Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

শুধু হেঁটে আর উপকার মেলে না, ৪২-এর অভিনেত্রীর দাবি কি সত্য? চিকিৎসক শেখাচ্ছেন সহজ কৌশল

দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির তারকা তৃষার বয়স যেন শুধু ক্যালেন্ডারেই ধরা পড়ে। পর্দায় তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই। তাই তাঁর ফিটনেস নিয়ে অনুরাগীদের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। তারই যেন জবাব দিলেন তৃষা।এক কালে কেবল হাঁটাহাঁটি করেই শরীর সুস্থ রাখতেন দক্ষিণী তারকা তৃষা কৃষ্ণন। পেশাজীবনে যখন তিনি মধ্যগগনে ছিলেন, তখনও কঠোর শরীরচর্চা নিয়ে ভাবতে হত না। কিন্তু বয়স ৪০ পেরিয়ে যাওয়ার পর শক্তিবৃদ্ধি, ভারোত্তোলনের মতো ব্যায়ামগুলি রুটিনে যোগ করেছেন অভিনেত্রী। সমাজমাধ্যমের পাতায় কেট্‌লবেল নিয়ে শরীরচর্চা করার ঝলক প্রকাশ করে তাই তিনি লিখেছেন, ‘এক সময়ে ভাবতাম, হাঁটাহাঁটি করাই যথেষ্ট। কিন্তু এখন উইকএন্ডের জন্য গায়ের শক্তি বাড়াচ্ছি ।’

তৃষার বয়স যেন শুধু ক্যালেন্ডারেই ধরা পড়ে। পর্দায় তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই। তাই তাঁর ফিটনেস নিয়ে অনুরাগীদের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। তারই যেন জবাব দিলেন তৃষা। তাঁর ফিট থাকার আসল মন্ত্র শুধু হাঁটা নয়। শক্তিবৃদ্ধিও প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি। কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, ৪০ পেরোনোর পর কি তবে হাঁটাহাঁটির বদলে বেশি করে অন্যান্য ব্যায়াম করা উচিত? এই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত নন ফিজ়িয়োথেরাপিস্ট ও পুষ্টিবিদ অভিজিৎ ভট্টাচার্য।

অভিজিতের মতে, ৪০-এর পর মহিলাদের জন্য হাঁটা যথেষ্ট নয়, এটা বলে দেওয়া যায় না। ধরা যাক, কারও হার্টের রোগ আছে, বা একটি কিডনি রয়েছে, অথবা হাঁটুতে সমস্যা আছে, কিংবা কার্টিলেজের সমস্যা আছে, তাঁরা যদি এখন জিমে গিয়ে কঠোর কায়িক শ্রম করেন, তা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। অর্থাৎ শরীরচর্চার ব্যাপারে একই নিয়ম সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

তবে একই সঙ্গে হাঁটাহাঁটিকে ব্যায়াম বা শরীরচর্চার অন্তর্ভুক্ত করতে চান না ফিজ়িয়োথেরাপিস্ট। তিনি বলছেন, ‘‘হাঁটাহাঁটি কিন্তু ব্যায়াম নয়। তাতে কোনও লাভ হয় না। কিন্তু ব্রিস্ক ওয়াকিং শরীরচর্চার আওতায় পড়ে। আর সেটি হল, জোরে হাঁটা। মনে রাখবেন, হাঁটা আর দ্রুত হাঁটা কিন্তু একেবারে ভিন্ন। এটি এক প্রকার অ্যারোবিক অ্যাক্টিভিটি। এখানে আপনি জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে হাঁটবেন, আপনার হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি পাবে। প্রতি দিন ৩০ মিনিটের এই অভ্যাস হার্টকে শক্তিশালী করে, রক্তচাপ কমায়, ওজন কমাতে সাহায্য করে, মেজাজ ভাল করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু যদি আপনি ধীর লয়ে, গল্প করতে করতে হাঁটেন, তাতে আদপে কোনও লাভ হয় না।’’

ফলে ৪০ পেরিয়ে গেলেই জিমে গিয়ে পরিশ্রম করতে হবে, তার কোনও মানে নেই। বিশেষ করে কোনও রোগ থাকলে, সেই মতো ব্যায়াম করা দরকার। তবে হাঁটাহাঁটি করতে চাইলে, দ্রুত পায়ে হাঁটার অভ্যাস উপকারী হতে পারে।

৪০ বছর বয়স মানুষের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক মোড় পরিবর্তনের সময়। এই বয়সে এসে অনেকেই হঠাৎ করে নিজের শরীর নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন। ওজন বেড়েছে, পেটের মেদ জমেছে, ব্লাড সুগার বা প্রেসারের সমস্যা ধরা পড়েছে—এমন নানা কারণে অনেকে তড়িঘড়ি জিমে ভর্তি হয়ে যান। কিন্তু প্রশ্ন হল—৪০ পেরোলেই কি জিমে গিয়ে কঠোর শরীরচর্চা করা জরুরি? নাকি শরীরের অবস্থা বুঝে ব্যায়ামের ধরন বেছে নেওয়াই বেশি যুক্তিযুক্ত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৪০ পার হলেই হঠাৎ করে কঠিন জিম-ওয়ার্কআউট শুরু করা সব সময় বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং শরীরের অবস্থা, পুরনো অসুখ, জয়েন্টের স্বাস্থ্য, হৃদ্‌যন্ত্রের সক্ষমতা—সব বিবেচনা করে ব্যায়াম নির্বাচন করা উচিত। অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত পায়ে হাঁটা বা ব্রিস্ক ওয়াকিং সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।


বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের পরিবর্তন

৪০-এর পর শরীরে বেশ কিছু স্বাভাবিক জৈব পরিবর্তন ঘটে—

  • মেটাবলিজম কমে যায় – ফলে ক্যালোরি বার্ন কম হয়

  • মাংসপেশি ক্ষয় (Muscle loss) শুরু হয়

  • হাড়ের ঘনত্ব কমে

  • হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে

  • ফ্যাট জমার প্রবণতা বাড়ে

এই কারণে একই খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখলেও ওজন বাড়তে থাকে। বিশেষ করে পেটের মেদ (Visceral fat) বাড়ে, যা ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।


৪০ পেরিয়ে জিমে যাওয়ার প্রবণতা

আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া, ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার, ট্রান্সফরমেশন ভিডিও দেখে অনেকেই হঠাৎ জিমে যোগ দেন। কিন্তু সমস্যা হয় যখন—

  • আগে কখনও নিয়মিত ব্যায়াম করেননি

  • জয়েন্ট পেইন আছে

  • স্লিপ ডিস্ক বা স্পন্ডিলাইটিস আছে

  • হার্টের সমস্যা আছে

এই অবস্থায় হাই-ইনটেনসিটি জিম ট্রেনিং বিপজ্জনক হতে পারে।


কেন কঠোর জিম সব সময় উপযুক্ত নয়

১. ইনজুরির ঝুঁকি

৪০-এর পর লিগামেন্ট ও টেন্ডন নমনীয়তা কমে। ফলে হেভি ওয়েট তুললে চোট লাগার আশঙ্কা বাড়ে।

২. জয়েন্ট স্ট্রেস

হাঁটু, কোমর, কাঁধে অতিরিক্ত চাপ পড়ে।

৩. হার্ট স্ট্রেন

হঠাৎ হাই-ইনটেনসিটি ট্রেনিং হার্টে চাপ ফেলে।

৪. রিকভারি টাইম বেশি

চোট সারতে সময় লাগে।


তবে কি জিম করা যাবে না?

অবশ্যই যাবে—কিন্তু শর্তসাপেক্ষে।

৪০-এর পর জিম করতে হলে—

  • ডাক্তারের ফিটনেস চেকআপ

  • ট্রেনারের গাইডেন্স

  • লো-ইমপ্যাক্ট এক্সারসাইজ

  • লাইট ওয়েট ট্রেনিং

অর্থাৎ লক্ষ্য হবে ফিটনেস, বডি-বিল্ডিং নয়।


দ্রুত পায়ে হাঁটা: নিরাপদ বিকল্প

যাঁরা জিমে যেতে পারেন না বা চান না, তাঁদের জন্য ব্রিস্ক ওয়াকিং অত্যন্ত কার্যকর ব্যায়াম।

কেন উপকারী?

  • জয়েন্টে কম চাপ

  • হার্টের জন্য ভালো

  • ক্যালোরি বার্ন হয়

  • স্ট্যামিনা বাড়ে

  • স্ট্রেস কমে


ব্রিস্ক ওয়াকিং কীভাবে করবেন

সাধারণ হাঁটা আর ব্রিস্ক ওয়াকিং এক নয়।

ব্রিস্ক ওয়াকিং মানে—

  • প্রতি মিনিটে ১০০–১২০ স্টেপ

  • কথা বলা যাবে, কিন্তু গান গাওয়া যাবে না

  • হার্ট রেট বাড়বে

সময়: ৩০–৪৫ মিনিট
ফ্রিকোয়েন্সি: সপ্তাহে ৫ দিন


রোগ থাকলে ব্যায়াম নির্বাচন

৪০-এর পর অনেকেরই কিছু না কিছু অসুখ থাকে। সেই অনুযায়ী ব্যায়াম জরুরি।

১. ডায়াবেটিস

উপকারী—

  • ব্রিস্ক ওয়াক

  • সাইক্লিং

  • লাইট স্ট্রেন্থ ট্রেনিং

এতে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ে।

২. হাই ব্লাড প্রেসার

উপকারী—

  • হাঁটা

  • যোগ

  • শ্বাসব্যায়াম

এড়াতে হবে—

  • হেভি ওয়েট

  • হাই-ইনটেনসিটি ট্রেনিং

৩. হার্টের রোগ

ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া জিম নয়। কার্ডিয়াক রিহ্যাব টাইপ ব্যায়াম দরকার।

৪. আর্থ্রাইটিস

লো-ইমপ্যাক্ট ব্যায়াম—

  • হাঁটা

  • সাঁতার

  • ওয়াটার এরোবিক্স


হাঁটার বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত দ্রুত হাঁটলে—

  • LDL কমে

  • HDL বাড়ে

  • ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে

  • ব্লাড প্রেসার কমে

  • ওজন কমে


মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব

৪০-এর পর মানসিক চাপও বাড়ে—

  • কাজের চাপ

  • পারিবারিক দায়িত্ব

  • অর্থনৈতিক চাপ

হাঁটা এন্ডরফিন বাড়ায়, যা “Feel good hormone” নামে পরিচিত।

ফলে—

news image
আরও খবর
  • উদ্বেগ কমে

  • ঘুম ভালো হয়

  • মুড উন্নত হয়


ওজন কমাতে হাঁটা বনাম জিম

বিষয় হাঁটা জিম
ইনজুরি ঝুঁকি কম বেশি
ক্যালোরি বার্ন মাঝারি বেশি
দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বেশি মাঝারি
জয়েন্টে চাপ কম বেশি

৪০-এর পর টেকসই ফিটনেস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


হাঁটার সঠিক ভঙ্গি

  • পিঠ সোজা

  • কাঁধ রিল্যাক্স

  • হাত নাড়ান

  • গোড়ালি আগে মাটিতে

  • চোখ সামনে


কখন হাঁটবেন?

সেরা সময়—

  • ভোর

  • সন্ধ্যা

খাবারের ৩০–৪৫ মিনিট পরে হাঁটা ভালো, বিশেষত ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য।


জিম + হাঁটা: সেরা কম্বিনেশন

অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন—

  • সপ্তাহে ২–৩ দিন লাইট জিম

  • ৫ দিন হাঁটা

এতে স্ট্রেন্থ + কার্ডিও দুটোই হয়।


স্ট্রেন্থ ট্রেনিং কেন দরকার

৪০-এর পর মাংসপেশি কমে (Sarcopenia)।

লাইট স্ট্রেন্থ ট্রেনিং—

  • হাড় মজবুত করে

  • মেটাবলিজম বাড়ায়

  • ফ্যাট কমায়


খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা

শুধু ব্যায়াম নয়, ডায়েট জরুরি।

৪০-এর পর দরকার—

  • প্রোটিন

  • ফাইবার

  • কম কার্ব

  • কম চিনি

  • ভালো ফ্যাট


বিশ্রাম ও ঘুম

রিকভারি খুব জরুরি।

ঘুম কম হলে—

  • ওজন বাড়ে

  • সুগার বাড়ে

  • প্রেসার বাড়ে


মহিলাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা

৪০-এর পর পেরিমেনোপজ শুরু হয়।

সমস্যা—

  • হরমোনাল ওজন বৃদ্ধি

  • হাড় ক্ষয়

  • মুড সুইং

উপকারী—

  • হাঁটা

  • যোগ

  • স্ট্রেন্থ ট্রেনিং


কখন জিম এড়াবেন

  • সার্জারির পর

  • হার্ট অ্যাটাকের পর

  • তীব্র জয়েন্ট পেইন

  • আনকন্ট্রোলড সুগার


প্রেরণার অভাব কাটাবেন কীভাবে

  • ওয়াকিং পার্টনার

  • মিউজিক

  • ফিটনেস ট্র্যাকার

  • স্টেপ গোল


বাস্তবসম্মত লক্ষ্য

৪০-এর পর লক্ষ্য হওয়া উচিত—

  • ফিট থাকা

  • রোগ নিয়ন্ত্রণ

  • এনার্জি বাড়ানো

বডি ট্রান্সফরমেশন নয়।


চিকিৎসকদের পরামর্শ

ফিটনেস শুরু করার আগে—

  • ECG

  • ব্লাড সুগার

  • লিপিড প্রোফাইল

  • BMI


জীবনযাত্রার সামগ্রিক পরিবর্তন

ফিটনেস মানে—

  • ব্যায়াম

  • ডায়েট

  • ঘুম

  • মানসিক স্বাস্থ্য

সব মিলিয়ে “হোলিস্টিক হেলথ”।


উপসংহার

৪০ পেরোলেই জিমে গিয়ে কঠোর শরীরচর্চা করতে হবে—এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং শরীরের অবস্থা, রোগব্যাধি, ফিটনেস লেভেল বুঝে ব্যায়াম নির্বাচন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

যাঁদের কোনও বড় অসুখ নেই, তাঁরা ট্রেনারের তত্ত্বাবধানে জিম করতে পারেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের জন্য নিয়মিত দ্রুত পায়ে হাঁটা এক অত্যন্ত কার্যকর, নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ব্যায়াম।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিয়মিততা। অল্প ব্যায়াম হলেও নিয়মিত করলে তবেই ফল মিলবে।

শেষ কথা—
৪০-এর পর লক্ষ্য হওয়া উচিত ফিট থাকা, শক্তিশালী থাকা, সুস্থ থাকা—প্রদর্শন নয়, প্রতিরোধই আসল ফিটনেস।

Preview image