মাত্র ১০ মিনিটে ডেলিভারি দেওয়ার প্রবণতা আজ এক গুরুতর সামাজিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দ্রুততার এই অমানবিক চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে ডেলিভারি কর্মীদের উপর, যাঁরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামছেন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে, মানসিক চাপও বেড়ে যাচ্ছে। মনে রাখা দরকার, এই কর্মীরাও শুধুমাত্র ডেলিভারি ম্যান নন—তাঁরা কারও বাবা, কারও স্বামী, কারও ছেলে, কারও ভাই। দ্রুত পরিষেবা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যদি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার বিনিময়ে হয়, তবে সেই ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা জরুরি। কয়েক মিনিট দেরি হলে কিছুই নষ্ট হয় না, কিন্তু একটি দুর্ঘটনা পুরো পরিবারের জীবন বদলে দিতে পারে। তাই অতি দ্রুত ডেলিভারির চাপ কমিয়ে মানবিক, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থার দিকেই এগোনো উচিত।
আধুনিক যুগে প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সুবিধার পেছনে যে মূল্য আমরা চুকাচ্ছি, তা কি আমরা সত্যিই অনুধাবন করছি? বিশেষত যখন কথা আসে দশ মিনিটের ডেলিভারি সেবার, তখন এই প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমাদের সুবিধার জন্য, আমাদের তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণের জন্য, একদল মানুষ প্রতিদিন তাদের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে, এবং এই বাস্তবতা আমাদের সবার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
দশ মিনিটে ডেলিভারির এই ধারণা শুনতে যতই আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন, এর পেছনে লুকিয়ে আছে একটি ভয়াবহ সত্য। যে ব্যক্তি আপনার দরজায় পৌঁছাচ্ছে আপনার অর্ডার করা জিনিস নিয়ে, তিনি শুধুমাত্র একজন ডেলিভারি কর্মী নন। তিনি একটি পরিবারের ভরণপোষণকারী, কারও প্রিয় সন্তান, হয়তো একজন নবজাতকের বাবা, বা একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার নিজের স্বপ্ন আছে, আশা আছে, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব আছে। কিন্তু আমাদের অত্যধিক তাড়াহুড়ো এবং অধৈর্যতা তাকে বাধ্য করছে প্রতিটি সেকেন্ডের জন্য লড়াই করতে, ট্রাফিক সিগন্যাল উপেক্ষা করতে, বিপজ্জনক গতিতে গাড়ি চালাতে।
এই দশ মিনিটের চ্যালেঞ্জ শুধুমাত্র একটি সময়সীমা নয়, এটি একটি মানসিক চাপের কারাগার। কল্পনা করুন একজন ডেলিভারি কর্মী প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হচ্ছেন, এবং তার মাথায় শুধুমাত্র একটি চিন্তা - কীভাবে দশ মিনিটের মধ্যে ডেলিভারি সম্পন্ন করবেন। তিনি জানেন, যদি দেরি হয়, তাহলে তার রেটিং কমে যাবে, বোনাস পাবেন না, হয়তো চাকরিও হারাতে পারেন। এই ভয় এবং চাপ তাকে এমন সব ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে যা কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কেউ নেবে না। রাস্তায় লাল সিগন্যাল দেখেও তিনি থামতে পারেন না, কারণ প্রতিটি সেকেন্ড তার জীবিকার সাথে জড়িত।
ডেলিভারি কর্মীদের যে শারীরিক এবং মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়, তা আমাদের অনেকেরই জানা নেই। একজন কর্মী প্রতিদিন গড়ে পঞ্চাশ থেকে সত্তরটি অর্ডার ডেলিভার করেন। প্রতিটি অর্ডারের জন্য দশ মিনিটের সময়সীমা মানে, তাকে ক্রমাগত দৌড়াতে হচ্ছে, যানবাহন চালাতে হচ্ছে, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হচ্ছে, তীব্র রোদে, ভারি বৃষ্টিতে, ঠান্ডায় - সব ধরনের আবহাওয়ায়। তাদের খাওয়ার সময় নেই, বিশ্রামের সময় নেই, এমনকি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার জন্যও তারা সময় পান না। এই অমানবিক পরিস্থিতি তাদের স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
রাস্তার বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। আমাদের শহরের রাস্তাগুলো ইতিমধ্যেই যানজটে পূর্ণ, এবং সেই যানজট ঠেলে দশ মিনিটে ডেলিভারি দেওয়া প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। কিন্তু কোম্পানিগুলো এই অসম্ভবকে সম্ভব করার চাপ দিচ্ছে। ফলস্বরূপ, ডেলিভারি কর্মীরা ভুল পথে গাড়ি চালান, পথচারীদের জন্য বরাদ্দ রাস্তা ব্যবহার করেন, জেব্রা ক্রসিং উপেক্ষা করেন, এবং প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ান। শুধু তাদের নিজেদের জীবন নয়, তারা অন্যদের জীবনও ঝুঁকিতে ফেলছেন, এবং এটি তাদের দোষ নয় - এটি একটি ব্যবস্থাগত সমস্যা যা আমরা সকলে মিলে তৈরি করেছি।
এই সমস্যা শুধুমাত্র শারীরিক নয়, মানসিকও। ডেলিভারি কর্মীরা ক্রমাগত উদ্বেগ, চাপ এবং ভয়ের মধ্যে থাকেন। তারা জানেন যে একটি দেরি তাদের পুরো মাসের আয়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। কাস্টমারদের কাছ থেকে তারা প্রায়ই অসভ্য আচরণ পান যদি কয়েক মিনিট দেরি হয়। কেউ তাদের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে না, কেউ জানতে চায় না তারা কেন দেরি করেছেন। সবাই শুধু তাদের অর্ডার চায়, এবং সেটাও সময়মতো। এই অমানবিক আচরণ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেক কর্মী ডিপ্রেশন, উদ্বেগজনিত সমস্যা এবং অনিদ্রায় ভুগছেন, কিন্তু তাদের এই সমস্যাগুলোর জন্য কোনো সাহায্য বা সহায়তা নেই।
কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বিজ্ঞাপনে দেখায় যে দশ মিনিটে ডেলিভারি একটি অত্যাশ্চর্য সেবা, কিন্তু এই সেবার পেছনের অন্ধকার দিক তারা কখনো দেখায় না। তারা দেখায় না যে কীভাবে একজন কর্মী রাস্তায় দুর্ঘটনায় পড়ছেন, কীভাবে একটি পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারাচ্ছে, কীভাবে একটি সন্তান তার বাবার জন্য অপেক্ষা করছে যে বাবা আর কখনো ফিরবে না। কোম্পানিগুলো শুধুমাত্র তাদের ব্র্যান্ড ইমেজ এবং লাভের কথা চিন্তা করে, কর্মীদের কল্যাণ তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই।
আমরা, ভোক্তা হিসেবে, এই সমস্যার একটি বড় অংশ। আমাদের অধৈর্যতা, আমাদের তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির চাহিদা এই পুরো ব্যবস্থাকে চালিত করছে। আমরা ভুলে যাই যে আমাদের সুবিধার জন্য একজন মানুষ তার জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন। আমরা ভাবি না যে আমাদের অর্ডার করা একটি খাবার বা একটি পণ্য কারও জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা রেটিং সিস্টেমে খারাপ রিভিউ দিই যদি পাঁচ-দশ মিনিট দেরি হয়, কিন্তু আমরা কখনো ভাবি না যে এই রিভিউ একজন কর্মীর জীবিকা নষ্ট করতে পারে, তার পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
অনেক সময় আমরা শুনি ডেলিভারি কর্মীদের দুর্ঘটনার খবর। একটি দুর্ঘটনা মানে শুধু একজন কর্মীর আঘাত নয়, এটি একটি পরিবারের জীবনে অন্ধকার নিয়ে আসে। যদি সেই কর্মী পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হন, তাহলে তার পরিবার কীভাবে চলবে? তার সন্তানদের শিক্ষা কীভাবে চলবে? তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা কীভাবে হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কারও কাছে নেই, কারণ সিস্টেম এমনভাবে তৈরি যে একজন কর্মী সহজেই প্রতিস্থাপনযোগ্য। একজন কর্মী দুর্ঘটনায় পড়লে, কোম্পানি অন্য একজনকে নিয়োগ দেয়, এবং জীবন চলতে থাকে - কিন্তু সেই কর্মীর পরিবারের জীবন থেমে যায়।
মানবিকতার প্রশ্নটি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কি সত্যিই এতটাই অসংবেদনশীল হয়ে গেছি যে একটি পিৎজা বা একটি মুদিপণ্যের জন্য আমরা কারও জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারি? আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ কোথায় চলে গেছে? সমাজ হিসেবে আমরা কি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছে গেছি যেখানে আমাদের সুবিধা সবকিছুর ঊর্ধ্বে? এই প্রশ্নগুলো আমাদের প্রত্যেককে নিজেদের কাছে জিজ্ঞাসা করা উচিত।
সমাধান কিন্তু খুব কঠিন নয়। প্রথমত, কোম্পানিগুলোকে এই অবাস্তব সময়সীমা বাতিল করতে হবে। দশ মিনিটের পরিবর্তে ত্রিশ বা চল্লিশ মিনিট একটি যুক্তিসঙ্গত সময়। এতে কর্মীরা নিরাপদে ডেলিভারি দিতে পারবেন, ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলতে পারবেন, এবং তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে হবে না। দ্বিতীয়ত, কোম্পানিগুলোকে কর্মীদের জন্য উপযুক্ত বীমা, স্বাস্থ্য সুবিধা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান করতে হবে। তৃতীয়ত, রেটিং সিস্টেমে পরিবর্তন আনতে হবে যাতে ছোটখাটো দেরির জন্য কর্মীরা শাস্তি না পান।
ভোক্তা হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। আমরা আরও ধৈর্যশীল হতে পারি, আরও মানবিক হতে পারি। যদি আমাদের অর্ডার পাঁচ-দশ মিনিট দেরিতে আসে, তাহলে সেটা কোনো বড় সমস্যা নয়। আমরা কর্মীদের সাথে সম্মানের সাথে কথা বলতে পারি, তাদের কষ্টের মূল্য দিতে পারি। আমরা এমন কোম্পানিকে সমর্থন করতে পারি যারা তাদের কর্মীদের ভালো রাখে, এবং যেসব কোম্পানি কর্মীদের শোষণ করে তাদের বয়কট করতে পারি।
সরকারেরও ভূমিকা রয়েছে এখানে। ডেলিভারি কর্মীদের অধিকার রক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন করা উচিত। কোম্পানিগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার নিচে ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দিতে নিষেধ করা যেতে পারে। কর্মীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি, কাজের ঘণ্টার সীমা এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা উচিত। নিয়মিত পরিদর্শন এবং লঙ্ঘনের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করার জন্য, কিন্তু কারও জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। দশ মিনিটের ডেলিভারি একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য হতে পারে, কিন্তু এটি একটি মানবিক ব্যর্থতা। আমাদের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে। আমাদের বুঝতে হবে যে কিছু জিনিস অপেক্ষার যোগ্য, এবং মানুষের জীবন যেকোনো সুবিধার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
আসুন আমরা একটি সমাজ তৈরি করি যেখানে প্রত্যেক কর্মীর মর্যাদা আছে, যেখানে কারও জীবনের সাথে খেলা করা হয় না, যেখানে লাভ মানুষের চেয়ে বড় নয়। দশ মিনিটের ডেলিভারি বন্ধ হওয়া উচিত - শুধু কর্মীদের জন্য নয়, আমাদের নিজেদের মানবিকতা রক্ষার জন্যও। কারণ, শেষ পর্যন্ত, যে সমাজ তার শ্রমজীবী মানুষদের মূল্য দেয় না, সেই সমাজ কখনো সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে না।