Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ভারতের চিকিৎসায় নতুন ইতিহাস চেন্নাইয়ে তৈরি হলো বিশ্বের প্রথম থ্রি ডি প্রিন্টেড হৃদপিণ্ড এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অপেক্ষার দিন শেষ

ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হলো বিশ্বের প্রথম থ্রি ডি বায়োপ্রিন্টেড মানব হৃদপিণ্ড। আইআইটি মাদ্রাজ এবং ভারতীয় বিজ্ঞানীদের তৈরি 'জীবন ধারা' বায়োপ্রিন্টার রোগীর নিজস্ব স্টেম সেল ব্যবহার করে এই কৃত্রিম অথচ জীবন্ত অঙ্গ তৈরি করেছে। অঙ্গের অভাবে মৃত্যু এখন অতীত। ভারত বিশ্বকে দেখাল নতুন জীবন দানের পথ।

ভারতের চিকিৎসায় নতুন ইতিহাস চেন্নাইয়ে তৈরি হলো বিশ্বের প্রথম থ্রি ডি প্রিন্টেড হৃদপিণ্ড এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অপেক্ষার দিন শেষ
Health & Science

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি বা বিয়োগান্তক ঘটনা হলো যখন চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও কেবল একটি অঙ্গের অভাবে কাউকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৫ লক্ষ মানুষের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয় কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দাতাদের অভাবে তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক মানুষই সময়মতো অঙ্গ পান। হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষার তালিকায় বা ওয়েটিং লিস্টে থাকা অবস্থাতেই মারা যান। কিডনি লিভার বা হৃদপিণ্ডের জন্য এই অপেক্ষা ছিল এক অনন্ত যন্ত্রণার মতো। কিন্তু আজ থেকে সেই যন্ত্রণার দিন শেষ হলো। ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এমন এক অসাধ্য সাধন করলেন যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।

আজ সকালে চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে এক দীর্ঘ বারো ঘণ্টার জটিল অস্ত্রপচারের পর ঘোষণা করা হয় যে বিশ্বের প্রথম থ্রি ডি বায়োপ্রিন্টেড হৃদপিণ্ড সফলভাবে একজন রোগীর শরীরে বসানো হয়েছে এবং তা স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। এই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি করেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং আইআইটি মাদ্রাজের ডিরেক্টর। যে হৃদপিণ্ডটি বসানো হয়েছে তা কোনো দাতা বা ডোনারের শরীর থেকে নেওয়া হয়নি বা এটি কোনো প্লাস্টিক বা ধাতুর তৈরি যন্ত্র নয়। এটি ল্যাবরেটরিতে তৈরি সম্পূর্ণ জীবন্ত মানবিক কোষ দিয়ে গঠিত একটি হৃদপিণ্ড।

জীবন ধারা বায়োপ্রিন্টার এবং প্রযুক্তির জাদু

এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পেছনে রয়েছে আইআইটি মাদ্রাজের বায়োটেকনোলজি বিভাগ এবং চেন্নাইয়ের একদল তরুণ বিজ্ঞানীর পনেরো বছরের কঠোর গবেষণা। তারা তৈরি করেছেন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত থ্রি ডি বায়োপ্রিন্টার যার নাম দেওয়া হয়েছে 'জীবন ধারা'। সাধারণ থ্রি ডি প্রিন্টার যেমন প্লাস্টিক বা ধাতু গলিয়ে কোনো বস্তু তৈরি করে ঠিক তেমনই এই বায়োপ্রিন্টার ব্যবহার করে 'বায়ো ইঙ্ক' বা জৈব কালি।

এই বায়ো ইঙ্ক তৈরি করা হয় রোগীর নিজের শরীর থেকে নেওয়া স্টেম সেল বা মূল কোষ এবং বিশেষ ধরনের কোলাজেন জেলের মিশ্রণে। প্রথমে সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই এর মাধ্যমে রোগীর হৃদপিণ্ডের একটি নিখুঁত ডিজিটাল নকশা বা ব্লু প্রিন্ট তৈরি করা হয়। তারপর সেই নকশা অনুযায়ী জীবন ধারা প্রিন্টারটি স্তরে স্তরে বা লেয়ার বাই লেয়ার কোষ সাজিয়ে হৃদপিণ্ড তৈরি করতে শুরু করে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল হৃদপিণ্ডের ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম রক্তনালী বা ব্লাড ভেসেল এবং ভালভগুলো তৈরি করা। বিজ্ঞানীরা এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করেছেন। এআই প্রিন্টিং এর সময় প্রতিটি কোষের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করে যাতে রক্ত চলাচলের পথগুলো নিখুঁতভাবে তৈরি হয়। একটি সম্পূর্ণ হৃদপিণ্ড প্রিন্ট করতে সময় লাগে প্রায় ৭২ ঘণ্টা। প্রিন্ট করার পর সেই অঙ্গটিকে একটি বিশেষ বায়ো রিঅ্যাক্টরে রাখা হয় যেখানে সেটি পরিপক্ক হয় এবং ধুকপুক করতে শুরু করে।

প্রথম রোগীর পুনর্জন্ম

এই ঐতিহাসিক অস্ত্রপচারের সাক্ষী হলেন তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী যুবক সেন্থিল কুমার। সেন্থিল গত পাঁচ বছর ধরে এন্ড স্টেজ হার্ট ফেইলিওর বা হৃদযন্ত্রের শেষ পর্যায়ের অকার্যকারিতায় ভুগছিলেন। তার হৃদপিণ্ড মাত্র ২০ শতাংশ কাজ করছিল এবং ডাক্তাররা বলেছিলেন জরুরি ভিত্তিতে প্রতিস্থাপন না করলে তিনি আর ছয় মাসের বেশি বাঁচবেন না। কিন্তু তার বিরল রক্তের গ্রুপের কারণে কোনো দাতা পাওয়া যাচ্ছিল না।

সেন্থিলের পরিবার যখন সব আশা ছেড়ে দিয়েছিল তখন ডাক্তাররা তাদের এই পরীক্ষামূলক চিকিৎসার প্রস্তাব দেন। সেন্থিল রাজি হয়ে যান। আজ অস্ত্রপচারের পর যখন তার নতুন হৃদপিণ্ডটি প্রথমবার স্পন্দিত হলো তখন অপারেশন থিয়েটারে উপস্থিত ডাক্তার এবং নার্সদের চোখে জল চলে আসে। প্রধান সার্জন ডক্টর পি বালানি বলেন এটি কেবল একটি অপারেশন নয় এটি একটি পুনর্জন্ম। সেন্থিলের শরীর এই নতুন অঙ্গটিকে নিজের অংশ বলেই মনে করছে কারণ এটি তার নিজের কোষ দিয়েই তৈরি।

কেন এটি দাতা অঙ্গের চেয়ে ভালো

প্রচলিত অঙ্গ প্রতিস্থাপনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অর্গান রিজেকশন বা শরীরের নতুন অঙ্গকে প্রত্যাখ্যান করা। যেহেতু দাতার অঙ্গটি বাইরের বস্তু তাই রোগীর ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তাকে আক্রমণ করে। এর জন্য রোগীকে সারা জীবন দামি ইমিunosuppressant বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দমানোর ওষুধ খেতে হয় যার অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে এবং এর ফলে রোগী সহজেই অন্য রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

কিন্তু থ্রি ডি বায়োপ্রিন্টেড অঙ্গে এই সমস্যা নেই। যেহেতু এটি রোগীর নিজের ডিএনএ এবং কোষ দিয়ে তৈরি তাই শরীর একে সহজেই গ্রহণ করে নেয়। সেন্থিল কুমারকে কোনো ইমিউনোসাপ্রেশ্যান্ট ওষুধ খেতে হবে না। তিনি কয়েক মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন।

অর্থনৈতিক প্রভাব এবং অঙ্গ পাচার রোধ

news image
আরও খবর

ভারতে অঙ্গের কালো বাজার বা অঙ্গ পাচার একটি বড় সামাজিক সমস্যা। গরিব মানুষদের টাকার লোভে কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। বায়োপ্রিন্টিং প্রযুক্তি সফল হওয়ার ফলে এই অবৈধ ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ যখন ল্যাবরেটরিতেই প্রয়োজন মতো অঙ্গ তৈরি করা যাবে তখন আর কারো শরীরের অঙ্গের প্রয়োজন হবে না।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি একটি বিপ্লব। বর্তমানে একটি হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা খরচ হয় এবং তারপর সারা জীবন ওষুধের খরচ আছে। বায়োপ্রিন্টেড হার্টের প্রাথমিক খরচ একটু বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অনেক সস্তা হবে। সরকার জানিয়েছে তারা এই প্রযুক্তিকে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসবে যাতে গরিব মানুষও এর সুবিধা পায়। এটি ভারতের মেডিকেল টুরিজম বা চিকিৎসা পর্যটন শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। সারা বিশ্ব থেকে রোগীরা এখন নতুন অঙ্গের জন্য ভারতে আসবেন।

অন্যান্য অঙ্গ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

হৃদপিণ্ড হলো সবচেয়ে জটিল অঙ্গগুলোর মধ্যে একটি। বিজ্ঞানীরা যখন হৃদপিণ্ড তৈরি করতে সফল হয়েছেন তখন অন্যান্য অঙ্গ তৈরি করা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আইআইটি মাদ্রাজের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন তারা ইতিমধ্যেই বায়োপ্রিন্টেড কিডনি এবং লিভার নিয়ে গবেষণা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আগামী দুই বছরের মধ্যে কিডনি এবং লিভার প্রতিস্থাপন শুরু হবে।

এছাড়াও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের জন্য নতুন চামড়া বা স্কিন প্রিন্ট করা হচ্ছে যা প্লাস্টিক সার্জারিতে বিপ্লব এনেছে। ভবিষ্যতে হয়তো মানুষের কোনো অঙ্গ নষ্ট হয়ে গেলে গাড়ির পার্টস বদলানোর মতো সহজেই তা বদলে ফেলা যাবে। মানুষ অনেক বেশি দিন সুস্থভাবে বাঁচতে পারবে।

নৈতিকতা এবং ঈশ্বরের কাজ

মানুষের ল্যাবরেটরিতে জীবন তৈরি করা নিয়ে কিছু নৈতিক বা এথিক্যাল প্রশ্নও উঠছে। অনেকে বলছেন মানুষ কি ঈশ্বরের কাজ নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন তারা জীবন তৈরি করছেন না তারা কেবল জীবনকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজই হলো মানুষের কষ্ট লাঘব করা। তবে এই প্রযুক্তির যাতে অপব্যবহার না হয় তার জন্য সরকার কঠোর নির্দেশিকা বা গাইডলাইন তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের জয়জয়কার

এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর সবচেয়ে বড় ঘটনা বলে অভিহিত করেছে। আমেরিকা এবং ইউরোপের উন্নত দেশগুলো যা করতে পারেনি ভারত তা করে দেখিয়েছে। হার্ভার্ড এবং জনস হপকিন্স এর মতো বিখ্যাত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইআইটি মাদ্রাজের সাথে যৌথ গবেষণার প্রস্তাব দিয়েছে। ভারত এখন বায়োটেকনোলজির বিশ্বগুরু।

সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া

ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে আজকের দিনটি দিওয়ালির মতো আনন্দের। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ বিজ্ঞানীদের এবং সেন্থিল কুমারকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। কলকাতার এক কিডনি রোগী যিনি গত তিন বছর ধরে ডায়ালিসিস নিচ্ছেন তিনি বলেন আজ আমার মনে নতুন আশা জাগল। হয়তো আমিও একদিন এই মেশিনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাব। একজন মা যার শিশু লিভারের রোগে আক্রান্ত তিনি বলেন আমি জানতাম ভারতের বিজ্ঞানীরা আমাদের হতাশ করবেন না।

উপসংহার

২০২৬ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি দিনটি প্রমাণ করল যে মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনো বাধাই টেকে না। মৃত্যু যেখানে নিশ্চিত ছিল বিজ্ঞান সেখানে জীবনের নতুন রাস্তা তৈরি করল। চেন্নাইয়ের হাসপাতালে যে নতুন হৃদপিণ্ডটি আজ ধুকপুক করছে তা কেবল সেন্থিল কুমারের নয় তা হলো সমগ্র মানবজাতির আশার স্পন্দন। এই প্রযুক্তি আমাদের শেখায় যে আমাদের শরীরের সীমাবদ্ধতাকে আমরা অতিক্রম করতে পারি। ভারত আজ বিশ্বকে এক অমৃতের সন্ধান দিল। এই বায়োপ্রিন্টেড অঙ্গ লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখে হাসি ফোটাবে এবং তাদের পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবে। আমরা এখন এক নতুন পৃথিবীর বাসিন্দা যেখানে অঙ্গের অভাবে কাউকে মরতে হবে না। জয় বিজ্ঞান জয় জীবন জয় ভারত।

Preview image