Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মেঘ রোদ পাহাড়ের খেলায় নতুন স্বর্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার হাতছানি মেখে পর্যটকদের টানছে পোখারিধুরা

চেনা পর্যটনস্থল বাদ দিয়ে যদি একটু ভিন্ন স্বাদ খুঁজে থাকেন, তবে শীতের আদর্শ গন্তব্য হতে পারে মেঘে ঢাকা শান্ত পাহাড়ি গ্ৰাম পোখারিধুরা। কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য, বাঁক পেরোলেই বদলে যাওয়া প্রকৃতি আর নির্জনতার সৌন্দর্য মিলিয়ে এই নতুন ঠিকানাটি এখন হয়ে উঠছে ভ্রমণপ্রেমীদের প্রিয় আশ্রয়।

পোখারিধুরা মেঘ, রোদ আর কাঞ্চনজঙ্ঘার অদৃশ্য দৃশ্য খেলার দেশ

ঘন পাইনে ঢাকা পাহাড়ি ঢাল, তার ফাঁকফোকরে হঠাৎ করে নেমে আসে কুয়াশার আস্ত চাদর। আবার কখনও সেই মেঘ কুয়াশার আড়াল সরে গেলে উঁকি দিতে থাকে তুলোর মতো সাদা আলোছায়ার খেলা। পাহাড়ি গ্রাম পোখারিধুরা যেন প্রকৃতির এহেন রূপান্তরেরই সাক্ষী। শীতের সকালের তীক্ষ্ণ হাওয়া আর দুপুরবেলার উষ্ণ সূর্যালোক মিলেমিশে এখানে তৈরি করে স্বপ্নময় পরিবেশ। নিস্তব্ধ গ্রামটি এখনও জনসমক্ষে খুব বেশি পরিচিত নয়। কিন্তু যারা সত্যিই ‘অফবিট’ ডেস্টিনেশন খুঁজছেন, তাঁদের কাছে পোখারিধুরা এখন ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

গত কয়েক বছরে উত্তরবঙ্গের মানচিত্রে বহু পরিবর্তন এসেছে। পর্যটকদের ভিড়ে ভরে উঠেছে তরাই ডুয়ার্স থেকে শুরু করে দার্জিলিং কালিম্পংয়ের বহু পরিচিত অঞ্চল। হোটেল, রিসর্ট, দোকানপাট, যানজট সব মিলিয়ে যেসব জায়গা একসময় শান্তির ঠিকানা ছিল, সেগুলোও এখন ভিড়ভাট্টার অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে প্রকৃতিপ্রেমীদের একাংশ এখন খুঁজছেন নির্জনতা, নিরিবিলি প্রকৃতি আর স্বস্তির বাতাস। সেই খোঁজে রামধুরা, মাঝিধুরা র মতো গ্রামগুলো যেমন জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তেমনই পর্যটন মানচিত্রে ধীরে ধীরে উঠে আসছে পোখারিধুরা নামটিও।

অরণ্যে লুকিয়ে থাকা এক শান্ত গ্রাম

পোখারিধুরা মূলত এক অরণ্যবেষ্টিত পাহাড়ি গ্রাম। এখনো সেখানে পর্যটকদের ভিড় তেমন নেই। তাই নিঃসঙ্গতা, শান্ত পরিবেশ আর প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে চান এমন ভ্রমণকারীদের কাছে এই জায়গা আদর্শ আশ্রয়। সবুজে মোড়া চারপাশ, দূরে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা পাইনের লম্বা সারি, মাঝে মাঝে পাখির ডাক সব মিলিয়ে শহুরে জীবনের ক্লান্তি নিমেষে ভুলে যায় মন।

এখানকার অন্যতম আকর্ষণ অবশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য। মেঘ সরলে সেই মহিমাময় শ্বেতশুভ্র চূড়া সারাদিন স্পষ্ট দেখা যায়। কখনও আলোয় ঝলমল করে, আবার কখনও কুয়াশার আড়ালে লুকোয়। এই লুকোচুরি দেখতেই অনেকেই আসেন পোখারিধুরা। কাছাকাছি চা বাগানের বিস্তীর্ণ এলাকা আরও বাড়িয়ে তোলে প্রকৃতির রূপ।

পোখারিধুরা নিস্তব্ধতা, মেঘ রোদ আর কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপে মোড়া এক অফবিট স্বর্গ

উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি জনপদগুলির মধ্যে বহু জায়গাই বর্তমানে পর্যটকদের ভিড়, হোটেল, যানজট এবং অতিরিক্ত বাণিজ্যিকতার কারণে তাদের মৌলিক সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। প্রকৃতিপ্রেমীরা তাই খুঁজছেন এমন কিছু স্থান, যেখানে থাকবে শান্তি, নির্জনতা, আর থাকবে প্রকৃতির সঙ্গে একান্তে কাটানোর সুযোগ। ঠিক তেমনই এক অজানা অথচ অপরূপ সুন্দর গ্রাম পোখারিধুরা

প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর নিস্তব্ধতা এবং প্রতিটি বাঁকে পাহাড়ের রূপের নতুন প্রকাশ। এখানে সময় যেন ধীরে বয়ে যায়। মেঘের ভেলা এসে পাহাড়ের কোল ছুঁয়ে যায়, আবার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সূর্যের আলো ভরে ওঠে চারপাশ। পোখারিধুরার এই রূপান্তরশীল আবহ মনকে বারবার ছুঁয়ে যায়।


হাঁটাহাঁটির সৌন্দর্য গ্রাম ঘোরার আসল মজা

এই গ্রামে ঘোরার আসল আনন্দ কোনো নির্দিষ্ট দর্শনীয় স্থানে নয় বরং প্রতিটি হাঁটায়, প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি দৃশ্যে।
পায়ে হেঁটে পাহাড়ি পথ ধরে চলতে চলতে আপনি দেখতে পাবেন

  • পাইনের ঘন অরণ্য

  • কুয়াশায় ঢেকে থাকা সরু রাস্তা

  • উপত্যকায় ছোট ছোট চা–বাগান

  • কাঠের ঘরবাড়ি আর একান্ত গ্রামজীবন

প্রতিটি বাঁকে পাহাড়ের নতুন রূপ দেখা যায়। কখনও মেঘ মাথার উপর নেমে আসে, আবার কখনও সূর্যের আলো পাহাড়ের গায়ে এসে পড়ে সোনালি আভা তৈরি করে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনশীল সৌন্দর্য মন ভরিয়ে দেয়।

হাঁটাহাঁটির অভিজ্ঞতাটি শরীরচর্চার মতো হলেও এর সবচেয়ে বড় উপহার মানসিক শান্তি। শহরের উত্তেজনা, ক্লান্তি ও অনবরত ব্যস্ততার পর এখানে এসে মন সত্যিই বিশ্রাম পায়।


কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য

পোখারিধুরার অন্যতম আকর্ষণ হলো কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন। বিশেষত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এ সময় কাঁচের মতো স্বচ্ছ আকাশ দেখা যায়।

এই সময় পাহাড়চূড়া বরফে মোড়া মহিমাময় রূপে ধরা দেয়। মেঘ সরে গেলে একটানা কয়েক ঘণ্টা কাঞ্চনজঙ্ঘার সাদা দীপ্তি চোখে ধরা পড়ে। এই দৃশ্যের তুলনা নেই।

যদিও পাহাড়ি আবহাওয়া বদলে যায় খুব দ্রুত। তাই কখনও কাঞ্চনজঙ্ঘা না-ও দেখা যেতে পারে। কিন্তু তাতেও মন খারাপ করার কারণ নেই। পোখারিধুরার মেঘ–কুয়াশার খেলাই পর্যটকদের মন ভোলানোর জন্য যথেষ্ট।

রাত নামলে আরেক সৌন্দর্য উন্মোচিত হয় দার্জিলিং শহরের আলো। দূরের পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা আলোয় ভরা শহরটি মনে হয় যেন নক্ষত্রমণ্ডলীর মতো ঝুলে আছে আকাশের নিচে।


পাশাপাশি ঘুরে দেখার জায়গা

পোখারিধুরা ভিড় এড়ানোর জন্য আদর্শ হলেও, এর আশেপাশে আরও কিছু সুন্দর ও অফবিট ডেস্টিনেশন রয়েছে, যা সহজেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘুরে দেখা যায়।

১. দাওয়াইপানি

ডিসেম্বর মাসে গেলে গাছে ঝুলে থাকা কমলালেবু এই গ্রামের প্রধান আকর্ষণ।
এখান থেকে দার্জিলিং পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়ে। শান্ত, নিরিবিলি, আর প্রকৃতির ঘন সান্নিধ্যে ভরপুর এই গ্রাম পর্যটকদের মন জয় করে।

২. মংপু

news image
আরও খবর

সিঙ্কোনা গাছের চাষের জন্য বিখ্যাত মংপু প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে প্রিয়।
এখানে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত বাংলো, যেখানে বারবার তিনি এসেছিলেন বিশ্রাম ও সৃষ্টির তাগিদে।
সিঙ্কোনা গাছ থেকে ওষুধ তৈরি হয়, এবং এখানে দেখা যায় বহু রবার গাছও। অরণ্যঢাকা এই শান্ত গ্রামটি পোখারিধুরা–ভ্রমণকে আরও সমৃদ্ধ করে।


পোখারিধুরা পৌঁছানোর উপায়

পোখারিধুরায় পৌঁছানো অত্যন্ত সহজ।

ট্রেন বা বাসে
পৌঁছতে পারবেন নিউ জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়িতে। এগুলি উত্তরবঙ্গের প্রধান গেটওয়ে।

বিমান
নিকটতম বিমানবন্দর বাগডোগরা
সেখান থেকে গাড়ি করে প্রায় ১.৫–২ ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় পোখারিধুরায়।

  • দূরত্ব

    • NJP → পোখারিধুরা: প্রায় ৫১ কিমি

    • দার্জিলিং → পোখারিধুরা: প্রায় ৩৫ কিমি

পথজুড়ে দেখা মিলবে ঘন সবুজ পাহাড়ি বন, সরু পথ, আর মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম যা যাত্রাকেই করে তোলে উপভোগ্য।


থাকার ব্যবস্থা

পোখারিধুরার কাছাকাছি একটি সুন্দর রিসর্ট রয়েছে, যেখানে রয়েছে

  • পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রুম

  • বারান্দা থেকে পাহাড় দেখার সুযোগ

  • শান্ত পরিবেশ

  • ঘরোয়া খাবারের ব্যবস্থা

প্রকৃতির সান্নিধ্যে একান্তে সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ।

অন্যদিকে মংপুতেও বেশ কিছু থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। চাইলে সেখান থেকেও দিনে দিনে ঘুরে আসা যায় পোখারিধুরা।


শেষ কথা পোখারিধুরার টান

আজকের ব্যস্ত, যান্ত্রিক, চাপপূর্ণ জীবনে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে শুধু শরীর নয় মনেরও বিশ্রাম দরকার। প্রতিদিনের দৌড়ঝাঁপ, কাজের চাপ, যাতায়াতের ক্লান্তি আর অবিরত শব্দদূষণের মধ্যে মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময়ই প্রয়োজন এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারে, প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে। পোখারিধুরা সেই রকমই এক আশ্রয় অন্তরের বিশ্রামের জায়গা।

এই পাহাড়ি গ্রামটির সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখা নয়, অনুভব করার মতো। সকালে ঘুম ভাঙে পাখির ডাক আর মেঘের চাদরে মোড়া উপত্যকার অপার শান্তিতে। পাইনের সুগন্ধ মেশা বাতাস মনকে হালকা করে দেয় মুহূর্তেই। দুপুরবেলা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে রোদ ঝলমল করে ওঠে, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই কুয়াশার আস্তর নেমে আসে। প্রকৃতির এই রূপান্তরশীলতা যেন মনে করিয়ে দেয় জীবনে বদল স্বাভাবিক, আর সেই বদলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সৌন্দর্য।

পোখারিধুরার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর নিস্তব্ধ পরিবেশ। এখানে নেই শহরের কোলাহল, নেই হাইহাই করা মানুষের ভিড়। বরং এখানে আছে নির্জনতা, শান্তি, আর নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ। পাইনের সারি, দূরের পাহাড়চূড়া, মেঘের ভেলা আর কুয়াশার স্নিগ্ধ ছোঁয়া এক অনন্য আবহ তৈরি করে, যা খুব দ্রুত মনকে শান্ত করে। আর সন্ধ্যা নামলে পাহাড় জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নরম নীল অন্ধকার এই সময়ে দূরে দার্জিলিং শহরের আলোকমালা যেন আকাশের নিচে ঝুলে থাকা ছোট ছোট নক্ষত্রের মতো ঝিকমিক করে।

এই গ্রামের সৌন্দর্য শুধু দিনের আলোতেই নয় রাতের নিস্তব্ধতাও সমান মোহময়। শহরের শব্দহীন অন্ধকারে নিজের অস্তিত্বকেই যেন নতুন করে অনুভব করা যায়। যারা মানসিক মুক্তি, প্রশান্তি, স্বস্তি খুঁজছেন, তাঁদের কাছে পোখারিধুরা হয়ে উঠতে পারে আত্মার পুনর্জন্মের স্থান।

পোখারিধুরার টান এটাই প্রকৃতির সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে ওঠা। এখানে এসে মানুষ শিখে যায় কিভাবে ধীরে চলতে হয়, কিভাবে মন স্থির রাখতে হয়, কিভাবে ছোট ছোট সৌন্দর্যের মধ্যেই খুঁজে নিতে হয় আনন্দ। মেঘ কুয়াশা, পাইনের গন্ধ, শীতল বাতাস, পাহাড়ের নীরবতা সব মিলিয়ে এই গ্রাম আপনাকে আবারও প্রকৃতির কোলে ফিরিয়ে নিতে চায়।

যদি শহরের ক্লান্তি পিছনে ফেলে কয়েকটা দিন পুরোপুরি নিজের মতো কাটাতে চান, মোবাইল ইন্টারনেট থেকে একটু দূরে থাকতে চান, মনকে নতুন করে সজীব করতে চান তবে পোখারিধুরা হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণগন্তব্য। এটি নিঃশব্দ, শান্ত, নির্জন, অথচ এমনই উষ্ণ যে আপনাকে প্রকৃতির আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে বলবে এখানেই থাকো, কিছুক্ষণ থেমে যাও, নিজেকে আবার খুঁজে পাও

 

Preview image