Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বাদুড়দের ব্লাড টেস্ট আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে ধরার অনুমতি নিপা আতঙ্কে রক্ত নিয়ে হল RT PCR

আলিপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নবাব মল্লিক: নিপা আতঙ্কে আলিপুর চিড়িয়াখানার বাদুড়দের আরটি-পিসিআর টেস্ট সম্পন্ন হল। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অফ মেডিক্যাল রিসার্চের একটি টিম চিড়িয়াখানার বাদুড়দের রক্ত ও সোয়াবের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছে। ভোরের আলো ফুটতেই নমুনা সংগ্রহ করে চলে যায় ওই টিম।

বাদুড়দের ব্লাড টেস্ট আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে ধরার অনুমতি নিপা আতঙ্কে রক্ত নিয়ে হল RT PCR
Health & Science

কলকাতা: দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে নিপা ভাইরাসের (NiV) পুনরাবির্ভাব সমগ্র ভারতের স্বাস্থ্য মহলে উদ্বেগের ঢেউ তুলেছে। এই আতঙ্কের রেশ ধরে এবার খাস কলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানায় শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন নজরদারি। সম্প্রতি চিড়িয়াখানা প্রাঙ্গণে বসবাসকারী বাদুড়দের শরীর থেকে রক্তের নমুনা এবং সোয়াব (Swab) সংগ্রহ করে আরটি-পিসিআর (RT-PCR) পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এই পদক্ষেপটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণগুলো কী, তা নিয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধান।

 

 


 

১. নিপা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক পরিচয় ও ভৌগোলিক ইতিহাস

নিপা ভাইরাস হলো একটি 'জুনোটিক' ভাইরাস, যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। ১৯ ডিসেম্বর ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার কাম্পুং সুঙ্গাই নিপা নামক গ্রামে প্রথম এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যার নাম থেকেই এর নামকরণ। এটি 'প্যারামিক্সোভিরিডি' (Paramyxoviridae) পরিবারের অন্তর্গত 'হেনিপাভাইরাস' (Henipavirus) গণের সদস্য।

ভারতে নিপা প্রথম হানা দেয় ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে। সেই সময় সংক্রমণের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে নদীয়া এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেরালায় এই ভাইরাসের বারবার ফিরে আসা প্রমাণ করেছে যে, ভারতের কিছু অঞ্চলের বাদুড়রা এই মারণ ভাইরাসের প্রাকৃতিক আধার।


 

২. আলিপুর চিড়িয়াখানা কেন লক্ষ্যবিন্দু?

কলকাতা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত আলিপুর চিড়িয়াখানা শুধুমাত্র বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল নয়, এটি হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এবং স্থানীয় বাদুড়দের প্রিয় বিচরণভূমি।

  • বিশাল গাছপালা: এখানে রয়েছে শতবর্ষী বট, অশ্বত্থ এবং নানা ফলদ গাছ, যা ফলভোজী বাদুড় বা ফ্রুট ব্যাটদের (Pteropus species) আদর্শ বাসস্থান।

  • জনসমাগম: প্রতিদিন এখানে কয়েক হাজার মানুষের আনাগোনা থাকে। যদি কোনো কারণে বাদুড়দের মাধ্যমে এই চত্বরে সংক্রমণ ছড়ায়, তবে তা দ্রুত মহামারী আকার ধারণ করতে পারে।

  • শহুরে বাস্তুসংস্থান: কলকাতার শহুরে কাঠামোয় এই চিড়িয়াখানা একটি গ্রিন জোন, ফলে শহরের অন্যান্য প্রান্তের বাদুড়রাও এখানে নিয়মিত যাতায়াত করে।


 

৩. নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া: এক বিশেষ অভিযান

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি (NIV) এবং আইসিএমআর (ICMR)-এর বিশেষজ্ঞ দলের এই অভিযানটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত।

ভোরের অভিযান

বাদুড়রা নিশাচর হওয়ায় দিনের আলো ফোটার আগেই তারা তাদের আশ্রয়ে ফিরে আসে। বিশেষজ্ঞরা ভোরের অন্ধকার থাকতেই 'মিস্টি নেট' (Mist Net) নামক এক বিশেষ ধরনের সূক্ষ্ম জাল পেতে রাখেন। এই জালে বাদুড়রা আটকে গেলে তাদের শরীর থেকে সতর্কতার সঙ্গে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

সংগৃহীত নমুনার ধরন

বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি বিষয় সংগ্রহ করেছেন:

  1. রক্তের নমুনা: রক্তে ভাইরাসের অ্যান্টিবডি বা সরাসরি আরএনএ-র উপস্থিতি শনাক্ত করতে।

  2. ওরোফ্যারিঞ্জিয়াল সোয়াব: বাদুড়ের মুখ ও গলা থেকে সংগৃহীত লালা।

  3. রেকটাল সোয়াব: মলমূত্রের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে।


 

৪. আরটি-পিসিআর (RT-PCR) পরীক্ষার কারিগরি দিক

নিপা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য আরটি-পিসিআর টেস্ট বর্তমানে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

 

পদ্ধতি:

এই প্রক্রিয়ায় ভাইরাসের আরএনএ-কে প্রথমে রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ এনজাইমের মাধ্যমে ডিএনএ-তে রূপান্তরিত করা হয়। এরপর পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে সেই ডিএনএ-র সংখ্যা কয়েক কোটি গুণ বাড়ানো হয় যাতে অতি ক্ষুদ্র ভাইরাসের উপস্থিতিও ধরা পড়ে।

$$N = N_0 imes 2^n$$

(এখানে $N$ হলো চূড়ান্ত ডিএনএ কপি সংখ্যা এবং $n$ হলো সাইকেল সংখ্যা)

নিপা ভাইরাসের ক্ষেত্রে বিশেষ করে 'N' (Nucleocapsid) এবং 'L' (Polymerase) জিনকে টার্গেট করা হয়। যদি পরীক্ষার রিপোর্টে এই জিনের উপস্থিতি ধরা পড়ে, তবে সংশ্লিষ্ট বাদুড়টিকে পজিটিভ হিসেবে গণ্য করা হয়।


 

৫. বাদুড় ও মানুষের সংঘাত: কেন আমরা ঝুঁকিতে?

বাদুড় মূলত ফল খায়। তারা যখন কোনো পেয়ারা, আম বা খেজুরের রসে মুখ দেয়, তখন তাদের লালায় থাকা নিপা ভাইরাস সেই ফলে মিশে যায়। মানুষ যখন সেই আধখাওয়া ফল অজান্তে গ্রহণ করে, তখন ভাইরাসটি মানবদেহে প্রবেশ করে।

এছাড়াও, খেজুরের রস সংগ্রহের হাড়িগুলোতে বাদুড়রা অনেক সময় বসে বা প্রস্রাব করে। কাঁচা খেজুরের রস পান করার মাধ্যমেও সংক্রমণের প্রবল সম্ভাবনা থাকে। আলিপুর চিড়িয়াখানায় প্রচুর পরিমাণে ফলের গাছ থাকায় কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছেন যে, সেখানকার ফল দর্শনার্থীরা বা অন্য প্রাণীরা গ্রহণ করলে বিপদ ঘটতে পারে।

news image
আরও খবর

 

৬. প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রস্তুতি

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের মতে, এই পরীক্ষাটি ছিল একটি 'প্রিভেন্টিভ সার্ভে' বা আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। নিপা ভাইরাসের মৃত্যুহার (Case Fatality Rate) ৪০% থেকে ৭৫% পর্যন্ত হতে পারে, যা করোনার তুলনায় অনেক গুণ বেশি ভয়াবহ।

 

গৃহীত পদক্ষেপসমূহ:

  • ফল সংগ্রহের ওপর নিষেধাজ্ঞা: চিড়িয়াখানা চত্বরে পড়ে থাকা কোনো ফল যাতে কেউ না ছোঁয়, তার জন্য রক্ষীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • খাঁচার সুরক্ষা: যে সব খাঁচায় প্রাইমেট (বানর, হনুমান) বা অন্যান্য ফলভোজী প্রাণী আছে, তাদের খাবারের থালা যেন খোলা না থাকে, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

  • নিয়মিত স্যানিটাইজেশন: বাদুড়দের আধিক্য আছে এমন গাছতলার এলাকাগুলো বিশেষ রাসায়নিক দিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে।


 

৭. বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় বাদুড়ের গুরুত্ব বনাম জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

এই পরীক্ষার খবর শুনে অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যে বাদুড় নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, বাদুড় পরিবেশের জন্য অপরিহার্য।

  • পরাগায়ন: বহু ফলের পরাগায়ন বাদুড়ের মাধ্যমেই ঘটে।

  • বীজ বিস্তার: বনায়ন প্রক্রিয়ায় বাদুড়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

  • পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ: এক একটি বাদুড় রাতে হাজার হাজার মশা ও ক্ষতিকারক পতঙ্গ খেয়ে ফসল রক্ষা করে।

তাই আলিপুর চিড়িয়াখানায় পরীক্ষার উদ্দেশ্য বাদুড় তাড়ানো বা নিধন করা নয়, বরং তাদের মধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতি জেনে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা প্রচার করা।


 

৮. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে 'One Health' ধারণার ওপর জোর দিচ্ছে। এর অর্থ হলো মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত। আলিপুর চিড়িয়াখানার এই পরীক্ষাটি 'ওয়ান হেলথ' কার্যক্রমেরই একটি অংশ। যদি প্রাণীদের মধ্যে কোনো মারণ ভাইরাসের লক্ষণ আগেভাগে পাওয়া যায়, তবে তা মানুষের মধ্যে আসার আগেই ঠেকানো সম্ভব।


 

৯. ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও গবেষণার দিক

নমুনা পরীক্ষার ফলাফল আসতে সাধারণত কয়েক দিন সময় লাগে। যদি ফলাফল পজিটিভ আসে, তবে:

  1. জিনোম সিকোয়েন্সিং: ভাইরাসের স্ট্রেইনটি কতটা শক্তিশালী তা জানতে জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হবে।

  2. কন্টাক্ট ট্রেসিং: বন্যপ্রাণীদের ক্ষেত্রে এটি কঠিন হলেও, ওই নির্দিষ্ট এলাকার বাদুড়দের গতিবিধি ট্র্যাক করা হবে।

  3. জনসচেতনতা: কলকাতার সাধারণ মানুষকে কাঁচা ফল বা খেজুরের রস খাওয়ার বিষয়ে কড়া সতর্কতা দেওয়া হবে।


 

১০. উপসংহার

আলিপুর চিড়িয়াখানার বাদুড়দের আরটি-পিসিআর পরীক্ষা কলকাতার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার এক অগ্রণী পদক্ষেপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এক অতি-সংবেদনশীল জৈব-মন্ডলে বাস করছি যেখানে সামান্য অসাবধানতা বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে এবং সচেতন থেকে আমরা এই সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো।

রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর এবং চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সম্মিলিতভাবে নজরদারি চালাচ্ছে যাতে শহরবাসী নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। নিপা আতঙ্ক কাটিয়ে এক সুস্থ কলকাতার প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

 

১১. বিশেষ নোট: ভাইরাসের স্পিলওভার মেকানিজম এবং জনস্বাস্থ্যের আগাম সতর্কবার্তা

নিপা ভাইরাসের ক্ষেত্রে 'স্পিলওভার' (Spillover) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক শব্দ। যখন কোনো ভাইরাস তার স্বাভাবিক আধার (যেমন বাদুড়) থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো প্রজাতি বা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, তখন তাকে স্পিলওভার বলা হয়। আলিপুর চিড়িয়াখানায় এই যে রক্ত ও সোয়াব পরীক্ষা করা হলো, তার মূল উদ্দেশ্য হলো এই স্পিলওভারের সম্ভাবনাকে শূন্যে নামিয়ে আনা।

ক. ভাইরাসের লোড ও সংক্রমণের তীব্রতা

গবেষণায় দেখা গেছে, বাদুড়রা যখন প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকে (যেমন খাদ্যাভাব বা পরিবেশের পরিবর্তন), তখন তাদের শরীর থেকে ভাইরাসের নিঃসরণ বা 'শেডিং' (Shedding) বেড়ে যায়। আলিপুর চিড়িয়াখানার মতো জনবহুল এলাকায় বাদুড়রা যদি কোনো কারণে বিরক্ত হয়, তবে তাদের লালা বা মূত্রের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। আরটি-পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দেখতে চাইছেন ওই বাদুড়দের শরীরে ভাইরাল লোড (Viral Load) কতটা।

খ. ক্রস-প্রজাতি সংক্রমণের ঝুঁকি

চিড়িয়াখানায় শুধুমাত্র মানুষ নয়, বরং অন্যান্য খাঁচাবন্দি প্রাণীও রয়েছে। বিশেষ করে ওরাংওটাং, শিম্পাঞ্জি বা অন্যান্য প্রাইমেটদের গঠন মানুষের কাছাকাছি হওয়ায় তাদের সংক্রমিত হওয়ার ভয় থাকে। বাদুড় যদি তাদের খাঁচার ওপরের গাছে বসে এবং ফল ফেলে দেয়, তবে সেই ফল খেয়ে ওই প্রাণীরা অসুস্থ হতে পারে। এই কারণেই নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ দলটি কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি।

গ. পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব

শহরাঞ্চলে নগরায়নের ফলে বাদুড়দের স্বাভাবিক বাসস্থান সংকুচিত হচ্ছে। ফলে তারা মানুষের বসতির কাছাকাছি বা চিড়িয়াখানার মতো নিরাপদ আশ্রয়ে ভিড় করছে। এটি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে দিচ্ছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। আলিপুরের এই ঘটনাটি আসলে আমাদের বাস্তুসংস্থানিক ভারসাম্য বজায় রাখার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।

একটি বিশেষ সতর্কতা: নিপা ভাইরাস মোকাবিলায় কোনো নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা ওষুধ এখনো সর্বজনীনভাবে উপলব্ধ নয়। তাই 'আর্লি ডিটেকশন' (Early Detection) বা দ্রুত শনাক্তকরণই হলো বাঁচার একমাত্র পথ। চিড়িয়াখানার এই পরীক্ষাটি সেই সুরক্ষা কবচেরই প্রথম ধাপ।

Preview image