Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ভারতীয় বিজ্ঞানীদের ঐতিহাসিক সাফল্য ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার এবং বিশ্বজুড়ে শোরগোল

ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক স্বর্ণালী দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কলকাতার চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট এবং আইআইটি খড়গপুরের বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে আবিষ্কার করলেন ক্যান্সারের এক নতুন ওষুধ যা কেমোথেরাপি ছাড়াই রোগ সারাতে সক্ষম। এই ওষুধটির নাম দেওয়া হয়েছে সঞ্জীবনী সুধা। এটি সস্তা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং খুব শীঘ্রই এটি বাজারে আসবে বলে জানানো হয়েছে।

ভারতীয় বিজ্ঞানীদের ঐতিহাসিক সাফল্য ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার এবং বিশ্বজুড়ে শোরগোল
Health & Science

মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং মারণ রোগ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আজ ভারত এক বিশাল জয় পেল। দীর্ঘ ১০ বছরের কঠোর পরিশ্রম এবং গবেষণার পর কলকাতার চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট বা সিএনসিআই এবং আইআইটি খড়গপুরের একদল বিজ্ঞানী এমন একটি ওষুধ তৈরি করেছেন যা ক্যান্সার চিকিৎসায় আমূল পরিবর্তন আনবে। এতদিন ক্যান্সার মানেই ছিল কেমোথেরাপি রেডিয়েশন এবং অপারেশনের মতো যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা পদ্ধতি। যার ফলে রোগীর শরীরের সুস্থ কোষগুলোও নষ্ট হয়ে যেত এবং চুল পড়ে যাওয়া বা ওজন কমে যাওয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিত। কিন্তু নতুন এই ওষুধটি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই শুধুমাত্র ক্যান্সারের কোষগুলোকে ধ্বংস করবে। বিজ্ঞানীরা এই ওষুধের নাম দিয়েছেন সঞ্জীবনী সুধা।

আজ সকালে কলকাতার সল্টলেকে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে সিএনসিআই এর অধিকর্তা ডক্টর সুজিত বসু এবং আইআইটি খড়গপুরের বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রধান ডক্টর অনন্যা রায় এই ঐতিহাসিক ঘোষণা করেন। তারা জানান এই ওষুধটি ন্যানো টেকনোলজি বা অতি ক্ষুদ্র কণা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি সাধারণ ক্যাপসুল বা ট্যাবলেটের মতো যা জলের সাথে খেতে হবে। এই ক্যাপসুলের ভেতরে থাকা ন্যানো পার্টিকেলগুলো রক্তে মিশে সোজা টিউমার বা ক্যান্সারের কোষে পৌঁছে যায় এবং সেখানে ওষুধ রিলিজ করে বা ছেড়ে দেয়। এর ফলে আশেপাশের সুস্থ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি হয় না।

গবেষণার নেপথ্য কাহিনী

এই গবেষণার শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। ডক্টর অনন্যা রায় এবং তার দল লক্ষ্য করেছিলেন যে ভারতের প্রাচীন আয়ুর্বেদে কিছু বিশেষ ভেষজ উদ্ভিদের উল্লেখ আছে যা টিউমার ছোট করতে পারে। তারা সেই ভেষজ উপাদানগুলো নিয়ে ল্যাবরেটরিতে কাজ শুরু করেন। এর সাথে যুক্ত হয় আধুনিক ন্যানো টেকনোলজি। দীর্ঘ ৫ বছর ধরে ইঁদুর এবং গিনিপিগের ওপর এই ওষুধের পরীক্ষা চালানো হয়। ফলাফলের সাফল্যের পর গত ৩ বছর ধরে মানুষের ওপর বা হিউম্যান ট্রায়াল চালানো হয়েছে। প্রথম ধাপে ১০০ জন এবং দ্বিতীয় ধাপে ৫০০ জন ক্যান্সার রোগীর ওপর এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে স্টেজ ৩ এবং স্টেজ ৪ এর রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ওষুধ ৮০ শতাংশ সফল হয়েছে। স্তন ক্যান্সার ফুসফুসের ক্যান্সার এবং রক্তের ক্যান্সার বা লিউকেমিয়ার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে ভালো কাজ করেছে।

কেন এটি আলাদা

বর্তমানে বাজারে যেসব ক্যান্সারের ওষুধ পাওয়া যায় তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি কেমোথেরাপি সেশনের খরচ কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ভারতীয় বিজ্ঞানীদের তৈরি এই সঞ্জীবনী সুধা ওষুধের দাম রাখা হয়েছে মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। এক মাসের কোর্সের খরচ হবে মাত্র ৩০০০ থেকে ৫০০০ টাকা। ডক্টর সুজিত বসু বলেন আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি ওষুধ তৈরি করা যা গ্রামের সাধারণ মানুষও কিনতে পারেন। ক্যান্সার চিকিৎসায় অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। আমরা সেই ছবিটা বদলাতে চেয়েছি। এই ওষুধটি পুরোপুরি ভারতে তৈরি বা মেক ইন ইন্ডিয়া প্রকল্পের ফসল তাই এর দাম কম রাখা সম্ভব হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি

এই আবিষ্কারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক মহলে সাড়া পড়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু এর একটি প্রতিনিধি দল গত মাসে কলকাতা সফরে এসেছিলেন। তারা সমস্ত গবেষণাপত্র এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের রিপোর্ট খতিয়ে দেখেছেন। আজ সকালে জেনেভা থেকে পাঠানো এক ইমেলে হু এই ওষুধটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং একে গেম চেঞ্জার বা যুগান্তকারী বলে অভিহিত করেছে। হু জানিয়েছে তারা এই ওষুধটি আফ্রিকা এবং এশিয়ার অনুন্নত দেশগুলোতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ভারতের সাথে কাজ করতে আগ্রহী। আমেরিকার এফডিএ বা ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও এই ওষুধ নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

রোগীদের অভিজ্ঞতা

যাদের ওপর এই ওষুধের ট্রায়াল চালানো হয়েছিল তাদের মধ্যে একজন হলেন মুর্শিদাবাদের গৃহবধূ সাবিহা বিবি। তিনি বলেন আমি যখন প্রথম এখানে আসি তখন ডাক্তাররা বলেছিলেন আমার হাতে আর মাত্র ৩ মাস সময় আছে। আমার লিভার ক্যান্সার শেষ স্টেজে ছিল। কিন্তু এই ওষুধ খাওয়ার ১ মাসের মধ্যে আমার ব্যথা কমতে শুরু করে। ৬ মাস পর স্ক্যান করে দেখা যায় টিউমারটি প্রায় নেই বললেই চলে। আজ আমি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি। আমার মতো হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে এই ওষুধ।

চিকিৎসকদের প্রতিক্রিয়া

শহরের বিশিষ্ট অঙ্কোলজিস্ট বা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা এই আবিষ্কারকে স্বাগত জানিয়েছেন। টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের প্রাক্তন ডিরেক্টর বলেন এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য কাজ। কেমোথেরাপির যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যে কত বড় আশীর্বাদ তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। তবে তিনি এও বলেন যে ওষুধটি বাজারে আসার পর আরও বড় পরিসরে এর ফলাফল দেখতে হবে। প্রতিটি মানুষের শরীর আলাদা তাই সবার ক্ষেত্রে এটি সমান কাজ নাও করতে পারে। তবুও এটি নিঃসন্দেহে এক নতুন আশার আলো।

news image
আরও খবর

সরকারি উদ্যোগ এবং বাজারজাতকরণ

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে তারা এই ওষুধটি দ্রুত বাজারে আনার জন্য সব রকম সাহায্য করবে। ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া বা ডিসিজিআই ইতিমধ্যেই এর জরুরি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। আশা করা হচ্ছে আগামী ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে এটি দেশের সমস্ত বড় ওষুধের দোকানে এবং সরকারি হাসপাতালে পাওয়া যাবে। সরকার জন ঔষধি কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে এটি আরও সস্তায় বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে। এছাড়াও প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ নেপাল এবং ভুটানে এই ওষুধ রপ্তানির কথাও ভাবা হচ্ছে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন তারা এখানেই থামছেন না। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা ব্রেন টিউমার এবং প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের ওষুধ তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আইআইটি খড়গপুরের ল্যাবে এখন দিনরাত কাজ চলছে। ডক্টর অনন্যা রায় বলেন ক্যান্সার মুক্ত ভারত গড়াই আমাদের স্বপ্ন। আমরা চাই আগামী ১০ বছরের মধ্যে ক্যান্সারকে একটি সাধারণ নিরাময়যোগ্য রোগে পরিণত করতে। আজ আমরা যে জায়গায় পৌঁছেছি তা প্রমাণ করে যে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা মেধা এবং উদ্ভাবনী শক্তিতে বিশ্বের কারোর চেয়ে কম নন।

অর্থনৈতিক প্রভাব

এই ওষুধটি ভারতের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ভারত বর্তমানে প্রচুর টাকার ক্যান্সার ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করে। দেশীয় এই ওষুধ সেই খরচ কমাবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে এই ওষুধের বিপুল চাহিদার ফলে ভারত বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তি শিল্পে এক বড় শক্তি হিসেবে উঠে আসবে। শেয়ার বাজারে ইতিমধ্যেই ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলোর শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করেছে যারা এই ওষুধটি উৎপাদনের দায়িত্ব পেতে পারে।

সাধারণ মানুষের উল্লাস

খবরটি টিভিতে দেখানোর পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে খুশির হাওয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন জানানোর ধুম পড়েছে। অনেকেই বলছেন ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের চেয়েও এটি বড় জয়। কারণ এটি মানুষের জীবন বাঁচাবে। স্কুল কলেজে ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞানীদের ছবি নিয়ে মিছিল করেছে। তরুণ প্রজন্ম বিজ্ঞান গবেষণায় আরও বেশি করে আগ্রহী হবে বলে শিক্ষাবিদরা মনে করছেন।

সতর্কবার্তা

তবে চিকিৎসকরা একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তারা বলছেন এই ওষুধটি আবিষ্কার হয়েছে মানেই কাল থেকে কেমোথেরাপি বা অপারেশন বন্ধ হয়ে যাবে এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে টিউমার অপারেশন করে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাই রোগীদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। নিজে থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া ঠিক হবে না। প্রতিটি কেস আলাদা তাই চিকিৎসার পদ্ধতিও আলাদা হবে।

উপসংহার

২০২৬ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দিল যে বিজ্ঞান বা গবেষণা কোনো সীমানা মানে না। কলকাতার একটি ল্যাবরেটরিতে বসে বিজ্ঞানীরা যা আবিষ্কার করলেন তা সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে নতুন জীবন দেবে। ক্যান্সারের মতো করাল ব্যাধি যা শুনলে একসময় মানুষ আঁতকে উঠত তা আজ বশ মানতে চলেছে। সঞ্জীবনী সুধা কেবল একটি ওষুধের নাম নয় এটি এক বিশ্বাসের নাম। বিশ্বাস যে মানুষ হারতে জানে না। বিশ্বাস যে অন্ধকারের শেষেই আলো আছে। ভারতের মাটি থেকে উঠে আসা এই আলো আজ সারা বিশ্বকে পথ দেখাবে। আমরা আমাদের বিজ্ঞানীদের স্যালুট জানাই। তাদের এই অবদান মানবজাতি চিরকাল মনে রাখবে। জয় হিন্দ।

Preview image