ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের মুকুটে আজ এক নতুন পালক যুক্ত হলো। এই প্রথম কোনো মানুষের শরীরে সফলভাবে বসানো হলো ল্যাবরেটরিতে তৈরি থ্রি ডি প্রিন্টেড জীবন্ত হার্ট বা হৃৎপিণ্ড। দিল্লির এইমস হাসপাতালে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার জটিল অস্ত্রপচারের পর নতুন জীবন পেলেন এক মৃত্যুপথযাত্রী রোগী। দাতার জন্য অপেক্ষা করার দিন শেষ। বিজ্ঞানের এই জাদুতে এবার মিটবে অঙ্গদানের ঘাটতি এবং বেঁচে যাবে লক্ষ লক্ষ প্রাণ।
মানুষের শরীর হলো প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি। আর সেই শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র হলো হার্ট বা হৃৎপিণ্ড। এই যন্ত্রটি বিকল হলে মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। এতদিন হার্ট ফেইলিওরের রোগীদের একমাত্র ভরসা ছিল হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট বা হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ছিল একজন ব্রেন ডেড দাতার। ভারতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ হার্ট না পেয়ে মারা যান। কিন্তু আজ সেই অসহায়তার দিন শেষ হতে চলেছে। ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে আজ এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটল। দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস বা এইমস এর কার্ডিও থোরাসিক বিভাগে আজ সফলভাবে সম্পন্ন হলো দেশের প্রথম থ্রি ডি প্রিন্টেড হার্ট প্রতিস্থাপন।
আজ সকাল ৬টায় এইমস এর ডিরেক্টর এবং প্রধান শল্যচিকিৎসক ডক্টর রণদীপ গুলেরিয়া এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা করেন। তিনি জানান গতকাল রাত থেকে চলা এক ম্যারাথন অস্ত্রপচারের পর ৪৫ বছর বয়সী এক রোগীর শরীরে ল্যাবরেটরিতে তৈরি বায়ো প্রিন্টেড হার্ট বসানো হয়েছে। রোগী এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং তার নতুন হার্ট স্বাভাবিকভাবেই ধুকপুক করছে। এই ঘটনা কেবল ভারতের জন্য নয় সমগ্র এশিয়ার জন্য এক বিরল সম্মান। এতদিন এই প্রযুক্তি কেবল আমেরিকা এবং ইজরায়েলের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ ছিল। ভারত আজ সেই অভিজাত ক্লাবের সদস্য হলো।
রোগীর পরিচয় এবং পটভূমি
যিনি এই নতুন জীবন পেলেন তিনি হলেন বিহারের পাটনার বাসিন্দা রমেশ কুমার। পেশায় তিনি একজন স্কুল শিক্ষক। গত ৩ বছর ধরে তিনি ডায়লেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি রোগে ভুগছিলেন। তার হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা ১০ শতাংশে নেমে এসেছিল। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন দ্রুত হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট না করলে তাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। কিন্তু গত ৬ মাস ধরে চেষ্টা করেও কোনো উপযুক্ত দাতা পাওয়া যাচ্ছিল না। তার রক্তের গ্রুপ বিরল হওয়ায় সমস্যা আরও জটিল হয়েছিল। রমেশের পরিবার যখন আশা ছেড়ে দিয়েছিল ঠিক তখনই এইমস এর চিকিৎসকরা তাকে এই পরীক্ষামূলক অস্ত্রপচারের প্রস্তাব দেন। রমেশ এবং তার পরিবার এতে রাজি হন এবং আজ সেই সাহসিকতার পুরস্কার মিলল।
কীভাবে তৈরি হলো এই কৃত্রিম হার্ট
অনেকেই ভাবতে পারেন এটি হয়তো প্লাস্টিক বা মেটালের তৈরি কোনো যান্ত্রিক হার্ট। কিন্তু না এটি সম্পূর্ণ জীবন্ত কোষ দিয়ে তৈরি। এই প্রযুক্তির নাম বায়ো প্রিন্টিং। আইআইটি দিল্লি এবং এইমস এর বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে গত ৫ বছর ধরে এই প্রজেক্টে কাজ করছিলেন।
১ কোষ সংগ্রহ প্রথমে রোগীর শরীর থেকে বা তার নিকটাত্মীয়ের শরীর থেকে কিছু স্টেম সেল বা ফ্যাট সেল সংগ্রহ করা হয়। এই কোষগুলোকে ল্যাবরেটরিতে কালচার করে বা চাষ করে কার্ডিয়াক সেল বা হৃৎপিণ্ডের কোষে পরিণত করা হয়।
২ বায়ো ইঙ্ক বা জৈব কালি তৈরি এই জীবন্ত কোষগুলোর সাথে বিশেষ ধরনের প্রোটিন এবং কোলাজেন মিশিয়ে তৈরি করা হয় বায়ো ইঙ্ক। এটি সাধারণ প্রিন্টারের কালির মতো তরল কিন্তু এতে প্রাণ আছে।
৩ থ্রি ডি প্রিন্টিং এরপর কম্পিউটারে রোগীর পুরনো হার্টের এমআরআই এবং সিটি স্ক্যান রিপোর্ট দেখে একটি নিখুঁত থ্রি ডি মডেল তৈরি করা হয়। সেই মডেল অনুযায়ী বায়ো প্রিন্টার স্তরে স্তরে বা লেয়ার বাই লেয়ার কোষ সাজিয়ে হার্ট তৈরি করে। প্রিন্ট করার পর এই হার্টটিকে একটি বিশেষ ইনকিউবেটরে রাখা হয় যেখানে এটি পরিপক্ক হয় এবং স্পন্দিত হতে শুরু করে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে প্রায় ৩ সপ্তাহ। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো যেহেতু এটি রোগীর নিজস্ব কোষ দিয়ে তৈরি তাই শরীর এটিকে প্রত্যাখ্যান বা রিজেক্ট করার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। সাধারণ ট্রান্সপ্লান্টের পর রোগীকে সারা জীবন ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ওষুধ খেতে হয় যাতে শরীর বাইরের অঙ্গটিকে মেনে নেয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই ওষুধের প্রয়োজন হবে না।
অস্ত্রপচারের চ্যালেঞ্জ
যদিও ল্যাবে হার্ট তৈরি করা হয়েছিল তবুও সেটিকে মানুষের শরীরে বসানো ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ডক্টর গুলেরিয়া বলেন মানুষের বুকের পাঁজরের গঠন এবং রক্তনালীগুলোর সংযোগ অত্যন্ত জটিল। কৃত্রিম হার্টের সাথে শরীরের মহাধমনী বা অ্যাওর্টা এবং পালমোনারি ধমনী জোড়া লাগানো ছিল সুচের ডগায় সুতো পরানোর মতো কঠিন কাজ। ৩০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একটি দল এই অসাধ্য সাধন করেছেন। অস্ত্রপচার চলাকালীন হার্ট লাং মেশিন ব্যবহার করা হয়েছিল। নতুন হার্টটি বসানোর পর যখন প্রথমবার ইলেকট্রিক শক দিয়ে সেটিকে চালু করা হয় তখন অপারেশন থিয়েটারে উপস্থিত সবার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মনিটরে যখন প্রথম ইসিজি রেখা ফুটে ওঠে তখন সবাই আনন্দে কেঁদে ফেলেন।
খরচ এবং সাধারণ মানুষের নাগাল
বর্তমানে হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করতে বেসরকারি হাসপাতালে ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা খরচ হয়। তার ওপর দাতা পাওয়ার অনিশ্চয়তা। বিজ্ঞানীদের দাবি এই থ্রি ডি প্রিন্টেড হার্ট বাণিজ্যিকভাবে তৈরি শুরু হলে এর খরচ নেমে আসবে ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকার মধ্যে। যেহেতু এতে দাতার প্রয়োজন নেই এবং ট্রান্সপোর্টেশন বা গ্রিন করিডর তৈরির খরচ নেই তাই এটি অনেক সস্তা হবে। রমেশ কুমারের অস্ত্রপচারটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়েছে কারণ এটি ছিল একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। সরকার জানিয়েছে আগামী দিনে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় এই চিকিৎসা আনা হবে।
অঙ্গদান সমস্যার সমাধান এবং অঙ্গ পাচার রোধ
ভারতে অঙ্গদানের হার খুবই কম। ধর্মীয় কুসংস্কার এবং সচেতনতার অভাবে মানুষ মরণোত্তর অঙ্গদান করতে চান না। এর ফলে এক বিশাল কালোবাজারি বা অর্গান ট্রাফিকিং চক্র তৈরি হয়েছে। গরিব মানুষের কিডনি বা লিভার টাকার লোভে বিক্রি হয়। এই থ্রি ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি সফল হলে এই কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ তখন আর কারো শরীর থেকে অঙ্গ নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। ল্যাবেই প্রয়োজন মতো হার্ট কিডনি বা লিভার তৈরি করে নেওয়া যাবে। এটি হবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক নৈতিক বিজয়।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
এইমস জানিয়েছে হার্টের পর তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো থ্রি ডি প্রিন্টেড কিডনি এবং লিভার প্রতিস্থাপন। কিডনি ফেইলিওরের রোগীরা যারা ডায়ালিসিসের যন্ত্রণায় ধুঁকছেন তাদের জন্য এটি হবে এক নতুন আশা। আইআইটি দিল্লির বিজ্ঞানীরা এখন স্কিন প্রিন্টিং বা চামড়া তৈরির ওপরও কাজ করছেন যা অ্যাসিড আক্রান্ত বা অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত বায়ো প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে বিশ্বের হাব বা কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে প্রশংসার বন্যা বয়ে যাচ্ছে। আমেরিকার মায়ো ক্লিনিক এবং ব্রিটেনের এনএইচএস থেকে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন জানানো হয়েছে। বিখ্যাত জার্নাল দ্য ল্যানসেট তাদের আগামী সংখ্যায় এই অস্ত্রপচার নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছে। হু বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে ভারত দেখিয়ে দিল যে উন্নয়নশীল দেশও বিজ্ঞানে প্রথম সারিতে থাকতে পারে।
নৈতিক বা এথিক্যাল প্রশ্ন
তবে সব আবিষ্কারের মতোই এর কিছু নৈতিক দিকও রয়েছে। কিছু ধর্মীয় সংগঠন প্রশ্ন তুলেছে যে মানুষ কি ঈশ্বরের কাজে হস্তক্ষেপ করছে। জীবন এবং মৃত্যু কি ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা যায়। বিজ্ঞানীরা অবশ্য এই তর্কে যেতে নারাজ। তাদের মতে বিজ্ঞান মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য। যদি প্রযুক্তি দিয়ে কারো প্রাণ বাঁচে তবে সেটাই সবচেয়ে বড় ধর্ম। রমেশ কুমারের স্ত্রী কান্নাভেজা চোখে বলেন আমার কাছে ডাক্তারবাবুরাই ভগবান। তারা আমার স্বামীকে যমের দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। এর চেয়ে বড় কোনো সত্য হতে পারে না।
রোগীর বর্তমান অবস্থা
রমেশ কুমার বর্তমানে আইসিইউতে পর্যবেক্ষণে আছেন। তাকে আগামী ২৪ ঘণ্টা ভেন্টিলেশনে রাখা হবে। তবে তার শরীরের ভাইটাল প্যারামিটার বা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো স্থিতিশীল আছে। আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে দেওয়া হবে এবং ১ মাসের মধ্যে তিনি বাড়ি ফিরতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বাড়ি ফিরে আবার স্কুলে পড়াতে পারবেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন।
উপসংহার
২০২৬ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি তারিখটি আমাদের মনে করিয়ে দিল যে অসম্ভব বলে কিছু হয় না। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির হাত ধরে মানুষ আজ মৃত্যুকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত। থ্রি ডি প্রিন্টেড হার্ট কেবল একটি মাংসপিণ্ড নয় এটি হলো মানুষের অদম্য জেদ এবং মেধার প্রতীক। আজ একটি রমেশ কুমার বেঁচেছেন কাল হাজার হাজার রমেশ কুমার বাঁচবেন। হাসপাতালের করিডরে আর কোনো মা বা স্ত্রীকে অঙ্গের অভাবে প্রিয়জনকে হারানোর আর্তনাদ করতে হবে না। ল্যাবরেটরির পেট্রি ডিশে এখন তৈরি হচ্ছে নতুন জীবনের স্পন্দন। সেই স্পন্দনের নাম বিজ্ঞান সেই স্পন্দনের নাম মানবতা। ভারত আজ বিশ্বকে পথ দেখাল যে আগামীর পৃথিবী হবে রোগমুক্ত এবং যন্ত্রণামুক্ত।