হাড় কাঁপানো ঠান্ডা না হলেও রাজ্যের আবহাওয়ায় ফের শীতের ছোঁয়া। গত দুদিনে দক্ষিণবঙ্গে সামান্য তাপমাত্রা কমায় সকালের ও রাতের হালকা শীত অনুভূত হচ্ছে।
অরিত্রিক ভট্টাচার্য, কলকাতা:
জানুয়ারি পেরিয়ে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পা রাখলেও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি শীত। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা না হলেও রাজ্যের আবহাওয়ায় এখনও জারি রয়েছে শীতের আমেজ। বিশেষ করে সকালের দিকে এবং রাতের বেলায় ঠান্ডার অনুভূতি ফের নতুন করে টের পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। গত কয়েক দিনে তাপমাত্রার সামান্য ওঠানামার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এবছর মাঘ মাসের শীত এখনও শেষ কথা বলেনি।
রবিবার কলকাতায় দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল ১৫ ডিগ্রির নিচে। সোমবার সকালে শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে দশমিক ৩ ডিগ্রি কম। যদিও পার্থক্য খুব বেশি নয়, তবু জানুয়ারি শেষে এমন তাপমাত্রা ফের একবার শীতের অস্তিত্বের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। শনিবার কলকাতায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৭ ডিগ্রির ঘরে। এক ধাক্কায় রবিবার তা নেমে আসে ১৫ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সোমবার সামান্য বৃদ্ধি পেলেও ফের স্বাভাবিকের নীচেই রয়ে গিয়েছে পারদ।
শুধু সর্বনিম্ন তাপমাত্রাই নয়, সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও এখন স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম। তবে দিনের বেলা রোদের দাপটে শীতের অনুভূতি খুব একটা স্থায়ী হচ্ছে না। সকাল ও রাতের ঠান্ডা আর দুপুরের হালকা উষ্ণতার এই বৈপরীত্যই এখন রাজ্যের আবহাওয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত দুদিনে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় সামান্য পারদ পতন লক্ষ্য করা গিয়েছে। কলকাতা ছাড়াও হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রামে সকালের দিকে হালকা শীত অনুভূত হয়েছে। বিশেষ করে ভোরের দিকে কুয়াশার দাপটে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় শীতের আমেজ আরও গাঢ় হয়ে উঠছে।
আবহাওয়া দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজ্যের প্রায় সমস্ত জেলাতেই আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে। দক্ষিণবঙ্গে আপাতত বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই। সকালের দিকে কুয়াশা থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান, দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক এলাকায় কুয়াশার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকবে। উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলাতেও কুয়াশার দাপট বজায় থাকবে বলে জানিয়েছে হাওয়া অফিস।
উত্তরবঙ্গের চিত্র অবশ্য দক্ষিণবঙ্গের তুলনায় খানিকটা আলাদা। সেখানে শীতের কামড় এখনও যথেষ্ট স্পষ্ট। দার্জিলিংয়ে তাপমাত্রার পারদ ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ারে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় ১১ ডিগ্রির আশেপাশে রয়েছে। সকালের দিকে ঘন কুয়াশার কারণে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি ও তরাই অঞ্চলে যান চলাচলেও মাঝে মাঝে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী সাতদিন রাজ্যের তাপমাত্রায় খুব বড় কোনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মোটামুটি একই রকম থাকবে। যদিও মাঝেমধ্যে এক দুই ডিগ্রি করে ওঠানামা হতে পারে। এই পরিবর্তনকে পুরোপুরি স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
আবহাওয়ার এই অস্থিরতার নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাব। জম্মু কাশ্মীর সংলগ্ন এলাকায় ইতিমধ্যেই একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা প্রবেশ করেছে। এছাড়াও ২ ফেব্রুয়ারি এবং ৫ ফেব্রুয়ারি আরও দুটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা ঢোকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ঝঞ্ঝাগুলির পরোক্ষ প্রভাবেই উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় আবহাওয়ার খামখেয়ালীপনা দেখা যাচ্ছে। তারই রেশ এসে পড়ছে পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময় বছরে সাধারণত শীত ধীরে ধীরে বিদায় নেওয়ার পথে থাকে। তবে হঠাৎ করে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সক্রিয়তা বাড়লে ঠান্ডার স্থায়িত্ব কিছুটা দীর্ঘায়িত হয়। এবছর ঠিক সেই পরিস্থিতিই দেখা যাচ্ছে। জানুয়ারির শেষ এবং ফেব্রুয়ারির শুরুতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম তাপমাত্রা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
শহরের বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলছে। অনেকেই জানিয়েছেন, দুপুরের দিকে শীতের অনুভূতি না থাকলেও সকালবেলা কাজে বেরোতে এখনও সোয়েটার কিংবা হালকা জ্যাকেট প্রয়োজন হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সকালের ঠান্ডা বেশ প্রভাব ফেলছে। চিকিৎসকরাও এই সময়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। হঠাৎ ঠান্ডা ও উষ্ণতার তারতম্যে সর্দি কাশি জ্বরের মতো সমস্যা বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন তাঁরা।
গ্রামাঞ্চলেও শীতের আমেজ এখনও স্পষ্ট। ভোরের দিকে মাঠঘাট ঢেকে যাচ্ছে কুয়াশায়। সূর্য ওঠার আগেই সাদা চাদরের মতো কুয়াশা নেমে আসছে ফসলের জমিতে। গাছপালা, ধানক্ষেত, সবজি ক্ষেত ভিজে উঠছে শিশিরে। এই দৃশ্য দেখে অনেকের মনেই ফিরছে শীতের পুরনো দিনের ছবি। যদিও দিন যত এগোচ্ছে, সূর্যের তাপে সেই কুয়াশা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে, তবু ভোরের শীত ও স্যাঁতসেঁতে ভাব এখনও গ্রামবাংলার নিত্যসঙ্গী।
কৃষকদের একাংশের মতে, এই সময়ের হালকা ঠান্ডা ও কুয়াশা কিছু কিছু ফসলের জন্য উপকারী। বিশেষ করে আলু, সর্ষে, গম এবং বিভিন্ন শীতকালীন সবজির ক্ষেত্রে রাতের ঠান্ডা ও ভোরের শিশির ফলনের পক্ষে সহায়ক হতে পারে। অনেক কৃষকই জানিয়েছেন, এই ধরনের আবহাওয়ায় মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে, যার ফলে সেচের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম হয়। এতে খরচও কিছুটা কমে।
তবে অন্যদিকে আশঙ্কার কথাও শোনাচ্ছেন চাষিদের একাংশ। তাঁদের মতে, এই কুয়াশা যদি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং দিনের বেলাতেও আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার না হয়, তাহলে ফসলে ছত্রাকজনিত রোগের আশঙ্কা বাড়তে পারে। বিশেষ করে শাকসবজি ও ফুলচাষের ক্ষেত্রে এই ধরনের আবহাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে। তাই তাঁরা নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
তবে আপাতত স্বস্তির খবর, আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই। আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন না কৃষকরা। অনেকেই মনে করছেন, এই শীত যদি খুব বেশি দিন না টেকে, তাহলে মোটের উপর এবছরের ফসলের জন্য এটি ক্ষতিকর হবে না।
শহরাঞ্চলের মতো গ্রামাঞ্চলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় শীতের এই শেষ পর্বের প্রভাব পড়ছে। ভোরবেলা কাজে বেরোনো মানুষজন এখনও গায়ে চাদর কিংবা হালকা সোয়েটার জড়িয়ে নিচ্ছেন। চায়ের দোকানে সকাল সকাল ভিড় বাড়ছে। অনেক জায়গায় আগুন পোহানোর দৃশ্যও চোখে পড়ছে, যা সাধারণত জানুয়ারি মাসের মধ্যেই কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু এবছর ফেব্রুয়ারির শুরুতেও সেই চিত্র বদলায়নি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবছর মাঘের শীত একেবারে সহজে বিদায় নিচ্ছে না। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা না থাকলেও রাজ্যের আবহাওয়ায় এখনও শীতের উপস্থিতি স্পষ্ট। দিনের বেলা রোদের তাপে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সকাল ও রাতের ঠান্ডা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, শীত এখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই ধরনের তাপমাত্রার ওঠানামা এই সময়ের জন্য অস্বাভাবিক নয়। সাধারণত জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। কিন্তু পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সক্রিয়তা বাড়লে সেই স্বাভাবিক ছক বদলে যেতে পারে। এবছর ঠিক সেটাই দেখা যাচ্ছে। উত্তর ভারতের বিভিন্ন অংশে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাব পড়ায় ঠান্ডা হাওয়া মাঝে মাঝেই পূর্ব ভারতের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। তার ফলেই পশ্চিমবঙ্গেও তাপমাত্রা পুরোপুরি ঊর্ধ্বমুখী হতে পারছে না।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের মতে, আপাতত বড় কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। আগামী কয়েক দিন সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় একই রকম থাকবে। তবে সপ্তাহান্তে সামান্য পারদ পতনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আবার পরের সপ্তাহে দিনের তাপমাত্রা এক দুই ডিগ্রি বাড়তেও পারে। অর্থাৎ এই সময়টা পুরোপুরি শীত বা পুরোপুরি বসন্ত কোনওটাই নয়। চলছে ঋতু পরিবর্তনের মাঝামাঝি এক অস্থির সময়।
এই আবহাওয়ার প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যের উপরও। চিকিৎসকদের মতে, হঠাৎ ঠান্ডা ও উষ্ণতার এই ওঠানামার ফলে সর্দি, কাশি, জ্বরের মতো সমস্যা বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সকালের ঠান্ডায় বাইরে বেরোলে গরম পোশাক ব্যবহার করা এবং রাতে হালকা ঠান্ডা বাতাস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।
শহরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলিতেও এই ধরনের মৌসুমি অসুস্থতার রোগী বাড়ছে বলে খবর। যদিও পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক নয়, তবু আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের যত্ন নেওয়ার উপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এবছরের শীতের চরিত্র কিছুটা ব্যতিক্রমী। ডিসেম্বর মাসে শীত দেরিতে এলেও জানুয়ারি জুড়ে বেশ কয়েক দফা ঠান্ডার স্পেল দেখা গিয়েছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতেও সেই রেশ পুরোপুরি কাটেনি। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও অনিয়মিত হতে পারে বলেও মত তাঁদের একাংশের। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই ঋতুর স্বাভাবিক চক্রে এমন অদলবদল দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—আর কতদিন থাকবে এই শীত। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করবে। তখন সকাল ও রাতের ঠান্ডাও কমবে। কিন্তু তার আগে আরও কয়েক দিন শীতের এই শেষ ইনিংস চলতেই পারে।
অতএব এখনই গরম পোশাক একেবারে তুলে রাখার সময় আসেনি। আলমারির এক কোণে সোয়েটার আর চাদর এখনও প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে ভোরের দিকে বাইরে বেরোতে হলে বা রাতের বেলায় ঠান্ডা বাতাসে থাকলে সাবধানতা অবলম্বন করাই ভালো।
কখনও সকালের কুয়াশা, কখনও রাতের ঠান্ডা বাতাস, আবার কখনও দুপুরের উজ্জ্বল রোদ—এই বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই এবছরের শীত ধীরে ধীরে বিদায় নেবে বলেই মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। শীতের এই শেষ অধ্যায় হয়তো খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু তার উপস্থিতি এখনও স্পষ্ট। আর সেই কারণেই ফেব্রুয়ারির শুরুতেও রাজ্যের আবহাওয়ায় শীতের রেশ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবছরের মাঘের শীত কোনও ঝাঁকুনি না দিয়ে, ধীরে ধীরে লুকোচুরি খেলেই বিদায় নিতে চাইছে। সেই বিদায়ের আগে কখনও সামান্য ঠান্ডা বাড়ছে, কখনও আবার রোদে গা জুড়িয়ে স্বস্তি মিলছে। এই ওঠানামার মধ্যেই সাধারণ মানুষ, কৃষক, চিকিৎসক ও আবহাওয়াবিদরা সবাই নজর রাখছেন আকাশের দিকে—শীত এবার ঠিক কবে পুরোপুরি বিদায় নেবে, সেই অপেক্ষাতেই।