শুধু শিশুদের নয়, প্রাপ্তবয়স্কদেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিকা নেওয়া প্রয়োজন। সংক্রামক রোগের বাড়তে থাকা ঝুঁকির মাঝে ১৮ বছরের পরেও কয়েকটি প্রতিষেধক নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে World Health Organization (হু), যাতে ভবিষ্যতে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমানো যায়।
১৮ বছরের পরেও জরুরি এই ৫ টিকা, কেন প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিষেধক নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে হু?
এক সময় মনে করা হতো, টিকাকরণ শুধুমাত্র শিশুদের জন্যই প্রয়োজন। জন্মের পর থেকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর শিশুদের বিভিন্ন প্রতিষেধক দেওয়া হয়, আর তাতেই রোগ প্রতিরোধের কাজ শেষ— এমন ধারণাই বহু মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে পরিবেশ, জীবনযাত্রা এবং রোগের ধরনও। দূষণ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনধারা, ভাইরাসের পরিবর্তিত রূপ এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংক্রামক রোগের কারণে এখন শুধু শিশু নয়, প্রাপ্তবয়স্কদেরও টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক প্রতিষেধকের কার্যকারিতা আজীবন থাকে না। নির্দিষ্ট সময় পরে শরীরে সেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে বড় হওয়ার পর আবার কিছু টিকার বুস্টার ডোজ় নেওয়া প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে যাঁদের নিয়মিত ভ্রমণ করতে হয়, যাঁরা দীর্ঘদিন কোনও রোগে ভুগছেন অথবা যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের টিকাকরণ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
World Health Organization (হু)-র মতে, ১৮ বছর পার হওয়ার পর অন্তত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টিকা নিয়ে রাখা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে গুরুতর অসুখের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। বর্তমানে সংক্রামক রোগের বাড়তে থাকা প্রবণতা এবং নতুন নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ মাথায় রেখে চিকিৎসকেরাও প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত টিকাকরণের উপর জোর দিচ্ছেন।
নিচে এমনই ৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষেধক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল, যেগুলি ১৮ বছরের পরেও নেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
টিড্যাপ প্রতিষেধক কেন জরুরি?
টিড্যাপ হল এমন একটি প্রতিষেধক যা মূলত তিনটি বিপজ্জনক রোগ— টিটেনাস, ডিপথেরিয়া এবং পারটুসিস বা হুপিং কাশির বিরুদ্ধে শরীরকে সুরক্ষা দেয়।
টিটেনাস কী?
টিটেনাস একটি মারাত্মক ব্যাক্টেরিয়াজনিত সংক্রমণ। সাধারণত মরচে ধরা লোহা, মাটি বা অপরিষ্কার জিনিসের মাধ্যমে শরীরে জীবাণু প্রবেশ করলে এই রোগ হতে পারে। এতে পেশিতে তীব্র টান, শ্বাসকষ্ট এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুও হতে পারে।
ডিপথেরিয়া কতটা বিপজ্জনক?
ডিপথেরিয়া একটি সংক্রামক রোগ যা গলা ও শ্বাসনালীকে আক্রান্ত করে। শ্বাস নিতে সমস্যা, জ্বর, গলা ফুলে যাওয়া এবং হৃদযন্ত্রের জটিলতা তৈরি করতে পারে এই রোগ।
পারটুসিস বা হুপিং কাশি
এটি অত্যন্ত সংক্রামক এক ধরনের কাশি, যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ মারাত্মক হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের থেকেও শিশুদের মধ্যে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ১০ বছর অন্তর টিড্যাপের বুস্টার ডোজ় নেওয়া উচিত। অনেকেই ছোটবেলায় এই টিকা নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময় পরে সেই সুরক্ষা কমে যেতে পারে। তাই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এইচপিভি টিকা: শুধু মহিলাদের জন্য নয়
এইচপিভি বা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস একটি অত্যন্ত সাধারণ ভাইরাস, যা বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বহু মানুষ মনে করেন, এই টিকা শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য। কিন্তু বাস্তবে মহিলা ও পুরুষ— উভয়েরই এই প্রতিষেধক নেওয়া জরুরি।
কোন কোন রোগ প্রতিরোধ করে?
এইচপিভি ভাইরাস মূলত জরায়ুমুখের ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত। তবে শুধু তাই নয়, এটি গলা, মুখ, যৌনাঙ্গ এবং মলদ্বারের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
কোন বয়সে নেওয়া উচিত?
১৮ বছর থেকে ২৬ বছর বয়সের মধ্যে এই টিকা নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও বেশি বয়সেও এই টিকা দেওয়া হয়।
কেন পুরুষদেরও নেওয়া দরকার?
পুরুষদের শরীরেও এই ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে এবং অন্যদের মধ্যেও ছড়াতে পারে। তাই শুধুমাত্র মহিলাদের নয়, পুরুষদেরও এই প্রতিষেধক নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
হেপাটাইটিস-বি টিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হেপাটাইটিস-বি একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা মূলত লিভারকে আক্রান্ত করে। দীর্ঘদিন ধরে এই ভাইরাস শরীরে থাকলে লিভার সিরোসিস, লিভার ফেলিওর এমনকি লিভারের ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে।
কীভাবে ছড়ায়?
রক্ত, শরীরের তরল পদার্থ, অপরিষ্কার সুচ, অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক বা সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
ছোটবেলায় টিকা নিলেও কেন আবার প্রয়োজন?
অনেকেই শিশু অবস্থায় হেপাটাইটিস-বি টিকা নেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় হওয়ার পরে বুস্টার ডোজ় নেওয়া দরকার হতে পারে, বিশেষত যাঁদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
কয়টি ডোজ় লাগে?
সাধারণত হেপাটাইটিস-বি টিকার তিনটি ডোজ় নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই ডোজ় সম্পূর্ণ করতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বুস্টার ডোজ়ও নেওয়া যেতে পারে।
নিউমোকক্কাল টিকা: নিউমোনিয়া থেকে সুরক্ষা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। সেই কারণে নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিসের মতো গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এই ধরনের সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে নিউমোকক্কাল টিকা অত্যন্ত কার্যকর।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বয়স্ক মানুষ
হাঁপানি রোগী
সিওপিডি আক্রান্ত ব্যক্তি
ডায়াবিটিস রোগী
দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি
কখন নেওয়া উচিত?
সাধারণত ৬৫ বছরের পরে এই টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে যাঁদের আগে থেকেই ফুসফুসের সমস্যা বা দীর্ঘস্থায়ী অসুখ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের পর থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শে এই প্রতিষেধক নেওয়া যেতে পারে।
কী কী রোগ প্রতিরোধ করে?
নিউমোনিয়া
মেনিনজাইটিস
রক্তে ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই টিকা গুরুতর সংক্রমণ এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
টাইফয়েডের টিকা কেন প্রয়োজন?
বর্তমানে টাইফয়েডের প্রকোপ আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। দূষিত জল ও খাবারের মাধ্যমে এই রোগ দ্রুত ছড়ায়। শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্রই টাইফয়েড আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
কী লক্ষণ দেখা যায়?
দীর্ঘদিন জ্বর
পেটব্যথা
দুর্বলতা
বমি
ক্ষুধামন্দা
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
যাঁদের নিয়মিত ভ্রমণ করতে হয়, বাইরে খাওয়ার অভ্যাস বেশি অথবা যাঁরা এমন এলাকায় যান যেখানে পরিষ্কার পানীয় জলের অভাব রয়েছে, তাঁদের টাইফয়েডের ঝুঁকি বেশি।
কেন টিকা জরুরি?
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী টাইফয়েডের ঘটনা বাড়ছে। ফলে শুধুমাত্র ওষুধের উপর নির্ভর না করে আগাম প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। চিকিৎসকদের মতে, ১৮ বছরের পরে টাইফয়েডের টিকা নিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন প্রাপ্তবয়স্কদের টিকাকরণ এখন সময়ের দাবি?
বর্তমানে সংক্রামক রোগের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। একদিকে যেমন নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে, তেমনই পুরনো রোগও নতুন রূপে ফিরে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং কমে যাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা— সব মিলিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের শরীর এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
অনেকেই ভাবেন, টিকা নেওয়া মানেই শিশুদের বিষয়। কিন্তু বাস্তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত টিকাকরণ শরীরকে বহু মারাত্মক রোগের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সুরক্ষার জন্যও টিকা নেওয়া জরুরি।
টিকা নেওয়ার আগে কী কী মাথায় রাখবেন?
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও টিকা নেবেন না
আগের টিকাকরণের রেকর্ড সঙ্গে রাখুন
কোনও অ্যালার্জি থাকলে আগে জানিয়ে দিন
দীর্ঘস্থায়ী অসুখ থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
নির্দিষ্ট সময়ে বুস্টার ডোজ় নিতে ভুলবেন না
কোন পেশার মানুষদের জন্য এই টিকাগুলি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য টিকাকরণ জরুরি হলেও কিছু পেশার মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক অনেক বেশি। কারণ তাঁদের নিয়মিত বহু মানুষের সংস্পর্শে থাকতে হয় অথবা এমন পরিবেশে কাজ করতে হয় যেখানে সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি থাকে।
স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসাকর্মী
চিকিৎসক, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, হাসপাতালের কর্মী বা অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা প্রতিদিন নানা ধরনের সংক্রমিত রোগীর সংস্পর্শে আসেন। ফলে তাঁদের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস-বি, টিড্যাপ এবং ফ্লু-সহ বিভিন্ন প্রতিষেধক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষক ও স্কুলকর্মী
স্কুল, কলেজ বা কোচিং সেন্টারে কর্মরত ব্যক্তিদের প্রতিদিন বহু ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়। শিশুদের মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সংক্রমণ ঠেকাতে নিয়মিত টিকাকরণ জরুরি।
পর্যটন ও পরিবহণ কর্মী
যাঁদের নিয়মিত বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করতে হয়, যেমন বিমানকর্মী, ট্রেন বা বাস পরিষেবার কর্মী, ট্যুর গাইড অথবা হোটেল শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষ, তাঁদের টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের মতো রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
খাদ্য পরিষেবা শিল্পের কর্মী
রেস্তরাঁ, হোটেল বা খাবার সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও টাইফয়েড এবং হেপাটাইটিসের ঝুঁকি থাকে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব থাকলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে কেন টিকা জরুরি?
মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সব সময় সমান শক্তিশালী থাকে না। বয়স, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ধূমপান বা মদ্যপানের কারণে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে সংক্রমণ শরীরে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবিটিস, কিডনির সমস্যা, হৃদরোগ, ক্যানসার অথবা অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রতিষেধক আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের রোগে আক্রান্ত মানুষের শরীর সহজে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না।
অনেক সময় সাধারণ জ্বর বা সংক্রমণও গুরুতর আকার নিতে পারে। তাই আগে থেকেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া নিরাপদ।
টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ভয় কতটা সত্যি?
অনেক মানুষ এখনও টিকা নিতে ভয় পান। তাঁদের ধারণা, প্রতিষেধক নিলে শরীরে বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই সামান্য এবং অস্থায়ী।
সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী কী হতে পারে?
ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা
হালকা জ্বর
ক্লান্তি
মাথাব্যথা
শরীরে ব্যথা
এই উপসর্গগুলি সাধারণত কয়েক ঘণ্টা বা এক-দু’দিনের মধ্যে কমে যায়। খুব কম ক্ষেত্রেই গুরুতর অ্যালার্জির সমস্যা দেখা যায়। তাই কোনও টিকা নেওয়ার আগে নিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে চিকিৎসককে জানানো জরুরি।
টিকাকরণ নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
“আমি সুস্থ, আমার টিকা দরকার নেই”
অনেকেই মনে করেন, শরীর সুস্থ থাকলে টিকা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সংক্রমণ কখন, কোথা থেকে শরীরে প্রবেশ করবে তা আগে থেকে বোঝা যায় না। সুস্থ মানুষও হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।
“ছোটবেলায় টিকা নিয়েছি, আর দরকার নেই”
সব টিকার কার্যকারিতা সারাজীবন থাকে না। অনেক প্রতিষেধকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পরে বুস্টার ডোজ় দরকার হয়।
“টিকা নিলে অসুস্থ হয়ে পড়ব”
টিকা শরীরকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রস্তুতি দেয়। ফলে সামান্য জ্বর বা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে, যা স্বাভাবিক। এটি আসলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার লক্ষণ।
“শুধু শিশুদের জন্য টিকা”
বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের টিকাকরণও বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বহু দেশেই বড়দের জন্য আলাদা টিকাকরণ কর্মসূচি চালু রয়েছে।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে টিকাকরণের গুরুত্ব কেন বেড়েছে?
কোভিড মহামারির পরে মানুষ বুঝতে পেরেছে, সংক্রামক রোগ কত দ্রুত গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। করোনা ভাইরাস দেখিয়ে দিয়েছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী না হলে বড় বিপদ ঘটতে পারে।
মহামারির পরে চিকিৎসকরা আরও বেশি করে প্রাপ্তবয়স্কদের টিকাকরণের উপর জোর দিচ্ছেন। কারণ—
ভাইরাস দ্রুত রূপ বদলাচ্ছে
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে
নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে
বয়স্কদের মধ্যে জটিলতা বেশি হচ্ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের সংক্রমণ মোকাবিলায় টিকাকরণ অন্যতম বড় অস্ত্র।
জীবনযাত্রার সঙ্গে টিকাকরণের সম্পর্ক
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেকেই পর্যাপ্ত ঘুম, সঠিক খাবার বা নিয়মিত শরীরচর্চা করতে পারেন না। এর ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। বাইরে খাওয়ার অভ্যাস, দূষিত পরিবেশ, ধূমপান এবং অতিরিক্ত স্ট্রেসও শরীরের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এই পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র ওষুধ বা চিকিৎসার উপর নির্ভর না করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। টিকা সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আরও কোন টিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও কিছু প্রতিষেধক নেওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। যেমন—
ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু টিকা
কোভিড বুস্টার ডোজ়
চিকেনপক্স টিকা
এমএমআর টিকা
শিংলস টিকা
সব টিকা সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা, পেশা এবং জীবনযাত্রার উপর ভিত্তি করে চিকিৎসক সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন।
টিকা নেওয়ার পরে কী কী সতর্কতা জরুরি?
টিকা নেওয়ার পর কিছু সাধারণ বিষয় মাথায় রাখা দরকার।
পর্যাপ্ত জল পান করুন
শরীর খারাপ লাগলে বিশ্রাম নিন
অতিরিক্ত জ্বর হলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন
ইনজেকশনের জায়গা পরিষ্কার রাখুন
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন না
কেন এখনই সচেতন হওয়া জরুরি?
ভারতের মতো জনবহুল দেশে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি। একদিকে দূষণ, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব— সব মিলিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি আগের তুলনায় বেড়েছে। শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও টাইফয়েড, নিউমোনিয়া, ভাইরাল জ্বর, হেপাটাইটিসের মতো রোগের প্রকোপ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানো যথেষ্ট নয়। বরং আগে থেকেই শরীরকে সুরক্ষিত রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই কারণেই প্রাপ্তবয়স্কদের টিকাকরণ এখন সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
টিকাকরণ নিয়ে সচেতনতা এখনও সমাজের অনেক অংশে যথেষ্ট নয়। বহু মানুষ জানেনই না যে ১৮ বছরের পরেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষেধক নেওয়া দরকার। অথচ সময়মতো সঠিক টিকা নিলে বহু জটিল এবং প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিড্যাপ, এইচপিভি, হেপাটাইটিস-বি, নিউমোকক্কাল এবং টাইফয়েড— এই পাঁচটি প্রতিষেধক প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকাকরণ সম্পূর্ণ করা উচিত।
কারণ সুস্থ জীবনযাপনের জন্য শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।