Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

১ কেজি চালে কতটা ডাল দিলে প্রতিবারই ধোসার ব্যাটার হবে নরম ও অতুলনীয়

বিখ্যাত শেফ রাজশেখর চিন্নাস্বামীর পরামর্শ মেনে চললে ধোসার ব্যাটার হবে একদম মসৃণ আর প্রতিটি ধোসা বেরোবে নিখুঁত স্বাদ ও টেক্সচারে।

বাড়িতে ধোসা বানানো নতুন কোনও বিষয় নয়। বহু পরিবারেই সপ্তাহান্তে কিংবা বিশেষ দিনে ধোসা তৈরি হয়। কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রতিবার ধোসার স্বাদ একরকম হয় না। কখনও ধোসা বেশি নরম হয়ে যায়, কখনও আবার শক্ত ও রাবারের মতো লাগে। কখনও রঙ ঠিক আসে না, আবার কখনও প্যান থেকে তুলতেই ভেঙে যায়। অথচ বাইরে কোনও ভাল দক্ষিণ ভারতীয় রেস্তোরাঁয় গেলে একই ধোসা হয় পাতলা, মুচমুচে, সোনালি রঙের এবং স্বাদে অনন্য। এই পার্থক্যের কারণ আসলে লুকিয়ে রয়েছে ধোসা তৈরির প্রথম ধাপেই, অর্থাৎ ব্যাটার বানানোর পদ্ধতিতে।

বিখ্যাত দক্ষিণ ভারতীয় শেফ রাজশেখর চিন্নাস্বামী বহুবার বলেছেন, ধোসার সাফল্যের প্রায় আশি শতাংশ নির্ভর করে ব্যাটারের উপর। ব্যাটার ঠিক হলে ধোসা ভাল হবেই। ব্যাটার ঠিক না হলে যত ভালো প্যানই ব্যবহার করা হোক না কেন, ফলাফল নিখুঁত হবে না। তাই ধোসা বানানোর আগে ব্যাটার তৈরির প্রতিটি ধাপ ধৈর্য এবং নিয়ম মেনে করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রথমেই আসা যাক উপকরণের সঠিক পরিমাপে। অনেকেই আন্দাজে চাল আর ডাল নেন। এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল হয়। সঠিক নিয়ম হল এক কেজি চালের জন্য এক চতুর্থাংশ ডাল ব্যবহার করা। অর্থাৎ চার ভাগ চাল হলে এক ভাগ ডাল। কাপের হিসাবে ধরলে চার কাপ চালের জন্য এক কাপ ডাল নিলেই নিখুঁত অনুপাত পাওয়া যায়। এর সঙ্গে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যোগ করতে হয়। একটি হল প্রায় পঞ্চাশ গ্রাম ছোলা এবং অন্যটি এক টেবিল চামচ মেথি। এই ছোলা এবং মেথিই ধোসার রঙ, মুচমুচে ভাব এবং হালকা বাদামি আভা এনে দেয়।

চাল এবং ডাল কখনও একসঙ্গে ভিজিয়ে রাখা উচিত নয়। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। চাল আলাদা করে কমপক্ষে পাঁচ ঘণ্টা বা সারা রাত ভিজিয়ে রাখা দরকার। এতে চাল ভালভাবে ফুলে ওঠে এবং পিষতে সুবিধা হয়। ছোলা এবং মেথি একসঙ্গে চার ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলেই যথেষ্ট। ডালের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ভিজিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। আধা ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলেই ডাল পিষতে উপযুক্ত হয়ে যায়।

ভিজানোর আগে চাল এবং ডাল অবশ্যই দুই থেকে তিনবার ভাল করে ধুয়ে নিতে হবে। এতে ধুলো ময়লা ও অতিরিক্ত স্টার্চ দূর হয়। ধোয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন জল পরিষ্কার হয়ে আসে। এরপর এমন বড় পাত্র ব্যবহার করতে হবে যাতে উপাদানগুলির উপর পর্যাপ্ত জল থাকে। জল কম হলে চাল বা ডাল সমানভাবে ফুলবে না। জল এমনভাবে দিতে হবে যাতে চাল এবং ডাল সম্পূর্ণভাবে ডুবে থাকে।

পিষে নেওয়ার ধাপটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে চাল এবং ছোলা একসঙ্গে পিষে নিতে হবে। পিষতে গিয়ে অল্প অল্প করে জল যোগ করতে হবে। একবারে বেশি জল দিলে ব্যাটার পাতলা হয়ে যাবে। চাল এবং ছোলা মসৃণ হয়ে গেলে এরপর মেথি দেওয়া ডাল যোগ করতে হবে এবং আবার পিষে নিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন মিশ্রণটি মাখনের মতো মসৃণ হয়।

এরপর এই দুটি মিশ্রণ একটি বড় পাত্রে নিয়ে হাত দিয়ে ভাল করে মেশাতে হবে। হাত দিয়ে মেশানোর একটি বিশেষ কারণ আছে। এতে ব্যাটারের মধ্যে বাতাস ঢোকে, যা ফারমেন্টেশনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ব্যাটার খুব বেশি জলযুক্ত হওয়া উচিত নয়, আবার খুব বেশি ঘনও নয়। ঠিক মাঝামাঝি কনসিসটেন্সি থাকাই আদর্শ।

এবার আসে ব্যাটার ফোলানোর বা ফারমেন্টেশনের বিষয়টি। এটি সম্পূর্ণভাবে আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে। শীতকালে তাপমাত্রা কম থাকায় ব্যাটার ফোলাতে দশ থেকে বারো ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। গ্রীষ্মকালে আট ঘণ্টার মধ্যেই ব্যাটার ভালভাবে ফুলে ওঠে। ব্যাটার ফুলে উঠলে তার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং হালকা টক গন্ধ বেরোতে শুরু করে।

লবণ যোগ করার সময় নিয়েও অনেকেই ভুল করেন। ব্যাটার ফোলার আগে লবণ দিলে ফারমেন্টেশন ঠিকমতো হয় না। তাই ব্যাটার ভালভাবে ফুলে ওঠার পরেই প্রয়োজন অনুযায়ী লবণ যোগ করা উচিত। এরপর হালকা হাতে আবার একবার মিশিয়ে নিতে হবে।

অনেকে ব্যাটার ফ্রিজে রেখে দেন। শেফদের মতে, সম্ভব হলে ব্যাটার ঘরের তাপমাত্রাতেই রাখা ভাল। এতে স্বাভাবিকভাবে ফারমেন্টেশন হয়। যদি বাধ্য হয়ে ফ্রিজে রাখতে হয়, তাহলে ধোসা বানানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ব্যাটার বাইরে বের করে রাখা উচিত। ব্যাটার ঘরের তাপমাত্রায় না এলে প্যানে ঠিকভাবে ছড়াবে না।

ধোসা বানানোর সময় প্যান প্রস্তুত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে প্যান ভালভাবে গরম করতে হবে। এরপর সামান্য জল ছিটিয়ে দিতে হবে। জল সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে গেলে বুঝতে হবে প্যানের তাপমাত্রা ঠিক আছে। এরপর একটি ভেজা কাপড় দিয়ে প্যান মুছে নিতে হবে এবং সামান্য তেল লাগাতে হবে। এতে ব্যাটার প্যানে লেগে থাকবে না এবং পাতলা করে ছড়ানো যাবে।

news image
আরও খবর

মুচমুচে ধোসা বানানোর জন্য ব্যাটার মাঝখান থেকে প্রান্ত পর্যন্ত গোল করে ছড়িয়ে দিতে হবে। খুন্তি বা বাটির নিচের অংশ ব্যবহার করে ধীরে ধীরে ছড়ানোই সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি। তাপমাত্রা ঠিক থাকলে ধোসা নিজে থেকেই প্যান থেকে উঠতে শুরু করবে। প্রান্তে সামান্য তেল দিলে ধোসা আরও খাস্তা হবে।

এই সমস্ত নিয়ম মেনে চললে ধোসা বানাতে কখনও বেকিং সোডা বা অন্য কোনও রাসায়নিক যোগ করার প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিকভাবেই ব্যাটার ফুলে ওঠে এবং ধোসা হয় নিখুঁত।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ধোসা বানানো কোনও কঠিন কাজ নয়। তবে প্রতিটি ধাপে সঠিক নিয়ম মেনে চলাই আসল চাবিকাঠি। চাল ডালের সঠিক অনুপাত, ভিজিয়ে রাখার সময়, পিষে নেওয়ার কৌশল, ফারমেন্টেশনের ধৈর্য এবং প্যানের সঠিক ব্যবহার এই পাঁচটি বিষয় মেনে চললেই বাড়ির রান্নাঘরেই তৈরি হতে পারে রেস্তোরাঁর মতো মুচমুচে ধোসা। ধোসার আসল জাদু কোনও গোপন উপাদানে নয়, বরং লুকিয়ে আছে যত্ন আর নিয়মের মধ্যেই।

ধোসার স্বাদ আরও উন্নত করতে কয়েকটি ছোট কিন্তু কার্যকর বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। অনেকেই ব্যাটার ঠিকভাবে তৈরি করলেও শেষ ধাপে এসে কিছু সাধারণ ভুল করে বসেন, যার ফলে ধোসা কাঙ্ক্ষিত মুচমুচে ভাব পায় না। প্রথমত, ব্যাটার ঢালার সময় প্যানের তাপমাত্রা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্যান অতিরিক্ত গরম হলে ব্যাটার ঠিকভাবে ছড়াতে পারবে না, আবার খুব ঠান্ডা হলে ধোসা শক্ত হয়ে যাবে। তাই প্রতিটি ধোসা বানানোর আগে প্যানের তাপমাত্রা সামান্য জল ছিটিয়ে পরীক্ষা করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, প্রতিবার ব্যাটার ঢালার আগে প্যান হালকা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে নেওয়া অত্যন্ত দরকারি। এতে প্যানের অতিরিক্ত তাপ কিছুটা কমে এবং ব্যাটার সহজে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এই ছোট অভ্যাসটি মেনে চললেই ধোসার পাতলাতা ও আকার অনেক বেশি সুন্দর হয়।

ধোসা উল্টানো নিয়েও অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি থাকে। প্রকৃতপক্ষে ভালোভাবে তৈরি ধোসা এক পিঠেই মুচমুচে হয়ে ওঠে। ধোসার কিনারা নিজে থেকেই উঠে এলে বুঝতে হবে সেটি তৈরি। তখন চাইলে ভাঁজ করে নেওয়া যায়। যদি বেশি খাস্তা পছন্দ হয়, তাহলে মাঝখানে সামান্য তেল বা ঘি দেওয়া যেতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ব্যাটারের পরিমাণ। একটি ধোসার জন্য বেশি ব্যাটার নিলে তা মোটা হয়ে যাবে এবং মুচমুচে ভাব কমে যাবে। মাঝারি আকারের একটি খুন্তি বা বাটি ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো। ধীরে ধীরে গোল করে ছড়িয়ে দিলে ধোসার গঠন নিখুঁত হয়।

ধোসার স্বাদ বাড়াতে অনেকে ব্যাটারে চিনি বা অতিরিক্ত তেল যোগ করেন। অভিজ্ঞ শেফদের মতে, এর প্রয়োজন নেই। চাল, ডাল, ছোলা ও মেথির সঠিক অনুপাত থাকলেই স্বাভাবিকভাবে ধোসায় হালকা মিষ্টি ভাব এবং সুন্দর রঙ চলে আসে। অতিরিক্ত কিছু যোগ করলে বরং আসল স্বাদ নষ্ট হতে পারে।

পরিবেশনের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার। ধোসা তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবেশন করা উচিত। বেশিক্ষণ রেখে দিলে মুচমুচে ভাব কমে যায়। গরম গরম ধোসার সঙ্গে নারকেল চাটনি বা সাম্বার পরিবেশন করলে স্বাদ আরও বাড়ে।

সবশেষে বলা যায়, ধোসা বানানো শুধুই একটি রান্নার প্রক্রিয়া নয়, এটি ধৈর্য এবং যত্নের কাজ। প্রতিটি ধাপে সময় দেওয়া এবং নিয়ম মেনে চলাই সাফল্যের চাবিকাঠি। এই অভ্যাসগুলি নিয়মিত অনুসরণ করলে বাড়ির রান্নাঘরেই প্রতিবার তৈরি হবে নিখুঁত মুচমুচে ধোসা, যার স্বাদ রেস্তোরাঁর ধোসাকেও টেক্কা দেবে।

Preview image