জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে এইচপিভি টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং এখন এটি ভারতে সহজলভ্য। কোন বয়স থেকে টিকা নেওয়া উচিত এবং এর দাম কত তা জানা প্রতিরোধে সহায়ক।
ভারতে মহিলাদের মধ্যে যে ধরনের ক্যানসার সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তার মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসার দীর্ঘ দিন ধরেই অন্যতম একটি ভয়াবহ রোগ হিসেবে পরিচিত। স্তন ক্যানসারের পর পরই এই রোগ রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। প্রতি বছর এই দেশে প্রায় এক লক্ষ কুড়ি হাজার মহিলা এই রোগে আক্রান্ত হন এবং তাদের মধ্যে অন্তত সাতাত্তর হাজার মহিলা মৃত্যুবরণ করেন। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয় বরং একটি সামাজিক বাস্তবতা যা মহিলাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে গভীর সংকটে ফেলে দেয়। তাই এই ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে আগাম প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এই প্রতিরোধের প্রধান অস্ত্র হল এইচপিভি টিকা।
জরায়ুমুখের ক্যানসারের জন্য দায়ী ভাইরাসটির নাম হল হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভি। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এই ভাইরাসের মোট দুই শত প্রজাতি রয়েছে যার মধ্যে বারোটি সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী। বিশেষ করে এইচপিভি প্রজাতি ষোল এবং আঠারোকে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে ধরা হয়। এই দুই প্রজাতিই অধিক ভাগ ক্ষেত্রে মহিলাদের জরায়ুমুখ ক্যানসারের মূল কারণ হয়ে ওঠে। তাই এই ভাইরাস দমন করতে প্রতিষেধক গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
এইচপিভি টিকার কার্যকারিতা নিয়ে অতীতে সন্দেহ থাকলেও বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে এই টিকা সঠিক সময়ে নিলে প্রায় নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে জরায়ুমুখ ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়। ব্রিটেনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ জানিয়েছে যে এইচপিভি টিকা নিয়ম মেনে নিলে মহিলাদের শরীরে এই ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে ভবিষ্যতে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কাও অনেক কমে যায়।
এখন প্রশ্ন হল এই টিকা কোন বয়স থেকে নেওয়া উচিত। ডাক্তারদের মতে নয় থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের মধ্যে এই টিকা নেওয়া যায়। তবে সবচেয়ে আদর্শ বয়স হল নয় বছর। এই বয়সে সাধারণত শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী থাকে এবং ভাইরাসটির সংস্পর্শে আসার আগেই শরীরে সুরক্ষা তৈরি হয়ে যায়। নয় বছর বয়সে টিকা নিলে শিশুদের দুটি ডোজ নিতে হয় এবং এই ডোজ দুটি ছয় মাস থেকে বারো মাস ব্যবধানে নেওয়া হয়। কখন কোন ডোজ নিতে হবে তা সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা উচিত।
এগারো থেকে বারো বছর বয়সেও একইভাবে দুটি ডোজে টিকা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি কারোর বয়স পনেরো বছর বা তার বেশি হয় তাহলে তাকে তিনটি ডোজ নিতে হবে। প্রথম ডোজ নেওয়ার পর এক থেকে দুই মাস পরে দ্বিতীয় ডোজ এবং প্রায় ছয় মাস পরে তৃতীয় ডোজ নিতে হয়। এইভাবে তিন ধাপে টিকা নিলে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা গড়ে ওঠে।
যারা সাতাশ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে তাদের ক্ষেত্রে টিকা নেওয়া সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নির্ভর। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই আগে থেকেই ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন এবং শরীরের অবস্থা বিচার করেই ডাক্তার নির্ধারণ করেন কারা এই টিকা নেবেন এবং কারা নেবেন না।
যদিও এই টিকা খুবই নিরাপদ তবুও কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়া নিষেধ। অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের এইচপিভি টিকা নেওয়া উচিত নয়। সন্তান জন্মের পরে চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানাবেন কখন টিকা নেওয়া নিরাপদ। যদি আগে কোনও ধরনের টিকা নেওয়ার ফলে অ্যালার্জি হয়ে থাকে বা অ্যানাফাইল্যাক্সিসের মতো মারাত্মক অবস্থা সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কেউ যদি গুরুতর অসুস্থ হন বা কোনও বিশেষ ওষুধ সেবন করেন সেই ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টিকা নেওয়া উচিত নয়।
এবার আসা যাক টিকার দামের প্রসঙ্গে। বর্তমানে ভারতে এইচপিভি টিকার দাম দুই হাজার টাকা থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায় যদিও কিছু প্রিমিয়াম টিকার দাম আরও বেশি। কোন টিকা কোন ভাইরাস উপপ্রজাতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে সক্ষম তার উপরই মূলত দাম নির্ভর করে।
এ দেশে চার ধরনের টিকা বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রথমটি হল সেরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি সার্ভাভ্যাক যা এইচপিভি ছয় এগারো ষোল এবং আঠারো উপপ্রজাতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। এই টিকাটি সাধারণত দুই থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। দ্বিতীয়টি হল গার্ডাসিল চার যা একইভাবে ছয় এগারো ষোল এবং আঠারো উপপ্রজাতিকে ঠেকাতে পারে এবং এর দাম তিন থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে। তৃতীয়টি সার্ভারিক্স যা মূলত এইচপিভি ষোল এবং আঠারো প্রজাতির বিরুদ্ধে কাজ করে এবং এর দাম আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার পাঁচশোর মধ্যে। আর সবচেয়ে শক্তিশালী হল গার্ডাসিল নাইন যা মোট নয়টি উপপ্রজাতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয় যেমন ছয় এগারো ষোল আঠারো একত্রিশ তেত্রিশ পঁয়তাল্লিশ বায়ান্ন এবং আটান্ন। এই টিকাটি অনেক বেশি দামে বিক্রি হয় এবং প্রতিটি ডোজের দাম প্রায় নয় হাজার থেকে এগারো হাজার টাকার মধ্যে।
জরায়ুমুখের ক্যানসার মহিলাদের জন্য একটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং বিশ্বব্যাপী এই রোগের কারণে প্রতি বছর বহু মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়েন। বিশেষ করে ভারত সহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই ক্যানসারের হার অত্যন্ত বেশি। কারণ এখনো অনেক মানুষ প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন নন এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েও যথেষ্ট তথ্য জানা নেই। এই রোগ থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলির মধ্যে একটি হল এইচপিভি টিকা যা বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত এবং নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত। এই টিকা দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা তৈরি করে এবং কিশোরী বয়স থেকে টিকা নিলে ভবিষ্যতে জরায়ুমুখের ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ভারত সরকার এই টিকাকে আরও সহজলভ্য করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে স্কুল পর্যায়ে বাধ্যতামূলক টিকাকরণ কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনায় রয়েছে। দেশের কিশোরীদের ছোট বয়সেই টিকা দেওয়া হলে তারা ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার আগেই সুরক্ষিত হয়ে যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে যে সঠিক বয়সে সঠিক ডোজে এই টিকা নিলে জরায়ুমুখের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি প্রায় নব্বই শতাংশ কমে যায়। এই তথ্য শুধু উদ্বুদ্ধই করে না বরং প্রমাণ করে যে এইচপিভি টিকা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
তবে এই টিকা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিটি মানুষের শরীরের অবস্থা ভিন্ন এবং কার শরীরে কোন প্রতিষেধক বেশি উপযোগী তা চিকিৎসকই ভালভাবে নির্ধারণ করতে পারেন। এছাড়া কারও শরীরে যদি আগে কোনও অ্যালার্জি তৈরি হয়ে থাকে অথবা কোনও গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকে তাহলেও চিকিৎসকের পরামর্শে টিকা নেওয়া জরুরি। টিকা গ্রহণের পিছনের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া বোঝা এবং নিজের শরীরের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হওয়া স্বাস্থ্য রক্ষার একটি বড় অংশ।
জরায়ুমুখের ক্যানসারের প্রতিরোধে টিকাকরণ ছাড়াও সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমরা যদি পরিবারে সমাজে এবং শিক্ষার ক্ষেত্রেও এই বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করি তাহলে আরও বেশি মানুষ এই টিকার গুরুত্ব বুঝতে পারবেন। ভুল ধারণা ভয় এবং অজ্ঞতা দূর হলে মানুষ নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে আরও সচেতন হতে পারবেন। কিশোরী এবং তরুণীদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক নারী সমাজকেও জানানো দরকার যে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং সময়মতো টিকা নিলে জীবন বাঁচানো যায়।
এইচপিভি টিকা শুধু একটি প্রতিষেধক নয় বরং একটি আশার আলো যা হাজার হাজার মেয়ের জীবন বদলে দিতে পারে। যেসব দেশে বহু বছর ধরে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে সেখানে জরায়ুমুখের ক্যানসারের হার দ্রুত কমে গেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও যদি টিকা উপলব্ধতা এবং সচেতনতা বাড়ে তাহলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এই রোগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। তাই এখনই সময় তথ্যভিত্তিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার এবং সকলকে উৎসাহিত করার যাতে প্রতিটি মেয়ে এবং নারী এই টিকা গ্রহণের বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
সব মিলিয়ে জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকা একটি বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ভারত সরকার ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে এই টিকাকে স্কুল পর্যায়ে চালু করার পরিকল্পনাও নিচ্ছে যাতে দেশের কিশোরীদের আগেই সুরক্ষা দেওয়া যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে সঠিক বয়সে সঠিক ডোজ গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে এই ক্যানসারের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। তাই সচেতনতা ছড়ানো এবং সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আগাম প্রতিরোধই জীবনকে সুরক্ষিত রাখতে পারে এবং এইচপিভি টিকা সেই প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর অস্ত্র।
শেষ কথা হল যে কোনও টিকা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি মানুষের শরীরের অবস্থা আলাদা এবং চিকিৎসকই ঠিক করে দিতে পারেন কোন টিকা আপনার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। সঠিক চিকিৎসা সঠিক দিকনির্দেশ এবং সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণই ভবিষ্যতের বিপদ থেকে মুক্ত থাকার উপায়।