Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

গ্রামীণ ভারতে এআই ডাক্তার প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বসছে স্মার্ট রোবট

৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হলো। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আজ প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল স্বাস্থ্য মিশন ২.০ উদ্বোধন করেছেন। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এআই ডাক্তার বা স্মার্ট ডায়াগনস্টিক রোবট বসানো হবে। এই রোবটগুলো প্রাথমিক লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় করতে পারবে এবং শহরের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সাথে ভিডিও কলে সংযোগ করিয়ে দেবে। এর ফলে গ্রামের মানুষকে আর চিকিৎসার জন্য শহরে ছুটতে হবে না।

ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আজ এক নতুন সূর্যোদয় হলো। স্বাধীনতার পর থেকে যে সমস্যাটি ভারতের গ্রামীণ জনজীবনকে সব সময় ভাবিয়ে এসেছে তা হলো উন্নত চিকিৎসার অভাব। গ্রামের মানুষকে সামান্য জ্বরের চিকিৎসার জন্য বা রক্ত পরীক্ষার জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটে বা গাড়ি ভাড়া করে শহরে যেতে হতো। অনেক সময় সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে পথেই রোগীর মৃত্যু হতো। কিন্তু আজ ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সেই অন্ধকার যুগের অবসান হতে চলেছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল স্বাস্থ্য মিশন ২.০ এর উদ্বোধন করল। এই মিশনের মূল স্তম্ভ হলো এআই ডাক্তার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন স্মার্ট রোবট।

আজ সকালে দিল্লির এইমস বা অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস এর প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই প্রকল্পের শুভ সূচনা করেন। তিনি একটি স্মার্ট রোবটের ডেমো প্রদর্শন করেন যার নাম দেওয়া হয়েছে আরোগ্য বন্ধু। মন্ত্রী বলেন ভারত আজ প্রযুক্তিতে বিশ্বের প্রথম সারির দেশ। আমরা যদি মঙ্গলে রকেট পাঠাতে পারি তাহলে কেন আমরা গ্রামের শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে ডিজিটাল ডাক্তার পাঠাতে পারব না। আজ থেকে আমরা সেই লক্ষ্যেই যাত্রা শুরু করলাম। আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি পঞ্চায়েতের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই আরোগ্য বন্ধু রোবট বসানো হবে।

কী এই এআই ডাক্তার বা আরোগ্য বন্ধু

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে একটি মেশিন কীভাবে মানুষের চিকিৎসা করবে। আসলে এই এআই ডাক্তার কোনো সাধারণ মেশিন নয়। এটি একটি অত্যাধুনিক ডায়াগনস্টিক কিয়স্ক যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দ্বারা পরিচালিত। দেখতে অনেকটা এটিএম মেশিনের মতো হলেও এর কার্যক্ষমতা অনেক বেশি। এই মেশিনে উন্নত মানের সেন্সর ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোন লাগানো আছে।

এর কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত সহজ এবং গ্রাম্য মানুষের কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে। যখন কোনো রোগী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসবেন তিনি মেশিনের সামনে বসবেন। মেশিনটি প্রথমে তার আধার কার্ড বা হেলথ আইডি স্ক্যান করে তার পুরনো চিকিৎসার ইতিহাস বা মেডিকেল হিস্ট্রি বের করে নেবে। এরপর রোগী তার নিজের ভাষায় সমস্যার কথা বলবেন। এই রোবটটি ভারতের ২২টি সরকারি ভাষা এবং ৫০০টিরও বেশি স্থানীয় উপভাষা বুঝতে সক্ষম। অর্থাৎ একজন তামিলভাষী বৃদ্ধা বা একজন বাংলাভাষী কৃষক তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললেই মেশিন তা বুঝে নেবে।

মেশিনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোগীর রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার শরীরের তাপমাত্রা রক্তের অক্সিজেনের মাত্রা বা এসপিও২ এবং হৃদস্পন্দন বা হার্ট রেট মেপে নেবে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকা বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে রক্তের শর্করা বা সুগার এবং হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করা যাবে। এমনকি স্টেথোস্কোপের কাজও এই মেশিনটি ডিজিটাল সেন্সরের মাধ্যমে করতে পারবে। সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করার পর মেশিনের ভেতরে থাকা শক্তিশালী এআই অ্যালগরিদম সেই তথ্য বিশ্লেষণ করবে এবং প্রাথমিক রোগ নির্ণয় করবে।

শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল সেতু

এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো টেলিমেডিসিন বা দূরচিকিৎসা। এআই ডাক্তার বা রোবটটি যদি দেখে যে রোগীর সমস্যা সাধারণ যেমন সর্দি কাশি বা সাধারণ জ্বর তাহলে সে নিজেই ওষুধ প্রেসক্রাইব করবে বা লিখে দেবে। কিন্তু যদি সমস্যাটি জটিল হয় যেমন হার্টের সমস্যা বা নিউরোলজিক্যাল কোনো সমস্যা তখন রোবটটি সঙ্গে সঙ্গে শহরের কোনো বড় সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে ভিডিও কলে সংযোগ স্থাপন করে দেবে।

শহরের ডাক্তার তখন তার স্ক্রিনে রোগীর সমস্ত রিপোর্ট দেখতে পাবেন এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে রোগীর সাথে সরাসরি কথা বলে পরামর্শ দেবেন। অর্থাৎ গ্রামের একজন গরিব মানুষ নিজের গ্রামে বসেই দিল্লি মুম্বাই বা কলকাতার সেরা ডাক্তারদের পরামর্শ পাবেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন এটি কেবল চিকিৎসা নয় এটি হলো সময়ের সাশ্রয় এবং অর্থের সাশ্রয়। একজন রোগীকে আর হাজার হাজার টাকা খরচ করে শহরে এসে হোটেলের ভাড়া দিয়ে থাকতে হবে না।

বাস্তবায়নের রোডম্যাপ এবং চ্যালেঞ্জ

সরকার জানিয়েছে প্রথম পর্যায়ে দেশের ১০টি রাজ্যের ১০০টি পিছিয়ে পড়া জেলায় বা অ্যাসপিরেশনাল ডিস্ট্রিক্টে এই রোবট বসানো হবে। উত্তর প্রদেশ বিহার পশ্চিমবঙ্গ ওড়িশা এবং রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই রোবটগুলো চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেটের প্রয়োজন। সেই কথা মাথায় রেখে প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সোলার প্যানেল বা সৌরবিদ্যুৎ এবং হাই স্পিড স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বা স্টারলিঙ্ক জাতীয় প্রযুক্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

news image
আরও খবর

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। গ্রামের মানুষকে এই প্রযুক্তির ওপর ভরসা করতে শেখানোই সবচেয়ে বড় কাজ। অনেকেই ভাবতে পারেন যে একটি মেশিন কীভাবে মানুষের মতো যত্ন নিয়ে চিকিৎসা করবে। এই ভীতি দূর করার জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে স্বাস্থ্য সহায়ক বা টেকনিশিয়ান থাকবেন যিনি রোগীকে মেশিনের ব্যবহার বুঝিয়ে দেবেন। এদের নাম দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল স্বাস্থ্য মিত্র। সরকার আগামী এক বছরে প্রায় ৫০ হাজার ডিজিটাল স্বাস্থ্য মিত্র নিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছে যা গ্রামীণ কর্মসংস্থানেও বড় ভূমিকা রাখবে।

অর্থনৈতিক প্রভাব এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু এর মতে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে চিকিৎসার খরচের একটি বড় অংশ চলে যায় যাতায়াত এবং ওষুধের পেছনে। প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল স্বাস্থ্য মিশন ২.০ এই খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ কমিয়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া রোগ নির্ণয় আগেভাগে হলে চিকিৎসার খরচও কমে যায়। এআই ডাক্তার ক্যানসার বা যক্ষ্মার মতো রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো খুব দ্রুত ধরে ফেলতে পারবে যা মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করবে।

এছাড়াও ভারতের ফার্মাসিউটিক্যাল বা ওষুধ শিল্পেও এর প্রভাব পড়বে। জেনেরিক ওষুধের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য এই রোবটগুলো প্রোগ্রাম করা হয়েছে। অর্থাৎ রোবটটি যখন প্রেসক্রিপশন লিখবে তখন সে দামী ব্র্যান্ডের ওষুধের বদলে সস্তা কিন্তু কার্যকরী জেনেরিক ওষুধের নাম লিখবে। এর ফলে গরিব মানুষের পকেট বাঁচবে।

গোপনীয়তা এবং ডেটা সুরক্ষা

ডিজিটাল যুগে তথ্যের গোপনীয়তা একটি বড় প্রশ্ন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে এই পুরো ব্যবস্থাটি আয়ুষ্মান ভারত ডিজিটাল মিশনের বা এবিডিএম এর অধীনে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে থাকবে। রোগীর তথ্য এনক্রিপ্ট করা থাকবে এবং রোগীর সম্মতি ছাড়া সেই তথ্য অন্য কেউ দেখতে পাবে না। ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। ভারত সরকার জানিয়েছে তারা ডেটা প্রাইভেসি নিয়ে কোনো আপস করবে না।

চিকিৎসক মহলের প্রতিক্রিয়া

ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন বা আইএমএ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে তবে তারা সতর্কও করেছে। আইএমএর সভাপতি বলেন প্রযুক্তি আমাদের বন্ধু হতে পারে কিন্তু তা ডাক্তারের বিকল্প নয়। এআই ডাক্তারকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করতে হবে যাতে সে তার সীমাবদ্ধতা বোঝে। জটিল পরিস্থিতিতে যেন সে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে মানুষের ওপর ছেড়ে দেয়। সরকার জানিয়েছে এই রোবটগুলো 'হিউম্যান ইন দ্য লুপ' বা মানুষের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সবসময় একজন মানুষের হাতেই থাকবে।

ভবিষ্যতের ভারত

২০৩০ সালের মধ্যে ভারতকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং একটি সুস্থ সবল জাতি হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন সরকার দেখছে এই এআই ডাক্তার প্রকল্প সেই স্বপ্নের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ থেকে পাঁচ বছর পর হয়তো গ্রামের কোনো এক ছোট্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বসে এক বৃদ্ধ কৃষক যখন চোখের পলকে নিজের হার্টের চেকআপ করিয়ে বাড়ি ফিরবেন তখন তিনি হয়তো বুঝবেন না যে এর পেছনে কত জটিল প্রযুক্তি কাজ করছে। কিন্তু তিনি এটুকু বুঝবেন যে তার দেশ তার স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখছে।

আজকের এই ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দিনটি তাই কেবল প্রযুক্তির জয়গান গাওয়ার দিন নয়। এটি হলো স্বাস্থ্য পরিষেবার গণতন্ত্রীকরণের দিন। শহরের পাঁচতারা হাসপাতালের সুবিধা আজ গ্রামের কুঁড়েঘরে পৌঁছে গেল। ডিজিটাল ইন্ডিয়া আজ তার সার্থকতা খুঁজে পেল ডিজিটাল হেলথ মিশনের মাধ্যমে। আরোগ্য বন্ধু কেবল একটি রোবট নয় এটি হলো কোটি কোটি ভারতবাসীর সুস্থ থাকার নতুন আশা।

Preview image