধকের পথ খুলে দিচ্ছে। সচেতনতা, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই আরও শক্তিশালী হবে। তাই আজ থেকেই টিকাকরণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি—কারণ প্রতিরোধই ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।