Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

প্রয়াত মোহনবাগান ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি টুটু বসু ক্রীড়ামহলে শোকের ছায়া

মোহনবাগান ক্লাবের দীর্ঘদিনের অভিভাবক এবং প্রাক্তন সভাপতি টুটু বসু পরলোকগমন করেছেন এই খবরে ময়দানে শোকের ছায়া নেমে এসেছে  

মোহনবাগান ক্লাবের দীর্ঘদিনের অভিভাবক এবং প্রাক্তন সভাপতি স্বপনসাধন বসু যিনি ময়দানে টুটু বসু নামে সর্বাধিক পরিচিত তাঁর জীবনাবসানে ভারতীয় ক্রীড়ামহলে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর এই প্রয়াণের খবর সামনে আসার সাথে সাথেই কলকাতা ময়দান সহ সমগ্র দেশের ফুটবল প্রেমীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। মোহনবাগান ক্লাবের উন্নতি এবং নব্বইয়ের দশকের চরম আর্থিক সংকটের সময় থেকে ক্লাবকে একার কাঁধে টেনে নিয়ে যাওয়ার পেছনে তাঁর যে অসামান্য অবদান রয়েছে তা ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বহু বর্তমান ও প্রাক্তন ফুটবলার, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব এবং অগণিত সবুজ-মেরুন সমর্থক তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা ফিরে তাকাবো টুটু বসুর সেই বর্ণময় জীবনের দিকে যা মোহনবাগান ক্লাবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।

কলকাতা ময়দানের এক অবিসংবাদিত অভিভাবক কলকাতা ময়দান মানেই আবেগ, উন্মাদনা এবং শতবর্ষের ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের অন্যতম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন স্বপনসাধন বসু। শুধুমাত্র একজন প্রশাসক হিসেবে নয়, তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন সত্যিকারের অভিভাবক হিসেবে। ফুটবলারদের কাছে তিনি ছিলেন পিতৃতুল্য। যেকোনো খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে শুরু করে ক্লাবের যেকোনো বড় সংকটে তিনি সব সময় সামনের সারিতে এসে দাঁড়িয়েছেন। মোহনবাগান ক্লাব যখনই কোনো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে, টুটু বসু নিজের সমস্ত কিছু উজাড় করে দিয়ে ক্লাবকে রক্ষা করেছেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং ক্লাবের প্রতি আত্মত্যাগ তাঁকে শুধুমাত্র একজন সভাপতি নয়, বরং মোহনবাগানের সমার্থক করে তুলেছিল।

নব্বইয়ের দশকের সংকট এবং ত্রাতা টুটু বসু নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে ভারতীয় ফুটবল এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় কর্পোরেট স্পনসরশিপের ধারণা আজকের মতো এতটা বিস্তৃত ছিল না। ক্লাবগুলোকে মূলত নির্ভর করতে হতো সদস্যদের চাঁদা এবং অনুদানের ওপর। এই সময়ে মোহনবাগান ক্লাব চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে। ক্লাবের দৈনন্দিন খরচ চালানো, ভালো ফুটবলারদের দলে সই করানো এবং পরিকাঠামো বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক সেই সময়েই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন টুটু বসু। তিনি নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অকাতরে অর্থ ব্যয় করে ক্লাবকে সেই চরম সংকট থেকে উদ্ধার করেন। তাঁর এই আর্থিক অনুদান এবং মানসিক সমর্থন ছাড়া সেই সময় মোহনবাগান ক্লাবের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব ছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ক্লাব তাঁর কাছে শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং তাঁর নিজের পরিবারের একটি অংশ।

অঞ্জন মিত্র এবং টুটু বসু জুটি: ময়দানের এক সোনালী অধ্যায় মোহনবাগান ক্লাবের ইতিহাসে অঞ্জন মিত্র এবং টুটু বসুর জুটির কথা চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই দুই প্রশাসকের যুগলবন্দীতে মোহনবাগান ক্লাব এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। একজন ছিলেন ক্লাবের মস্তিষ্ক আর অন্যজন ছিলেন ক্লাবের প্রাণ। এই জুটির সময়কালেই মোহনবাগান একাধিক জাতীয় লিগ, ফেডারেশন কাপ, রোভার্স কাপ এবং ডুরান্ড কাপের মতো বড় বড় ট্রফি জয় করেছিল। তাঁদের মধ্যেকার বোঝাপড়া এবং ক্লাবের প্রতি তাঁদের একনিষ্ঠ ভালোবাসা মোহনবাগানকে ভারতীয় ফুটবলের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত করেছিল। যদিও পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যে কিছু মতানৈক্য তৈরি হয়েছিল, তবুও মোহনবাগানের প্রতি তাঁদের দুজনের অবদান কেউ কখনো অস্বীকার করতে পারবে না।

ফুটবলারদের সাথে আত্মিক সম্পর্ক টুটু বসুর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল ফুটবলারদের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত এবং আত্মিক সম্পর্ক। তিনি কখনোই খেলোয়াড়দের শুধুমাত্র ক্লাবের কর্মচারী হিসেবে দেখতেন না। বিশেষ করে বিদেশী ফুটবলারদের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক পরম আশ্রয়। হোসে রামিরেজ ব্যারেটোর মতো কিংবদন্তি ফুটবলারকে মোহনবাগানে নিয়ে আসা এবং তাঁকে বছরের পর বছর ধরে ক্লাবে ধরে রাখার পেছনে টুটু বসুর অবদান অনস্বীকার্য। ব্যারেটো নিজেও বহুবার প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে টুটু বসু তাঁর কাছে পিতার মতো। একইভাবে সনি নর্দে থেকে শুরু করে ওডাফা ওকোলির মতো তারকারাও টুটু বসুর স্নেহ এবং ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। দেশীয় ফুটবলারদের ক্ষেত্রেও তাঁর দরজা সবসময় খোলা থাকতো। খেলোয়াড়দের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া, তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাঁদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখার জন্য তিনি যে ভূমিকা পালন করতেন তা আজকের দিনের পেশাদার ফুটবলে খুব একটা দেখা যায় না।

আধুনিক ফুটবলের সাথে মানিয়ে নেওয়া সময় বদলানোর সাথে সাথে ভারতীয় ফুটবলেও পেশাদারিত্বের ছোঁয়া লাগে। আইএসএল (ইন্ডিয়ান সুপার লিগ) শুরু হওয়ার পর ভারতীয় ফুটবলের রূপরেখা পুরোপুরি বদলে যায়। এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ক্লাবে কর্পোরেট বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল। টুটু বসু একজন দূরদর্শী প্রশাসক হিসেবে বুঝতে পেরেছিলেন যে ক্লাবের ঐতিহ্য বজায় রাখার পাশাপাশি আধুনিক ফুটবলের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বড় বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন। তাঁর এই দূরদর্শিতার ফলেই পরবর্তীকালে মোহনবাগান ক্লাব বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে পেরেছিল এবং আইএসএলের মতো বড় মঞ্চে নিজেদের জায়গা পাকা করতে পেরেছিল। তিনি সবসময় চাইতেন মোহনবাগান যেন সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে চলে, কিন্তু তার শিকড় যেন বাংলার মাটিতেই শক্তভাবে প্রোথিত থাকে।

news image
আরও খবর

শুধুমাত্র ফুটবল নয়, সার্বিক ক্রীড়ার উন্নয়ন মোহনবাগান বলতে আমরা সাধারণত ফুটবলকেই বুঝি, কিন্তু টুটু বসু শুধুমাত্র ফুটবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁর সময়ে মোহনবাগান ক্লাবের ক্রিকেট দল, হকি দল এবং অ্যাথলেটিক্স বিভাগও যথেষ্ট উন্নতি করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একটি বড় ক্লাবকে শুধুমাত্র একটি খেলার ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না, বরং ক্রীড়াজগতের প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্লাবের পতাকা উঁচুতে তুলে ধরতে হবে। তাঁর উৎসাহ এবং পৃষ্ঠপোষকতায় মোহনবাগানের ক্রিকেট দলও ময়দানে যথেষ্ট দাপট দেখিয়েছিল। তিনি তরুণ প্রতিভাদের তুলে আনার ওপর বিশেষ জোর দিতেন এবং ক্লাব তাঁবুতে তাদের জন্য উন্নত মানের অনুশীলনের ব্যবস্থা করেছিলেন।

সমর্থকদের কাছের মানুষ মোহনবাগান ক্লাবের প্রাণভ্রমরা হলেন তার সমর্থকেরা। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে যারা গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে গলার শিরা ফুলিয়ে ক্লাবের জন্য চিৎকার করেন, সেই সমর্থকদের সাথে টুটু বসুর এক অদ্ভুত সুন্দর সম্পর্ক ছিল। তিনি জানতেন সমর্থকরাই ক্লাবের আসল শক্তি। ম্যাচ জেতার পর যেমন তিনি সমর্থকদের সাথে আনন্দ ভাগ করে নিতেন, তেমনি ম্যাচ হারার পর সমর্থকদের ক্ষোভ এবং অভিমানও তিনি মাথা পেতে নিতেন। তিনি কখনোই সমর্থকদের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেননি। ক্লাব তাঁবুতে সাধারণ সমর্থকদের সাথে বসে চা খাওয়া, তাদের মতামত শোনা এবং তাদের আবেগ অনুভূতির মূল্য দেওয়া—এসবই তাঁকে অন্য সমস্ত প্রশাসকদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

এক যুগের অবসান টুটু বসুর প্রয়াণের সাথে সাথে ভারতীয় ফুটবল প্রশাসনের এক বিরাট যুগের অবসান ঘটলো। এমন একজন নিঃস্বার্থ, আবেগপ্রবণ এবং দূরদর্শী প্রশাসক আর হয়তো ভারতীয় ফুটবলে দেখা যাবে না। তাঁর অভাব মোহনবাগান ক্লাব এবং সমগ্র ভারতীয় ক্রীড়ামহল পদে পদে অনুভব করবে। তাঁর মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কর্মকর্তারাও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ময়দানের এই দুই প্রধান ক্লাবের মধ্যে মাঠে যতই রেষারেষি থাকুক না কেন, মাঠের বাইরে যে এক অদ্ভুত ভ্রাতৃত্ববোধ রয়েছে, টুটু বসু ছিলেন সেই ভ্রাতৃত্ববোধের অন্যতম প্রতীক।

শ্রদ্ধাঞ্জলি ও ভবিষ্যৎ আজ যখন টুটু বসু আমাদের মধ্যে নেই, তখন তাঁর দেখানো পথ এবং তাঁর আদর্শই মোহনবাগান ক্লাবের আগামী দিনের পাথেয় হওয়া উচিত। তিনি যে আবেগ এবং ভালোবাসা দিয়ে ক্লাবকে লালন পালন করেছিলেন, বর্তমান এবং আগামী দিনের প্রশাসকদের সেই একই আবেগ নিয়ে কাজ করে যেতে হবে। টুটু বসু শারীরিক ভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও, মোহনবাগান ক্লাবের প্রতিটি ইঁটে, প্রতিটি ট্রফিতে এবং অগণিত সমর্থকদের হৃদয়ে তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।

সবুজ-মেরুন পতাকার প্রতিটি পতপত শব্দে যেন আজও শোনা যায় তাঁর সেই পরিচিত গলা। গঙ্গার ধারের ওই ক্লাব তাঁবু যতদিন থাকবে, যতদিন বাংলার বুকে ফুটবল বেঁচে থাকবে, স্বপনসাধন (টুটু) বসুর নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে। তিনি ছিলেন মোহনবাগানের এক সত্যিকারের রূপকার, একজন প্রকৃত অভিভাবক এবং একজন অকৃত্রিম ফুটবল প্রেমী। তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করি। তাঁর এই অকাল প্রয়াণে শোকস্তব্ধ ময়দান আজ তাঁকে এক বাক্যে জানাচ্ছে—বিদায়, কিংবদন্তি। আপনি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল সবুজ-মেরুন হয়েই থাকবেন।

Preview image