ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ ঘিরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আর্থিক পরিষেবা ও ফিনটেক খাত। সম্প্রতি এই চুক্তির আওতায় যে আর্থিক পরিষেবা সংক্রান্ত বিশেষ সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে, তা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই সমঝোতার ফলে ভারতীয় ব্যাংক, বিমা সংস্থা, ডিজিটাল পেমেন্ট কোম্পানি এবং বিশেষ করে ফিনটেক স্টার্টআপগুলির জন্য নিউজিল্যান্ডের বাজারে প্রবেশের পথ অনেকটাই সহজ হবে। একই সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিও ভারতের দ্রুত সম্প্রসারিত ডিজিটাল অর্থনীতিতে কাজ করার সুযোগ পাবে।
বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় যখন ডিজিটাল লেনদেন, ফিনটেক এবং সীমান্তছাড়া আর্থিক পরিষেবা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, ঠিক সেই সময়েই এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিল ভারত ও নিউজিল্যান্ড। দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement বা FTA)–এর আওতায় সম্প্রতি যে আর্থিক পরিষেবা সংক্রান্ত সমঝোতা (Financial Services Annex) চূড়ান্ত হয়েছে, তা শুধু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক ফিনটেক ও ডিজিটাল অর্থনীতির মানচিত্রেই বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই চুক্তি কার্যকর হলে ভারতীয় ব্যাংক, বিমা সংস্থা, পেমেন্ট কোম্পানি এবং বিশেষ করে ফিনটেক স্টার্টআপগুলির জন্য নিউজিল্যান্ডের বাজারে প্রবেশের পথ অনেকটাই সহজ হবে। একই সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিও ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা ভবিষ্যতে এশিয়া–প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের আর্থিক প্রভাব আরও শক্তিশালী করবে।
এই আর্থিক পরিষেবা চুক্তিটি মূল এফটিএর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে পরিষেবা খাতের মধ্যে ব্যাংকিং, বিমা, বিনিয়োগ পরিষেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং ফিনটেক উদ্ভাবনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, দুই দেশই একে অপরের আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি সম্মান দেখাবে এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো বজায় রেখেই বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেবে। এর ফলে আর্থিক পরিষেবার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ডিজিটাল পেমেন্ট ও ক্রস-বর্ডার লেনদেন ব্যবস্থার উন্নয়ন। ভারত ইতিমধ্যেই ইউপিআই-এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম সফল রিয়েল-টাইম পেমেন্ট সিস্টেম তৈরি করেছে। এই প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক স্তরে প্রসারিত করার ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সহযোগিতা ভারতীয় ফিনটেক সংস্থাগুলির জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের পেমেন্ট অবকাঠামোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন হলে সীমান্ত পেরিয়ে টাকা পাঠানো আরও দ্রুত, কম খরচে এবং নিরাপদ হবে। এতে প্রবাসী ভারতীয়, ব্যবসায়ী এবং ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহারকারীরা সরাসরি উপকৃত হবেন।
ফিনটেক স্টার্টআপগুলির দিক থেকেও এই চুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। ভারত বর্তমানে বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ ফিনটেক হাব হিসেবে পরিচিত। ডিজিটাল ঋণ, ইনস্যুরটেক, ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট, ব্লকচেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আর্থিক পরিষেবায় ভারতীয় স্টার্টআপগুলি আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিতি পাচ্ছে। তবে বিদেশি বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামো একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভারত–নিউজিল্যান্ড এফটিএ এই বাধা অনেকটাই কমাতে পারে, কারণ চুক্তির আওতায় রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ রাখা হয়েছে।
চুক্তিতে ডেটা সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবার ক্ষেত্রে গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা একটি সংবেদনশীল বিষয়। এই সমঝোতায় বলা হয়েছে, দুই দেশই নিজেদের জাতীয় আইন ও নীতির মধ্যে থেকেই তথ্য আদান-প্রদান করবে। ফলে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়বে, অন্যদিকে তেমনই গ্রাহকের গোপনীয়তা ও আর্থিক নিরাপত্তা বজায় থাকবে।
ব্যাংকিং ও বিমা খাতের ক্ষেত্রেও এই চুক্তি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। ভারতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি নিউজিল্যান্ডে শাখা খুলতে বা স্থানীয় সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্বে ব্যবসা বাড়াতে পারবে। একইভাবে নিউজিল্যান্ডের সংস্থাগুলিও ভারতের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে, যদিও তা হবে ভারতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম মেনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রতিযোগিতার ফলে পরিষেবার মান উন্নত হবে এবং গ্রাহকদের জন্য আরও আধুনিক ও সাশ্রয়ী আর্থিক পণ্য বাজারে আসবে।
সব মিলিয়ে, ভারত–নিউজিল্যান্ড এফটিএর আর্থিক পরিষেবা চুক্তিকে শুধু একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা হিসেবে নয়, বরং ডিজিটাল অর্থনীতি ও ফিনটেক ভবিষ্যতের দিকে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এই চুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় আর্থিক পরিষেবা ও ফিনটেক শিল্প আন্তর্জাতিক স্তরে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও, দুই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো পরস্পরের পরিপূরক। ভারত একটি বিশাল ভোক্তা বাজার, শক্তিশালী আইটি ও ফিনটেক ইকোসিস্টেমের অধিকারী, অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড উন্নত আর্থিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো, স্থিতিশীল অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য পরিচিত।
এই FTA–র লক্ষ্য শুধুমাত্র শুল্ক কমানো নয়, বরং পণ্য, পরিষেবা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে পরিষেবা খাত, যার মধ্যে আর্থিক পরিষেবা একটি প্রধান স্তম্ভ, সেখানে এই চুক্তিকে গেম–চেঞ্জার হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
এই FTA–র সবচেয়ে আলোচিত অংশ হল আর্থিক পরিষেবা সংযোজন, যা মোট ১৮টি ধারায় বিভক্ত। এটি মূলত ব্যাংকিং, বিমা, বিনিয়োগ পরিষেবা, পেমেন্ট সিস্টেম, ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবা এবং ফিনটেক উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংযোজনটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) সাধারণ পরিষেবা চুক্তি বা GATS–এর তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক, বিস্তারিত এবং বাস্তবমুখী। এতে বাজারে প্রবেশের নিয়ম, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া, নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতা এবং তথ্য আদান–প্রদানের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমে সহযোগিতা। ভারত ইতিমধ্যেই UPI–র মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম সফল রিয়েল–টাইম পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে এই সমঝোতার ফলে ভবিষ্যতে—
ভারতীয় পেমেন্ট সিস্টেম নিউজিল্যান্ডের আর্থিক অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে,
ক্রস–বর্ডার রেমিটেন্স আরও দ্রুত, সস্তা ও স্বচ্ছ হতে পারে,
ভারতীয় ফিনটেক কোম্পানিগুলি আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের কাছে পরিষেবা দিতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট প্রযুক্তিকে বৈশ্বিক মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফিনটেক হাব। শত শত স্টার্টআপ ডিজিটাল লেনদেন, ঋণ প্রদান, ইনস্যুরটেক, রোবো–অ্যাডভাইসরি এবং ব্লকচেনভিত্তিক পরিষেবায় কাজ করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক জটিলতা একটি বড় বাধা।
এই FTA সেই বাধা অনেকটাই কমাবে। চুক্তির আওতায় দুই দেশ রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স ও ডিজিটাল স্যান্ডবক্সে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় ফিনটেক সংস্থাগুলি নিউজিল্যান্ডে পরীক্ষামূলকভাবে তাদের পরিষেবা চালু করতে পারবে এবং সেখানকার নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পাবে।
ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রে ডেটা সুরক্ষা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব ডেটা সুরক্ষা আইন ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পূর্ণ অধিকার রাখবে।
অর্থাৎ, সীমান্ত পেরিয়ে তথ্য আদান–প্রদান হলেও জাতীয় নিরাপত্তা, গ্রাহকের গোপনীয়তা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা কোনওভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এই বিষয়টি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশে ডেটা লোকালাইজেশন ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।
এই FTA কার্যকর হলে ভারতীয় ব্যাংক ও বিমা সংস্থাগুলি নিউজিল্যান্ডে শাখা খুলতে বা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ব্যবসা বাড়াতে পারবে। একইভাবে নিউজিল্যান্ডের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিও ভারতের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে, তবে তা হবে ভারতীয় নিয়ম ও RBI–র নির্দেশিকা মেনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে প্রতিযোগিতা বাড়বে, পরিষেবার মান উন্নত হবে এবং গ্রাহকের জন্য নতুন আর্থিক পণ্য ও পরিষেবা তৈরি হবে।
এই চুক্তির আর্থিক পরিষেবা অংশটি কেবল ব্যবসায়িক সুবিধা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথও প্রশস্ত করবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারত আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে এবং নিউজিল্যান্ডের বিনিয়োগকারীরাও ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই FTA আগামী কয়েক বছরে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
এই চুক্তির ভূ–রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। এশিয়া–প্যাসিফিক অঞ্চলে যখন বিভিন্ন বাণিজ্য জোট সক্রিয় হচ্ছে, তখন নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ভারতের এই সমঝোতা একটি কৌশলগত বার্তা দিচ্ছে। এটি ভারতের বহুপাক্ষিক বাণিজ্য নীতিকে আরও শক্তিশালী করবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান সুদৃঢ় করবে।
ভারত–নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আর্থিক পরিষেবা সংযোজন কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং ডিজিটাল ভবিষ্যতের দিকে এক বড় পদক্ষেপ। এটি ভারতীয় ফিনটেক, ডিজিটাল পেমেন্ট ও আর্থিক পরিষেবা খাতের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের দরজা খুলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করছে যে, আধুনিক বাণিজ্য চুক্তি আর শুধু শুল্কের হিসাব নয়, বরং প্রযুক্তি, তথ্য ও উদ্ভাবনের উপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভারত বৈশ্বিক ফিনটেক মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে এবং আগামী দশকে ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।