নতুন করে শীতের দাপট অনুভূত হচ্ছে দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে। হঠাৎ করেই তাপমাত্রা অনেকটা নেমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আবহাওয়াবিদরাও অবাক। নদিয়া জেলার কল্যাণীতে পারদ নেমেছে সাত ডিগ্রির ঘরে যা এই সময়ের জন্য অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। সাধারণত পাহাড়ি এলাকায় এমন ঠান্ডা দেখা গেলেও এবার সমতলের শহরেও হাড়কাঁপানো শীত অনুভূত হচ্ছে। তুলনায় কালিম্পংয়ের মতো শৈলশহরের তাপমাত্রার সঙ্গে প্রায় সমান হয়ে গিয়েছে কল্যাণীর আবহাওয়া। আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী উত্তর ভারত থেকে আসা শুষ্ক ঠান্ডা হাওয়ার জেরেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আকাশ পরিষ্কার থাকার কারণে রাতে তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাচ্ছে। দিনের বেলায় রোদ থাকলেও সকালের দিকে এবং গভীর রাতে ঠান্ডার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। বর্ধমান নদিয়া মুর্শিদাবাদ বীরভূম সহ একাধিক জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে অনেকটাই নিচে নেমেছে। কলকাতাতেও ঠান্ডা বাড়ছে ধীরে ধীরে। শহরের বাসিন্দারা সকালে বেরোতেই গরম পোশাকের প্রয়োজন অনুভব করছেন। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আজ রাতে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমতে পারে। যদিও কল্যাণীর মতো এতটা নিচে নামার সম্ভাবনা নেই তবুও পারদ নামতে পারে দশ ডিগ্রির আশেপাশে। উত্তর পশ্চিম দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসের প্রভাব শহরে আগামী কয়েকদিন বজায় থাকবে বলে জানানো হয়েছে। এই ঠান্ডা আবহাওয়ার জেরে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভোর রাতে কুয়াশার দাপট বাড়তে পারে ফলে রাস্তাঘাটে চলাচলের ক্ষেত্রেও সাবধানতা জরুরি। আপাতত বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই এবং শুষ্ক আবহাওয়াই বজায় থাকবে। সব মিলিয়ে রাজ্যে শীত যে পুরোপুরি জাঁকিয়ে বসেছে তা স্পষ্ট। পাহাড় থেকে সমতল সর্বত্রই ঠান্ডার আমেজ। আগামী কয়েকদিন তাপমাত্রার এই ওঠানামার দিকেই নজর থাকবে সকলের।
কল্যাণীতে পারদ নেমে যাওয়া মানেই দক্ষিণবঙ্গের শীত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা উত্তরবঙ্গের শীতের গল্প শোনা গেলেও এবার দক্ষিণবঙ্গের একাধিক এলাকায় তাপমাত্রা যে ভাবে নেমে এসেছে তা অনেককেই অবাক করেছে। কল্যাণীতে তাপমাত্রা সাত ডিগ্রির ঘরে নামা শুধু একটি সংখ্যামাত্র নয় এটি গোটা রাজ্যে শীতের প্রবল উপস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে। বহু মানুষের কাছেই এই শীত কালিম্পং বা দার্জিলিংয়ের পুরনো দিনের ঠান্ডার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। বিশেষ করে ভোররাত এবং খুব সকালের দিকে ঠান্ডার দাপট এতটাই বেশি যে ঘর থেকে বেরোনো কঠিন হয়ে পড়ছে।
বর্তমানে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গে অফিসিয়াল কোল্ড ওয়েভ ঘোষণা না হলেও, শীতের প্রভাব যথেষ্ট। বিশেষ করে ভোর ও গভীর রাতে বাইরে বেরোলে গরম জামাকাপড় ছাড়া থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেকেই ইতিমধ্যেই লেপ, কম্বল, সোয়েটার ও রুম হিটার ব্যবহার শুরু করে দিয়েছেন। শহরের বাজারেও শীতের পোশাকের চাহিদা বেড়েছে।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, এই শীতের দাপট আরও কয়েকদিন বজায় থাকতে পারে। তাপমাত্রা সামান্য ওঠানামা করলেও বড় ধরনের উষ্ণতার সম্ভাবনা আপাতত নেই। তাই আগামী কয়েকদিন কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের বাসিন্দাদের শীতের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সংক্ষেপে বলা যায়, কল্যাণীর ৭ ডিগ্রির শীত যেমন চমকে দিয়েছে, তেমনই কলকাতাতেও শীতের অনুভূতি এবার বেশ জোরালো।
কল্যাণী মূলত সমতল অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও এখানে তাপমাত্রা এতটা নেমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। আবহাওয়াবিদদের মতে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে তৈরি হওয়া উচ্চচাপ বলয় থেকে শুষ্ক এবং ঠান্ডা বাতাস দক্ষিণ দিকে নেমে আসছে। এই ঠান্ডা উত্তরী হাওয়া যখন গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে বইছে তখন স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাচ্ছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিষ্কার আকাশ এবং কম আর্দ্রতা। ফলে রাতে তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাচ্ছে এবং ভোরে কনকনে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে।
কল্যাণীর সাত ডিগ্রি তাপমাত্রা দক্ষিণবঙ্গের শীতের চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। নদীয়া বীরভূম পশ্চিম বর্ধমান বাঁকুড়া পুরুলিয়া সহ একাধিক জেলায় রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই কম। দিনের বেলায় রোদ থাকলেও সেই রোদে খুব বেশি উষ্ণতা নেই। বরং সকালের দিকে কুয়াশা এবং ঠান্ডা হাওয়ার মিলিত প্রভাবে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই কলকাতা নিয়ে কৌতূহল বাড়ছে। কল্যাণীতে যখন পারদ সাত ডিগ্রিতে নেমে যাচ্ছে তখন শহর কলকাতায় রাতে তাপমাত্রা কতটা নামতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আবহাওয়া দফতরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী কলকাতার ভৌগোলিক অবস্থান এবং নগরায়ণের কারণে এখানে তাপমাত্রা সাধারণত আশপাশের জেলার তুলনায় সামান্য বেশি থাকে। তবে এবার শীতের দাপট এমন যে কলকাতাতেও রাতের তাপমাত্রা চৌদ্দ থেকে পনেরো ডিগ্রির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। কিছু কিছু এলাকায় ভোরের দিকে আরও এক থেকে দুই ডিগ্রি কম অনুভূত হচ্ছে।
কলকাতার বাসিন্দাদের কাছে এই তাপমাত্রা হয়তো পাহাড়ি শীতের মতো নয় কিন্তু শহরের স্বাভাবিক শীতের তুলনায় এটি যথেষ্ট বেশি। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার উষ্ণ শীতের সঙ্গে অভ্যস্ত তাদের কাছে এবারের ঠান্ডা বেশ কষ্টকর মনে হচ্ছে। সকালে অফিস বা স্কুল কলেজে বেরোনোর সময় গরম জামাকাপড় ছাড়া থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছে। রাতের দিকে হালকা কম্বলে আরাম পাওয়া যাচ্ছে না অনেকেই লেপ বা মোটা কম্বল ব্যবহার শুরু করেছেন।
এই শীতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু এবং বয়স্ক মানুষদের উপর। চিকিৎসকদের মতে এই ধরনের আবহাওয়ায় সর্দি কাশি শ্বাসকষ্ট এবং রক্তচাপ সংক্রান্ত সমস্যা বাড়তে পারে। তাই খুব ভোরে বা গভীর রাতে অপ্রয়োজনে বাইরে বেরোনো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গরম পোশাক ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গরম খাবার খাওয়ার উপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
কলকাতা শহরের দৈনন্দিন জীবনেও শীতের প্রভাব স্পষ্ট। সকালবেলা রাস্তাঘাটে লোকজনের সংখ্যা তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। অনেকেই দেরি করে ঘর থেকে বেরোচ্ছেন। চায়ের দোকানগুলিতে ভিড় বাড়ছে কারণ গরম চা বা কফি ঠান্ডা মোকাবিলায় বড় ভরসা হয়ে উঠছে। শহরের বাজারে গরম পোশাকের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সোয়েটার জ্যাকেট শাল মাফলার এসবের চাহিদা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
শুধু কলকাতা নয় হাওড়া হুগলি উত্তর চব্বিশ পরগনা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা সহ আশপাশের জেলাগুলিতেও শীতের প্রভাব প্রায় একই রকম। ভোরের দিকে কুয়াশার কারণে কোথাও কোথাও দৃশ্যমানতা কমে যাচ্ছে। যদিও এখনো বড় ধরনের যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়নি তবে ভোররাতে যাতায়াতকারী গাড়িচালকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে যে এই মুহূর্তে রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কোল্ড ওয়েভ ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কারণ কোল্ড ওয়েভ ঘোষণার জন্য নির্দিষ্ট কিছু তাপমাত্রাগত মানদণ্ড রয়েছে। তবে বাস্তবে অনুভূত শীত অনেকটাই বেশি। শুষ্ক ঠান্ডা হাওয়া এবং কম আর্দ্রতার কারণে শরীরে ঠান্ডার অনুভূতি প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি হচ্ছে।
এই শীত কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়েও আলোচনা চলছে। আবহাওয়াবিদদের মতে আগামী কয়েকদিন উত্তরী হাওয়ার প্রভাব বজায় থাকতে পারে। ফলে রাতের তাপমাত্রা খুব দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা নেই। দিনের বেলায় সামান্য উষ্ণতা এলেও রাতের ঠান্ডা জারি থাকবে। তবে বড় ধরনের বৃষ্টি বা পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাব না এলে তাপমাত্রা খুব বেশি ওঠানামা করবে না।
কল্যাণীতে সাত ডিগ্রি তাপমাত্রা শুধুমাত্র একটি দিনের ঘটনা নয় এটি সামগ্রিক আবহাওয়ার প্রবণতার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শীতের চরিত্র বদলাতে দেখা যাচ্ছে। কখনো খুব কম সময়ের জন্য তীব্র শীত আবার কখনো দীর্ঘ সময় ধরে মাঝারি শীত অনুভূত হচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এর পেছনে কাজ করছে। তবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
গ্রামাঞ্চলের মানুষদের কাছে এই শীত আরও বেশি কঠিন। অনেক জায়গায় এখনো পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা নেই। রাতের ঠান্ডায় খোলা ঘরে বা অল্প সুরক্ষিত ঘরে থাকা মানুষদের কষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোথাও কোথাও শীতবস্ত্র বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।
শহরের তুলনায় গ্রামে সকালের কুয়াশা অনেক বেশি ঘন। ফলে চাষের কাজেও প্রভাব পড়ছে। কৃষকদের মতে সকালে জমিতে কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে। তবে এই শীত কিছু কিছু ফসলের জন্য উপকারীও হতে পারে। বিশেষ করে শীতকালীন সবজির ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
কলকাতার রাতের তাপমাত্রা নিয়ে কথা বলতে গেলে নগরায়ণের প্রভাবও মাথায় রাখতে হয়। কংক্রিটের জঙ্গল তাপ ধরে রাখার প্রবণতা থাকলেও এবারের ঠান্ডা এতটাই প্রবল যে সেই প্রভাব অনেকটাই কমে যাচ্ছে। শহরের উপকণ্ঠে এবং খোলা জায়গাগুলিতে ঠান্ডা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। সল্টলেক নিউটাউন রাজরহাটের মতো এলাকায় ভোরের দিকে ঠান্ডা হাওয়ার দাপট স্পষ্ট।
শীতের এই সময়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা খুবই জরুরি। পর্যাপ্ত গরম পোশাক ব্যবহার ছাড়াও হালকা গরম জল পান করা এবং ঠান্ডা খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যারা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভুগছেন তাদের নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বলা যায় কল্যাণীর সাত ডিগ্রি তাপমাত্রা দক্ষিণবঙ্গের শীতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কলকাতায় যদিও তাপমাত্রা তার চেয়ে বেশি থাকছে তবুও শীতের অনুভূতি যথেষ্ট তীব্র। আগামী কয়েকদিন এই পরিস্থিতি বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষকে সতর্ক থেকে শীতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শীত যেমন একদিকে কষ্টের তেমনই অনেকের কাছে এটি উপভোগের সময়ও। গরম চা কম্বল আর সকালের রোদে বসে শীতের আমেজ উপভোগ করাটাও বাঙালির জীবনের একটি চিরাচরিত অভ্যাস। এই শীত সেই অনুভূতিটাকেই আবার নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে।