আইসিসি টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ এর সুপার এইট পর্বে জায়গা করে নিয়ে চমক দিল শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দল টুর্নামেন্টের আগে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত না হলেও গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে লঙ্কানরা।
আইসিসি টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ এর সুপার এইট পর্বে উঠে শ্রীলঙ্কা যে চমক উপহার দিয়েছে তার নেপথ্যে রয়েছে লড়াই বিশ্বাস আর কঠোর পরিশ্রমের এক অসাধারণ গল্প টুর্নামেন্ট শুরুর আগে শ্রীলঙ্কাকে খুব বেশি শক্তিশালী দল হিসেবে ধরা হয়নি বড় দলগুলির তুলনায় তাদের অভিজ্ঞতা ও ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন ছিল অনেকেরই কিন্তু মাঠে নামার পর সেই সমস্ত হিসেব একে একে ভুল প্রমাণ করেছে লঙ্কানরা গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক জয় আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং এবং নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের মাধ্যমে তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট এখনও ঘুরে দাঁড়াতে জানে।
এই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ওপেনার পাথুম নিসাঙ্কা যিনি অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দুর্দান্ত শতরান করে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে দেন সেই ইনিংস শুধুই একটি শতরান ছিল না বরং তা ছিল সাহস আত্মবিশ্বাস ও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের এক নিখুঁত প্রদর্শনী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উইকেটে টিকে থেকে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বড় মঞ্চে দায়িত্ব নিতে হয়।
নিসাঙ্কা এখন আর শুধু একজন ওপেনার নন তিনি শ্রীলঙ্কার নির্ভরযোগ্য রান মেশিন হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠেছেন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শতরান করা শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ক্রিকেটার তিনি তাঁর আগে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন কেবল মাহেলা জয়বর্ধনে এমন একটি তালিকায় নিজের নাম লেখানো যে কোনও ব্যাটারের জন্যই গর্বের কিন্তু নিসাঙ্কার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বিশেষ কারণ তিনি এমন এক সময়ে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন যখন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট নতুন করে নিজেদের পরিচয় গড়ার চেষ্টা করছে।
শুধু টি টোয়েন্টি নয় একদিনের ক্রিকেটেও নিসাঙ্কা ইতিমধ্যেই ইতিহাস গড়েছেন আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ২১০ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে তিনি শ্রীলঙ্কার হয়ে প্রথম দ্বিশতরান করা ব্যাটার হিসেবে নাম লিখিয়েছেন এই ইনিংস দেখিয়ে দেয় যে তিনি কেবল ছোট ফরম্যাটের খেলোয়াড় নন বরং দীর্ঘ ইনিংস গড়ে ম্যাচ নিজের দখলে নেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর রয়েছে।
তবে এই সাফল্যের গল্প যতটা ঝলমলে তার পেছনের পথ ততটাই কঠিন সংগ্রামে ভরা পাথুম নিসাঙ্কার শৈশব কেটেছে চরম অভাবের মধ্যে তাঁর বাবা গলে একটি মাঠে সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ করতেন সংসারের আয় ছিল খুবই সীমিত ভালো ক্রিকেট ব্যাট প্যাড বা গ্লাভস কেনার মতো সামর্থ্য ছিল না অনেক সময় পুরনো সরঞ্জাম নিয়েই অনুশীলন করতে হয়েছে তাঁকে।
নিসাঙ্কার মা ছিলেন তাঁর জীবনের আর এক বড় অনুপ্রেরণা সংসার চালাতে এবং ছেলের ক্রিকেট খেলার খরচ জোগাতে তিনি মন্দিরের বাইরে ফুল ও ধূপ বিক্রি করতেন অনেক সময় সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে সামান্য আয়ের মধ্যেও ছেলের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন তিনি সেই আত্মত্যাগই আজ বাস্তব রূপ পেয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আলোয়।
এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই নিসাঙ্কা শিখেছেন লড়াই করতে শিখেছেন সুযোগের মূল্য দিতে ছোট বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল অসম্ভব জেদ আর অধ্যবসায় স্থানীয় স্তরের ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্স করে ধীরে ধীরে তিনি নির্বাচকদের নজরে আসেন ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকেই তাঁর ব্যাট কথা বলতে শুরু করে।
টেস্ট একদিনের এবং টি টোয়েন্টি তিন ফরম্যাটেই ধারাবাহিক রান করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে তিনি কেবল মুহূর্তের নায়ক নন বরং দীর্ঘদিন দলের ভরসা হয়ে ওঠার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে হাজার হাজার রান করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই এবং প্রতিটি ইনিংসে তাঁর ব্যাটিংয়ে দেখা যায় পরিণত মনোভাব ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা এবং ধৈর্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে নিসাঙ্কার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মানসিক দৃঢ়তা ছোটবেলার অভাব তাঁকে ভেঙে দেয়নি বরং আরও শক্ত করেছে মাঠে কোনও চাপই তাঁকে সহজে নড়বড়ে করতে পারে না বড় দলের বিরুদ্ধে বড় ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্সই তার প্রমাণ।
আইসিসি টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার এইট পর্বে ওঠা শ্রীলঙ্কার কাছে শুধু একটি পর্বে পৌঁছনো নয় বরং এটি একটি বার্তা যে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে লঙ্কান ক্রিকেট আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে আর সেই প্রজন্মের মুখ নিঃসন্দেহে পাথুম নিসাঙ্কা।
এই বিশ্বকাপে তাঁর পারফরম্যান্স ইতিমধ্যেই তাঁকে বিশ্ব ক্রিকেটের আলোচনায় এনে দিয়েছে ভবিষ্যতে আইপিএল বিগ ব্যাশ বা অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে তাঁর চাহিদা বাড়বে বলেই মনে করছেন অনেকে তবে নিসাঙ্কা নিজে বরাবরই বলেছেন দেশের জার্সিতে খেলাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় গর্ব।
একসময় যে ছেলে ভালো ব্যাট কেনার সামর্থ্য না থাকার কারণে স্বপ্ন দেখা প্রায় অসম্ভব মনে করত আজ সেই ছেলেই বিশ্বের সেরা বোলারদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শতরান করছে এই গল্প শুধু ক্রিকেটের নয় এই গল্প লড়াইয়ের আত্মবিশ্বাসের এবং কখনও হার না মানার।
সব মিলিয়ে বলা যায় পাথুম নিসাঙ্কার উত্থান শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের জন্য শুধু একটি ভালো ব্যাটার পাওয়ার গল্প নয় বরং এটি একটি নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত প্রতিভা পরিশ্রম আর ত্যাগ একসঙ্গে মিশলে যে কোনও সীমাবদ্ধতাকেই জয় করা যায় নিসাঙ্কা সেই জীবন্ত প্রমাণ আর ভবিষ্যতে তিনি যে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসে আরও বড় অধ্যায় লিখবেন তা বলাই যায়।
এই উত্থানের গল্প আরও গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় এটি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয় বরং একটি দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের প্রতিচ্ছবি পাথুম নিসাঙ্কার মতো একজন ক্রিকেটারের উত্থান শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটকে নতুন করে বিশ্বাস জুগিয়েছে যে প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে লড়াই করা সম্ভব।
শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট গত এক দশকে নানা চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে একের পর এক অভিজ্ঞ তারকার অবসর দলের ধারাবাহিকতা নষ্ট করেছে আর্থিক সংকট প্রশাসনিক সমস্যা এবং তরুণ প্রতিভাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার অভাব সব মিলিয়ে এক সময় মনে হচ্ছিল লঙ্কান ক্রিকেট বুঝি হারিয়ে যেতে বসেছে ঠিক সেই সময়েই নিসাঙ্কার মতো ক্রিকেটাররা সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
পাথুম নিসাঙ্কার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর মানসিক দৃঢ়তা ছোটবেলার অভাব তাঁকে হতাশ করেনি বরং আরও দৃঢ় করেছে মাঠে নামলে তাঁর চোখে মুখে যে আত্মবিশ্বাস দেখা যায় তা অভিজ্ঞ অনেক ক্রিকেটারের মধ্যেও দেখা যায় না কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ধৈর্য ধরে ইনিংস গড়া ম্যাচের গতি বুঝে নিজের খেলা বদলানো এসব গুণই তাঁকে আলাদা করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নিসাঙ্কার ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর টেকনিক্যাল শৃঙ্খলা তিনি অহেতুক ঝুঁকি নেন না আবার সুযোগ পেলে আক্রমণ করতেও দ্বিধা করেন না আধুনিক ক্রিকেটে যেখানে অনেক ব্যাটার শুরু থেকেই বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হয়ে যান সেখানে নিসাঙ্কা সময় নিয়ে নিজেকে সেট করেন এবং তারপর ম্যাচ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যান।
তাঁর এই মানসিকতা দলের অন্য তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে ড্রেসিংরুমে তিনি এখন আর শুধু একজন ব্যাটার নন বরং অনুপ্রেরণার উৎস একজন যে প্রমাণ করেছেন কঠিন পরিস্থিতি থেকেও উঠে আসা সম্ভব শ্রীলঙ্কার তরুণ ক্রিকেটাররা তাঁর দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।
নিসাঙ্কার গল্পে সবচেয়ে আবেগঘন দিকটি হল তাঁর পরিবারের অবদান বাবা একজন সাধারণ মাঠকর্মী মা মন্দিরের বাইরে ফুল ও ধূপ বিক্রি করে সংসার চালাতেন সেই পরিবার থেকেই উঠে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আলোয় পৌঁছনো সহজ কথা নয় অনেক সময় অনুশীলনের খরচ জোগাতে পরিবারকে বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে সেই ত্যাগ আজ সার্থক হয়েছে।
এই ধরনের গল্প কেবল ক্রিকেটপ্রেমীদের নয় সাধারণ মানুষকেও অনুপ্রাণিত করে কারণ এখানে শুধু ব্যাট বল আর রান নেই এখানে আছে জীবনসংগ্রামের বাস্তব চিত্র নিসাঙ্কা দেখিয়ে দিয়েছেন যে জন্মস্থান বা আর্থিক অবস্থা কখনও সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে নিসাঙ্কার সামনে সম্ভাবনার দিগন্ত অনেক বিস্তৃত টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলির নজরে এনেছে তবে তাঁর মূল লক্ষ্য যে দেশের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স সেটি তিনি বারবার স্পষ্ট করেছেন শ্রীলঙ্কার মতো দলের জন্য এমন একজন নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেটার পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের।
বিশেষজ্ঞদের মতে যদি তিনি ফিটনেস ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন তাহলে আগামী কয়েক বছর তিনি শ্রীলঙ্কা ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড হয়ে উঠবেন টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর ধৈর্য একদিনের ক্রিকেটে তাঁর লম্বা ইনিংস খেলার ক্ষমতা এবং টি টোয়েন্টিতে পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার দক্ষতা তাঁকে তিন ফরম্যাটের পূর্ণাঙ্গ ব্যাটার করে তুলেছে।
এই উত্থান শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের কাছেও একটি বার্তা দিচ্ছে যে ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে প্রতিভা তুলে আনার প্রক্রিয়ায় আরও মনোযোগ দেওয়া দরকার নিসাঙ্কার মতো খেলোয়াড় যদি সঠিক সময়ে সুযোগ পান তাহলে আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারেন।
সব মিলিয়ে বলা যায় পাথুম নিসাঙ্কার গল্প শুধু একটি ক্রিকেটিং সাফল্যের গল্প নয় এটি আত্মবিশ্বাস অধ্যবসায় এবং পরিবারের ত্যাগের সম্মিলিত রূপ তাঁর ব্যাটে প্রতিটি রান যেন সেই সংগ্রামেরই প্রতিফলন ভবিষ্যতে তিনি যে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট ইতিহাসে আরও বড় অধ্যায় লিখবেন সেই বিশ্বাস আজ আর শুধু আশা নয় বরং বাস্তব সম্ভাবনায় পরিণত হয়েছে।