ভারতে মহিলাদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্যান্সার সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার। ইউটেরাসের মুখ বা সার্ভিক্সে হওয়া এই রোগ সময়মতো ধরা পড়লে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হতে পারে।
ভারতে মহিলাদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক দেখা ক্যান্সারের নাম সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার। তবে আশার কথা হল — এই ক্যান্সার সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে প্রায় সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। সচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং HPV ভ্যাকসিন গ্রহণের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মহিলাকে এই রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব বলে জানাচ্ছেন পিয়ারলেস হাসপাতালের কনসালটেন্ট গাইনিঅঙ্কো সার্জেন ডাঃ অমিত মণ্ডল।
এই প্রতিবেদনে জানুন —
সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার কী
কেন হয় এই রোগ
কী কী লক্ষণ দেখা যায়
কোন পরীক্ষা করলে আগেভাগে ধরা পড়ে
চিকিৎসা পদ্ধতি কী
HPV ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর
কীভাবে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব
সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার কী?
মহিলাদের প্রজনন অঙ্গের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল সার্ভিক্স — অর্থাৎ জরায়ুর মুখের অংশ, যা ইউটেরাস ও ভ্যাজাইনার সংযোগ ঘটায়। এই অংশের কোষে ক্যান্সার তৈরি হলে তাকে বলা হয় সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার।
এই ক্যান্সার সাধারণত হঠাৎ হয় না। প্রথমে সার্ভিক্সের কোষে কিছু প্রাক-ক্যান্সারাস পরিবর্তন দেখা দেয়, যাকে বলা হয় ডিসপ্লাসিয়া। এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। ঠিক এই কারণেই সময়মতো স্ক্রিনিং করালে এই রোগকে সহজেই প্রতিরোধ বা নিরাময় করা সম্ভব।
ভারতে সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের পরিস্থিতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী —
ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১.২৫ লক্ষ মহিলা নতুন করে সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হন
প্রায় ৭৫ হাজারের বেশি মহিলা এই রোগে প্রাণ হারান
গ্রামীণ ও আধা-শহরাঞ্চলে সচেতনতার অভাবে মৃত্যুহার বেশি
ডাঃ অমিত মণ্ডল জানান, “এই ক্যান্সার এতটাই প্রতিরোধযোগ্য যে সঠিক সময়ে স্ক্রিনিং ও ভ্যাকসিনেশন হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব।”
কেন হয় সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার?
সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের প্রধান কারণ হল হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমণ।
HPV কী?
HPV হল একটি যৌনবাহিত ভাইরাস (Sexually Transmitted Infection), যার শতাধিক প্রজাতি রয়েছে। তবে বিশেষ করে HPV-16 ও HPV-18 টাইপ সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী।
কীভাবে সংক্রমণ হয়?
ডাঃ অমিত মণ্ডল জানান —
যৌন সংসর্গের মাধ্যমেই সাধারণত HPV শরীরে প্রবেশ করে
একাধিক যৌনসঙ্গী থাকলে ঝুঁকি বাড়ে
খুব অল্প বয়সে যৌন সংসর্গ শুরু করলেও সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি
ধূমপান করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে
তবে মনে রাখতে হবে — HPV সংক্রমণ মানেই ক্যান্সার নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরীরের ইমিউন সিস্টেম নিজে থেকেই ভাইরাসকে নির্মূল করে দেয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাস দীর্ঘদিন থেকে গিয়ে কোষের ক্ষতি করে এবং ক্যান্সারে রূপ নেয়।
সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের লক্ষণ কী কী?
প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগে প্রায় কোনও উপসর্গই দেখা যায় না, যা একে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি।
তবে রোগ অগ্রসর হলে দেখা দিতে পারে —
সাধারণ লক্ষণ:
মেনোপজের পর যোনি থেকে রক্তপাত
মাসিক চক্রের বাইরেও অস্বাভাবিক ব্লিডিং
সহবাসের পর রক্তপাত
ভ্যাজাইনা থেকে সাদা স্রাব (কখনও দুর্গন্ধযুক্ত)
তলপেটে বা কোমরে ব্যথা
যৌন সংসর্গের সময় ব্যথা
ডাঃ মণ্ডল বলেন, “এই লক্ষণগুলির যেকোনও একটি দেখা দিলেই অবহেলা না করে দ্রুত গাইনিকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।”
কীভাবে রোগ ধরা পড়ে? (Screening & Diagnosis)
১. HPV টেস্ট
সার্ভিক্সের কোষ থেকে নমুনা নিয়ে HPV ভাইরাস আছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়। এটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্ক্রিনিং পদ্ধতি।
৩০ বছর বয়সের পর যৌন সক্রিয় মহিলাদের ৫ বছর অন্তর HPV টেস্ট করা উচিত
রিপোর্ট নেগেটিভ হলে পাঁচ বছর পরে আবার পরীক্ষা যথেষ্ট
পজিটিভ হলে পরবর্তী ধাপে প্যাপ স্মিয়ার করা হয়
২. প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট
এতে সার্ভিক্স থেকে কোষ নিয়ে মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করা হয় — কোষে কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়েছে কি না তা বোঝার জন্য।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে —
ক্যান্সারের আগের পর্যায়
প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার
সংক্রমণ বা প্রদাহ
— সবই শনাক্ত করা সম্ভব।
৩. কোলপোস্কপি ও বায়োপসি
যদি স্ক্রিনিং টেস্টে সন্দেহজনক কিছু ধরা পড়ে, তখন কোলপোস্কোপ নামক বিশেষ যন্ত্র দিয়ে সার্ভিক্স পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন হলে বায়োপসি করে নিশ্চিত করা হয় ক্যান্সার হয়েছে কি না।
সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের ধাপ (Stages)
সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার সাধারণত চারটি ধাপে বিভক্ত —
Stage 1 ক্যান্সার শুধু সার্ভিক্সেই সীমাবদ্ধ
Stage 2 জরায়ুর আশপাশে ছড়িয়েছে
Stage 3 পেলভিক ওয়াল বা ভ্যাজাইনার নিচের অংশে পৌঁছেছে
Stage 4 মূত্রথলি, অন্ত্র বা দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়েছে
প্রথম পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসা অত্যন্ত সফল হয়।
চিকিৎসা কীভাবে হয়?
ডাঃ অমিত মণ্ডল জানান, “প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ৯৫ শতাংশ রোগী পরবর্তী পাঁচ বছর সুস্থ জীবনযাপন করেন।”
চিকিৎসা নির্ভর করে —
রোগের স্টেজ
রোগীর বয়স
সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না
সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার উপর
১. প্রাথমিক পর্যায় (Stage 0–1)
এই ক্ষেত্রে সাধারণত —
সার্জারি করে সার্ভিক্স বা জরায়ুর অংশবিশেষ অপসারণ করা হয়
অনেক ক্ষেত্রে ফার্টিলিটি বজায় রেখে চিকিৎসা সম্ভব
কিছু ক্ষেত্রে করা হয় —
LEEP procedure
Cone biopsy
Radical hysterectomy
২. মধ্যম পর্যায় (Stage 2–3)
এই ক্ষেত্রে —
রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সমন্বয়ে চিকিৎসা হয়
টিউমার ধ্বংস করে রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়
৩. অগ্রসর পর্যায় (Stage 4)
এই পর্যায়ে চিকিৎসার লক্ষ্য হয় —
রোগীর জীবনমান উন্নত করা
ব্যথা ও উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ
আয়ু বৃদ্ধি
চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে —
ক্লান্তি
বমি ভাব
চুল পড়া (কেমোথেরাপিতে)
ত্বকের সমস্যা (রেডিওথেরাপিতে)
মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া
সন্তান ধারণে সমস্যা
তবে আধুনিক চিকিৎসায় এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
HPV ভ্যাকসিন: সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র
ডাঃ অমিত মণ্ডল বলেন, “সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল HPV ভ্যাকসিন।”
কাদের জন্য এই ভ্যাকসিন?
৯–১৪ বছর ২টি ডোজ
১৫–২৬ বছর ৩টি ডোজ
২৬–৪৫ বছর ৩টি ডোজ (ডাক্তারের পরামর্শে)
এই ভ্যাকসিন যৌন জীবন শুরু হওয়ার আগেই নিলে সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়। তবে যৌন সক্রিয় হলেও নেওয়া যেতে পারে — এতে ভবিষ্যতের সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব।
ভ্যাকসিন কতটা নিরাপদ?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের মতে —
HPV ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ নিরাপদ
গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত কম
লক্ষ লক্ষ মানুষ বিশ্বজুড়ে এই টিকা নিয়েছেন
সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া —
ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা
সামান্য জ্বর
মাথা ঘোরা
স্ক্রিনিং বনাম ভ্যাকসিন — কোনটি বেশি জরুরি?
ডাঃ মণ্ডলের মতে —
“ভ্যাকসিন এবং স্ক্রিনিং — দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভ্যাকসিন ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমায়, আর স্ক্রিনিং বর্তমান রোগকে আগেভাগে ধরতে সাহায্য করে।”
অর্থাৎ —
ভ্যাকসিন = প্রতিরোধ
স্ক্রিনিং = দ্রুত শনাক্তকরণ
এই দু’য়ের সমন্বয়েই সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার নির্মূল সম্ভব।
গর্ভধারণ ও সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার
অনেক মহিলা ভাবেন — ক্যান্সার হলে কি আর মা হওয়া সম্ভব নয়?
ডাঃ অমিত মণ্ডল জানান —
প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রে ফার্টিলিটি-স্পেয়ারিং সার্জারি করা সম্ভব
এতে জরায়ু রেখে শুধু ক্যান্সার আক্রান্ত অংশ অপসারণ করা হয়
ফলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণ সম্ভব হতে পারে
তবে চিকিৎসা পরিকল্পনা অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে হবে।
মানসিক প্রভাব ও সামাজিক দিক
ক্যান্সার মানেই শুধু শারীরিক অসুখ নয় — মানসিক চাপ, ভয়, সামাজিক লজ্জা ও একাকীত্বও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারের ক্ষেত্রে —
যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে অনেকেই সংকোচ বোধ করেন
ফলে দেরিতে চিকিৎসা শুরু হয়
ডাঃ মণ্ডল বলেন, “এই রোগে কোনও লজ্জার কিছু নেই। এটি একটি ভাইরাল সংক্রমণ থেকে হওয়া ক্যান্সার — সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই জীবন বাঁচাতে পারে।”
ভারতে সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগ
ভারত সরকার ২০২৩ সাল থেকে —
জাতীয় স্তরে HPV ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রাম চালু করেছে
স্কুল ও কলেজ স্তরে মেয়েদের টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে
সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে স্ক্রিনিং সুবিধা দেওয়া হচ্ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক দশকে ভারতে সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার প্রায় নির্মূল করা সম্ভব।
কোন বয়সে কী করবেন? (Quick Guide)
৯–১৪ বছর HPV ভ্যাকসিন (২ ডোজ)
১৫–২৬ বছর HPV ভ্যাকসিন (৩ ডোজ)
৩০ বছর থেকে প্রতি ৫ বছরে HPV টেস্ট
উপসর্গ থাকলে অবিলম্বে গাইনিকোলজিস্ট দেখান
সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে বড় অস্ত্র
ডাঃ অমিত মণ্ডল বলেন —
“আমরা এমন একটি ক্যান্সারের মুখোমুখি, যা একদিকে সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য, অন্যদিকে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় শতভাগ নিরাময়যোগ্য। তবুও সচেতনতার অভাবে হাজার হাজার মহিলা প্রতি বছর প্রাণ হারান — এটাই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক।”
এই রোগ সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা, স্কুল পর্যায়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং HPV ভ্যাকসিন গ্রহণ — এই চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়েই সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার মুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার কি সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব?
সংক্ষেপে উত্তর — হ্যাঁ, সম্ভব।
প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ৯৫% পর্যন্ত রোগী সুস্থ জীবনযাপন করেন
স্ক্রিনিং ও ভ্যাকসিনের মাধ্যমে এই রোগ প্রায় পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য
আধুনিক চিকিৎসায় জটিল পর্যায়েও রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব