মেসি কাণ্ড ঘিরে চলা বিতর্কের মাঝেই এবার মুখ খুললেন অভিনেতা অঙ্কুশ হাজরা। সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়া সমালোচনা নিয়ে তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। কীভাবে পুরো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং কোন বিষয়গুলি ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা নিয়েই অঙ্কুশের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কলকাতা এমন এক শহর, যেখানে ফুটবল শুধুই একটি খেলা নয়—এটি আবেগ, সংস্কৃতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ভালোবাসার নাম। মোহনবাগান–ইস্টবেঙ্গল ডার্বির উত্তেজনা থেকে শুরু করে গলির মাঠে খালি পায়ে খেলা শিশুদের চোখে দেখা স্বপ্ন—সব মিলিয়ে এই শহরের সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক গভীর এবং আন্তরিক। সেই শহরেই যখন ঘোষণা হয়, বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি আসছেন, তখন সেই খবর যেন কলকাতার হৃদয়ে একসঙ্গে আনন্দ আর গর্বের ঢেউ তুলে দেয়।
কিন্তু বাস্তবতা সবসময় প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলায় না। মেসির কলকাতা সফর যে স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় বিতর্ক, বিশৃঙ্খলা, ক্ষোভ এবং আত্মসমালোচনার এক দীর্ঘ পর্বে। এই পুরো ঘটনার মধ্যেই উঠে আসে অভিনেতা অঙ্কুশ হাজরার নাম—যিনি একদিকে সমালোচিত, অন্যদিকে আবার সমর্থিত।
এই প্রতিবেদন সেই পুরো কাহিনির বিস্তারিত বিশ্লেষণ—যেখানে রয়েছে আয়োজকের ব্যর্থতা, তারকা সংস্কৃতির প্রভাব, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রায়াল, সাধারণ দর্শকের বঞ্চনা এবং অঙ্কুশের অবস্থান। মেসির মতো একজন কিংবদন্তি ফুটবলারের উপস্থিতি যে কোনও শহরের জন্য গর্বের বিষয়। কলকাতা, যাকে বলা হয় ভারতের ফুটবল রাজধানী, সেখানে মেসির আগমন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু আয়োজনে ঘাটতি, সমন্বয়ের অভাব, নিরাপত্তা প্রশ্ন এবং ভিআইপি সংস্কৃতির বাড়াবাড়ি গোটা বিষয়টিকে নিয়ে যায় এক অন্য দিকে। আর সেই আবহেই অঙ্কুশের মন্তব্য নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
কলকাতা দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে ভারতের ফুটবল রাজধানী বলে দাবি করে এসেছে। এই শহরে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা জার্মানির পতাকা দেখা যায় বিশ্বকাপের সময়। মেসি এখানে শুধু একজন বিদেশি ফুটবলার নন—তিনি বহু মানুষের শৈশবের নায়ক, অনুপ্রেরণা।
তাই যখন শোনা গেল, মেসি কলকাতায় আসবেন, তখন মানুষ ভেবেছিল—এটি হবে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্কুলপড়ুয়া ছাত্র থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী ফুটবলপ্রেমী, সবাই নিজের মতো করে এই মুহূর্তের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। এই পরিস্থিতিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দেন বহু মানুষ। প্রশ্ন ওঠে—এই ধরনের আন্তর্জাতিক ইভেন্টের জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল কি না আয়োজক সংস্থা? আর এখানেই উঠে আসে তারকাদের ভূমিকা, যাঁরা মেসির সঙ্গে ছবি তুলেছেন বা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
কিন্তু যতই আয়োজনের দিন এগোতে থাকে, ততই নানা অস্পষ্টতা সামনে আসতে শুরু করে। অনুষ্ঠানটির প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? এটি কি ফুটবল উন্নয়নের জন্য, নাকি শুধুই এক প্রোমোশনাল ইভেন্ট? সাধারণ দর্শকদের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে?—এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না।
টিকিট বিক্রি, আমন্ত্রণপত্র, ভিআইপি তালিকা—সব কিছু নিয়েই ছিল ধোঁয়াশা।
অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রান্তে যানজট, উত্তেজনা আর বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ অনেক দূর থেকে এসে মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁদের মধ্যে কেউ জানতেন না, কোথা দিয়ে প্রবেশ করতে হবে, আবার কেউ জানতেন না আদৌ তাঁদের প্রবেশাধিকার আছে কি না।
মাঠের ভেতরে তখন ভিন্ন ছবি—তারকা, প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনীতিবিদ ও পরিচিত মুখেদের আনাগোনা। এই বৈপরীত্যই জন্ম দেয় ক্ষোভের।
অনেক দর্শক অভিযোগ করেন, তাঁদের টিকিট থাকা সত্ত্বেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কেউ কেউ বলেন, ভিড় সামলানোর নামে তাঁদের একাধিকবার গেট বদলাতে বলা হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত অনেকে অনুষ্ঠান না দেখেই ফিরে যান।
এই ক্ষোভই পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটায়।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে ছড়িয়ে পড়ে ভিডিও, ছবি এবং ক্ষুব্ধ পোস্ট। সেখানে সরাসরি আঙুল ওঠে আয়োজকদের দিকে। কিন্তু তার পাশাপাশি প্রশ্ন ওঠে—তারকারা কি এই বিশৃঙ্খলার অংশ?
এই জায়গাতেই অঙ্কুশ হাজরার নাম সামনে আসে।
অঙ্কুশ হাজরা টলিউডের জনপ্রিয় মুখ। যুবসমাজের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা যথেষ্ট। মেসির সঙ্গে তাঁর ছবি, মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি অনেকের চোখে পড়ে।
কিছু মানুষের ধারণা তৈরি হয়—তারকাদের জন্য আলাদা সুবিধা দেওয়া হয়েছে, আর সাধারণ দর্শক বঞ্চিত হয়েছেন। এই ধারণা থেকেই অঙ্কুশকে ঘিরে শুরু হয় ট্রোলিং। এই অভিযোগের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় ট্রোলিং। কেউ বলেন, তিনি ব্যক্তিগত প্রচারের জন্য এই সুযোগ ব্যবহার করেছেন। আবার কেউ প্রশ্ন তোলেন, একজন জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে তাঁর কি আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল না?
অঙ্কুশের বিরুদ্ধে অভিযোগের মূল সুর ছিল—তিনি নাকি এই ইভেন্টকে ব্যক্তিগত প্রচারের জন্য ব্যবহার করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, একজন অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা কি অপরাধ? নাকি সমস্যার মূল ছিল পুরো ব্যবস্থাপনায়?
এই বিতর্কের মাঝেই অঙ্কুশ দীর্ঘ সময় নীরব থাকেন।
অবশেষে যখন অঙ্কুশ মুখ খোলেন, তখন তাঁর বক্তব্য ছিল সংযত কিন্তু স্পষ্ট। তিনি বলেন, তিনি শুধুই একজন আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন। আয়োজনে তাঁর কোনও ভূমিকা ছিল না।
তিনি আরও জানান, ফুটবলপ্রেমী হিসেবে মেসিকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পাওয়া তাঁর কাছে আবেগের বিষয় ছিল।
অঙ্কুশ শুধু নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেই থেমে যাননি। তিনি এটাও স্বীকার করেন, হয়তো পুরো পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বোঝা উচিত ছিল।
এই জায়গাতেই তাঁর বক্তব্য অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। কারণ তিনি দায় এড়িয়ে যাননি।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও উঠে এসেছে তারকা সংস্কৃতির প্রশ্ন। যখন কোনও তারকা কোনও বড় ইভেন্টে অংশ নেন, তখন তাঁর উপস্থিতি জনমানসে একটি বার্তা দেয়।
প্রশ্ন হল—তারকারা কি শুধু আমন্ত্রিত অতিথি, নাকি তাঁদের সামাজিক দায়িত্বও রয়েছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুরো কাণ্ডের মূল দায় আয়োজকদের। একটি আন্তর্জাতিক ইভেন্ট মানেই পেশাদার পরিকল্পনা, যা এখানে স্পষ্টভাবে অনুপস্থিত ছিল।
নিরাপত্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, দর্শক অভিজ্ঞতা—সব জায়গাতেই ছিল ঘাটতি।
এই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। এত বড় ভিড়ের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
বিরোধীরা তদন্তের দাবি তোলে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে ফুটবল সংস্কৃতির। মেসির সফর হতে পারত অনুপ্রেরণার উৎস, কিন্তু তা হয়ে দাঁড়ায় হতাশার প্রতীক।
অনেক তরুণ ফুটবলপ্রেমী বলেন, এই অভিজ্ঞতা তাঁদের মন খারাপ করে দিয়েছে।
মিডিয়ার একাংশ এই ঘটনার রিপোর্টিংয়ে দায়িত্বশীল ছিল, আবার একাংশ উত্তেজনা বাড়ানোর অভিযোগেও বিদ্ধ।
সংবেদনশীল শিরোনাম আর ভাইরাল কনটেন্টের দৌড়ে অনেক সময় বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়।
অঙ্কুশের বক্তব্যের পর অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়ান। আবার কেউ বলেন, তিনি আরও আগে কথা বলতে পারতেন।
এই দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়াই দেখায়, সমাজ কতটা বিভক্ত।
মেসি কাণ্ড আমাদের শেখায়—বড় নাম আনলেই বড় ইভেন্ট সফল হয় না। প্রয়োজন পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও দর্শকের প্রতি সম্মান।
তারকাদেরও বুঝতে হবে, তাঁদের উপস্থিতি কী বার্তা দিচ্ছে।
মেসি কাণ্ড ও অঙ্কুশ হাজরার মুখ খোলা শুধুই একটি বিনোদনমূলক বিতর্ক নয়। এটি আমাদের ইভেন্ট সংস্কৃতি, তারকা প্রভাব এবং জনমানসের প্রতিচ্ছবি।
কলকাতা ফুটবল ভালোবাসে। সেই ভালোবাসার সম্মান রাখতে হলে ভবিষ্যতে এমন ভুল আর করা চলবে না।
কারণ ফুটবল আবেগ। আর আবেগ নিয়ে খেললে ক্ষতিটা শুধু একটি ইভেন্টের নয়—একটি প্রজন্মের বিশ্বাসের।
মেসি কাণ্ডে অঙ্কুশ হাজরার মুখ খোলা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে সমালোচনা, অন্যদিকে আত্মপক্ষ সমর্থন—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে এটুকু স্পষ্ট, এই ঘটনার মাধ্যমে তারকা, আয়োজক এবং প্রশাসন—সবারই নিজেদের ভূমিকা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।