Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

হার্দিকের মন্ত্রে তিলকের শতরান বুমরাহর আগুনে স্পেল গুজরাতকে উড়িয়ে জয়ে ফিরল মুম্বই

রবিবার কলকাতার পর সোমবার মুম্বইও জয়ের পথে ফিরল অহমদাবাদে গুজরাত টাইটান্সকে ৯৯ রানে হারিয়ে মরসুমে দ্বিতীয় জয় তুলে নিল মুম্বই ইন্ডিয়ান্স।

রবিবার কলকাতা, সোমবার মুম্বই—আইপিএলের মঞ্চে যেন একের পর এক প্রত্যাবর্তনের গল্প। দীর্ঘদিন জয়ের মুখ না দেখা দুই দলই অবশেষে ঘুরে দাঁড়াল। কলকাতার পর দিনই মুম্বই ইন্ডিয়ান্সও ফিরে পেল জয়ের স্বাদ। অহমদাবাদের মাঠে গুজরাত টাইটান্সকে ৯৯ রানে উড়িয়ে দিয়ে মরসুমে দ্বিতীয় জয় তুলে নিল তারা।

টসে জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল গুজরাত টাইটান্স। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য। মন্থর পিচে ব্যাটিং করা সহজ না হলেও মুম্বইয়ের হয়ে একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিলক বর্মা।

ম্যাচের শুরুটা অবশ্য মুম্বইয়ের পক্ষে মোটেই সুখকর ছিল না। ওপেন করতে নেমে দ্রুত ফিরে যান কুইন্টন ডি কক এবং অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা দানিশ মালেওয়ার। মাত্র চার ওভারের মধ্যেই দুই ওপেনারকে হারিয়ে চাপে পড়ে যায় দল। এরপর সূর্যকুমার যাদবও নিজের খারাপ ফর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি।

এই পরিস্থিতিতে ইনিংস সামলানোর দায়িত্ব নেন নমন ধীর এবং তিলক বর্মা। তবে শুরুতে তিলকের ব্যাটে রান আসছিল না। আগের পাঁচ ইনিংসে মাত্র ৪৩ রান করা এই তরুণ ব্যাটার এ দিনও প্রথম দিকে সংগ্রাম করছিলেন। গুজরাতের বোলারদের সামনে যেন আটকে যাচ্ছিলেন তিনি। দর্শকদের কটাক্ষও শুনতে হচ্ছিল তাঁকে।

কিন্তু ম্যাচের আসল মোড় ঘোরে ১৪তম ওভারের পর স্ট্র্যাটেজিক টাইমআউটে। সেই সময় অধিনায়ক হার্দিক পাণ্ড্য তিলকের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর সেই আক্রমণাত্মক বার্তা যেন নতুন করে জ্বালানি যোগায় তিলকের ব্যাটে।

টাইমআউটের পর সম্পূর্ণ অন্য রূপে দেখা যায় তাঁকে। একের পর এক বড় শট খেলতে শুরু করেন তিনি। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ এবং অশোক শর্মার ওভারে ঝড় তোলেন তিলক। ১৮তম ওভারে তিনটি ছয় ও দুটি চার মেরে ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে দেন। শেষ ওভারেও একইভাবে আক্রমণ চালিয়ে যান।

প্রথম ২২ বলে মাত্র ১৯ রান করা তিলক, পরের ২৩ বলে করেন অবিশ্বাস্য ৮২ রান। মাত্র ৪৫ বলে শতরান পূর্ণ করে তিনি মুম্বইয়ের হয়ে দ্রুততম শতরানের নজির গড়েন। তাঁর এই ইনিংসের উপর ভর করেই ১৯৯/৫-এর বড় স্কোর তোলে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স।

জবাবে ব্যাট করতে নেমেই ধাক্কা খায় গুজরাত টাইটান্স। প্রথম বলেই সাই সুদর্শনকে ফিরিয়ে দেন জসপ্রীত বুমরাহ। পরের ওভারে জস বাটলারও ফেরেন দ্রুত। দুই ওভারে দুই তারকা ব্যাটারকে হারিয়ে চাপে পড়ে যায় গুজরাত।

শুভমন গিল এবং ওয়াশিংটন সুন্দর কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গিল আউট হতেই ম্যাচের ফল অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়। এরপর নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট হারাতে থাকে গুজরাত।

এই ম্যাচে বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন অশ্বনী কুমার। এতদিন বিশেষ ছাপ রাখতে না পারলেও এ দিন তিনি হয়ে ওঠেন ম্যাচের অন্যতম নায়ক। চার ওভারে মাত্র ২৪ রান দিয়ে চারটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন তিনি।

স্পিনারদের দাপটের পাশাপাশি এই ম্যাচে আলাদা করে নজর কাড়লেন জসপ্রীত বুমরাহও। দীর্ঘদিন পর নিজের স্বাভাবিক ছন্দে দেখা গেল মুম্বইয়ের তারকা পেসারকে। নতুন বলে আগুনঝরা স্পেল করে শুরুতেই গুজরাতের ব্যাটিং পরিকল্পনা ভেঙে দেন তিনি। ইনিংসের প্রথম বলেই গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে চাপ বাড়িয়ে দেন প্রতিপক্ষের উপর। তিন ওভারে মাত্র ১৫ রান দিয়ে একটি উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি তাঁর নিয়ন্ত্রিত বোলিং গুজরাতের ব্যাটারদের বড় শট খেলতে দেয়নি। শুধু উইকেট নয়, তাঁর লাইন-লেন্থ এবং গতির মিশ্রণই গুজরাতকে চাপে ফেলে দেয়।

বুমরাহর সঙ্গে সমান তালে ম্যাচে প্রভাব ফেলেছেন মুম্বইয়ের স্পিনাররাও। মন্থর উইকেটকে কাজে লাগিয়ে একের পর এক গুজরাত ব্যাটারকে ভুল শট খেলতে বাধ্য করেন তারা। মিচেল স্যান্টনার নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মিডল ওভারে রান আটকান এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দুটি উইকেট তুলে নেন। অন্যদিকে তরুণ আল্লা গজনফরও দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণ দেখিয়ে গুজরাতের রান তোলার গতি সম্পূর্ণ থামিয়ে দেন। তাঁর ঝুলিতেও আসে দুটি উইকেট।

এ ছাড়াও অশ্বনী কুমার ছিলেন মুম্বইয়ের আর এক বড় নায়ক। নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট তুলে নিয়ে তিনি গুজরাতের শেষ আশা ভেঙে দেন। ফলে কোনও জুটি গড়ে উঠতেই পারেনি। একপ্রান্তে উইকেট পড়েছে, অন্যপ্রান্তে রান আটকে গেছে—এই দুই চাপ সামলাতে পারেনি গুজরাত টাইটান্স।

শুভমন গিল, জস বাটলার, সাই সুদর্শনের মতো তারকা ব্যাটারদের উপস্থিতি সত্ত্বেও দলটি কখনও ম্যাচে ফিরতে পারেনি। শুরুতেই দুই বড় উইকেট হারানোর ধাক্কা সামলাতে না পেরে ক্রমশ ব্যাকফুটে চলে যায় তারা। মিডল অর্ডার থেকেও কেউ লড়াই গড়তে পারেননি। ফলে ব্যাটিং লাইনআপ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

news image
আরও খবর

শেষ পর্যন্ত মাত্র ১০০ রানে অলআউট হয়ে যায় গুজরাত টাইটান্স। ২০০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে এই ধরনের ভেঙে পড়া তাদের জন্য বড় ধাক্কা। আর মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের জন্য এটি ছিল পূর্ণ আধিপত্যের জয়। ৯৯ রানের বিশাল ব্যবধানে ম্যাচ জিতে শুধু দুই পয়েন্টই নয়, নিজেদের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে আনল তারা।

এই জয়ের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হল দলের বিভিন্ন বিভাগে একসঙ্গে পারফরম্যান্স আসা। ব্যাট হাতে তিলক বর্মার শতরান, অধিনায়ক হার্দিক পাণ্ড্যের নেতৃত্ব, বুমরাহর নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং স্পিনারদের কার্যকর আক্রমণ—সব মিলিয়ে এটি ছিল সম্পূর্ণ দলগত সাফল্য। এতদিন যে ছন্দের অভাব দেখা যাচ্ছিল, এই ম্যাচে তার অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে মুম্বই।

বিশেষ করে তিলক বর্মার দুর্দান্ত ইনিংস দলের ব্যাটিং ইউনিটকে নতুন ভরসা দেবে। আর বুমরাহর ছন্দে ফেরা বোলিং আক্রমণকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। হার্দিক পাণ্ড্যের নেতৃত্বও এই ম্যাচে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কঠিন সময়েও কীভাবে খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করতে হয়, তা দেখা গেছে তাঁর আচরণে।

আইপিএলের মতো দীর্ঘ এবং প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টে একটি জয় অনেক সময় শুধু পয়েন্ট টেবিলের অবস্থানই বদলায় না, বদলে দেয় পুরো দলের মানসিকতা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিকনির্দেশও। একটি ভালো জয় দলের ভিতরে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে, হারতে থাকা দলকে আবার জয়ের রাস্তায় ফিরিয়ে আনে এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের জন্য গুজরাত টাইটান্সের বিরুদ্ধে পাওয়া এই জয় ঠিক তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কারণ এই ম্যাচে তারা শুধু জেতেনি, প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে চাপে রেখে একতরফা লড়াইয়ে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। ব্যাটিং, বোলিং এবং নেতৃত্ব—তিন বিভাগেই নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে মুম্বই। একটি দলের কাছে এর চেয়ে ভালো প্রত্যাবর্তন আর হতে পারে না। দীর্ঘদিন প্রত্যাশামতো ফল না পাওয়ার পর এমন জোরালো জয় যে কোনও দলের ড্রেসিংরুমে নতুন শক্তি এনে দেয়।

মুম্বইয়ের মতো সফল ফ্র্যাঞ্চাইজির ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ এই দল জানে কীভাবে বড় টুর্নামেন্ট জিততে হয়, চাপের ম্যাচে কীভাবে পারফর্ম করতে হয় এবং শেষ মুহূর্তে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু যখন ফল আসছিল না, তখন প্রশ্ন উঠছিল দল নির্বাচন, ব্যাটিং অর্ডার, বোলিং কম্বিনেশন এবং অধিনায়কত্ব নিয়েও। সেই সব প্রশ্নের অনেকটাই উত্তর মিলেছে এই ম্যাচে।

সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল ব্যাটিং ইউনিটের ছন্দে ফেরা। তিলক বর্মার শতরান শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, দলের জন্যও বড় স্বস্তি। মিডল অর্ডারে একজন ব্যাটার যখন দায়িত্ব নিয়ে ইনিংস গড়ে ম্যাচ শেষ করতে পারেন, তখন পুরো দল আত্মবিশ্বাস পায়। ওপেনাররা ব্যর্থ হলেও মধ্যক্রম দলকে টেনে তুলতে পারছে—এই বার্তাই প্রতিপক্ষদের জন্য চিন্তার কারণ।

অধিনায়ক হার্দিক পাণ্ড্যের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো ব্যাট হাতে বড় রান করেননি, কিন্তু একজন নেতা হিসেবে সতীর্থদের উজ্জীবিত করার কাজটা করেছেন নিখুঁতভাবে। কঠিন সময়ে সঠিক বার্তা দেওয়া, সঙ্গী ব্যাটারকে আত্মবিশ্বাস জোগানো এবং মাঠে ইতিবাচক শক্তি ধরে রাখা—এই গুণগুলো বড় দলের অধিনায়কের পরিচয় দেয়।

বোলিং বিভাগেও মুম্বই এই ম্যাচে শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। জসপ্রীত বুমরাহর নিয়ন্ত্রিত স্পেল, নতুন বলে আক্রমণাত্মক শুরু এবং স্পিনারদের ধারাবাহিক সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে যে দলটি ধীরে ধীরে ভারসাম্যে ফিরছে। যদি বুমরাহ নিয়মিত ছন্দে থাকেন এবং স্পিনাররা এমন সহায়তা করতে পারেন, তবে মুম্বইকে থামানো কঠিন হবে।

এই ধরনের জয় প্রতিপক্ষ দলগুলোর কাছেও স্পষ্ট বার্তা পাঠায়। মুম্বই হয়তো শুরুটা খারাপ করেছে, কিন্তু তারা এখনও ভয়ংকর প্রতিপক্ষ। যেকোনও দিন তারা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। বড় ব্যবধানে জয় মানে শুধু দুই পয়েন্ট নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনে চাপ তৈরি করাও।

আইপিএলের ইতিহাস বলছে, অনেক দল শুরুতে পিছিয়ে থেকেও পরে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেছে। মুম্বই ইন্ডিয়ান্স নিজেও অতীতে এমন বহুবার করেছে। তাই এই জয় তাদের মরসুমের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতেই পারে। সামনে যদি ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে পয়েন্ট টেবিলে দ্রুত উপরে উঠে আসা সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই জয় দলের মধ্যে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনবে। খেলোয়াড়রা বুঝবে যে তারা এখনও সেরা ক্রিকেট খেলতে সক্ষম। ব্যর্থতার চাপ কমবে, সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে এবং তরুণ ক্রিকেটাররাও নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ পাবে।

সেই দিক থেকে দেখলে, এই জয় মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের কাছে শুধুই দুই পয়েন্ট নয়। এটি ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিশালী ইঙ্গিত, হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার সুযোগ এবং বাকি মরসুমে নতুন করে লড়াই শুরু করার মঞ্চ। যদি তারা এই ছন্দ বজায় রাখতে পারে, তবে আবারও শিরোপার লড়াইয়ে নিজেদের নাম জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে।

একটি জয় অনেক সময় ইতিহাস লেখার শুরু হয়। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের জন্য এই জয়ও হয়তো তেমন একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

Preview image