ডেঙ্গি রোখার হাতিয়ার কি তা হলে চলে এল? মশাবাহিত রোগটি নিয়ে আতঙ্কের অবসান হতে পারে। ডেঙ্গির টিকা আসতে চলেছে এ দেশেও।
ডেঙ্গি—শব্দটা শুনলেই এখন আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন সাধারণ মানুষ। বর্ষা এলেই শহর থেকে গ্রাম, রাজ্য থেকে দেশ—সব জায়গায় ডেঙ্গির দাপট শুরু হয়ে যায়। হাসপাতাল ভর্তি জ্বরের রোগী, প্লেটলেট কমে যাওয়ার ভয়, আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার আতঙ্ক—সব মিলিয়ে ডেঙ্গি যেন এক নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বের বহু দেশেই ডেঙ্গি এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা ডেঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। মশা নিধন, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, ওষুধ আবিষ্কার—সব দিকেই চলছে গবেষণা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এমন কোনও নিশ্চিত উপায় হাতে আসেনি, যা ডেঙ্গিকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে পারে। তবে এবার আশার আলো দেখাচ্ছে জাপানের একটি নতুন টিকা—কিউডেঙ্গা (QDENGA বা TAK-003)।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক এবং ড্রাগ নিয়ামক সংস্থা এই টিকাটিকে অনুমোদন দেওয়ার পথে এগোচ্ছে বলে খবর। যদি সব কিছু ঠিকঠাক থাকে, তাহলে খুব শীঘ্রই ভারতে ডেঙ্গির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষেধক পাওয়া যেতে পারে।
ডেঙ্গি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত এডিস ইজিপ্টি (Aedes aegypti) নামের মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই মশা পরিষ্কার জলে জন্মায় এবং দিনের বেলাতেই বেশি কামড়ায়।
ডেঙ্গি ভাইরাসের চারটি প্রধান ধরন রয়েছে:
এই চার ধরনের ভাইরাসের মধ্যে যে কোনও একটি শরীরে প্রবেশ করলে ডেঙ্গি হতে পারে। একবার ডেঙ্গি হলে শরীরে সেই ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, কিন্তু অন্য ধরনের ভাইরাসে আবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
আর দ্বিতীয়বার সংক্রমণ হলে রোগের তীব্রতা অনেক বেশি হতে পারে। তখন ডেঙ্গি হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গি শক সিনড্রোম পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রাণঘাতী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হন। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা—সব জায়গাতেই ডেঙ্গির প্রকোপ বাড়ছে।
ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো—এমন বহু দেশে ডেঙ্গি একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা।
কারণ:
এই সব কারণে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করতে প্রথম থেকেই মশা নিধনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
যেমন:
বিজ্ঞানীরা Wolbachia ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে মশাকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছেন। এতে মশার শরীরে ডেঙ্গি ভাইরাস বাঁচতে পারে না।
তবে সমস্যা হল—
তাই গবেষকরা এখন মানুষের শরীরেই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করার দিকে জোর দিচ্ছেন।
যেভাবে করোনার সময় টিকা মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, ঠিক তেমনই ডেঙ্গির ক্ষেত্রেও টিকা একটি বড় সমাধান হতে পারে।
কারণ:
এই কারণেই বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গির টিকা নিয়ে গবেষণা চলছে বহু বছর ধরে।
জাপানের বায়োফার্মা সংস্থা Takeda তৈরি করেছে ডেঙ্গির এই নতুন টিকা।
টিকার নাম:
QDENGA (TAK-003)
এটি একটি লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন।
অর্থাৎ—
ডেঙ্গি ভাইরাসের দুর্বল সংস্করণ ব্যবহার করে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা হয়।
এই টিকা শরীরে প্রবেশ করলে—
সবচেয়ে বড় কথা—
চার ধরনের ডেঙ্গি ভাইরাসের বিরুদ্ধেই সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এই টিকা তৈরি করা হয়েছে।
এই টিকাটি ইতিমধ্যেই বিশ্বের ৪১টি দেশে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে—
অনেক দেশ ইতিমধ্যেই টিকাটিকে অনুমোদন দিয়েছে।
ভারতেও এই টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে।
বয়সসীমা:
৪ বছর থেকে ৬০ বছর
৪৮০ জনের উপর পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
চিকিৎসক ও গবেষকরা এই ট্রায়ালের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করছেন।
ভারতে কোনও টিকা অনুমোদনের আগে একাধিক স্তরে পরীক্ষা করা হয়।
এই ক্ষেত্রে দায়িত্বে রয়েছে—
Subject Expert Committee (SEC)
তারা দেখছে:
প্রাথমিক রিপোর্টে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
সব কিছু ঠিক থাকলে—
SEC তাদের রিপোর্ট জমা দেবে
তারপর CDSCO অনুমোদন দেবে
এরপর টিকা বাজারে আসতে পারে।
সম্ভাব্যভাবে দেওয়া হবে:
এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড়।
গবেষকরা বলছেন—
একটি ডোজ় যথেষ্ট নয়।
একাধিক ডোজ় লাগতে পারে।
তবে এটি ডেঙ্গি সংক্রমণ কমাতে বড় ভূমিকা নেবে।
গবেষণায় দেখা গেছে—
৭০%–৮০% পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে।
গুরুতর ডেঙ্গি কমাতে আরও বেশি কার্যকর।
এখন পর্যন্ত বড় কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সাধারণ প্রতিক্রিয়া:
ভারতে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হন।
বর্ষা এলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
যদি এই টিকা অনুমোদন পায়—
তাহলে
টিকা এলেও সতর্কতা জরুরি।
যেমন:
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন—
আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
টিকা, চিকিৎসা ও প্রযুক্তির সাহায্যে ডেঙ্গিকে হারানো সম্ভব।
ডেঙ্গি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ ভাইরাসজনিত রোগ হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর বর্ষা এলেই ভারত-সহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে ডেঙ্গির প্রকোপ বেড়ে যায় এবং হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হন। কখনও প্লেটলেট কমে যাওয়ার ভয়, কখনও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, আবার কখনও শক সিনড্রোম—সব মিলিয়ে ডেঙ্গি সাধারণ জ্বরের থেকেও অনেক বেশি আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে। এতদিন পর্যন্ত এই রোগের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনও ওষুধ বা প্রতিষেধক না থাকায় চিকিৎসকদেরও অনেক সময় শুধুমাত্র উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হয়েছে। ফলে রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল মশা নিয়ন্ত্রণ এবং সচেতনতা।
এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গির বিরুদ্ধে কার্যকর টিকার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বড় অগ্রগতি। জাপানের তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা নিয়ে যে আশার আলো তৈরি হয়েছে, তা শুধু ভারতের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডেঙ্গি কোনও একটি দেশের সমস্যা নয়—এটি একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট। এমন একটি টিকা যদি কার্যকরভাবে সংক্রমণ কমাতে পারে, তাহলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁদের জন্য এই টিকা বড় সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে।
ভারতে এই টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে এবং বিশেষজ্ঞ কমিটি তা খতিয়ে দেখছে—এই খবর সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশা জাগিয়েছে। যদি কেন্দ্রীয় ড্রাগ নিয়ামক সংস্থা অনুমোদন দেয়, তাহলে আগামী দিনে ডেঙ্গি প্রতিরোধে স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। হাসপাতালের উপর চাপ কমবে, গুরুতর রোগীর সংখ্যা কমবে এবং মৃত্যুর হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে ডেঙ্গি নিয়ে যে আতঙ্ক প্রতি বছর ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—টিকা এলেই ডেঙ্গি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয়ে যাবে, এমনটা এখনই বলা যায় না। কারণ ডেঙ্গি একটি পরিবেশ-নির্ভর রোগ, যার সঙ্গে মশা, আবহাওয়া, জলবায়ু এবং মানুষের জীবনযাত্রার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। টিকা সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করবে ঠিকই, কিন্তু মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার পরিবেশ বজায় রাখা, জমা জল সরানো, নিয়মিত ফগিং এবং জনসচেতনতা—এই সব পদক্ষেপও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
ডেঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই আসলে একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এখানে শুধু সরকার বা চিকিৎসকদের ভূমিকা নয়, সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধও অত্যন্ত জরুরি। বাড়ির ছাদে, বারান্দায়, ফুলের টবে বা আশপাশে কোথাও জল জমে থাকলে তা পরিষ্কার করা, মশারি ব্যবহার করা, শরীর ঢেকে রাখা পোশাক পরা—এই ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় সুরক্ষা দিতে পারে। টিকা এই লড়াইকে আরও শক্তিশালী করবে, কিন্তু সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য সম্মিলিত সচেতনতা অপরিহার্য।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস বলছে, বহু মারাত্মক রোগ একসময় মানুষের কাছে আতঙ্কের কারণ ছিল, কিন্তু টিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। যেমন গুটিবসন্ত, পোলিও বা করোনা মহামারি—সব ক্ষেত্রেই টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ঠিক তেমনই ডেঙ্গির ক্ষেত্রেও এই নতুন টিকা ভবিষ্যতের পথ দেখাতে পারে। হয়তো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ডেঙ্গি আর মৃত্যুভয়ের কারণ হয়ে থাকবে না, বরং একটি নিয়ন্ত্রিত রোগে পরিণত হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা নিয়ে যে ইতিবাচক খবর সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। যদি সব পরীক্ষায় সফল হয়ে এই টিকা অনুমোদন পায়, তাহলে ডেঙ্গি প্রতিরোধে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে সেই সঙ্গে সচেতনতা, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এই সব বিষয়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে মেনে চলতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের সচেতনতা যুক্ত হলে ডেঙ্গির মতো ভয়াবহ রোগকেও একদিন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব—এই আশাই এখন দেখছেন চিকিৎসক ও গবেষকেরা।