চোখের রেটিনার ছবি বিশ্লেষণ করে ডায়াবিটিস শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই রোগ ধরার এই নতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে এ দেশে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি এক যুগান্তকারী সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এক ফোঁটা রক্তও আর বের করতে হবে না আঙুল থেকে। আর সুচের যন্ত্রণা, ভয় বা অস্বস্তিও থাকবে না। শুধু চোখের দিকে তাকালেই জানা যাবে শরীরে ডায়াবিটিস বাসা বেঁধেছে কি না। এমনই অবিশ্বাস্য অথচ বাস্তব সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স—সংক্ষেপে এআই—এবার মানুষের চোখের ছবি বিশ্লেষণ করে ডায়াবিটিস শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। এই প্রযুক্তিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান সময়ে ডায়াবিটিস বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ ও দ্রুত বিস্তার লাভ করা রোগ। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব—সব মিলিয়ে এই রোগের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ভারতেই অন্তত ১০ কোটি মানুষ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত। আরও ভয়াবহ তথ্য হল, এই রোগের শিকার হচ্ছে শিশু ও কিশোররাও। ফলে ডায়াবিটিস শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা নয়, বরং এটি এক সর্বজনীন স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।
ডায়াবিটিস শনাক্ত করার প্রচলিত পদ্ধতি হল রক্ত পরীক্ষা। ফাস্টিং ব্লাড সুগার, পোস্টপ্রান্ডিয়াল সুগার বা HbA1c পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা নির্ণয় করা হয়। কিন্তু এই পদ্ধতিগুলির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক মানুষ নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করতে ভয় পান। আবার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক পরীক্ষার সুবিধা সব জায়গায় পাওয়া যায় না। ফলে বহু মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে অজান্তেই ডায়াবিটিসে আক্রান্ত থাকেন, যা পরে মারাত্মক জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে নতুন এক দিগন্ত খুলে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তি। গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, ডায়াবিটিসের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে মানুষের চোখে, বিশেষ করে রেটিনায়। চোখের ভিতরের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলিতে যে পরিবর্তন ঘটে, তা ডায়াবিটিসের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। তবে সাধারণ চোখের পরীক্ষায় এই সূক্ষ্ম পরিবর্তন অনেক সময় ধরা পড়ে না। ঠিক এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এআই প্রযুক্তি।
ভারত ও আমেরিকার একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সংস্থা যৌথভাবে এই বিষয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। মেঙ্গালুরুর ইয়েনেপোয়া ইউনিভার্সিটি, মাদ্রাজ ডায়াবিটিস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (এমডিআরএফ) এবং আমেরিকার ইমোরি ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা এই নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন। তাঁদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ‘ডায়াবিটিস টেকনোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স’-এ।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ডায়াবিটিস রোগীর রেটিনা ও সুস্থ মানুষের রেটিনার মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকে। চোখের ভিতরের শিরা-উপশিরায় যে পরিবর্তনগুলি ঘটে, সেগুলি মানুষের চোখে সহজে ধরা পড়ে না। কিন্তু উন্নত কম্পিউটার অ্যালগরিদম ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সাহায্যে এআই সেই পরিবর্তনগুলি বিশ্লেষণ করতে পারে। রেটিনার ত্রিমাত্রিক ছবি নিয়ে সেই ছবি থেকে লক্ষ লক্ষ তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ণয় করতে পারে, ব্যক্তির ডায়াবিটিস আছে কি না।
ডায়াবিটিস হলে রেটিনার রক্তবাহী সরু ধমনীগুলি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। চোখের ভিতরের রক্তজালিকাগুলিতে প্রদাহ শুরু হয়, যার ফলে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। ফলে রেটিনার বিভিন্ন অংশে ঠিকমতো অক্সিজেন পৌঁছায় না। অনেক সময় চোখের ভিতরে রক্তক্ষরণও ঘটে। রেটিনার উপর ছোট ছোট লাল বিন্দু, ফোস্কার মতো দাগ বা হলদেটে চর্বির মতো জমাট পদার্থ দেখা যায়। দৃষ্টি ঝাপসা হতে থাকে, অনেক সময় সোজা জিনিসও বাঁকা দেখা যায়। এই সমস্ত পরিবর্তন এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
গবেষণার প্রথম পর্যায়ে ১৩৯ জন মানুষের উপর এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রায় ২৭৩টি রেটিনাল ইমেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডায়াবিটিস রোগীদের চোখে নির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন রয়েছে। গবেষকেরা মনে করছেন, আরও বেশি মানুষের উপর এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি যদি সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে ডায়াবিটিস শনাক্ত করার পদ্ধতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল দ্রুত ও সহজ রোগ নির্ণয়। কোনও রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র চোখের ছবি বিশ্লেষণ করে ডায়াবিটিস শনাক্ত করা গেলে সাধারণ মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত সুবিধাজনক হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকায়, যেখানে আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা সীমিত, সেখানে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
এআই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা। গবেষকেরা বলছেন, শুধু ডায়াবিটিস শনাক্ত করাই নয়, রক্তে শর্করার মাত্রা ভবিষ্যতে কীভাবে ওঠানামা করতে পারে, তাও অনুমান করা সম্ভব হতে পারে। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য আগেভাগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ক্যানসার শনাক্তকরণ, হৃদরোগ নির্ণয়, নিউরোলজিক্যাল রোগ বিশ্লেষণ—সব ক্ষেত্রেই এআই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ডায়াবিটিস শনাক্তকরণে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
তবে এই প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, এআই প্রযুক্তির নির্ভুলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ভুল নির্ণয় রোগীর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করার জন্য প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো ও প্রশিক্ষিত জনবল। তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও ডেটা নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। যদি চোখের ছবি বিশ্লেষণ করে সহজেই ডায়াবিটিস শনাক্ত করা যায়, তবে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ধারণাও বদলে যাবে। মানুষ আরও সহজে ও দ্রুত নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে পারবেন।
ডায়াবিটিস বর্তমানে শুধু একটি রোগ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। এই রোগের কারণে কর্মক্ষমতা কমে যায়, চিকিৎসার খরচ বাড়ে এবং জীবনযাত্রার মান নষ্ট হয়। ফলে ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে নতুন ও কার্যকর পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে চোখের ছবি বিশ্লেষণ করে ডায়াবিটিস শনাক্ত করার এআই প্রযুক্তি চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এটি শুধু রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতিকে সহজ করবে না, বরং ভবিষ্যতে ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থার পথও খুলে দেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে। গবেষণা যত এগোবে, ততই এই প্রযুক্তির নির্ভুলতা বাড়বে। ভবিষ্যতে স্মার্টফোন বা সাধারণ চোখের স্ক্যানিং ডিভাইসের সাহায্যে মানুষ নিজেই নিজের চোখের ছবি তুলে ডায়াবিটিসের ঝুঁকি জানতে পারবেন—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর এই নতুন প্রযুক্তি শুধু ডায়াবিটিস শনাক্ত করার একটি নতুন পদ্ধতি নয়, বরং এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই চোখের ছবি বিশ্লেষণ করে রোগ শনাক্ত করার ধারণা আজ গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকলেও, আগামী দিনে তা বাস্তব চিকিৎসা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
মানবসভ্যতা যত এগোচ্ছে, ততই প্রযুক্তি মানুষের জীবনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। এআই প্রযুক্তি হয়তো আগামী দিনে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়ক হয়ে উঠবে—যেখানে চোখের এক ঝলকেই ধরা পড়বে শরীরের জটিল রোগের সংকেত।
ডায়াবিটিসের মতো ভয়াবহ রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই প্রযুক্তি যদি সফল হয়, তবে তা কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে। আর সেখানেই নিহিত রয়েছে এই গবেষণার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব—মানুষের জীবনকে আরও নিরাপদ, সহজ ও সুস্থ করে তোলার সম্ভাবনা।
মানবসভ্যতা যত এগোচ্ছে, ততই প্রযুক্তি মানুষের জীবনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। এআই প্রযুক্তি হয়তো আগামী দিনে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়ক হয়ে উঠবে—যেখানে চোখের এক ঝলকেই ধরা পড়বে শরীরের জটিল রোগের সংকেত।
ডায়াবিটিসের মতো ভয়াবহ রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই প্রযুক্তি যদি সফল হয়, তবে তা কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে। আর সেখানেই নিহিত রয়েছে এই গবেষণার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব—মানুষের জীবনকে আরও নিরাপদ, সহজ ও সুস্থ করে তোলার সম্ভাবনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে। যেখানে রোগ নির্ণয়ের জন্য আর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না, প্রয়োজন হবে না জটিল পরীক্ষার। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের শরীরের সূক্ষ্ম সংকেত বিশ্লেষণ করে আগেভাগেই সতর্কবার্তা দিতে পারবে। এতে শুধু রোগ শনাক্ত নয়, রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।
এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে যদি প্রাথমিক স্তরেই ডায়াবিটিস ধরা যায়, তবে রোগের ভয়াবহ জটিলতা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হবে। হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা, চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, স্নায়ুর ক্ষতি—ডায়াবিটিস থেকে জন্ম নেওয়া এই সব বিপজ্জনক সমস্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে। ফলে চিকিৎসার খরচ যেমন কমবে, তেমনই মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে।
গবেষকদের বিশ্বাস, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে এবং সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে। তখন হয়তো হাসপাতালের পাশাপাশি স্কুল, অফিস কিংবা ঘরের কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও চোখের ছবি তুলে ডায়াবিটিস নির্ণয় করা সম্ভব হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি শুধু প্রযুক্তির জয় নয়, বরং মানুষের সুস্থ ভবিষ্যতের দিকে এক বড় পদক্ষেপ।