টানা ছয় ম্যাচ জয়হীন কেকেআর। তার পরও সমর্থকদের পাশে থাকার আর্জি অজিঙ্ক রাহানের। কলকাতাবাসীর জন্য নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে চান। যদিও তাঁর আশ্বাসে আত্মবিশ্বাসের অভাব স্পষ্ট।হেরেই চলেছে কলকাতা নাইট রাইডার্স। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং কিছুই ঠিকঠাক করতে পারছে না অজিঙ্ক রাহানের দল। তাঁর নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে ম্যাচের পর ম্যাচ। গুজরাত টাইটান্সের কাছে হারের পরও কেকেআর সমর্থকদের ভরসা রাখার আবেদন জানাচ্ছেন রাহানে। কলকাতাবাসীর জন্য নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
কেকেআরের খেলা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। পরিকল্পনা, প্রথম একাদশ নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞেরা। আইপিএলের ধারাভাষ্যকারদের একাংশের মতে, কেকেআর দু’তিন বছর আগের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলছে। ২০ ওভারের খেলা অনেক বদলে গিয়েছে। কেকেআর যে ক্রিকেট খেলছে, তা এখন অচল। রাহানে অবশ্য হাল ছাড়তে নারাজ। লড়াইয়ে ময়দান ছেড়ে পালাতে নারাজ মুম্বইয়ের ক্রিকেটার।
গুজরাত ম্যাচের পর সাংবাদিক বৈঠকে রাহানে বলেছেন, ‘‘কেকেআর সমর্থকদের বলব, আমরা জানি অসাধারণ সমর্থন পাচ্ছি। আমরা কলকাতার মানুষের জন্য খেলছি। তাঁদের জন্য নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের ভাবনা খুব পরিষ্কার। একটা একটা করে ম্যাচ নিয়ে ভাবার চেষ্টা করছি আমরা। শনিবার কলকাতায় ফিরে আমরা আলোচনা করব।’’ রবিবার ঘরের মাঠে কেকেআরের প্রতিপক্ষ বৈভব সূর্যবংশী, যশস্বী জয়সওয়ালদের রাজস্থান রয়্যালস। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দলে কী বিশেষ পরিবর্তন করতে পারবেন, তার কোনও দিশা অবশ্য দিতে পারেননি কেকেআর অধিনায়ক।
রাহানে বলেছেন, ‘‘আমরা খুব দূরের কথা ভাবতে চাইছি না। টানা হারতে থাকলে কষ্ট হয়। কেউ হারতে চায় না। সকলে জেতার জন্যই মাঠে নামি। কিন্তু এটাই খেলার নিয়ম। খেলোয়াড় হিসাবে এই কঠিন পরিস্থিতি মেনে নিতেই হয়। মাথা উঁচু রাখতে হবে। প্রতিদিন নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।’’
রাহানে হয়তো এখনও বুঝতে পারছেন না, চেষ্টা করেও তাঁর দল সেরাটা দিতে পারছে না। শুধু চেষ্টায় লাভ কিছু হচ্ছে না। অথবা তাঁদের সেরাটা এখনকার আইপিএলের মানের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। টানা ব্যর্থতা নিয়ে আদৌ কোনও পর্যালোচনা হচ্ছে শিবিরে? রাহানে বলেছেন, ‘‘জিতি বা হারি, আমরা সব সময় আলোচনা করি। কী ভাবে উন্নতি করা যায়, তা নিয়ে কথা হয়। মানতেই হবে, কোনও কিছুই আমাদের পক্ষে আসছে না। এই কঠিন অস্বস্তিকর সময়ে আমরা প্রতিটি দিনকে নতুন সুযোগ হিসাবে দেখছি। আমাদের নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী খেলতেই হবে। দলের প্রত্যেককে প্রত্যেকের পাশে থাকতে হবে। অন্যের সাফল্য উপভোগ করতে হবে।’’
রাহানে সাফল্য উপভোগ করার কথা বলছেন। অথচ আইপিএলের প্রথম ছয় ম্যাচে কেকেআরের ক্রিকেটারেরা এমন কোনও সাফল্য পাননি, যা উপভোগ করা যায়। রাহানেদের পারফরম্যান্স এখনও পর্যন্ত কেকেআর সমর্থকদের হতাশা ছাড়া কিছু দিতে পারেনি। তা-ও আশ্বাস দিচ্ছেন অধিনায়ক! রাহানে বলেছেন, ‘‘আমাদের মূল বিষয় হল, মাঠে নেমে ইতিবাচক থাকা এবং স্বাধীন ক্রিকেট খেলা। দলের সকলে খুব কঠোর পরিশ্রম করছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের আসল বিষয় হল ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো জেতা। একটা বা দুটো ভাল ওভার সব বদলে দিতে পারে।’’কোন কোন বিষয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ফল বদলাতে পারে, জানেন রাহানেরা। প্রথম ছ’ম্যাচের পর আরও একটা বিষয় পরিষ্কার, কেকেআরের ক্রিকেটারেরা বদলাতে পারছেন না। ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো জিততে পারছেন না। ম্যাচের কোনও অংশকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। ব্যাটারেরা পারছেন না। বোলারেরা পারছেন না। রাহানের নেতৃত্বও পারছে না। অধিনায়কের আশ্বাসেও আত্মবিশ্বাসের অভাব স্পষ্ট।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট এমন একটি ফরম্যাট, যেখানে একটি ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে অনেক ছোট ছোট মুহূর্ত। একটি ভালো ওভার, একটি ক্যাচ, একটি রান আউট, কিংবা একটি সাহসী সিদ্ধান্ত—সব কিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে ম্যাচের ভাগ্য। এই ফরম্যাটে কোনও দল যদি এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে নিজেদের পক্ষে আনতে না পারে, তাহলে যতই শক্তিশালী দল হোক না কেন, পরাজয় প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে Kolkata Knight Riders-এর পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে এই বাস্তবতাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথম ছ’টি ম্যাচের পর একটি বিষয় খুব পরিষ্কার—দল হিসেবে কেকেআর নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারছে না। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো ম্যাচের ক্রিটিক্যাল মোমেন্টগুলোতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা কার্যকর করা। কেকেআরের ক্ষেত্রে এই জায়গাটাতেই বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচেই এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে, যেখানে সামান্য বেশি মনোযোগ বা ভালো পরিকল্পনা থাকলে ফলাফল অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু সেই সুযোগগুলো হাতছাড়া হচ্ছে বারবার।
ব্যাটিং বিভাগ দিয়ে শুরু করলে দেখা যায়, দলের ব্যাটারেরা প্রয়োজনীয় সময়ে দায়িত্ব নিতে পারছেন না। টি-টোয়েন্টিতে পাওয়ারপ্লে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব। এই সময়েই ম্যাচের ভিত তৈরি হয়। কিন্তু কেকেআরের ব্যাটারেরা অনেক সময় এই সুযোগকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। দ্রুত উইকেট পড়ে যাচ্ছে, বা রান রেট ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে মিডল অর্ডারের উপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে। মিডল অর্ডারের ব্যাটারেরাও সেই চাপ সামলাতে পারছেন না। কেউ ইনিংস গড়তে পারছেন না, আবার কেউ বা শেষ পর্যন্ত থেকে ম্যাচ ফিনিশ করতে পারছেন না। ফলে দল বারবার মাঝপথেই দিক হারিয়ে ফেলছে।
এখানে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের কথা বললে ভুল হবে। দলের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও চোখে পড়ছে। একটি সফল টি-টোয়েন্টি দল সবসময় জানে কে কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে খেলবে। কিন্তু কেকেআরের ক্ষেত্রে সেই স্পষ্টতা অনুপস্থিত। একজন ব্যাটার আক্রমণাত্মক খেলতে গেলে অন্যজনও একইভাবে ঝুঁকি নিচ্ছেন, যার ফলে উইকেট হারানোর সম্ভাবনা বাড়ছে। আবার যখন ধীর গতিতে খেলার প্রয়োজন, তখনও অনেক সময় অযথা আক্রমণ করতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনছেন।
বোলিং বিভাগেও একই সমস্যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বোলারদের কাজ শুধু উইকেট নেওয়া নয়, বরং রান আটকানো এবং ব্যাটারদের চাপের মধ্যে রাখা। কিন্তু কেকেআরের বোলারেরা অনেক সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী বল করতে পারছেন না। ডেথ ওভারে অতিরিক্ত রান দিয়ে দিচ্ছেন, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে। একটি ম্যাচে যদি শেষ ৪-৫ ওভারে ৫০-৬০ রান দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে জেতা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। এই জায়গাটাতেই বারবার পিছিয়ে পড়ছে দল।
ফিল্ডিংও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা অনেক সময় ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে। একটি ক্যাচ মিস করা, একটি রান আউটের সুযোগ নষ্ট করা—এই ছোট ছোট ভুলগুলোই বড় ব্যবধান তৈরি করে দেয়। কেকেআরের ফিল্ডিংয়ে সেই ধারাবাহিকতা নেই। সহজ ক্যাচ হাতছাড়া হচ্ছে, ফিল্ডিংয়ে তৎপরতার অভাব দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রতিপক্ষ দল অতিরিক্ত সুযোগ পাচ্ছে, যা তারা কাজে লাগাচ্ছে।
নেতৃত্বের প্রসঙ্গে আসলে, Ajinkya Rahane-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একজন অধিনায়কের কাজ শুধুমাত্র মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়, বরং দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি স্পষ্ট। রাহানে হয়তো দলের প্রতি আস্থা রাখার কথা বলছেন, কিন্তু সেই আশ্বাস মাঠে প্রতিফলিত হচ্ছে না। খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে।
একজন সফল অধিনায়ক জানেন কখন আক্রমণ করতে হবে এবং কখন রক্ষণাত্মক হতে হবে। বোলিং পরিবর্তন, ফিল্ড সেটিং—এই সব ছোট ছোট সিদ্ধান্তই ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে। কিন্তু কেকেআরের ক্ষেত্রে অনেক সময় এই সিদ্ধান্তগুলো সঠিক সময়ে নেওয়া হচ্ছে না। ফলে প্রতিপক্ষ দল সহজেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিচ্ছে।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে মোমেন্টাম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি দল যদি ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স করতে পারে, তাহলে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং তারা ম্যাচের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু কেকেআরের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তারা কোনও ম্যাচেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারছে না। কখনও ব্যাটিং ব্যর্থ হচ্ছে, কখনও বোলিং, আবার কখনও ফিল্ডিং। ফলে দল কখনওই একটি সম্পূর্ণ পারফরম্যান্স দিতে পারছে না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিকতা। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে চাপের মধ্যে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই জরুরি। কিন্তু কেকেআরের খেলোয়াড়দের মধ্যে সেই মানসিক দৃঢ়তার অভাব দেখা যাচ্ছে। ছোট ছোট ভুলের পর তারা আরও চাপে পড়ে যাচ্ছেন, যা পরবর্তী ভুলের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কেকেআরকে প্রথমেই নিজেদের ভুলগুলো স্বীকার করতে হবে এবং সেগুলো সংশোধনের জন্য কাজ করতে হবে। ব্যাটিংয়ে দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে, বোলিংয়ে পরিকল্পনা মেনে চলতে হবে এবং ফিল্ডিংয়ে আরও মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।
কোচিং স্টাফের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি খেলোয়াড়দের সঠিকভাবে গাইড করতে পারেন এবং তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারেন, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। দলকে বুঝতে হবে যে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রতিটি বল, প্রতিটি রান, প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ছোট সাফল্যই বড় জয় এনে দেয়।
সবশেষে বলা যায়, কেকেআরের বর্তমান সমস্যার মূল কারণ হলো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে ব্যর্থতা। যতক্ষণ না তারা এই জায়গাটায় উন্নতি করতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফলাফল তাদের পক্ষে আসা কঠিন। তবে ক্রিকেট এমন একটি খেলা, যেখানে একটি ভালো ম্যাচই সবকিছু বদলে দিতে পারে। যদি কেকেআর নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে শুরু করতে পারে, তাহলে তারাও আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
এই কারণেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট এতটা অনিশ্চিত এবং উত্তেজনাপূর্ণ। এখানে কোনও কিছুই নিশ্চিত নয়, আর একটি ছোট মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের চিত্র। কেকেআরের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই মুহূর্তগুলোকে নিজেদের পক্ষে আনা এবং আবার জয়ের পথে ফিরে আসা।