ভারতের বিমান চলাচল ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন (DGCA) এবং কেন্দ্রীয় বেসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে সংসদীয় কমিটির দ্বারস্থ হয়েছে দেশের বিভিন্ন পাইলট সংগঠন। পাইলটদের অভিযোগ, বিমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম, পক্ষপাত এবং দুর্নীতি চলছে, যার ফলে যাত্রী নিরাপত্তা ও পাইলটদের কর্মপরিস্থিতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ভারতের বিমান চলাচল ক্ষেত্রে সম্প্রতি এক বড় বিতর্ক ও আইনি যুদ্ধ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে চলে এসেছে। পাইলট ইউনিয়নগুলো, বিশেষ করে Federation of Indian Pilots ও Indian Pilots Guild, ভারতের নাগরিক বিমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা DGCA (Directorate General of Civil Aviation) এবং কেন্দ্রীয় সিভিল অ্যাভিয়েশন মন্ত্রক-এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করে আদালতের দরজায় মাথা রেখেছে। তাদের দাবি — DGCA ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ উড়ে নিরাপত্তা ও পাইলটদের কাজ/বিশ্রাম-সম্পর্কিত নিয়মগুলোকে দুর্বল করেছে এবং আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছে, ফলে প্রচলিত ফ্লাইট নিরাপত্তা নীতির মুখে বড় সংশয় তৈরি হয়েছে।
এই বিতর্কটি হঠাৎ শুরু হয়নি; বরং এটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা ফ্লাইট ডিউটি টাইম সীমাবদ্ধতা (FDTL) নিয়ম এবং এর বাস্তবায়ন-সম্পর্কিত ব্যাপক বিরোধের ফল। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত স্টেপ-বাই-স্টেপ ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো।
FDTL বা Flight Duty Time Limitation হলো এমন এক রেগুলেশন যা পাইলট ও ক্রুদের ফ্লাইটে কাজের সর্বোচ্চ সময়, বিশ্রামের সময় ও বিরতির নিয়ম নির্ধারণ করে — যাতে তারা অতিরিক্ত ক্লান্ত না হন এবং ফ্লাইট পরিচালনার সময় সতর্ক থাকেন। এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবিক ভুল কমানো এবং যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২০১১ সালে ভারত এই নিয়মগুলো বিশ্বব্যাপী অনুকূল নিরাপত্তা মান অনুসারে গঠন করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিয়মগুলোতে পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টা শুরু হয়, যা ২০১৯ ও পরে ২০২৩-২৪ সালে আপডেটেড করা হয় Civil Aviation Requirement (CAR) 2024 নামে।
সরলভাবে বললে:
আগের নিয়মে পাইলটদের কাজের সময় ও বিশ্রামের সময় নির্দিষ্ট ছিল, যা বিশ্বমানের মতো কঠোর।
নতুন CAR-এ এই সময় ও নিয়মগুলো কিছু শিথিল বিবেচনায় বদলে দেওয়া হয়েছে।
পাইলট সংগঠনগুলো দাবি করছে, এই নতুন নিয়মগুলো পুরোনো নিরাপত্তা মানকে দুর্বল করে দেয় এবং ফ্লাইট নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করে।
এখানে মূল বিষয় হলো “FDTL” নিয়মানুসারে পাইলটদের ক্লান্তি কমানোর জন্য কতটা নির্দিষ্ট সময় বিশ্রাম ও কাজ করা উচিত — এবং তা জরুরি কারণ ক্লান্ত পাইলটদের ভুলের ঝুঁকি অনেক বেশি, যা বিমান দুর্ঘটনাও ঘটাতে পারে।
এই পুরো ইস্যুটির আইনি কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি ‘Contempt of Court’ (আদালতের নির্দেশ অমান্য-সম্পর্কিত মামলা)। পাইলট সংগঠনগুলো দাবী করেছে যে DGCA-এর কিছু সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালতের দেওয়া নির্দেশনার বিরুদ্ধে, এবং তারা এটা “আদালতের অমান্য” হিসেবে দেখছে।
প্রকৃত ঘটনা ক্রমানুবদ্ধভাবে এমন:
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিল মাসে Delhi High Court-এর এক বা একাধিক নির্দেশ আসে।
তখন DGCA-কে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের নতুন CAR অনুযায়ী FDTL নিয়মগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে পাইলটদের বিশ্রাম ও নিরাপত্তা কাঠামো ঠিক মতো অনুসরণ হয়।
DGCA একটি আফিডেভিট (সুপারিশ) দিয়েছিল, যাতে বলা হয়েছিল নিয়মগুলো ১ জুলাই ও ১ নভেম্বর দুই ধাপে প্রায় সব কার্যকর করা হবে।
এই সময় আদালত পুলিশ বা অন্য কোনো রেগুলেটর-ধারা নয় — বরং এই আধুনিক নিয়মগুলোকে বাস্তবায়নে “সময়ের সীমা” জারি করেছিল। এর মানে DGCA-কে এটা বাধ্যতামূলকভাবে মানতে হবে।
পাইলট সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী:
DGCA নতুন CAR 2024-এর কিছু নিয়ম অন্তর্ভুক্তি ও সংশোধনী ছাড়াই বিভিন্ন বিমান সংস্থাকে ছাড় দিয়েছে।
তারা অনুমতি দিয়েছে কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ সময়ের বেশি ফ্লাইট বা বিশ্রাম শর্ত ছাড়িয়ে যেতে।
এই ছাড়গুলো আদালতের নির্দেশের বিরুদ্ধে এবং নির্দিষ্ট সময়সূচির বাইরে অনুমোদিত।
বিশেষ করে DGCA-কে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন এয়ারলাইনকে নতুন নিয়মে সময় বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছে, যা “ডিফিউশন অফ IMPLEMENTATION” বা বাস্তবায়নে দুর্বলতা তৈরি করেছে।
এটা শুধু মোট সময় বাড়ানো নয় — কিছু নিয়মের শর্ত পরিবর্তন ও ইউনিক-সুবিধা মনোনীত করা হয়েছে। যেমন:
অতিরিক্ত ফ্লাইট সময় (Max FDP) বাড়িয়ে ১.৫ ঘণ্টা পর্যন্ত করা হয়েছে।
FDP-এর অভ্যন্তরীণ সীমা ২ ঘণ্টা বাড়িয়ে ৩ ঘণ্টা করা হয়েছে — যা কার ২০২৪-এর আদলে অনুমোদিত ছিল না।
কিছু নিয়মের অধীনে “Weekly rest”-এর বদলে “leave substituted” করা যায় — যা আদেশ বিবেচনায় ছিল না।
এই সব অসামঞ্জস্যগুলোকে পাইলট সংগঠন “উদ্দেশ্যমূলক ও ইচ্ছাকৃত অমান্য” হিসেবে দেখছে।
পাইলট সংগঠনগুলো একটি Contempt of Court Petition দায়ের করেছে, যার মূল দাবিগুলি হলো:
DGCA-এর অপব্যবহার এবং অভিযোজিত শিথিলতা
CAR-এর বাস্তবায়ন পর্যায়ক্রমে না করা
আদালতের নির্ধারিত সময়সূচি অমান্য
পাইলটদের ক্লান্তি ও নিরাপত্তা-নিয়মের উদ্দেশ্য ব্যাহত
সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর জন্য আলাদা নিয়ম অনুমোদন
পাইলট সংগঠনগুলোকে পর্যাপ্তভাবে আলোচনা না করে একপক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া
এখানে শর্তসাপেক্ষ নয় — তাদের বক্তব্য, “আমরা জানিয়েছি এই নিয়মানুযায়ী আমাদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা হয়নি, আর তা আদালতের নির্দেশ অমান্য করছে” — এই কারণেই মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগের বিপরীতে DGCA-এর যুক্তি হলো:
আদালতের কাছে CAR-এর বিষয়টি সংরক্ষণ করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ‘Freeze’ বা স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়নি।
DGCA-এর statutory power আছে —
• Aircraft Act, 1934 অনুযায়ী নিয়ম ভিন্ন পরিস্থিতিতে অস্থায়ী ভগ্নাংশ দেওয়া।
শিথিলতা বা ব্যতিক্রম দেওয়া সম্ভব যদি সেটা কল্যাণকর এবং পরিস্থিতিগত প্রয়োজন হয়।
নিয়মের কিছু অনুকরণ ও শর্তায়ন সময়সাপেক্ষ — এবং DGCA এয়ারলাইনের কার্যক্রম ও অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তা করছে।
DGCA নিজেই মনে করে CAR 2024 এখনও কার্যকর; তবে কিছু শিথিলতা টেম্পোরারি ও এয়ারলাইন-specific।
এই যুক্তিতে DGCA প্রধানত বলছে “আমরা দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করেছি, আর সেটা আইনিভাবে করা হয়েছে” — তারা অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি দ্বিমত রাখছে।
Delhi High Court-এর বিচারপতি আদালতের নোটিশ জারি করেছেন এবং DGCA-কে তাদের প্রতিক্রিয়া জমা দিতে বলেছে।
এই প্রক্রিয়া একটি ধারণা দেয় যে আদালত এই মামলাকে গম্ভীরতা দিয়ে নিচ্ছে এবং “Contempt of Court” সম্পর্কিত ধারাগুলি গুরুত্বের সাথে যাচাই করবে।
আদালত পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছে এপ্রিল ১৭, ২০২৬-তে।
এটি নির্দেশ করে যে আদালত পুরো বিষয়টি বিশদে পর্যবেক্ষণ ও বিচার করবে, আর মাঝে কোনো সিদ্ধান্ত অগ্রিম ঘোষণার আগেই প্রতিটি পক্ষের যুক্তি শুনবে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু কেবল আইনি বা ব্যুরোক্রেটিক বিষয় নয় — এর বাস্তব প্রভাব অনেক বেশি গভীর:
FDTL-এর শিথিলতা, পাইলটদের কাজের সময় বাড়ানো এবং বিশ্রামের শর্ত কমানো —
এটি পাইলটদের ক্লান্তি বাড়াতে পারে, বিশেষ করে দীর্ঘ ফ্লাইটে।
ক্লান্তি বাড়লে মানবিক ভুলের প্রবণতা বেড়ে যায় — যা বিমানের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হলে যাত্রীদের জীবন ও বিমানের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে।
পাইলট সংগঠনগুলো নিজেদের পেশাদার নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য-অধিকার রক্ষায় সংগঠিত হয়ে দাবি তুলছে।
তারা বলছে, “নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি পাইলটদের সঙ্গে পরামর্শ না করে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটা পেশাগত আচরণে ভুল।”
এখানে শ্রমিকদের অধিকারের দিকও উঠে আসে — নিতান্তই নিরাপত্তা-উদ্দেশ্যে নেওয়া নিয়মগুলি কার্যকর হবে কি না।
এই আইনি লড়াই বিমান সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রক সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলেছে।
যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পাইলট সংগঠনের মধ্যে সংঘাত থাকে, বিমান সম্প্রদায়ের আস্থা কমে যেতে পারে।
বিমানের সময়সূচি, পাইলট সংখ্যা, রোস্টারিং ইত্যাদি সবকিছুতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
যাত্রীরা নিরাপত্তা বিষয়ক সংশয় করার সুযোগ পায়, যা পুরো বিমান শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ইস্যু শুধুই আইনি বা প্রযুক্তিগত নয় — এর আড়ালে বাড়তি চাপ, অপারেশনাল বাধ্যতা ও সরকারের বিমান নীতি-ও কাজ করছে।
ভারতে বিমান পরিষেবা দ্রুত বাড়ছে। নতুন এয়ারলাইন, আন্তর্জাতিক ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ছে।
এই বাড়তি চাপের ফলে পাইলট ও ক্রু-সংক্রান্ত সমস্যা অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
পাইলটের সংখ্যা কম পড়লে, অনেক সংস্থা হয়তো কাজের সময় বাড়িয়ে সমস্যার মোকাবিলা করতে চায়।
DGCA একটি স্বাধীন রেগুলেটর সংস্থা হলেও,
সরকারের বিমান নীতি ও বিভিন্ন এয়ারলাইনের চাপও এখানে ভূমিকা রাখে।
সংস্থা যদি কঠোর নিয়ম আরোপ করে, বিপুল এয়ারলাইন ও যাত্রী-সংখ্যার চাপের মাঝে অপারেশনাল সমস্যা হতে পারে।
এটি কোনো সাধারণ বিরোধ নয় — এটি নিয়ন্ত্রক ও নিয়ন্ত্রিত সংস্থা, পেশাদার সংগঠন ও সরকার-জোটের মধ্যে একটি জটিল লড়াই।
এই মামলার ভবিষ্যৎ পর্যায়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
যদি আদালত পাইলট সংগঠনগুলোর পক্ষ নিয়ে করে এবং DGCA-এর পদক্ষেপকে “Contempt of Court” ঘোষণা করে —
➤ তাহলে CAR-এর বাস্তবায়নে আবার কড়াকড়ি ও নির্দিষ্ট সময়সূচি জারি হতে পারে।
➤ DGCA-কে কঠোরভাবে নিয়ম বাস্তবায়ন করতে হবে।
অন্যদিকে আদালত যদি DGCA-এর statutory power-এর পক্ষে মন্তব্য করে —
সিদ্ধান্তে বলা হতে পারে, “নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু ক্ষমতা আছে যা পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যতিক্রম করতে পারে” — এবং শিথিলতা অনুমোদন বৈধ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিমান নিরাপত্তা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে আইনি, প্রযুক্তিগত, মানবিক ও নীতিগত দিকগুলোকে খুব সংহতভাবে দেখা হয়।
যদি নিয়মগুলো শিথিলভাবে বা অস্পষ্টভাবে প্রয়োগ হয়, তাহলে নিরাপত্তা সংস্কৃতি দুর্বল হতে পারে।
পাইলট-সংগঠন অংশীদার না হলে বাস্তবায়নেও সমস্যা হতে পারে।
এই মামলার রায় এপ্রিল ২০২৬-এ আসার পর পুরো ইস্যুটি নতুন রূপ পেতে পারে।
পাইলট সংগঠন দাবি করে DGCA নিয়মের বাস্তবায়ন ফাঁকি দিয়েছে।
পাইলটরা “Contempt of Court” মামলা করেছে, অর্থাৎ আদালতের নির্দেশ অমান্য হয়েছে।
DGCA বলছে — “আমরা সরকারের আইন অনুযায়ী কাজ করছি এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নিয়েছি।”
আদালত DGCA-কে তাদের প্রতিক্রিয়া দিতে বলেছে এবং পরবর্তী শুনানি অ্যাপয়েন্ট করেছে।
এই মামলার রায় দেশের বিমান নিরাপত্তা, পাইলটের কাজ-ধারা ও আইন-শৃঙ্খলার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।