Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

প্রয়াত পীযূষ পাণ্ডে: ভারতীয় বিজ্ঞাপনের যুগান্তকারী স্রষ্টার বিদায়

ভারতের কিংবদন্তি অ্যাডম্যান পীযূষ পাণ্ডে প্রয়াত হয়েছেন, বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতীয় বিজ্ঞাপনের জগতে এনে দিয়েছিলেন নতুন মাত্রা— ‘ফেভিকল’, ‘ক্যাডবেরি’, ‘ভোডাফোন’-এর মতো ব্র্যান্ডকে উপহার দিয়েছিলেন স্মরণীয় প্রচারাভিযান। তাঁর সৃষ্টিগুলো প্রমাণ করে গিয়েছে, বিজ্ঞাপন কেবল বিক্রির নয়, অনুভূতিরও গল্প।

প্রয়াত পীযূষ পাণ্ডে: ভারতীয় বিজ্ঞাপনের যুগান্তকারী স্রষ্টার বিদায়

ভারতের বিজ্ঞাপনী জগতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। প্রয়াত হলেন কিংবদন্তি অ্যাডম্যান, ওগিলভি ইন্ডিয়ার প্রাক্তন চিফ ক্রিয়েটিভ অফিসার পীযূষ পাণ্ডে। বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞাপনের প্রাণকেন্দ্র— এমন এক সৃজনশীল মন, যিনি সাধারণ মানুষকে শুধু বিজ্ঞাপন নয়, গল্প, অনুভূতি ও সংস্কৃতির অংশীদার করেছিলেন।

এক সাধারণ শুরু থেকে অনন্য উচ্চতায়

পীযূষ পাণ্ডের জন্ম ১৯৫৫ সালে জয়পুরে। ছোটবেলায়ই গল্প শোনাতে ও শুনতে ভালোবাসতেন। তাঁর পরিবারে ছিল লেখালেখি ও সৃজনশীলতার পরিবেশ। দিদি প্রতিমা পাণ্ডেও ছিলেন একজন খ্যাতনামা লেখিকা ও বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞ। পীযূষ স্কুলে ও কলেজে ক্রিকেট খেলতেন, এমনকি রাজস্থান রঞ্জি ট্রফি দলেও খেলেছেন। কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরল যখন তিনি ওগিলভি অ্যান্ড মাদার (Ogilvy & Mather)–এর সঙ্গে যুক্ত হলেন।

প্রথমে তিনি কপিরাইটার হিসেবে যোগ দেন, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি, ভাষার সহজতা ও মানুষের আবেগকে বোঝার ক্ষমতা দিয়ে আলাদা হয়ে ওঠেন। ১৯৮২ সালে শুরু হওয়া তাঁর বিজ্ঞাপনী যাত্রা ধীরে ধীরে ভারতীয় বিজ্ঞাপনের চেহারাই বদলে দিল।

বিজ্ঞাপনের ভাষায় এনে দিলেন মানবিক ছোঁয়া

পীযূষ পাণ্ডের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর “ইন্ডিয়াননেস”— অর্থাৎ ভারতীয়তার ছাপ। পশ্চিমা ঢঙের বিজ্ঞাপনের ভিড়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, স্থানীয় ভাষা, হাস্যরস, সংস্কৃতি ও আবেগ দিয়েও কত গভীরভাবে মানুষের মনে পৌঁছানো যায়।

‘ফেভিকল কা জোড়’— এই একটিমাত্র বিজ্ঞাপনই যথেষ্ট তাঁর প্রতিভার পরিচয় দিতে। কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিও, যেখানে গ্রামের বাসে অতিরিক্ত যাত্রী বসে আছে বা মুরগি ডিম পাড়ছে ফেভিকল লাগানো জায়গায়— মজার ছলে বলা সেই গল্প ভারতীয় সমাজের সারল্য আর বুদ্ধিমত্তাকে একত্রে ফুটিয়ে তুলেছিল। ফেভিকল আজও ভারতের অন্যতম শক্তিশালী ব্র্যান্ড, যার পেছনে পীযূষ পাণ্ডের সৃজনশীল মস্তিষ্কই মূল চালিকাশক্তি।

আরেকটি অবিস্মরণীয় কাজ— ক্যাডবেরি ডেয়ারি মিল্কের “কুছ খাস হ্যায়” প্রচারাভিযান। ক্রিকেট মাঠে এক তরুণীর আনন্দনৃত্যের সেই দৃশ্য কেবল একটি চকলেট বিক্রির বিজ্ঞাপন নয়; সেটি ছিল এক প্রজন্মের মুক্তচিন্তার প্রতীক। নারী চরিত্রের সহজ আনন্দ, সমাজের বাঁধন ভেঙে নিজেকে প্রকাশ করার বার্তা— সব মিলিয়ে সেই বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছিল এক সাংস্কৃতিক মুহূর্ত।

গান, রং ও আবেগের এক সিম্ফনি

পীযূষ পাণ্ডে শুধু বিজ্ঞাপন নির্মাতা নন, তিনি ছিলেন গল্পকার। তাঁর কাজের মূল মন্ত্র ছিল— “মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাও, বাকিটা ব্র্যান্ড নিজেই করবে।”

‘এশিয়ান পেন্টস’-এর ‘হর খুশি মেঁ রং হ্যায়’ স্লোগান সেই দর্শনেরই প্রতিফলন। ঘরের রং নিয়ে এমন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি খুব কম বিজ্ঞাপনে দেখা যায়। সেখানে রং মানে শুধু দেয়ালের নয়, জীবনেরও।

তাঁর কাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’— ভারতের ঐক্যের প্রতীক সেই গান। ১৯৮৮ সালে দোর্দর্শনে প্রথম সম্প্রচারিত এই গান আজও ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অঙ্গ। পীযূষ পাণ্ডে এর গীতিকার ছিলেন। “ভাষা আলাদা, সুর এক”— এই ভাবনা আজও প্রাসঙ্গিক।

সাফল্যের স্বীকৃতি ও পুরস্কার

পীযূষ পাণ্ডে ছিলেন এমন একজন স্রষ্টা যাঁর কাজ শুধু দর্শকের ভালোবাসাই পায়নি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। তিনি একাধিকবার ক্যানস লায়ন্স (Cannes Lions)-এ পুরস্কৃত হয়েছেন, যা বিজ্ঞাপনের বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মানগুলির একটি।

২০১৬ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়া তিনি ব্রিটিশ অ্যান্ড ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্স থেকে “লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড” পেয়েছিলেন। তাঁর সহকর্মী ও শিষ্যরা তাঁকে আদর করে বলতেন “দ্য বিগ ম্যান অফ স্মল স্টোরিজ”— কারণ তিনি ছোট গল্পে গড়ে তুলতেন বিশাল অনুভূতি।

সৃজনশীলতার দর্শন: বিজ্ঞাপন মানে গল্প বলা

পীযূষ পাণ্ডে প্রায়ই বলতেন, “Advertising is not about selling products, it’s about connecting people.” তাঁর কাছে বিজ্ঞাপন ছিল সমাজের আয়না। তিনি বিশ্বাস করতেন, যদি কোনো প্রচারাভিযান মানুষের মুখে হাসি আনতে পারে বা তাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তাহলে সেই প্রচারই সফল।

তাঁর অফিসের দরজায় নাকি সবসময় খোলা থাকত— নতুন আইডিয়া নিয়ে কেউ এলে তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তিনি তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহ দিতেন, “নিজের সংস্কৃতিকে চিনো, নিজের ভাষায় ভাবো, তাহলেই তোমার কাজ মানুষের মনে থাকবে।”

রাজনীতি, সামাজিক বার্তা ও ব্র্যান্ড ইমেজ

যদিও তাঁর বেশিরভাগ কাজ বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন নিয়ে, তবু সামাজিক বার্তা প্রচারের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। “মিলে সুর মেরা তুমহারা”-র পাশাপাশি তিনি বহু সমাজসচেতন প্রচারাভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— যেমন, ভোট দেওয়ার সচেতনতা, কন্যাশিক্ষা, পরিবেশ রক্ষা ইত্যাদি।

news image
আরও খবর

রাজনৈতিক প্রচারের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির নির্বাচনী প্রচারে তাঁর সৃজনশীল পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল। যদিও তিনি নিজে কখনো সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হননি, তাঁর বিশ্বাস ছিল— “রাজনীতি নয়, মানুষের উন্নয়নই হোক প্রচারের মূল বার্তা।”

এক মানুষ, যিনি ছিলেন গল্পের ভেতরে

সহকর্মীরা বলেন, পীযূষ পাণ্ডে কখনো নিজেকে ‘বিজ্ঞাপন নির্মাতা’ ভাবতেন না; বরং তিনি ছিলেন গল্পকার, দর্শক ও চরিত্রের মাঝের সেতু। অফিসে তিনি ছিলেন হাসিখুশি, প্রাণবন্ত, এবং অগাধ ধৈর্যের অধিকারী। তাঁর লেখা বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্টে সাধারণ মানুষ, তাদের ভাষা ও জীবন যেভাবে উঠে এসেছে, তা আজও অনন্য।

একবার এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “আপনার সবচেয়ে প্রিয় বিজ্ঞাপন কোনটি?” তিনি হেসে বলেছিলেন, “যেটা এখনও বানাইনি। কারণ সেরা কাজ সবসময় সামনে পড়ে থাকে।”

এই উত্তরেই বোঝা যায়, তাঁর সৃজনশীলতা কখনও থেমে থাকেনি।

সহকর্মীদের শ্রদ্ধা ও প্রয়াণের পর প্রতিক্রিয়া

তাঁর প্রয়াণের খবরে দেশের বিজ্ঞাপন জগৎ যেন স্তব্ধ। ওগিলভির বর্তমান প্রধান বললেন, “আমরা শুধু একজন সহকর্মী হারাইনি, আমরা হারিয়েছি এক অনুপ্রেরণা।”

বলিউড থেকে শুরু করে ব্যবসা ও শিল্প জগত— সর্বত্র শ্রদ্ধা ও শোকের বার্তা এসেছে। অমিতাভ বচ্চন টুইট করেছেন, “পীযূষ পাণ্ডে শুধু বিজ্ঞাপন বানাননি, তিনি মানুষের গল্প বলেছেন। তাঁর সৃষ্টিগুলো আমাদের হৃদয়ে চিরজীবী থাকবে।”

ক্রিকেটার সুনীল গাভাস্কার লিখেছেন, “তিনি মাঠের বাইরেও খেলতেন, আর প্রতিটি বিজ্ঞাপনেই করতেন ছক্কা।”

বিজ্ঞাপনের জাদুকর, যিনি জীবনকেও ব্র্যান্ডে পরিণত করেছিলেন

পীযূষ পাণ্ডের সাফল্য শুধু তাঁর সৃষ্টিতে নয়, তাঁর ভাবনায়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন— বিজ্ঞাপন মানে কৃত্রিমতা নয়, বরং জীবনের সরল মুহূর্তগুলোকে তুলে ধরা। তাঁর কাজ ভারতীয় বিজ্ঞাপনের জন্য যা করেছে, তা যেমন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সাংস্কৃতিকভাবেও প্রভাবশালী।

তিনি বিজ্ঞাপনকে এক শিল্পে পরিণত করেছিলেন— যেখানে গল্প, সঙ্গীত, রং, আবেগ ও সমাজ মিলেমিশে তৈরি হয় এক সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা। তাঁর স্লোগান, তাঁর জিঙ্গল, তাঁর হাস্যরস— সবই ভারতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে।

এক অনন্ত উত্তরাধিকার

আজ পীযূষ পাণ্ডে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট জগৎ বেঁচে আছে প্রতিটি টেলিভিশন ফ্রেমে, প্রতিটি ব্র্যান্ডের গল্পে। ফেভিকল-এর বাসে গাদাগাদি করে বসা যাত্রীদের মতোই তাঁর চিন্তাধারা আমাদের মনে গেঁথে গেছে অবিচ্ছেদ্যভাবে।

বিজ্ঞাপনের সেই শিল্পী দেখিয়ে গেছেন— বিক্রি নয়, সংযোগই বিজ্ঞাপনের মূল শক্তি। তাঁর প্রতিটি কাজ যেন বলে, “মানুষের গল্পই সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড।”

চার দশকের সৃজনশীল পথচলা শেষে আজ তিনি অদৃশ্যের পথে পা রাখলেন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর লেখা, তাঁর স্লোগান— “ফেভিকল কা জোড়”, “কুছ খাস হ্যায়”, “হর খুশি মেঁ রং হ্যায়”— এইসব শব্দরেখা ভারতের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে।

সমাপ্তি: গল্প শেষ, কিন্তু প্রতিধ্বনি রয়ে গেল

পীযূষ পাণ্ডে চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর কাজই তাঁর জীবনের আসল পরিচয়। তিনি ছিলেন এমন এক স্রষ্টা, যিনি প্রমাণ করে গেছেন— সৃজনশীলতা মানে শুধু কল্পনা নয়, বরং বাস্তব জীবনের সৌন্দর্যকে নতুন চোখে দেখা।

 

Preview image